"কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কি পাহাড়ের কান্না ও অসন্তেষের মূল কারন"
![]() |
| কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ |
কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯২৩ সালে চালানো হয় জরিপ এবং বাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা হয়। ১৯৪৬ সালে পূর্ব বাংলায় নিযুক্ত ব্রিটিশ প্রকৌশলী ই.এ. মুর কাপ্তাইয়ের ৪০ মিটার ওজানে ‘বারকাল’ নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার স্থান পরিবর্তনের পর ১৯৫১ সালে প্রকৌশলী খাজা আজিমউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল বাঁধের স্থানটি চুড়ান্ত করে। এই বাঁধের কাজে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানকে অর্থ সহায়তা দিতে রাজি হয়। বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদার কোম্পানি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের ‘উটাহ ইন্ট্যারন্যাশনাল ইনকর্পোরেশন’ নামক প্রতিষ্ঠানকে। ১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসে বাঁধ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয়।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্রক্রিয়াই হলো নদী কিংবা জলের গতিপথে বাঁধ দিয়ে প্রথমে পানি জমা করা হয়। এরপর জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ পানিকে নির্দিষ্ট চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। এতে জমা হওয়া পানির বিভব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে পাওয়া যায় বিদ্যুৎ।
![]() |
| কাপ্তাই হ্রদ |
কোনো ধরনের কার্বন নিঃসরণ না করেই পাওয়া যায় পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ। এই লক্ষ্যেই সব যাচাই বাছাই শেষে কাপ্তাইতে ৬৭০.৬৫ মিটার লম্বা আর ৪৫.৭ মিটার উঁচু বাঁধ দেওয়া হয়। এটি নির্মাণে মোট খরচ হয় ৪.৯ কোটি রুপি। ১৯৬২ সালের ৩০ মার্চ যখন এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়, তখন এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট ছিলো দুটি, প্রতিটির সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ছিলো চল্লিশ মেগাওয়াট করে। তাই শুরুতে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ছিলো ৮০ মেগাওয়াট। বর্তমানে এর ৫টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট এবং মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ২৩০ মেগাওয়াট।
লেকের কারনে ভূমিহারানোর ইতিহাস:
বিশাল আকারের এই কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের সময় যে ১ লক্ষ মানুষকে তাদের আবাসভূমি থেকে সরানো হয়েছিলো তাদের সঠিক উপায়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। নির্মাণের সময় নৃগোষ্ঠী অধিবাসীদের মতামতের তোয়াক্কা করা হয়নি। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের পরে ১ লক্ষ মানুষের পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া পুরো ব্যবস্থাটিই ছিলো ত্রুটিপূর্ণ। দাতা এবং কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির ব্যাপারটিকে আমলে নেয়নি। নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে তাদের কাছে মনে হয়েছিলো ‘যাযাবর’ প্রকৃতির এবং পাহাড়ের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে ঘুরে জুম চাষ করে বেড়ায়। তবে একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় পাহাড়ি বা পাহাড়ের নৃগোষ্ঠী জুম চাষের একেকটি চক্র ছিলো সাত থেকে দশ বছরের, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা দশ থেকে পনের বছর পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ পাহাড়ের অধিবাসীরা সত্যিকার অর্থে মোটেও যাযাবর নয়। পাশাপাশি পাহাড়িদের একটা বড় অংশ জুম চাষ ছাড়াও নদী উপত্যকার উর্বর সমতল ভূমিতে কৃষিকাজ শুরু করেছিল। বাঁধ নির্মাণের পর বন্যায় পাহাড়ি জনপদের আবাসভূমির পাশাপাশি প্রায় চল্লিশ শতাংশ কৃষিকাজ উপযোগী ভূমিও তলিয়ে যায়।
কিছু গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, এক লক্ষ লোকের পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছিলো না। প্রাথমিকভাবে যখন বাঁধের কাজ শুরু হয় তখন অনেক মানুষকেই কাসালং উপত্যকায় নিয়ে আসা হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাফ করে সেখানে জমি তৈরি করে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হয় বাস্তহারাদের। ১৯৬২ সালের বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার পর সেই এলাকাও প্লাবিত হয়। পাকিস্তান সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন এরপর জোরালোভাবে আর কখনোই পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়নি।
এই উদ্যোগ না নিতে পারার পেছনেও আছে কিছু কারণ, এর মধ্যে একটি ছিলো অর্থনৈতিক সংকট। এই প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ছাড় দেওয়া উচিত ছিলো, সরকার সেটি দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে তাদেরকে সমপরিমাণ উর্বর চাষাবাদযোগ্য জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেটিও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রথমত, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এমন ভূমি সংকটের কারণে সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে। আবার অনেক পরিবারকেই নদী উপত্যকার উর্বর জমির বদলে দেওয়া হয়েছে পাহাড়ি অনুর্বর জমি। ব্রিটিশদের আসার পর থেকেই দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি জনপদ সমতলে কৃষিকাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। ফলে এই অনুর্বর জমি আপাতভাবে জীবনধারণের জন্য কোনো কাজেই আসছিলো না পাহাড়ী জনপদের। ন্যায্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ থেকেও বঞ্চিত ছিলো আদিবাসীরা। বাঁধ এলাকায় যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদেরকে হেক্টরপ্রতি পাঁচশত থেকে সাতশত টাকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে একই পরিমাণ উর্বর জমি কিনতে খরচ করতে হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
