"মাথা ব্যাথা বা মাইগ্রেইনে কম্পিউটার ও মোবাইল স্ক্রিনের প্রভাব ও প্রতিকার"
শুরুতে মাথা ব্যাথা নিয়ে নিয়ে কিছু আলোচনা করেই মূল বিষয়েনআলোচনায় আসছি।
আসলে মাথা ব্যথা কি এটা কাউকেই ব্যাখ্যা করে বলার অপেক্ষা রাখে না, কেননা জীবনে কখনো না কখনো মাথা ব্যাথায় ভুগে নাই এমন মানুষ পাওয়া যাবে না।
এখন আসি মাথা ব্যাথার কারনে:
সাধারনত মাথা ব্যাথার কারণ গুলোকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।
১। প্রাইমারী কারণ।
২। সেকেন্ডারী কারন।
প্রাইমারী কারনের মধ্যে আছে;
1. Tension type headeche (69%)
2.Migrain(14%)
3.Idiopathic stabbing (2%)
4.Exortional (1%)
5.Cluster headeche(.1%)
6. Computer Vision syndrome.
সেকেন্ডারী কারণঃ
1.Systeamic infection (69%)
2.Head injury(4%)
3.Vascular disorder(1%)
4. sub arachnoid hrge
5. Brain tumer.
এত সকল কারন গুলো আসলেই একটি সেশন বা একদিনে আলোচনা করে শেষ করা আদৌ সম্ভব না।
![]() |
| মাথা ব্যাথায় কম্পিউটার ও মোবাইলের প্রভাব |
আজ মাইগ্রেইন এবং কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রম নিয়েই আলোচনা করব।
প্রথমেই মাইগ্রেইন দিয়েই শুরু করব।
মাইগ্রেন কী?
মাইগ্রেন শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ‘হেমিক্রানিয়া’ থেকে, যার অর্থ মাথার একদিকে ব্যথা।
আমি শুরুতেই মাথা ব্যাথার অনেকগুলো কারনের কথা বলেছি, মাইগ্রেইন এগুলোর মধ্যে একটি। তাই মাথায় রাখতে হবে সব মাথাব্যথাই মাইগ্রেন নয়। দৃষ্টিস্বল্পতা, মস্তিষ্কের টিউমার, মাথায় অন্য সমস্যার কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। মাইগ্রেন এক ধরনের প্রাইমারি হেডেক(Headeche), যা নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। চিকিৎসকের অধীনে এবং নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করা হয়।
এখন আসি এপিডেমোলজিতে:
* সাধারনত Middle age এর আগেই মাইগ্রেইন দেখা দেয়।
* পুরুষ-মহিলার অনুপাত হিসাব করলে দেখা যায় শতকরা ৬ ভাগ পুরুষ আর ২০ভাগ মহিলারা মাইগ্রেইনে ভুগেন।
মাইগ্রেন কেন হয়?
মাইগ্রেন কেন হয় তা পুরোপুরি জানা যায়নি।
তার পরও কিছু কারন যেগুলো সাধারনত দেখা যায় সেগুলো হলো:
Mechanism গত করণ:
যেমন-
- Aoura মানে ব্রেইনের Ion channel disfunction এর জন্য।
- Spreading front of cortical depolarisation(excitation)
- Hyper polarisation/depression
- Exta cranial vasodilatation
- Activation of trigaminal vascular systeam
অভ্যাসগত/পারসোনাল কারণঃ
যেসব কারণে মাইগ্রেন হতে পারে সেগুলোকে ‘ট্রিগার’ বলে।
তবে এটি বংশগত বা অজ্ঞাত কোনো কারণে হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হরমোনের প্রভাব রয়েছে বলেও কিছু গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে। বিভিন্ন বয়সে নারী-পুরুষের আক্রান্ত হবার হারের পার্থক্য তারই সাক্ষ্য দেয়। এটি সাধারণত পুরুষের চেয়ে নারীদের বেশি হয়। নারীদের ঋতুস্রাবের সময়ও মাথাব্যথা বাড়ে।
তাছাড়াও যেসকল ট্রিগার ফেক্টর আছে সেগুলো হলঃ
১।চকলেট, পনির, কফি ইত্যাদি বেশি খাওয়া।
২। জন্মবিরতিকরণ ওষুধ।
৩।দুশ্চিন্তা,
৪।অতিরিক্ত ভ্রমণ,
৫। অতিরিক্ত ব্যায়াম,
৬।অনিদ্রা,
৭।অনেকক্ষণ টিভি দেখা,
৮।দীর্ঘসময় কম্পিউটারে কাজ করা,
৯। মোবাইলে কথা বলা ইত্যাদির কারণে এ রোগ হতে পারে। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অতি উজ্জ্বল আলো এই রোগকে বাড়িয়ে দেয়। মাইগ্রেনের ব্যথার সাথে অনেক সময় চোখের সমস্যা থাকতে পারে।
অনেক সময় খাবার, পারফিউমের গন্ধ, সিগারেটের ধোঁয়া, খুব গরম বা ঠাণ্ডা থেকেও মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
লক্ষন:
১।মাথাব্যথা শুরু হলে তা কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
২। মাথাব্যথা, বমি ভাব এ রোগের প্রধান লক্ষণ। তবে অতিরিক্ত হাই তোলা, কোনো কাজে মনোযোগ নষ্ট হওয়া, বিরক্তিবোধ করা ইত্যাদি উপসর্গ মাথাব্যথা শুরুর আগেও হতে পারে।
