"লোকদেখনো বা রিয়ার শাস্তি"
.jpeg) |
| রিয়া"র শাস্তি |
রিয়া (الرياء) অর্থ প্রদর্শন করা বা প্রদর্শনেচ্ছা। আল্লাহর জন্য করণীয় ইবাদত পালনের মধ্যে মানুষের দর্শন, প্রশংসা বা বাহবার ইচ্ছা পোষণ করাকে রিয়া বলে।
১। কাজের উদ্দেশ্য এবং আন্তরিকতার দিকে মনোযোগ না দিয়ে অন্যদের মনোযোগ এবং প্রশংসা অর্জনের জন্য সর্বজনীন স্থানে উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ করা বা তেলাওয়াত করা।
২। প্রশংসা বা স্বীকৃতি চাওয়া এড়াতে বিচক্ষণ পদ্ধতিতে না করে নিজের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে এমনভাবে দাতব্য দান করা বা সদয় আচরণ করা।
৩। রমজান বা অন্যান্য ধর্মীয় উপলক্ষ্যে উপবাস বা অন্যান্য উপাসনা সম্পাদন করা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না করে অন্যদেরকে ধার্মিক বা ধার্মিক দেখানোর জন্য।.৪। নিজের জ্ঞান বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য অন্যদের সাথে ধর্মীয় বিতর্ক বা আলোচনায় লিপ্ত হওয়া, নিজের বিশ্বাসের বোঝা বাড়ানো এবং অন্যদের উপকার করার চেয়ে।
৫। ধর্মীয় পোশাক বা আনুষাঙ্গিক, যেমন একটি হিজাব বা প্রার্থনার পুঁতি, এমনভাবে পরিধান করা যা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তির ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি হিসাবে পরিধান করার পরিবর্তে একজনের ধার্মিকতা বা ভক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে করা হয়।
মুমিনের ইবাদত ধ্বংস করে তাকে জাহান্নামী বানানোর জন্য শয়তানের অন্যতম ফাঁদ ‘রিয়া’। কুরআন-হাদীসে রিয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তাদের একজন বড় আলিম, একজন প্রসিদ্ধ শহীদ ও একজন বড় দাতা। তারা আজীবন আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে কাটালেও রিয়ার কারণে তারা ধ্বংসগ্রস্ত হয়।[
মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৫১৩-১৫১৪ (কিতাবুল ইমারাহ, বাবু মান কাতালা লির্রিয়া)।]
বিভিন্ন হাদীসে রিয়াকে ‘শিরক আসগার’ বা ছোট শিরক এবং ‘শিরক খাফী’ বা লূক্কায়িত শিরক বলা হয়েছে। কারণ বান্দা আল্লাহর জন্য ইবাদত করলেও অন্য সৃষ্টি থেকেও সেজন্য ‘কিছু’ আশা করে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করে। এ শিরকের কারণে মুসলিম কাফির বলে গণ্য না হলেও তার ইবাদত ধ্বংস ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। মাহমূদ ইবন লাবীদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً
‘‘আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তোমাদের ব্যাপারে ভয় পাই তা হলো শিরক আসগার বা ক্ষুদ্রতর শিরক। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন: হে আল্লাহর রাসূল, শিরক আসগার কী? তিনি বলেন: রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা। কিয়ামতের দিন যখন মানুষদেরকে তাদের কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে তখন মহান আল্লাহ এদেরকে বলবেন, তোমরা যাদের দেখাতে তাদের নিকট যাও, দেখ তাদের কাছে তোমাদের পুরস্কার পাও কি না!’’[আহমদ, আল-মুসনাদ ৫/৪২৮-৪২৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১০২। হাদীসটি সহীহ।]
এক হাদীসে আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَلا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنْ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ قَالَ قُلْنَا بَلَى فَقَالَ الشِّرْكُ الْخَفِيُّ أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ
