4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: 2026 > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

 


মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এবং তৎকালীন সর্বাধিক ইবাদতকারী জিন ইবলিশকে আদেশ করেন আদম (আ.)-কে সিজদা করার জন্য। কিন্তু অহংকার ও আত্মঅহমিকার কারণে ইবলিশ এই নির্দেশ অমান্য করে এবং চিরতরে অভিশপ্ত হয়ে যায়। এরপর সে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ চেয়ে নেয় এবং প্রতিজ্ঞা করে যে মানবজাতিকে সে বিভ্রান্ত করবেই।

এই প্রতিজ্ঞার বাস্তবায়ন শুরু হয় আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে প্রেরণের পরপরই। তাঁদের সন্তানদের মধ্যেই মানব ইতিহাসের প্রথম নৈতিক বিচ্যুতি দেখা যায়। হাবিল ছিল সত্যনিষ্ঠ ও আল্লাহভীরু, আর কাবিল ছিল নফসের অনুসারী ও অবাধ্য। ঈর্ষা ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে কাবিল তার সহোদর হাবিলকে হত্যা করে—যা মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ড।

হত্যার পর কাবিল গভীর বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। সে জানত না মৃতদেহের কী করবে। তখন সে এক কাককে অন্য একটি কাকের মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে ফেলতে দেখে। এই দৃশ্য থেকেই কাবিল দাফনের ধারণা পায়। এই ঘটনা কুরআনে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবেই বর্ণিত। কিন্তু পরবর্তীকালে কিছু বিভ্রান্ত গোষ্ঠী এই ঘটনাকে বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে রহস্যবাদী ও শয়তানঘেঁষা দর্শনের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছে।

হত্যার পর কাবিল সত্যের পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ শুরু করে। তার এই পথই পরবর্তীতে একটি বিকৃত জ্ঞানচর্চার ধারায় রূপ নেয়। ইতিহাসে কাবিলের অনুসারীদের থেকেই তথাকথিত “কাবালিস্ট” চিন্তাধারার জন্ম বলে মনে করা হয়। এই কাবালিস্টরা ঐশী ওহির পরিবর্তে গোপন জ্ঞান, তন্ত্র, মন্ত্র, তাবিজ ও অতিপ্রাকৃত শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। তাদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলো পরিচিত হয় “ওকাল্ট টেম্পল” নামে।

এই ধারার প্রকৃত রূপ আরও স্পষ্ট হয় পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারা ১০২ নং আয়াতে। সেখানে উল্লেখ আছে যে শয়তানরা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং সুলাইমান (আ.)-এর নামে এসব অপপ্রচার চালাত। অথচ সুলাইমান (আ.) কখনো কুফরি করেননি। বরং কুফরি করেছিল শয়তানরাই। হারুত ও মারুত নামে দুই ফেরেশতা বাবিল নগরে পরীক্ষাস্বরূপ প্রেরিত হন। তারা যাদুর শিক্ষা দেওয়ার আগে স্পষ্টভাবে সতর্ক করতেন—“আমরা পরীক্ষা মাত্র, কুফরি করো না।”

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যাদু বাস্তব হলেও তা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ক্ষতি করতে পারে না। তবুও মানুষ এমন জ্ঞান অর্জন করত যা তাদের জন্য কল্যাণকর ছিল না, বরং দাম্পত্য সম্পর্ক ধ্বংস করত। স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো ছিল সেই যাদুর অন্যতম ভয়াবহ দিক। কারণ পরিবারই মানব সভ্যতার মূল ভিত্তি। এই ভিত্তিতে আঘাত হানাই শয়তানের অন্যতম প্রধান কৌশল।

ইতিহাসে দেখা যায়, যখন কোনো জাতি নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই তারা যাদু, তাবিজ ও অলৌকিক শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। বনি ইসরাইলদের মধ্যেও এমনটাই ঘটেছিল। দাসত্ব, লাঞ্ছনা ও হতাশার যুগে তারা পরিশ্রম ও সংগ্রামের পরিবর্তে শর্টকাট মুক্তির আশায় যাদুবিদ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সুযোগেই শয়তান তাদেরকে বিভ্রান্ত করে।

এই ধারাবাহিক বিকৃত জ্ঞানচর্চাই পরবর্তীতে ব্যাফোমেট নামক প্রতীকী দর্শনের দিকে এগিয়ে যায়—যা কেবল একটি মূর্তি নয়, বরং শয়তানি আদর্শের একটি সাংকেতিক রূপ।

নাইট টেম্পলার, ওকাল্ট টেম্পল ও ব্যাফোমেটের ঐতিহাসিক উত্থান

কাবালিস্ট ও যাদুবিদ্যার ধারাবাহিকতা কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মধ্যযুগে তা একটি সংগঠিত রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর রূপ নেয়। এই পর্যায়ে ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হয় নাইট টেম্পলার বা তথাকথিত ওকাল্ট টেম্পল নামক গোপন আদেশ।

নাইট টেম্পলারদের পূর্ণ নাম ছিল “খ্রিস্টের দরিদ্র সহযোদ্ধা ও সলোমনের মন্দিরের রক্ষক” (ল্যাটিন: Pauperes commilitones Christi Templique Salomonici)। নাম শুনে ধর্মীয় ও নিষ্ঠাবান একটি সংগঠন মনে হলেও বাস্তব ইতিহাসে তাদের কর্মকাণ্ড ছিল ভয়াবহ ও রক্তাক্ত। ক্রুসেডের নামে তারা মুসলিম বিশ্বে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস অধ্যায়।

১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের সময় ফ্রাঙ্ক বাহিনী ফাতেমীয় খিলাফতের কাছ থেকে জেরুজালেম দখল করার পর ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা তথাকথিত “পবিত্র ভূমি” দর্শনের নামে সেখানে যাতায়াত শুরু করে। এই সুযোগকে সামনে রেখে ১১১৯ সালে ফরাসি নাইট হিউগ ডি পেয়েন্স জেরুজালেমের রাজা বাল্ডউইন ও প্যাট্রিয়ার্ক ওয়ারমুন্ডের কাছে একটি সামরিক–ধর্মীয় আদেশ গঠনের প্রস্তাব দেন। আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়—খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে এই সংগঠনের কাজ।

বাস্তবে কিন্তু চিত্র ছিল ভিন্ন। এই তথাকথিত রক্ষক দলই হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ক্রুসেড ছিল মূলত ধর্মীয় আবরণে চালানো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন।