৩।মাথার যেকোনো অংশ থেকে এ ব্যথা শুরু হয়। পরে পুরো মাথায় ছড়িয়ে পড়ে।
৪। চোখের পেছনে ব্যথার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। শব্দ ও আলো ভালো লাগে না। কখনো কখনো অতিরিক্ত শব্দ ও আলোয় ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।
৫।প্রচন্ড মাথাব্যথার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিবিভ্রম এবং বমির ভাব থাকতে পারে।
৬। সাধারণত রক্তে সেরোটোনিন অথবা ফাইভ এইচটির মাত্রা পরিবর্তিত হলে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। মস্তিষ্কের বহিরাবরণে যে ধমনীগুলো আছে সেগুলো মাইগ্রেন শুরুর প্রারম্ভে ফুলে যায় তাই মাথাব্যথার তীব্রতা ব্যাপক হয়।
মাইগ্রেনের প্রকারভেদঃ
ইগ্রেনের কয়েকটি ধরন আছে। তার একটি হচ্ছে ক্লাসিক্যাল মাইগ্রেন। ক্লাসিক্যাল মাইগ্রেনের শুরুটা অধিকাংশ সময়েই আপনি বুঝতে পারেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দৃষ্টিবিভ্রম হয়। চোখের সামনে আলোর ঝলকানি, চোখে সর্ষে ফুল দেখেন। হাত-পা, মুখের চারপাশে ঝিনঝিনে অনুভূতি হয়। শরীরের এক পাশে দূর্বলতা বা অবশভাব হতে পারে। এরপর শুরু হয় মাথাব্যথা, যা মাথার একপাশের একটি স্থান থেকে শুরু হয়ে আস্তে আস্তে সেই পাশের পুরো স্থানেই বিস্তৃত হয়। প্রচণ্ড দপদপে ব্যথা আপনাকে কাহিল করে ফেলে। প্রচুর ঘাম হয়। বমি কিংবা বমি ভাব হয়। আলো আর শব্দ একদম সহ্য হয় না। কথা বলতেও অনীহা লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। চুপচাপ অন্ধকার ঘরে থাকতেই বেশি ভালো লাগে।
প্রতিকার:
মাইগ্রেন হলে ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ রয়েছে। ব্যথার তীব্রতার উপর নির্ভর করে পেইনকিলার নেয়া যেতে পারে। সাধারণ প্যারাসিটামলেও অনেকের কাজ হতে পারে, তবে ব্যথা তীব্র হলে ওষুধের তীব্রতাও বাড়াতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার ওষুধ খাওয়া উচিত না।
ঔষুধের পাশাপাশি মাইগ্রেনের ব্যথার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হচ্ছে যথাসম্ভব অন্ধকার ও শব্দবিহীন পরিবেশে ঘুমানো, অন্তত কয়েক ঘন্টা।
যেসব খাবার মাইগ্রেন প্রতিরোধে সহায়ক:
১) ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার। যেমন- ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, আলু ও বার্লি মাইগ্রেন প্রতিরোধক।
২) বিভিন্ন ফল, বিশেষ করে খেজুর ও ডুমুর ব্যথা উপশম করে।
৩) সবুজ, হলুদ ও কমলা রঙের শাকসবজি (বিশেষত পালংশাক) নিয়মিত খেলে উপকার হয়।
৪) ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি মাইগ্রেন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তিল, আটা ও বিট ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে।
৫) আদার টুকরো বা আদার রস দিনে দুইবার পানিতে মিশিয়ে খেতে পারেন।
৬) প্রতিদিন রোদে ১০ মিনিট থাকতে পারলে ভালো হয়। সম্ভব না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন ‘ডি’ সাপ্লিমেন্ট খেতে পারেন।
৭) মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্যের অভাবের কারণে অনেক সময় মাথা ধরে। ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খান। লো ফ্যাট ডায়েট মেনে চলুন।
যেসব খাবার খাবেন না:
১) চা, কফি ও কোমলপানীয়, চকলেট, আইসক্রিম, দই, দুধ, মাখন, টমেটো ও টক জাতীয় ফল
২) গমজাতীয় খাবার, যেমন রুটি, পাস্তা, ব্রেড ইত্যাদি
৩) ডিম, মাংস
৪) আপেল, কলা ও চিনাবাদাম
৫) পেঁয়াজ
তবে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন খাবারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় একটা ডায়েরি রাখা। যাতে আপনি নোট করে রাখতে পারেন কোন কোন খাবার ও কোন কোন পারিপার্শ্বিক ঘটনায় ব্যথা বাড়ছে বা কমছে। এরকম এক সপ্তাহ নোট করলে আপনি নিজেই নিজের সমাধান পেয়ে যাবেন। তবে ব্যথা বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মাইগ্রেন থেকে রেহাই পাওয়ার কিছু উপায়
