ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা
ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা
ঈমান আনার পর মুমিনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব:
ইসলাম ও তরবারির অনস্বীকার্য সম্পর্ক:
ঈমান আনার পর একজন মুমিনের জীবনে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য কী? এই মৌলিক প্রশ্নটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান যুগের এক শ্রেণির তথাকথিত আলেম বা 'ঠুন্ডা মৌলভী'রা এই সত্যটি এড়িয়ে যান অথবা জেনেও তা সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ করেন না। ভোগবিলাস আর আপোষকামী রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে তারা আজ বাতিলের সাথে আপোষ করে নিয়েছেন। এক অর্থে, তারা তরবারির তেজ বিক্রি করে অমুসলিমদের কাছ থেকে শুধু জায়নামাজ আর তসবীহ কিনে তুষ্ট থাকছেন। কিন্তু ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ বুঝতে হলে অবশ্যই জানতে হবে—ইসলামের সাথে তরবারির (জিহাদ ও শক্তির) সম্পর্ক আসলে কী?
ইসলাম ও তরবারির সম্পর্ক: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
আজকাল একদল ইসলামবিদ্বেষী প্রচার করে যে, ইসলাম তরবারির জোরে বা জবরদস্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা। আবার এই প্রোপাগান্ডা মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেক আধুনিক মুসলিম এমনভাবে কথা বলেন যেন ইসলামের সাথে তরবারির কোনো সম্পর্কই নেই। সত্য হলো, তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে ইসলামের শৌর্য-বীর্যের ইতিহাসকেই অস্বীকার করেন। ইসলামের সাথে তরবারির সম্পর্ক মূলত ইনসাফ কায়েম ও আত্মরক্ষার।
ঈমান ও কালিমার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা যখন বলি **'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)'**, তখন এর গভীর তাৎপর্য হলো:
1. **লা (না):** এটি একটি চূড়ান্ত অস্বীকার। অর্থাৎ দুনিয়ার যাবতীয় খোদাদ্রোহী মতবাদ ও শক্তিকে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করা।
2. **ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই):** আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল তথাকথিত 'ইলাহ' বা বিধানদাতাকে বাতিল ঘোষণা করা।
3. **মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.):** আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মানার একমাত্র বৈধ পদ্ধতি হলো প্রিয় নবী (সা.)-এর দেখানো পথ। এর বাইরে অন্য কোনো মতাদর্শ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা মেনে নেওয়া ঈমানের পরিপন্থী।
এখানে **'ইলাহ'** মানে শুধু স্রষ্টা নয়, বরং তিনি একমাত্র বিধানদাতা। মানুষের তৈরি শাসনব্যবস্থা, আইন, অর্থব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে একমাত্র আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান (ইসলাম) গ্রহণ করার নামই হলো আত্মসমর্পণ।
শান্তি বনাম ইনসাফ: তরবারির প্রয়োজনীয়তা কেন?
অনেকে মনে করেন ইসলাম মানে কেবল ব্যক্তিগত শান্তি। কিন্তু ইসলাম হলো সামষ্টিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নাম। যখন আপনি পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন, তখন কায়েমী স্বার্থান্বেষী 'বাতিল শক্তি' আপনাকে ছেড়ে দেবে না। তারা জল, স্থল ও আকাশপথে আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আপনার ধন-সম্পদ, ইজ্জত এবং ভূখণ্ড কেড়ে নিতে চাইবে।
ঠিক এই সন্ধিক্ষণে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী রাখার জন্য **'তরবারি'** বা শক্তির ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়ে।
এই তরবারি হলো:
* অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার।
* মুমিনদের দেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ঢাল।
* ইনসাফ কায়েমের গ্যারান্টি।
এটাই হলো জিহাদ। যেখানে জিহাদের মানসিকতা বা প্রস্তুতি নেই, সেখানে ইসলাম কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে টিকে থাকতে পারে না। দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামের বাণী পৌঁছাতে হয়, আর সেই দাওয়াতের পথে আসা জুলুমের বাধা দূর করতে হয় তরবারির মাধ্যমে।
জান্নাতের দ্বার তরবারির ছায়াতলে:
সহিহ মুসলিম শরিফের একটি হাদিসে (১৯০২) বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
> **"নিঃসন্দেহে জান্নাতের দ্বারসমূহ তরবারির ছায়াতলে রয়েছে।"**
>
এই হাদিসটি মুমিনকে শিক্ষা দেয় যে, বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছাড়া জান্নাতের পথ সুগম হয় না। আবু বকর ইবনে আবু মুসা আশ'আরী (রা.)-এর বর্ণনায় দেখা যায়, এই কথা শোনার পর সাহাবীরা তাদের তরবারির খাপ ভেঙে আমরণ যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। কারণ তারা জানতেন, ইজ্জত ও ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য শক্তির কোনো বিকল্প নেই।
ঈমান আনার পর প্রথম কাজ: ভূখণ্ড রক্ষা
হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন:
> **"ঈমান আনার পর সর্বোত্তম আমল হলো মুসলিম ভূখণ্ড রক্ষা করা।" (সহিহ বুখারী: ১৫১৯)**
>
একজন মুসলমানের প্রথম কাজ হলো নিজের ভূমি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। কারণ ভূখণ্ড না থাকলে সেখানে ইসলামী সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের চারটি মৌলিক উপাদান—জনগণ, সরকার, সার্বভৌমত্ব এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ড যদি শত্রুর দখলে চলে যায়, তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাই মনে রাখতে হবে, যারা তরবারিকে অস্বীকার করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা হয় অজ্ঞ, না হয় মুনাফেক। ইসলামের প্রচার হবে আখলাক ও দাওয়াতের মাধ্যমে, কিন্তু ইসলামের বিজয় ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে শক্তির মাধ্যমে। ঈমান আনার পর মুমিনের কাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ভূমি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সেখানে আল্লাহর আইন তথা ইনসাফ কায়েম করা। যারা এই সত্যকে অস্বীকার করে, তারা মূলত উম্মাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