টেম্পলারদের সদর দফতর স্থাপন করা হয় টেম্পল মাউন্টে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদে, যাকে তারা সলোমনের মন্দির বলে দাবি করত। এখান থেকেই “টেম্পলার” নামের উৎপত্তি। শুরুতে মাত্র নয়জন নাইট নিয়ে গঠিত এই আদেশ ছিল দারিদ্র্যপীড়িত। তাদের প্রতীক ছিল একটি ঘোড়ায় দুই নাইট—যা দারিদ্র্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হতো।

কিন্তু খুব দ্রুতই এই চিত্র বদলে যায়। ক্লেয়ারভাক্সের সেন্ট বার্নার্ড নামক প্রভাবশালী চার্চ নেতার প্রত্যক্ষ সমর্থনে টেম্পলাররা ইউরোপজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করে। ১১২৯ সালে ট্রয়েসের কাউন্সিলে চার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর পোপ ইনোসেন্ট দ্বিতীয় ১১৩৯ সালে এক বিশেষ ফরমান জারি করেন, যার মাধ্যমে টেম্পলারদের করমুক্তি, সীমান্তহীন চলাচল ও স্থানীয় শাসনের ঊর্ধ্বে অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।

এই সিদ্ধান্ত টেম্পলারদের কার্যত একটি “রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র” বানিয়ে তোলে। তারা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাংকিং, জমি মালিকানা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। অনেক মানুষ তাদের কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখত। ফলে টেম্পলাররা শুধু সামরিক শক্তিই নয়, অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়।

কিন্তু এই উত্থানের আড়ালে চলছিল গোপন দীক্ষা অনুষ্ঠান, রহস্যময় আচার ও শয়তানঘেঁষা বিশ্বাসচর্চা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে—তারা গোপনে ব্যাফোমেট নামক এক সত্তার উপাসনা করত। এই ব্যাফোমেট ছিল কোনো সাধারণ মূর্তি নয়; বরং একটি প্রতীকী দর্শন, যেখানে ঐশী বিধানকে উল্টে দেওয়া, নৈতিক সীমা ভাঙা এবং মানুষের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে বসানো হয়।

১৩শ শতাব্দীর শেষদিকে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ক্রুসেডে একের পর এক পরাজয়, বিশেষ করে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর কাছে জেরুজালেম পুনর্দখল, টেম্পলারদের সামরিক গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ইউরোপীয় রাজারা তাদের বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ওঠে।

ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ চতুর্থ ছিলেন টেম্পলারদের সবচেয়ে বড় শত্রু। তিনি তাদের বিরুদ্ধে শয়তান পূজা, কুফরি, অশ্লীল আচার ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। ১৩০৭ সালে রাজা ফিলিপ পোপ ক্লিমেন্ট পঞ্চমের ওপর চাপ সৃষ্টি করে টেম্পলারদের গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করেন। বহু টেম্পলারকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং অনেককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।

শেষ পর্যন্ত ১৩১২ সালে পোপ ক্লিমেন্ট পঞ্চম আনুষ্ঠানিকভাবে নাইট টেম্পলার আদেশ ভেঙে দেন। কিন্তু এই আকস্মিক পতনই টেম্পলারদের ঘিরে অসংখ্য কিংবদন্তি ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জন্ম দেয়। গোপন জ্ঞান, লুকানো ধনসম্পদ এবং ব্যাফোমেটের রহস্য—সব মিলিয়ে টেম্পলার নামটি ইতিহাসে এক অমোচনীয় ছাপ রেখে যায়।

এই পর্যায় থেকেই ব্যাফোমেট ধীরে ধীরে একটি সুস্পষ্ট শয়তানি প্রতীকে পরিণত হয়, যার পূর্ণাঙ্গ রূপ আমরা আধুনিক যুগে দেখতে পাই।


এলিফাস লেভির ব্যাফোমেট, আধুনিক শয়তানবাদ ও Satanic Temple

নাইট টেম্পলারদের পতনের পর ব্যাফোমেট নামটি বহু শতাব্দী ধরে রহস্য ও কিংবদন্তির আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রতীক নতুন রূপে, নতুন ভাষায় এবং নতুন দর্শনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয়। এই পুনর্জাগরণের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন ফরাসি ওকাল্ট দার্শনিক ও যাদুবিদ এলিফাস লেভি।

১৮৫৬ সালে প্রকাশিত তার গ্রন্থ Transcendental Magic: Its Doctrine and Ritual-এ লেভি ব্যাফোমেটের যে চিত্র অঙ্কন করেন, সেটিই আজকের পরিচিত ব্যাফোমেট। এই চিত্র কোনো দৈব শিল্পকর্ম নয়; বরং প্রতিটি উপাদান পরিকল্পিতভাবে শয়তানি দর্শনের প্রতীক হিসেবে নির্মিত।

লেভির ব্যাফোমেট একটি ডানাওয়ালা, ছাগল-মুখবিশিষ্ট, অর্ধ-মানব অর্ধ-পশু অবয়ব। এর কপালে উল্টো পেন্টাগ্রাম, শিংয়ের মাঝে জ্বলন্ত মশাল, এক হাত উপরে ও এক হাত নিচে নির্দেশিত—যার মাধ্যমে বলা হয় “As above, so below”। এই বাক্যাংশ হার্মেটিক দর্শন থেকে নেওয়া, যার মূল কথা হলো—ঐশী ও পার্থিবের মধ্যে কোনো সীমারেখা নেই। অর্থাৎ স্রষ্টা ও সৃষ্টির পার্থক্য মুছে দেওয়া।

ব্যাফোমেটের বাহুতে লেখা থাকে দুটি ল্যাটিন শব্দ—SOLVE (ভাঙো) এবং COAGULA (একত্র করো)। এই শব্দদ্বয় দ্বারা বোঝানো হয় নৈতিকতা, বিশ্বাস ও ধর্মীয় কাঠামো ভেঙে নতুন এক মানবকেন্দ্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা। এখানে আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে মানুষের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে বসানো হয়।

লেভির ব্যাফোমেট একই সঙ্গে পুরুষ ও নারী বৈশিষ্ট্য বহন করে—যা হার্মাফ্রোডাইট রূপ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক প্রাকৃতিক বিভাজনকে অস্বীকার করা হয়। এই দ্বৈততা মূলত সমস্ত প্রাকৃতিক ও নৈতিক সীমা ভাঙার প্রতীক।

এই প্রতীকই পরবর্তীতে আধুনিক শয়তানবাদের কেন্দ্রীয় আইকনে পরিণত হয়।

আধুনিক শয়তানবাদ ও Satanic Temple

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শয়তানবাদ একটি সংগঠিত মতাদর্শ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬৬ সালে আন্তন সজানডোর লা ভে যুক্তরাষ্ট্রে Church of Satan প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৬৯ সালে The Satanic Bible প্রকাশ করেন। লা ভে শয়তানকে কোনো বাস্তব অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে নয়, বরং অহংকার, ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও সীমাহীন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে একবিংশ শতাব্দীতে শয়তানবাদ আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়—রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এই পর্যায়ে আবির্ভূত হয় The Satanic Temple।