‘‘দাজ্জালের চেয়েও যে বিষয় আমি তোমাদের জন্য বেশি ভয় পাই সে বিষয়টি কি তোমাদেরকে বলব না? আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন। তিনি বলেন, বিষয়টি গোপন শির্ক। গোপন শির্ক এই যে, একজন সালাতে দাঁড়াবে এরপর যখন দেখবে যে মানুষ তার দিকে তাকাচ্ছে তখন সে সালাত সুন্দর করবে।’’[ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১৪০৬ (কিতাবুয যুহদ, বাবুর রিয়া ওয়াস সুমআখ); আলবানী, সহীহুুত তারগীব]
রিয়ার কারণ সমাজের মানুষদের কাছে সম্মান, মর্যাদা বা প্রশংসার আশা। আমাদের বুঝতে হবে যে, দুনিয়ায় কোনো মানুষই কিছু দিতে পারে না। যে মানুষকে দেখানোর বা শোনানোর জন্য, যার প্রশংসা বা পুরস্কার লাভের জন্য আমি লালায়িত হচ্ছি সে আমার মতই অসহায় মানুষ। আমার কর্ম দেখে সে প্রশংসা নাও করতে পারে। হয়ত তার প্রশংসা শোনার আগেই আমার মৃত্যু হবে। অথবা প্রশংসা করার আগেই তার মৃত্যু হবে। আর সে প্রশংসা বা সম্মান করলেও আমার কিছুই লাভ হবে না। আমার পালনকর্তার পুরস্কারই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি অল্পতেই খুশি হন ও বেশি পুরস্কার দেন। তিনি দিলে কেউ ঠেকাতে পারে না। আর তিনি না দিলে কেউ দিতে পারে না।
কা’ব ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلا فِي غَنَمٍ بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ
‘‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে একটি মেষপালের মধ্যে ছেড়ে দিলে নেকড়ে দুটি মেশপালের যে ক্ষতি করে, সম্পদ ও সম্মানের লোভ মানুষের দীনের তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে।’’[তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৫৮৮ (কিতাবুয যুহদ, বাব ৪৩)। হাদীসটি হাসান-সহীহ।]
জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে শোনানোর জন্য এবং মানুষের নিকট প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য কোনো আমল করে আল্লাহ তাআলা তার অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাকে রিয়াকারীর শাস্তি দেবেন। (বুখারি, হাদিস : ২/৯৬২; মুসলিম, হাদিস : ২/৪১২; তিরমিজি, হাদিস : ২/৬১; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২/৩১০; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৩/৪০; শুয়াবুল ঈমান, হাদিস : ৫/৩৩০)
হাদিসে মর্মার্থ হলো- কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের সামনে তার দোষ-ক্রটি প্রকাশ করে তাকে অপমান ও অপদস্ত করবেন।
রিয়াকারীর চারটি নিদর্শনঃ
১) একাকিত্বে নেক কাজে অলসতা করে।
২) মানুষের সামনে পূর্ণ আনন্দ ও নিপুনতার সাথে আমল করে।
৩) যে কাজে মানুষ প্রশংসা করে সে কাজ আরও বেশি করে।
৪) যে কাজে তার নিন্দা হয়, সেটা কম করে।
----হযরত আলী (রাঃ)।
রিয়া একটি গোপন শিরক বা ছোট শিরক। কিয়ামতের দিন রিয়াকারীকে চার নামে ডাকা হবেভ
১) হে কাফের,
২) হে ফাজের (অবাধ্য),
৩) হে ধোকাবাজ ও
৪) হে ক্ষতিগ্রস্ত
আমল কবুল হওয়ার জন্য চারটি জিনিস জরুরী:
১) ইলম ( কেননা ইলম ছাড়া কোন আমল ছহীহ হওয়া কঠিন বরং অসম্ভব, আর ছহীহ আমলই কবুল হয়)
২) নিয়্যত ( নিয়্যত ছাড়া আমল প্রতিদানযোগ্য নয় এমনকি অনেক আমল গ্রহনযোগ্য হয় না)। হাদিসে আছে, “সকল কর্ম তার নিয়্যতের উপ নির্ভরশীল”।
৩) ছবর (প্রত্যেক আমল সহ্য ও ধৈর্য্যের সাথে ধীর-স্থিরভাবে সম্পন্ন করতে হবে)
৪) ইখলাস ( কারন এখলাস ছাড়া কোন আমল কবুল হয় না)।
তিনটি বিষয় আছে যা আমলে কেল্লা স্বরূপঃ
১) এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, আমল করার তৌফিক আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। (তাহলে অহংকার ও দাম্ভীকতা থাকবে না)
২) প্রত্যেক আমল আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য করা হয়, (যাতে নাফসের খায়েশ ভেঙ্গে যায়)
৩) আমলের ছওয়াব ও প্রতিদান কেবল আল্লাহর নিকট চাইতে হবে ( যাতে হৃদয় থেকে রিয়া ও লোভ লালসা বের হয়ে যায়)।
