গোলাম আজম ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা: জামায়াতের দাবির একটি আলোচনামূলক বিশ্লেষণ
ভূমিকা: ইতিহাস বনাম রাজনৈতিক পুনর্লিখন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংগ্রাম নয়; এটি ছিল একটি আদর্শিক ও নৈতিক লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রশ্নে কার অবস্থান কী ছিল—তা নির্ধারণ করা ইতিহাসের মৌলিক দায়িত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একটি দাবি জোরেশোরে উত্থাপন করা হয় যে গোলাম আজম নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। এই দাবি যদি সত্য হতো, তবে তা ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা, তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।
১. ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক অবস্থান: পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে গোলাম আজম ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির। সে সময় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থহীনভাবে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে। তিনি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে “বিদ্রোহ”, “ভারতের ষড়যন্ত্র” এবং “ইসলামি ঐক্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
একজন ব্যক্তি যদি কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পক্ষে থাকেন, তবে অন্তত সেই রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্যতা তিনি স্বীকার করেন। গোলাম আজমের বক্তব্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ন্যায্যতার কোনো স্বীকৃতি পাওয়া যায় না—বরং উল্টোটি পাওয়া যায়।
২. যুদ্ধকালীন ভূমিকা: অনুপস্থিতি ও বিদেশে অবস্থান
২৫ মার্চ ১৯৭১-এর পর গোলাম আজম বাংলাদেশে অবস্থান না করে পাকিস্তানে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে তিনি নিপীড়িত জনগণের পাশে ছিলেন না; বরং দখলদার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে অবস্থান করেন।
এই সময় তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে বক্তব্য দেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে অবৈধ প্রমাণ করার রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্ত হন। ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই যেখানে স্বাধীনতার পক্ষে থাকা নেতা নিজের জনগণকে ফেলে দখলদার রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেন।
৩. “শান্তির পক্ষে ছিলেন” যুক্তির ভ্রান্তি
জামায়াতের একটি প্রচলিত যুক্তি হলো—গোলাম আজম নাকি রক্তপাতের বিরোধী ছিলেন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিলেন। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক বিভ্রান্তি রয়েছে।
নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা বজায় রেখে যে “শান্তি” চাওয়া হয়, তা প্রকৃত শান্তি নয়; তা দমননীতি। ১৯৭১ সালে “শান্তি” শব্দটি ব্যবহার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও দমন অভিযানকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। সেই বয়ানকে সমর্থন করা কখনোই স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান হতে পারে না।
৪. স্বাধীনতার পর আচরণ: স্বীকৃতি ও সংবিধান প্রশ্ন
স্বাধীনতার পর গোলাম আজম দীর্ঘদিন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি এবং দেশের সংবিধানের মূল রাষ্ট্রীয় নীতিগুলোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু।
যদি তিনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার পক্ষে থাকতেন, তবে স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি তিনি স্বীকার করতেন। বাস্তবে দেখা যায়, তিনি স্বাধীনতাকে একটি “ঘটিত বাস্তবতা” হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন—সমর্থন করেননি।
৫. Acceptance বনাম Support: একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী বিষয় হলো—কোনো বাস্তবতা মেনে নেওয়া আর সেই বাস্তবতার পক্ষে থাকা এক নয়।
স্বাধীনতার বহু বছর পর বাংলাদেশকে মেনে নেওয়া রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হতে পারে; কিন্তু সেটিকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান হিসেবে দেখানো ইতিহাসের বিকৃতি। জামায়াত এই পার্থক্যটি ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে দিতে চায়।
উপসংহার: দাবি নয়, প্রমাণই ইতিহাস
গোলাম আজম বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন—এই দাবি কোনো প্রামাণ্য দলিল, সমসাময়িক বক্তব্য বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক দায় এড়ানো এবং অতীতকে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা।
ইতিহাস আবেগ বা দলীয় আনুগত্য দিয়ে নয়, বরং প্রমাণ, সময়রেখা ও কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করা হয়। সেই মানদণ্ডে বিচার করলে এই দাবি একটি অসার, বিভ্রান্তিকর এবং ইতিহাসবিরোধী বয়ান হিসেবেই চিহ্নিত হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