Satanic Temple নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী ও যুক্তিবাদী সংগঠন হিসেবে দাবি করে। তারা প্রকাশ্যে বলে—তারা কোনো শয়তানের পূজা করে না। বরং শয়তান তাদের কাছে বিদ্রোহ, সংশয়বাদ এবং কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে তাদের সব কর্মকাণ্ডই ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক কাঠামোকে ভাঙার দিকেই কেন্দ্রীভূত।

এই সংগঠনটি ব্যাফোমেটকে তাদের প্রধান প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তারা ব্যাফোমেটের মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়—বিশেষত সেই সব জায়গায় যেখানে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্মৃতিস্তম্ভ (যেমন Ten Commandments) স্থাপন করা হয়েছে।

তাদের যুক্তি ছিল—যদি একটি ধর্মের প্রতীক রাষ্ট্রীয় জায়গায় রাখা যায়, তবে অন্য ধর্ম বা দর্শনের প্রতীকও রাখা উচিত। এই কৌশলের মাধ্যমে তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে বিতর্কিত করে তোলে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রকাশ্যে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করে।

ডেট্রয়েট, ওকলাহোমা, আরকানসাসসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাফোমেট মূর্তি উন্মোচন উপলক্ষে শত শত মানুষ সমবেত হয়। এই অনুষ্ঠানগুলো অনেকটা হ্যালোইন উৎসব, আন্ডারগ্রাউন্ড রেভ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের সংমিশ্রণ ছিল। ছাগল-মুখবিশিষ্ট বিশাল ব্রোঞ্জ মূর্তি, পেন্টাগ্রাম, কালো পোশাক—সব মিলিয়ে একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক বার্তা দেওয়া হয়।

Satanic Temple দাবি করে—ব্যাফোমেটের দুই পাশে থাকা শিশু মূর্তিগুলো নাকি “ভয়হীনতা ও প্রশ্ন করার স্বাধীনতার প্রতীক”। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের সামনে শয়তানি প্রতীক উপস্থাপন করাই ছিল ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে আঘাত করার কৌশল।

এই সংগঠনটি সমকামী বিবাহ, গর্ভপাত, লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণসহ নানা বিতর্কিত ইস্যুতে শয়তানের প্রতীক ব্যবহার করে সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা করে। তাদের বক্তব্যে শয়তান হলো “আলোকিত বিদ্রোহী”, আর ধর্ম হলো “নৈতিক দমনযন্ত্র”।

এভাবে ব্যাফোমেট আর কেবল একটি মূর্তি নয়—এটি হয়ে ওঠে আধুনিক কুফুরী দর্শনের ভিজ্যুয়াল ম্যানিফেস্টো। ঐশী বিধানের পরিবর্তে মানবিক প্রবৃত্তি, সীমাহীন স্বাধীনতা ও নৈতিক আপেক্ষিকতাকে প্রতিষ্ঠা করাই এর মূল লক্ষ্য।

এই পর্যায়ে এসে স্পষ্ট হয়—ব্যাফোমেট, শয়তানবাদ ও আধুনিক রাজনৈতিক আন্দোলন একই সুতোয় গাঁথা।

কোডেক্স গিগাস, যাদুবিদ্যা, ইলুমিনাতি চর্চা ও চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

ব্যাফোমেট ও আধুনিক শয়তানবাদের আলোচনা থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে—এই দর্শনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি কোথায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় মধ্যযুগীয় এক রহস্যময় গ্রন্থের দিকে, যা ইতিহাসে পরিচিত কোডেক্স গিগাস, বা বহুল আলোচিত “ডেভিলস বাইবেল” নামে।

কোডেক্স গিগাস : শয়তানি কিংবদন্তির কেন্দ্রবিন্দু

ত্রয়োদশ শতকে বোহেমিয়ার একটি খ্রিস্টীয় মঠে রচিত এই অতিকায় পাণ্ডুলিপিটি আকার, বিষয়বস্তু ও কিংবদন্তি—সব দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। প্রায় তিন ফুট লম্বা, এক টনের কাছাকাছি ওজনের এই গ্রন্থে লাতিন বাইবেলের পূর্ণ পাঠের পাশাপাশি রয়েছে ইহুদি ইতিহাস, বিশ্বকোষ, চিকিৎসাবিদ্যা, জাদুবিদ্যা, তাবিজ, ডাইনি শনাক্তকরণ এবং নানা অতিপ্রাকৃত নির্দেশনা।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—এই গ্রন্থের এক পাতায় অঙ্কিত বিশাল শয়তানের প্রতিকৃতি। মধ্যযুগীয় ইউরোপে এমন স্পষ্ট ও একক শয়তানচিত্র বিরল ছিল। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এক সন্ন্যাসী মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচতে এক রাতেই এই গ্রন্থ লেখার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অসম্ভব বুঝে শয়তানের সাহায্য প্রার্থনা করে। বিনিময়ে সে নিজের আত্মা সঁপে দেয়, আর সেই রাতেই শয়তান পুরো গ্রন্থ লিখে ফেলে।

ইতিহাসবিদরা এই কাহিনিকে কিংবদন্তি হিসেবে দেখলেও একটি বিষয় অস্বীকার করতে পারেননি—গ্রন্থটির লেখনশৈলী সম্পূর্ণ একক হাতের লেখা এবং এটি রচনায় বহু বছর সময় লাগার কথা। এই রহস্যই কোডেক্স গিগাসকে শয়তানি জ্ঞানচর্চার প্রতীকে পরিণত করেছে।

এই গ্রন্থের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়—ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি জাদুবিদ্যা ও অতিপ্রাকৃত চর্চাকে একই কভারে আনার প্রবণতা নতুন নয়। আধুনিক ইলুমিনাতি ও ওকাল্ট দর্শন এই মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যেরই পরিশীলিত রূপ।

যাদুবিদ্যা, হার্মেটিজম ও কাব্বালার ধারা

যাদুবিদ্যা মানব ইতিহাসে সর্বত্র বিদ্যমান। পশ্চিমা জাদুবিদ্যার ভিত্তি গড়ে ওঠে মূলত তিনটি উৎস থেকে—হেলেনিস্টিক হার্মেটিজম, ইহুদি কাব্বালা এবং মধ্যযুগীয় আলকেমি। হার্মেটিজম মানুষকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে স্থাপন করে এবং দাবি করে—মানুষ নিজ শক্তিতে বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