বাঁধ নির্মাণের শুরু থেকেই পাহাড়ি নেতারা ছিলেন এর বিরুদ্ধে। তবে সরকার এবং বাঁধ নির্মাণকারী স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদেরকে বাঁধ নির্মাণের পরে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছিল। পাশাপাশি এর মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন হবে বলেও বোঝানো হয়েছিল। তবে অনেক পরিবেশবিদ এবং বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়েছিলেন বাঁধ নির্মাণের পর বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়ে পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। তাই বর্তমান বাঁধের আরো উজানে বিকল্প একটি স্থান বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রাস্তবও করা হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত সেই স্থানটি ভারতের সীমান্তরেখার কাছাকাছি হওয়ায় রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কথা ভেবেই তা বাদ দেওয়া হয়েছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্বপুরুষদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার চাকমা ভারতের অরুণাচল প্রদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। অরুণাচলে আশ্রয় নেওয়া এই চাকমা শরণার্থীদের চিহ্নিত করা হয়েছে ‘পরিবেশগত কারণে সৃষ্ট শরণার্থী’ হিসেবে। অরুণাচল প্রদেশে আশ্রয় নেওয়া এই চাকমারা এখনো রাষ্ট্রহীন, ভারত কিংবা বাংলাদেশ কোনো দেশেরই নাগরিকত্ব নেই এই ভুক্তভোগীদের।
কাপ্তাই হ্রদের কান্নার ইতিহাস:
পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা জানলেও কত জনই বা জানে কাপ্তাই হ্রদের কথা? কত জনই বা অনুধাবন করে? কত জনই বা অনুভব করে কাপ্তাই হ্রদের কান্না!! বেশ তো বলেন উপজাতি উপজাতি? একবার ও কি ভেবে দেখেছেন উপজাতি বলার মধ্যে স্বার্থ কতটুকু? কখনও জানার চেষ্টা করেছেন এদের ইতিহাস কি? সংস্কৃতি কি? রাজনীতি কি? এরা কেন আজও সংগ্রাম করছে? এসব মাথায় কেন আসছেনা জানেন?
একটা জাতির পিছনে যখন কোন নিরাপত্তা বাহিনী কাজ করে তখন ওই জাতি মাথা খুড়ে দাড়ানোর একটু হলেও সাহস পায়। আর তাদের পিছনে যে শান্তিবাহিনী নামক নিরাপত্তা বাহিনী থাকছে বর্তমান সেনাবাহিনী শাসক ও সেটেলার বাঙালিরা এদের সন্ত্রাসী চাদাবাজঁ বলে ছাপিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। অথচ বলছে না যে ওরা কেন এইসব করছে?? আর আপনারাও ওইসব রহস্যময় গল্পশুনে জানার চেষ্টা গুলোকে উড়িয়ে দিয়েছেন শোষক শ্রেণীর বেড়াজালে। পার্বত্য ইতিহাের রাজনীতি সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে প্রথমেই চোখ রাখতে হবে কাপ্তাই হ্রদের দিকে। আচ্ছা আপনার মনে কি কোনদিন প্রশ্ন জাগেনি যে পাহাড়িরা কেন আজও কাপ্তাই হ্রদের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছে??? তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কিসের লোভে কাপ্তাই হ্রদ তৈরি করেছিল??
সর্বপ্রথম হ্রদ সৃষ্টির জন্য রাঙামাটির সুবলং চিলাকধাঁক নামক জায়গায় বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাই অতপর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও জায়গার অকার্যপূর্নতায় তা সরিয়ে কাপ্তাইয়ের দিকে আনা হয়। এর ফলে ১টি শহর, একটি জনপদ, রাজমহল, ১৮হাজার পরিবার, ১ লাখের অধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ও ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট কোম্পানি উদ্যোগে ১৯৫৬ সালের দিকে বাধ নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯৬২ সালে বাধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়। হ্রদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যঃ
কাপ্তাই হ্রদে জলবিদ্যুৎ সৃষ্টি ছাড়াও আরো ছয়টি উদ্দেশ্যে নিয়ে এই হ্রদ সৃষ্টি করা হয়।
তা
হল-
১. পাহাড়ের বনজ সম্পদ আহরণ
২. প্রত্যন্ত উপজেলার সাথে নৌ-
যোগাযোগ সৃষ্টি
৩. মৎস্য চাষ ও প্রজনন
৪.পর্যটন শিল্পের বিকাশ
৫. কর্ণফুলির ভাটিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও
৬. কৃষি ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধি।
উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কতদুরঃ–
যে ছয়টি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে
কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টি করা হয়েছিল,
সেসব উদ্দেশ্য কতটুকুইবা বাস্তবায়ন
হয়েছে, সে প্রশ্ন সচেতন
রাঙামাটিবাসীর।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গত ৫৩ বছরেও অর্জন করেনি ওই সকল লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবায়িত হয়নি ওই সব প্রতিশ্রুতি। ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন যেন রাঙামাটি বাসীর স্বপ্নই। অথচ সামান্য ৭/৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেলে পুরো পার্বত্য এলাকা জ্বলে ওঠত আলোয়। ।। অথচ এইসকল ইতিহাস জেনেও অনেকে না জানার মত ভান করে থাকে। আজ ও সেই বাস্তুচ্যুত আদিবাসী সমাজ স্বপ্ন দেখে অধিকার নিয়ে বেচেঁ থাকার। ফিরে না পেলেও চলবে অন্তত থাকার জায়গাগুলো যেন কেউ কেড়ে না নেই ওই স্বপ্ন আকড়ে ধরে আছে আজও। আমরা বহির হতে বিচার করি,মূল জায়গায় যেতে চাই না তাই আমাদের এসকল সমস্যা।
![]() |
| কাপ্তাইর মনোরম চিত্র |
অধিকার ফিরে পাক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, ওরাও বাংলাদেশের নাগরিক।
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