মাইগ্রেন চিকিৎসায় তাৎক্ষণিক এবং প্রতিরোধক ঔষধের পাশাপাশি কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়।
১) প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে হবে এবং সেটা হতে হবে পরিমিত।
২) কোনো বেলার খাবারই বাদ দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে সকালের নাশতা কখনোই বাদ দেওয়া যাবে না। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দেয়।
৩) অতিরিক্ত বা কম আলোতে কাজ না করা।
৪) কড়া রোদ বা তীব্র ঠান্ডা পরিহার করতে হবে।
৫) উচ্চশব্দ ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বেশিক্ষণ না থাকা।
৬) বেশি সময় ধরে কম্পিউটারের মনিটর ও টিভির সামনে না থাকা।
৭) মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেলে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা (বিশেষ করে বমি হয়ে থাকলে)
৮) বিশ্রাম করা, ঠান্ডা কাপড় মাথায় জড়িয়ে রাখা উচিত।
৯। অতি আলো কিংবা কম আলোতে পড়াশোনা করবেন না।
১০। অন্ধকার রুমে টিভি দেখবেন না।নারী
মাইগ্রেন সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা:
১) অনেকে মনে করেন মাইগ্রেন মানেই মাথা ব্যথা। এ ধারণা ঠিক নয়। মাইগ্রেনের অনেকগুলো লক্ষণের মধ্যে একটি হচ্ছে মাথা ব্যথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় মাথা ব্যথা ছাড়াও মাইগ্রেন আক্রমণ করতে পারে।
২) অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে, মাইগ্রেন কেবল মেয়েদেরই হয়। আসলে এটি নারী-পুরুষ যে কারোরই হতে পারে। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৮ ভাগ পুরুষ ও ১৮ ভাগ নারী এই সমস্যায় ভোগেন। আবার, শুধু বড়দের নয়, হতে পারে শিশুদেরও।
৩) অনেকের ধারণা শুধু মাত্র মানসিক চাপ থেকেই মাইগ্রেন হয়। এটি ঠিক নয়। প্রায় ৭০% মাইগ্রেনের কারণ দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ হলেও আরও বহু কারণে আক্রমণ করতে পারে মাইগ্রেন।
৪) মাইগ্রেনের ব্যথা বেশিদিন থাকে না বলে ভুল ধারণা প্রচলিত আছে অনেকের মধ্যে। তবে মাইগ্রেন অনেকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। অনেক সময় মাইগ্রেন একমাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
৫) অনেকে মনে করেন মাইগ্রেন থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এটি ঠিক নয়। যদিও মাইগ্রেনের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই, তবে লক্ষণসমূহ বিচার করে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
মাইগ্রেনের চিকিৎসায় নতুন কার্যকরী ওষুধ
গবেষকরা বলছেন, মাইগ্রেন বা দীর্ঘ সময়ের মাথা ব্যথা সারাতে অন্য সব ঔষধ বা চিকিৎসা যখন ব্যর্থ হবে, তখন এই নতুন ঔষধ কাজ করবে। নতুন এই ঔষধটি হচ্ছে ইনজেকশন। মাসে একবার এই ইনজেকশন নেয়া যাবে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘এরেনুম্যাব’।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস অল্প সময়ের মধ্যে মাইগ্রেন রোগীদের কাছে এই ঔষধ নিয়ে যাবে; যদি এর দাম সামর্থের মধ্যে বা একটা যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে। নতুন এই ঔষধের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে এক চিকিৎসা বিষয়ক সম্মেলনে। গবেষকরা বলেছেন, এই ঔষধ গুরুতর মাইগ্রেন আক্রান্ত এক তৃতীয়াংশ মানুষকে সাহায্য করবে। একজন মাইগ্রেন রোগী মাসে যতবার এই রোগে আক্রান্ত হন, নতুন ঔষধ ব্যবহারে আক্রান্তের সেই হার অর্ধেকে নেমে আসবে। মাইগ্রেনে আক্রান্ত সকলের জন্য এটি এক সুসংবাদ বটে।
মাইগ্রেন নামের এই ভয়ানক যন্ত্রণাকে স্বাভাবিক মাথাব্যথা ভেবে দিনের পর দিন সহ্য করে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। প্রত্যেকের উচিত মাইগ্রেন সম্পর্কে জানা ও সচেতন হওয়া। সেইসাথে প্রতিরোধমূলক নির্দেশনাসমূহ মেনে চলা। কারণ যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই, "প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়”।
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