কাব্বালা তৌরাতের গোপন ব্যাখ্যার নামে সংখ্যাতত্ত্ব, প্রতীক ও মন্ত্রের মাধ্যমে ঐশী ক্ষমতা আহরণের চেষ্টা করে। আলকেমি বস্তুগত রূপান্তরের আড়ালে আত্মিক ক্ষমতা অর্জনের দর্শন প্রচার করে। এই তিনটি ধারা মিলেই পরবর্তীতে ফ্রিম্যাসনরি, রোসিক্রুশিয়ানিজম ও আধুনিক গুপ্তসংঘের ভিত্তি তৈরি করে।

এই দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—ওহিভিত্তিক ধর্মকে অপ্রাসঙ্গিক করা এবং মানুষের যুক্তি ও ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা। ব্যাফোমেট এই দর্শনেরই প্রতীকী রূপ।

পীর–কবিরাজ ও স্থানীয় ইলুমিনাতি চর্চা

ইলুমিনাতি বা শয়তানি দর্শন সবসময় পাশ্চাত্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উপমহাদেশেও এর বিকৃত প্রতিফলন দেখা যায় পীরবাদ, কবিরাজি ও তথাকথিত অলৌকিক সাধনায়। অজ্ঞতা, হতাশা ও দ্রুত সমাধানের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এসব ভণ্ড সাধকের কাছে টেনে নিয়ে যায়।

এই শ্রেণির লোকেরা ধর্মীয় শব্দ, কুরআনের আয়াতের বিকৃত ব্যবহার, অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের অংশ এবং জিন–প্রেতের ভয় দেখিয়ে মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে। অনেক ক্ষেত্রে নির্জন সাধনা, অপবিত্র আচার ও কুফুরী মন্ত্রের মাধ্যমে তারা তথাকথিত ক্ষমতা অর্জনের দাবি করে।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো—এই সব চর্চার মূল দর্শনও একই: আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার পরিবর্তে মধ্যস্থতাকারী, গোপন জ্ঞান ও অলৌকিক শক্তির ওপর নির্ভরতা। এটি শয়তানের সেই পুরনো কৌশলই, যা আদম (আ.)-এর যুগ থেকে শুরু হয়ে আজও অব্যাহত।

শয়তানের ঘোষিত পরিকল্পনা ও চূড়ান্ত উপলব্ধি

ইতিহাস, ধর্মগ্রন্থ ও বিভিন্ন ওকাল্ট লেখায় শয়তানের যে দর্শন ফুটে ওঠে, তার মূল লক্ষ্য একটাই—মানুষকে আল্লাহর বিধান থেকে সরিয়ে আত্মকেন্দ্রিক স্বাধীনতার মোহে বন্দি করা। কখনো তা জ্ঞানের নামে, কখনো বিদ্রোহের নামে, কখনো আবার অলৌকিকতার মোড়কে উপস্থাপিত হয়।

আদম (আ.)-এর যুগে অহংকার, সুলাইমান (আ.)-এর যুগে যাদুবিদ্যা, মধ্যযুগে টেম্পলার ও আধুনিক কালে ব্যাফোমেট—রূপ বদলালেও উদ্দেশ্য বদলায়নি। প্রতিটি পর্যায়ে শয়তান মানুষকে বলে—প্রশ্ন করো, সীমা ভাঙো, নৈতিকতা অস্বীকার করো, নিজেকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করো।

কিন্তু ঐশী জ্ঞান স্পষ্ট করে দেয়—মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিহিত রয়েছে আনুগত্য, নৈতিকতা ও স্রষ্টার বিধানের মধ্যে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি এই সীমা অতিক্রম করেছে, সে জাতিই শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে গেছে।


উপসংহার

ব্যাফোমেট কোনো বিচ্ছিন্ন মূর্তি নয়; এটি একটি ধারাবাহিক কুফুরী দর্শনের প্রতীক। যাদুবিদ্যা, ইলুমিনাতি, আধুনিক শয়তানবাদ ও ভণ্ড অলৌকিক চর্চা—সবই একই সূত্রে গাঁথা। এসবের মোকাবিলা সম্ভব কেবল সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা ও ঐশী নির্দেশনার প্রতি অবিচল থাকার মাধ্যমে।

আল্লাহ যেন মানবজাতিকে সব প্রকার বিভ্রান্তি ও শয়তানি প্ররোচনা থেকে হেফাজত করেন—এই কামনাই শেষ কথা।

(সমাপ্ত)

সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

সনাতন ধর্ম: পৌরাণিক বিনোদন, আচারসর্বস্বতা ও ক্ষমতার কাঠামোর এক সমালোচনামূলক পাঠ


সনাতন ধর্ম: পৌরাণিক বিনোদন, আচারসর্বস্বতা ও ক্ষমতার কাঠামোর এক সমালোচনামূলক পাঠ

সনাতন ধর্মকে সাধারণত “চিরন্তন” বা “আদিম” ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত পৌরাণিক কাহিনি, আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা, যার ভিত্তি যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর নয়, বরং কল্পনা, ভোগবাদ এবং শ্রেণিভিত্তিক স্বার্থরক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এই ধর্মের আখ্যানভিত্তিক কাঠামো এতটাই রসালো ও নাটকীয় যে, একে অনেক সময় ধর্মের চেয়ে বিনোদনের সংকলন বলাই বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়। দেব-দেবীর লীলা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কাহিনি, প্রতিশোধ, প্রতারণা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে এটি এক বিশাল পৌরাণিক নাট্যভাণ্ডার।


অজ্ঞতার যুগে ভোগবাদ থেকে ধর্মের জন্ম

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের জ্ঞান সীমিত ছিল। প্রকৃতি, রোগ, মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ—এসবের ব্যাখ্যা দিতে না পেরে মানুষ কল্পনাভিত্তিক শক্তির আশ্রয় নেয়। সেই সুযোগেই সমাজের এক বিশেষ শ্রেণি ধীরে ধীরে ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ভোগ-বিলাস, নারীর প্রতি লালসা, মাংসাহার, ক্ষমতা ও প্রাচুর্যের আকাঙ্ক্ষা—এই মানবিক দুর্বলতাগুলোকেই ধর্মীয় বৈধতা দিয়ে সনাতন ধর্মের বহু আচার ও কাহিনি গড়ে ওঠে। দেবতাদের চরিত্রেও সেই একই মানবিক দুর্বলতার প্রতিফলন দেখা যায়, যা একটি “ঐশ্বরিক” ধারণার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।