যেসব কারণে মানুষ রিয়া বা লৌকিকতা করে
ঈবাদাত ও নেক আমল সমূহে আল্লাহ্ তাআলাকে রাজি-খুশির পরিবর্তে দুনিয়ার মানুষের কাছে নিজের বড়ত্ব, যশ-খ্যাতি, ক্ষমতা লাভের বাসনা। সমাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় সুন্দর করে ইবাদাত করা, লোকদের সন্তুষ্টি করার জন্য আমল করা ও নির্জনে গাফলতি করা এবং নিজেকে জাহির করার জন্য কাজ করা। বর্তমানে রিয়ার এক এক নতুন ধারার ফিতনার প্রচলন শুরু হয়েছে; যেমন- কোনো ভালো কাজ করে বা দান-সদাকা দিয়ে অথবা নিজে ইবাদাত-বন্দেগি করার বিষয় বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা।
যেসব কাজ মনে হলেও রিয়া বা লৌকিকতা নয়ঃ
* কেউ না চাইতেই মানুষ তার ভালো কাজের প্রশংসা করে। এটা বরং মুমিনের জন্য আগাম সুসংবাদ।
* দাবি-দাওয়া ছাড়াই খ্যাতি অর্জন। যেমন- কোনো আলিম কিংবা দ্বীনি শিক্ষার্থী লোকদের দ্বীন-ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে থাকেন। তাদের কাছে যা দুর্বোধ্য ও জটিল সেগুলোর সমাধান তারা দিয়ে থাকেন। এভাবে জনগণের মাঝে কখনো কখনো তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষিতে লৌকিকতা থেকে দূরে থাকার নামে দ্বীনি কাজ থেকে তারা বিরত থাকা মোটেও সমীচীন হবে না। বরং তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাবেন এবং নিয়ত ঠিক রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।
* কেউ কেউ কখনো কোনো উদ্যমী ইবাদতকারীকে দেখে তার মতো ইবাদতে আগ্রহী হয়ে ওঠা। এটা কোনো লৌকিকতা বা রিয়া নয়। সে তার ইবাদতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত করলে অবশ্যই ছওয়াব পাবে।
* পোশাক-পরিচ্ছদ ও জুতা সুন্দর-পরিপাটি করে পরা এবং সুগন্ধি ইত্যাদি ব্যবহার করা। এর কোনোটিই রিয়া বা লৌকিকতা নয়।
* পাপ গোপন রাখা এবং সে সম্পর্কে কাউকে কিছু না বলা রিয়া নয়। বরং শারয়িভাবে আমরা নিজেদের ও অন্যদের দোষ গোপন রাখতে আদিষ্ট। কিছু লোকের ধারণা অপরাধ প্রকাশ করা জরুরি; যাতে করে সে মুখলিছ বা খাঁটি মানুষবলে গণ্য হবে। এটি একটি ভুল ধারণা এবং ইবলিসের ধোঁকা। কেননা পাপের কথা বলে বেড়ানো মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
* একমাত্র আল্লাহ্ তাআ'লা কে রাজি-খুশির জন্য দান-সদাকা, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, পরোপকার, মানুষকে অর্থ-সম্পদ বা বিভিন্নভাবে সহায়তা করলে যদি কারও নাম ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এগুলো রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না।
রিয়া থেকে মুক্তির উপায়ঃ
এক. সম্মান, খ্যাতি-প্রীতি ও দেমাগ-ভাব অন্তর থেকে বের করতে হবে।
দুই. রিয়ার চেতনা এসে গেলেও তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবে না বরং নিয়ত ঠিক রেখে কাজ করে যেতে থাকবে, এভাবে আস্তে আস্তে সেটা অভ্যাসে পরিণত হবে এবং অভ্যাস থেকে ইবাদত ও ইখলাস-নিষ্ঠায় পরিণত হবে।
তিন. যে ইবাদত প্রকাশ্যে করার বিধান, তাতো প্রকাশ্যেই করতে হবে। এছাড়া অন্যান্য ইবাদত প্রকাশ করারও নিয়ত রাখবে না, গোপনে করারও উদ্যোগ নিবে না।
চার. ইবাদাত করতে হবে একমাত্র আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
পাঁচ. কোনো কাজে কখনও গাফিলতি না করা।
ছয়. মানুষকে সব সময় বড় মনে করে নিজেকে ছোট মনে করা।
সাত. নেক লোক ও হক্কানি আলেম-ওলামাদের সংস্পর্শে থাকা। ইসলামী কিতাবাদি পড়া ও প্রয়োজনে তাদের পরামর্শ নেওয়া।
আট. নিজের বিবেকের কাছে নিজের কর্মের হিসেব নেওয়া।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের রিয়াসহ সব ধরনের ছোট ও বড় শিরক এবং গুনাহ থেকে মুক্ত রাখুন। ইসলামের আলোয় আমাদের জীবন পরিচালিত করার তাওফিক দান করুন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