ধর্মগ্রন্থের ঐতিহাসিক দুর্বলতা ও বৈজ্ঞানিক অসংগতি

সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের রচিত—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের অভাব নেই। এগুলো আদিকাল থেকে সংরক্ষিত কোনো ঐশী গ্রন্থ নয়, বরং আনুমানিক তিন থেকে চার হাজার বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে রচিত সংকলন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব গ্রন্থে অসংখ্য ঐতিহাসিক অসংগতি, গাণিতিক ভুল, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ভ্রান্তি এবং অবৈজ্ঞানিক ধারণা বিদ্যমান। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হাস্যকর ও অবাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে “চিরন্তন সত্য” হিসেবে এসব গ্রন্থের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।


ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষণ ও মুখস্ত করার বাস্তবতা

বিশ্বের অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থই মৌখিক সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরবর্তীতে বহু সংযোজন, বিয়োজন ও বিকৃতির মধ্য দিয়ে গেছে। সনাতন ধর্মের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন পুরাণ ও শাস্ত্রের অসংখ্য সংস্করণ, পরস্পরবিরোধী বর্ণনা ও আঞ্চলিক ভিন্নতা তার প্রমাণ।

এর বিপরীতে দেখা যায়, একমাত্র কুরআনই এমন একটি ধর্মগ্রন্থ, যা স্বাভাবিকভাবে সম্পূর্ণ মুখস্ত করা সম্ভব এবং যার লক্ষ লক্ষ হাফেজ বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রন্থটির পাঠ্যগত বিকৃতি কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অন্য ধর্মগ্রন্থে এমন কোনো সংরক্ষণ কাঠামো দেখা যায় না।


রাষ্ট্র, সমাজ ও নৈতিকতার বিষয়ে দিকনির্দেশনার অভাব

সনাতন ধর্মে রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা মানুষকে নৈতিকভাবে গড়ে তোলার কোনো সুসংগঠিত ও বৈজ্ঞানিক কাঠামো নেই। এখানে ঈশ্বরকেন্দ্রিক মানবগঠন নয়, বরং আচারকেন্দ্রিক আনুগত্যই মুখ্য।

এর বিপরীতে হাজারো যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও রগরগে কাহিনি ধর্মীয় গ্রন্থে স্থান পেয়েছে, যা প্রশ্ন তোলে—একটি ধর্মের ভেতরে এতো অশ্লীল ও ভোগবাদী বর্ণনার প্রয়োজন কেন? ধর্ম যদি মানুষকে সংযম শেখায়, তবে এই বিপুল কামনাময় আখ্যানের যৌক্তিকতা কোথায়?


নারী: অবমাননা ও প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের প্রতীক

সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো নারীর অবস্থান। এখানে নারীকে প্রকৃত সম্মান দেওয়া হয়নি; বরং তাকে পুরুষের ভোগের বস্তু, দেবতাদের লীলার উপকরণ এবং পুরোহিত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণাধীন সত্তায় পরিণত করা হয়েছে।

যে ধর্মে দেবীমূর্তি তৈরিতে বেশ্যালয়ের মাটির প্রয়োজন হয়, যে সমাজে বেশ্যা না থাকলে ধর্মীয় প্রয়োজনে নতুন করে বেশ্যা তৈরি করতে হয়—সেই ধর্ম কীভাবে নৈতিকতার দাবিদার হয়? যে ব্যবস্থা নিজেই যৌন শোষণকে ধর্মীয় বৈধতা দেয়, তাকে ধর্ম বলা যায় কি না—এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।


ইগো, পরিচয় সংকট ও বংশগত ধর্মচর্চা

অনেকেই সনাতন ধর্মে জন্মগ্রহণ করার কারণে একে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে পারেন না। এটি মূলত ইগো ও পরিচয় সংকটের ফল। তারা জানেন, ধর্মটিতে অসংখ্য ত্রুটি রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর যৌক্তিক জবাব দিতে পারেন না। আবার সামাজিক চাপের কারণে ধর্ম ত্যাগও করতে সাহস পান না।

ফলে তারা একটি ভঙ্গুর, যুক্তিহীন ধর্মীয় কাঠামো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন—যার ভিত্তি বিশ্বাস নয়, বরং অভ্যাস ও ভয়।


ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পূজা-পার্বণের ব্যবসা

ব্রাহ্মণ সমাজ নিজেদের ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও সামাজিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে পুরো ধর্মটিকেই পূজা-পার্বণের ধর্মে রূপান্তর করেছে। বছরের প্রতিটি মাসে একাধিক পূজা, ব্রত ও আচার চালু করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ, খাদ্য ও শ্রম আদায় করা হয়েছে।

ফলে সনাতন ধর্ম দাঁড়িয়েছে একটি অবিরাম আচারচক্রের ওপর—যেখানে বারো মাসই পূজা, উৎসব ও ব্রত। প্রচলিত প্রবাদে বলা হয় “১২ মাসে ১৩ পূজা”, কিন্তু বাস্তবে বলা উচিত—“১২ মাসে হাজারো পূজা”। কারণ, আনুষ্ঠানিক উৎসবের বাইরেও অসংখ্য লোকাচার ও গ্রামীণ পূজা নিম্নবর্ণের মানুষদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।


উপসংহার

সনাতন ধর্ম মূলত একটি পৌরাণিক, আচারসর্বস্ব ও শ্রেণিনির্ভর ধর্মীয় কাঠামো, যা যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবিক ন্যায়বোধের পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এটি মানুষকে মুক্ত চিন্তার পথে না নিয়ে গিয়ে বরং আচার, ভয় ও সামাজিক চাপে বন্দি করে রাখে।

এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সত্য ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। প্রশ্ন করাই উন্নতির প্রথম ধাপ—আর প্রশ্নহীন ধর্ম মানেই স্থবিরতা।


লেখক:দীপা মনি

ফ্যাক্ট-চেক,জামায়াত নেতা ড.মোবারক হোসাইনের ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে বিতর্কের সমাধান

 



ফ্যাক্ট-চেক,জামায়াত নেতা ড.মোবারক হোসাইনের ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে বিতর্কের সমাধান

কুমিল্লা–৫ আসনের জামায়াত প্রার্থী ড. মোবারক হোসাইনের পিএইচডি ডিগ্রি ভুয়া কি?

সারসংক্ষেপ (Verdict at a glance)

ড. মোবারক হোসাইনের পিএইচডি থিসিস নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর একটি অংশ যাচাইযোগ্যভাবে সত্য, বিশেষত ভাষাগত ভুল ও অনুলিপি সদৃশ অংশের ক্ষেত্রে। তবে “ডিগ্রি সম্পূর্ণ ভুয়া/অবৈধ”—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো কোনো আনুষ্ঠানিক একাডেমিক বা আইনি রায় এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে দাবি আংশিক সত্য, আংশিক অপ্রমাণিত।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রেক্ষাপট

ড. মোবারক হোসাইন—বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির-এর সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং কুমিল্লা–৫ (ব্রাহ্মণপাড়া-বুড়িচং) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সংসদ সদস্য প্রার্থী।


দাবি ১

“ড. মোবারক হোসাইনের পিএইচডি থিসিসে গুরুতর ভাষাগত ও অর্থগত ভুল রয়েছে”

যাচাই ফলাফল: সত্য (Verified)

যা পাওয়া গেছে:
ভারতের জাতীয় থিসিস আর্কাইভ Shodhganga-এ সংরক্ষিত থিসিসের একাধিক অধ্যায়ে এমন ইংরেজি বাক্য পাওয়া যায়, যেগুলো ব্যাকরণগতভাবে দুর্বল এবং অর্থ বোঝা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ—

  • “mainstream of the unmarried is unmarried” ধরনের পুনরুক্তি
  • এলোমেলো বাক্যগঠন, যা একাডেমিক লেখার মানদণ্ড পূরণ করে না

উপসংহার:
একটি ডক্টরেট থিসিসের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাগত মান এখানে প্রশ্নবিদ্ধ—এ দাবি সমর্থিত।


দাবি ২

“থিসিসে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন ‘Prophet Al-Banna’”

যাচাই ফলাফল: সত্য (Verified)

যা পাওয়া গেছে:
থিসিসের একটি অংশে মিশরের ইসলামী চিন্তাবিদ হাসান আল-বান্নার নামের সঙ্গে “Prophet” শব্দ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিশ্লেষণ:
হাসান আল-বান্না কোনো ধর্মীয় নবী নন; ফলে এ ধরনের শব্দচয়ন তথ্যগতভাবে ভুল এবং ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল।

উপসংহার:
এই অভিযোগটি তথ্যভিত্তিক ও যাচাইযোগ্য।


দাবি ৩

“আরবি নামের ‘Bin’ শব্দকে ‘container’ হিসেবে লেখা হয়েছে”

যাচাই ফলাফল: সত্য (Verified)

যা পাওয়া গেছে:
থিসিসে “Ubaidullah Bin Ma’mar” এবং “Abdullah Bin Amir” নাম দুটি যথাক্রমে

  • “Ubaidullah container Ma’mar”
  • “Abdullah container Amir”
    রূপে লেখা হয়েছে।

বিশ্লেষণ:
আরবি Bin অর্থ “পুত্র”; এটি ইংরেজি bin/container নয়। এ ধরনের ভুল কেবল বানানজনিত নয়, বরং অর্থ বিকৃত করে।

উপসংহার:
দাবিটি সত্য এবং গুরুতর একাডেমিক অসতর্কতার প্রমাণ দেয়।


দাবি ৪

“থিসিসে উইকিপিডিয়া থেকে কপি-পেস্ট করা হয়েছে”

যাচাই ফলাফল: আংশিক সত্য (Partially Verified)

যা পাওয়া গেছে:
থিসিসের কিছু অনুচ্ছেদ হাসান আল-বান্না সম্পর্কিত উইকিপিডিয়া নিবন্ধের সঙ্গে গঠন ও বাক্যপ্রবাহে মিল রয়েছে। কিছু শব্দ পরিবর্তনের চেষ্টা দেখা যায়, তবে তাতে নতুন ভুল সৃষ্টি হয়েছে।

যা পাওয়া যায়নি:

  • কোনো স্বীকৃত plagiarism-checking সংস্থার আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট
  • বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউজিসি-সদৃশ কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন

উপসংহার:
অনুলিপি সদৃশতা দৃশ্যমান, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে plagiarism প্রমাণিত হয়নি।


দাবি ৫

“যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া হয়েছে, সেটি বিতর্কিত”

যাচাই ফলাফল: আংশিক সত্য (Partially Verified)

যা জানা যায়:
ডিগ্রিটি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান—Shri Jagdishprasad Jhabarmal Tibrewala University (SJJT), রাজস্থান, ভারত।

  • এটি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
  • আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান তুলনামূলকভাবে নিচে
  • ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Times of India-তে রাজস্থানের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে

যা নিশ্চিত নয়:

  • SJJT থেকে ড. মোবারক হোসাইনের ডিগ্রি সরকারিভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে—এমন কোনো নোটিফিকেশন পাওয়া যায়নি।

উপসংহার:
বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, নির্দিষ্ট এই ডিগ্রি বাতিল—এমন প্রমাণ নেই।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Final Verdict)

বিষয়ফ্যাক্ট-চেক ফলাফল
ভাষাগত ও অর্থগত ভুলসত্য
আপত্তিকর শব্দ ব্যবহারসত্য
Bin → container ভুলসত্য
উইকিপিডিয়া কপিআংশিক সত্য
ডিগ্রি সম্পূর্ণ ভুয়াঅপ্রমাণিত

সামগ্রিক রায়

ড. মোবারক হোসাইনের পিএইচডি থিসিসের একাডেমিক মান গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ—এটি তথ্যভিত্তিকভাবে বলা যায়। তবে “ডিগ্রি ভুয়া বা অবৈধ”—এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো কোনো আনুষ্ঠানিক একাডেমিক বা আইনি ঘোষণা এখনো নেই,তবে চরম আপিত্তকর বিষয় এটি।



বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬

গোলাম আজম ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা: জামায়াতের দাবির একটি আলোচনামূলক বিশ্লেষণ

 গোলাম আজম ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা: জামায়াতের দাবির একটি আলোচনামূলক বিশ্লেষণ

ভূমিকা: ইতিহাস বনাম রাজনৈতিক পুনর্লিখন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংগ্রাম নয়; এটি ছিল একটি আদর্শিক ও নৈতিক লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রশ্নে কার অবস্থান কী ছিল—তা নির্ধারণ করা ইতিহাসের মৌলিক দায়িত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একটি দাবি জোরেশোরে উত্থাপন করা হয় যে গোলাম আজম নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। এই দাবি যদি সত্য হতো, তবে তা ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা, তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।

১. ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক অবস্থান: পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ

১৯৭১ সালে গোলাম আজম ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির। সে সময় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থহীনভাবে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে। তিনি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে “বিদ্রোহ”, “ভারতের ষড়যন্ত্র” এবং “ইসলামি ঐক্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

একজন ব্যক্তি যদি কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পক্ষে থাকেন, তবে অন্তত সেই রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্যতা তিনি স্বীকার করেন। গোলাম আজমের বক্তব্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ন্যায্যতার কোনো স্বীকৃতি পাওয়া যায় না—বরং উল্টোটি পাওয়া যায়।

২. যুদ্ধকালীন ভূমিকা: অনুপস্থিতি ও বিদেশে অবস্থান

২৫ মার্চ ১৯৭১-এর পর গোলাম আজম বাংলাদেশে অবস্থান না করে পাকিস্তানে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে তিনি নিপীড়িত জনগণের পাশে ছিলেন না; বরং দখলদার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে অবস্থান করেন।

এই সময় তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে বক্তব্য দেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে অবৈধ প্রমাণ করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্ত হন। ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই যেখানে স্বাধীনতার পক্ষে থাকা নেতা নিজের জনগণকে ফেলে দখলদার রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেন।

৩. “শান্তির পক্ষে ছিলেন” যুক্তির ভ্রান্তি

জামায়াতের একটি প্রচলিত যুক্তি হলো—গোলাম আজম নাকি রক্তপাতের বিরোধী ছিলেন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক বিভ্রান্তি রয়েছে।

নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা বজায় রেখে যে “শান্তি” চাওয়া হয়, তা প্রকৃত শান্তি নয়; তা দমননীতি। ১৯৭১ সালে “শান্তি” শব্দটি ব্যবহার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও দমন অভিযানকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। সেই বয়ানকে সমর্থন করা কখনোই স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান হতে পারে না।

৪. স্বাধীনতার পর আচরণ: স্বীকৃতি ও সংবিধান প্রশ্ন

স্বাধীনতার পর গোলাম আজম দীর্ঘদিন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি এবং দেশের সংবিধানের মূল রাষ্ট্রীয় নীতিগুলোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু।

যদি তিনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার পক্ষে থাকতেন, তবে স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি তিনি স্বীকার করতেন। বাস্তবে দেখা যায়, তিনি স্বাধীনতাকে একটি “ঘটিত বাস্তবতা” হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন—সমর্থন করেননি।

৫. Acceptance বনাম Support: একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী বিষয় হলো—কোনো বাস্তবতা মেনে নেওয়া আর সেই বাস্তবতার পক্ষে থাকা এক নয়।

স্বাধীনতার বহু বছর পর বাংলাদেশকে মেনে নেওয়া রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হতে পারে; কিন্তু সেটিকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান হিসেবে দেখানো ইতিহাসের বিকৃতি। জামায়াত এই পার্থক্যটি ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে দিতে চায়।

উপসংহার: দাবি নয়, প্রমাণই ইতিহাস

গোলাম আজম বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন—এই দাবি কোনো প্রামাণ্য দলিল, সমসাময়িক বক্তব্য বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক দায় এড়ানো এবং অতীতকে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা।

ইতিহাস আবেগ বা দলীয় আনুগত্য দিয়ে নয়, বরং প্রমাণ, সময়রেখা ও কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করা হয়। সেই মানদণ্ডে বিচার করলে এই দাবি একটি অসার, বিভ্রান্তিকর এবং ইতিহাসবিরোধী বয়ান হিসেবেই চিহ্নিত হয়।

গোলাম আজমের নামে ভিত্তিহীন অপবাদ, অভিযোগ মিথ্যা।

 



বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে গোলাম আজম সৌদি আরবকে অনুরোধের দাবি মিথ্যা, তথ্যহীন ও অপবাদ।


নীচে ঐতিহাসিক দলিল ও ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট দেওয়া হলো:

দাবিটি দুই ভাগে ভেঙে দেখলে পরিষ্কার হয়:
(ক) “গোলাম আজম সৌদি আরবকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে অনুরোধ করেছিলেন”—এটি কি সত্য?
(খ) এটি কি “১৯৭১ সালে” হয়েছিল—তার প্রমাণ আছে কি?

১) “১৯৭১ সালে” সৌদি আরবকে অনুরোধ—টাইমলাইন মিলছে না

বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। কিন্তু সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৫ সালের আগস্টে—এ নিয়ে একাধিক রেফারেন্স আছে (তারিখে সামান্য ভিন্নতা থাকলেও বছরটি একই):

  • “International recognition of Bangladesh” তালিকায় সৌদি স্বীকৃতির তারিখ ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ দেখানো।
  • Arab News–এ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে সৌদি স্বীকৃতি ২৮ আগস্ট ১৯৭৫ বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, স্বীকৃতির প্রশ্ন/লবিং-এর বাস্তব প্রেক্ষাপট মূলত ১৯৭২–১৯৭৫ সময়কাল, বিশেষত ১৯৭৩–১৯৭৫। তাই “১৯৭১ সালেই সৌদিকে স্বীকৃতি না দিতে অনুরোধ”—এই নির্দিষ্ট তারিখ-দাবির পক্ষে শক্ত, প্রত্যক্ষ ডকুমেন্টারি প্রমাণ (চিঠির কপি/ডিপ্লোম্যাটিক রেকর্ড/প্রামাণ্য আর্কাইভ) মূলধারার উৎসে সাধারণত দেখা যায় না। বরং যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো স্বাধীনতার পরে (exile পর্বে) বেশি কেন্দ্রীভূত।

২) “সৌদিকে স্বীকৃতি না দিতে অনুরোধ করেছিলেন”—এ বিষয়ে অভিযোগ/বর্ণনা কী আছে?

(ক) অভিযোগ: ১৯৭৩–১৯৭৬ সময়ে সৌদিকে স্বীকৃতি না দিতে/সহায়তা না করতে অনুরোধ

bdnews24–এ “Try Azam for treason” শিরোনামের রিপোর্টে (একটি অভিযোগ-ভিত্তিক বক্তব্য হিসেবে) বলা হয়—
গোলাম আজম ১৯৭৩–১৯৭৬ সময়ে সৌদি বাদশাহর সঙ্গে বহুবার সাক্ষাৎ করে সৌদি আরবকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে বা আর্থিক সহায়তা না করতে অনুরোধ করেছিলেন—এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

The Daily Star–এ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদন আছে—তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন—এই ধরনের অভিযোগ।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এগুলো প্রসিকিউশন/অভিযোগপক্ষের ভাষ্য—স্বতন্ত্রভাবে যাচাইকৃত “চিঠির কপি + আর্কাইভাল প্রমাণ” একই রিপোর্টে সাধারণত প্রদর্শিত নয়; তাই এগুলোকে “অভিযোগ/অ্যালিগেশন” হিসেবে ট্রীট করা যুক্তিসঙ্গত।

(খ) গোলাম আজমের নিজের লেখায় কী ইঙ্গিত পাওয়া যায়?

গোলাম আজমের আত্মজীবনীধর্মী লেখার (প্রকাশিত PDF) অংশে তিনি ১৯৭৫ সালের মে মাসে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন—তৎকালীন বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা/সমাজতন্ত্র ইত্যাদি থাকার কারণে বাদশাহ ফয়সালের আমলে সৌদি বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, এবং তিনি নতুন বাদশাহ খালেদের নীতি জানার উদ্দেশ্যে সৌদি যান।

এটা স্বীকৃতি-বিরোধী লবিংয়ের সরাসরি স্বীকারোক্তি নয়; বরং তিনি নিজে এটাকে “নীতি জানার/যোগাযোগের” ফ্রেমে রেখেছেন। তবে এতে দু’টি জিনিস নিশ্চিত হয়:

  1. সৌদি স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়টি তখন বাস্তব ছিল,
  2. তিনি ওই ইস্যু ঘিরে সৌদি নেতৃত্ব/পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন।

(গ) বিপরীত দাবি: তিনি পরে সৌদিকে স্বীকৃতিতে রাজি করাতে লবিং করেছিলেন

openDemocracy–তে একটি প্রো-ডিফেন্স/প্রতিবাদী বর্ণনায় বলা হয়েছে—বিরোধীরা দাবি করে তিনি লবিং করেছিলেন স্বীকৃতি না দিতে; কিন্তু লেখক বলছেন তিনি বরং পরে সৌদিকে স্বীকৃতিতে রাজি করাতে লবিং করেছিলেন।
এবং গোলাম আজমকে সমর্থনকারী ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়—তিনি সৌদি সরকারকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে লবিং করেছিলেন (বিশেষত পরবর্তী সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে)।

অর্থাৎ, একই বিষয়ের ওপর একাধিক, পরস্পরবিরোধী ন্যারেটিভ আছে—একদিকে অভিযোগপক্ষের বক্তব্য, অন্যদিকে ডিফেন্স/সমর্থকপক্ষের বক্তব্য।

৩) তাহলে সবচেয়ে সতর্ক/প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত কী?

  • “১৯৭১ সালে” সৌদি আরবকে স্বীকৃতি না দিতে অনুরোধ করেছিলেন—এটি নির্দিষ্ট বছর হিসেবে বলার মতো শক্ত প্রমাণ (চিঠির স্ক্যান/সরকারি আর্কাইভ/ডিপ্লোম্যাটিক কেবল) এই মুহূর্তে প্রধান নির্ভরযোগ্য সূত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং স্বীকৃতি-ইস্যুর কেন্দ্র সময় ১৯৭২–১৯৭৫; অভিযোগগুলোও মূলত ১৯৭৩–১৯৭৬ সময়কে টার্গেট করে।
  • তবে, স্বাধীনতার পরে তিনি সৌদি/মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রশ্নে তৎপর ছিলেন—এ নিয়ে বহু রিপোর্ট/দাবি আছে, কিন্তু সেই তৎপরতার লক্ষ্য (স্বীকৃতি ঠেকানো বনাম স্বীকৃতি আনা) নিয়ে উৎসভেদে মতপার্থক্য আছে।

৪)  “ফুল ফ্যাক্টচেক” হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

 যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট সোর্স নেই, তাই আমরা এটিকে কঠোর ফ্যাক্টচেকের মানদণ্ডে বিচার করতে পারি। নিচে সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিচ্ছি।


সংক্ষিপ্ত রায় (Bottom line)

“গোলাম আজম ১৯৭১ সালে সৌদি আরবকে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় স্বীকৃতি না দিতে অনুরোধ করেছিলেন”—এই দাবিটি প্রমাণিত নয় এবং বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া এটি গ্রহণযোগ্য নয়।


কেন এই দাবি টেকে না — ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা

১) টাইমলাইনের মৌলিক সমস্যা

  • বাংলাদেশ স্বাধীন হয়: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
  • সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়: ১৯৭৫ সালে

👉 ১৯৭১ সালে সৌদি আরবের সামনে “বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেব কি না”—এই প্রশ্নটাই বাস্তবে তখনো সক্রিয় কূটনৈতিক ইস্যু ছিল না।
অর্থাৎ টাইমলাইন অনুযায়ী দাবিটি অসংগত


২) কোনো প্রাইমারি বা সেকেন্ডারি সোর্স নেই

এই দাবির পক্ষে সাধারণত যেসব জিনিস থাকা দরকার:

  • সৌদি সরকার/বাংলাদেশ সরকার/পাকিস্তানের ডিপ্লোম্যাটিক কেবল
  • কোনো চিঠির কপি
  • আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সমসাময়িক রিপোর্ট
  • আদালতে উপস্থাপিত ডকুমেন্টারি এক্সিবিট

👉 এগুলোর কোনোটিই নেই
শুধু “শোনা যায়”, “বলা হয়”, “ফেসবুকে লেখা”—এসব ফ্যাক্টচেকের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।


৩) অভিযোগ বনাম প্রমাণ — এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ

গোলাম আজম–এর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে (বিশেষ করে ১৯৭৩–৭৫) বিদেশে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রশ্নে ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে—এটা সত্য।

কিন্তু:

  • অভিযোগ ≠ প্রমাণ
  • অভিযোগগুলোও ১৯৭১ সালকে কেন্দ্র করে নয়, বরং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কে ঘিরে
  • সেগুলোতেও “সৌদি আরবকে অনুরোধ করেছিলেন”—এমন দাবির লিখিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই

৪) “সোর্স নাই” হলে ফ্যাক্টচেকের নিয়ম কী বলে?

ফ্যাক্টচেকের একটি মৌলিক নীতি হলো:

Extraordinary claim requires credible evidence

যখন কোনো দাবির:

  • সোর্স নেই
  • টাইমলাইন মেলে না
  • প্রাইমারি ডকুমেন্ট নেই

👉 তখন সেই দাবি Unverified / Unsupported / Likely misinformation হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

  • ❌ এটি প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য নয়
  • ❌ ১৯৭১ সালের দাবি টাইমলাইনগতভাবে ভুল
  • ❌ বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া এটি একটি অপপ্রচারমূলক বা গুজবধর্মী দাবি
  • ✅ সর্বোচ্চ যা বলা যায়: স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ আছে—কিন্তু নির্দিষ্ট এই দাবি নয়।
সর্বশেষে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে করি তৎকালীন জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতা করলেও সৌদি সরকারকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিতে না বলার অভিযোগ মিথ্যা। 

ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

  মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এ...