জরুরিয়ত ছাড়া ছবি সহ কাগজের পোস্টার ছাপানো, শরয়ী হুকুম

 "জরুরিয়ত ছাড়া ছবি সহ কাগজের পোস্টার ছাপানো ও শরয়ী হুকুম"






জরুরত ছাড়া ছবি-সংবলিত কাগজের পোস্টার প্রকাশ ও শরয়ী বিধান: একটি দলিলভিত্তিক পর্যালোচনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ,

সম্প্রতি আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি-সংবলিত কাগজের পোস্টার, শুভেচ্ছা ব্যানার এবং বিভিন্ন প্রচারণামূলক উপকরণে ব্যক্তির প্রতিকৃতি ব্যবহারের শরয়ী বিধান সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে একটি সংক্ষিপ্ত পোস্ট করেছিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল না কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক দলকে আক্রমণ করা। বরং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আলেম সমাজ ও সচেতন মুসলমানদের মতামত জানা।

দুঃখজনকভাবে, আলোচনার পরিবর্তে বিষয়টি অনেকেই আবেগের দৃষ্টিতে দেখেছেন। বিশেষ করে একটি ইসলামী রাজনৈতিক ধারার কিছু সমর্থক আমার পোস্টকে নিজেদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মন্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অথচ আমি কোথাও কোনো দলের নাম উল্লেখ করিনি। বরং সাধারণভাবে একটি শরয়ী প্রশ্ন উত্থাপন করেছি—যে কাজকে দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ আলেমগণ নাজায়েজ বা অন্তত অপছন্দনীয় বলে আলোচনা করেছেন, সেই কাজকে কি দলীয় প্রয়োজনে বৈধ হিসেবে গ্রহণ করা যায়?

আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন না করে ব্যক্তিগত সমালোচনা ও আবেগপ্রসূত বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ ইসলামে কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে সমাধানের পথ হলো কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যার দিকে ফিরে যাওয়া।

ইসলামে ছবি সম্পর্কে মৌলিক ধারণা

প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে, ইসলামী শরীয়তে "ছবি" বলতে কী বোঝানো হয়েছে।

আরবি ভাষায় "তাসবীর" শব্দের অর্থ হলো কোনো বস্তুর আকৃতি, অবয়ব বা প্রতিকৃতি তৈরি করা। আধুনিক যুগে এটি হতে পারে কাগজে অঙ্কিত ছবি, ডিজিটাল ফটোগ্রাফ, ব্যানার, পোস্টার কিংবা ভাস্কর্য বা মূর্তির আকারে।

ইসলামের সূচনাকালে আরব সমাজে মূর্তি ও প্রতিকৃতিকে কেন্দ্র করে শিরক, কুসংস্কার এবং ব্যক্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। মানবজাতিকে সেই পথ থেকে রক্ষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) ছবি ও মূর্তি নির্মাণের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা প্রদান করেছেন।

এ কারণেই হাদিসে তাসবীর নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে কঠিন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং মুসলিম সমাজকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

ছবি সম্পর্কে হাদিসের নির্দেশনা

হযরত আবু তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

"যে ঘরে কুকুর অথবা প্রাণীর ছবি থাকে, সে ঘরে রহমতের ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না।"

(সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

এই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ঘরে প্রাণীর ছবি সংরক্ষণ বা প্রদর্শনের বিষয়টি সাধারণ কোনো বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে ধর্মীয় গুরুত্ব জড়িত রয়েছে।

আবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

"কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে ছবি নির্মাণকারীরা।"

(সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিনি একবার এমন একটি গদি ক্রয় করেছিলেন যাতে প্রাণীর ছবি অঙ্কিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেটি দেখে ঘরে প্রবেশ না করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যান। তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ দেখে আয়েশা (রাঃ) কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন—

"এই ছবি তৈরিকারীদের কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে এবং বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার কর।"

(সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

এ ধরনের অসংখ্য হাদিস ইসলামী গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর আলোকে অধিকাংশ ফকিহ প্রাণীর ছবি নির্মাণ ও প্রদর্শনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

প্রাণহীন বস্তুর ছবি সম্পর্কে বিধান

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামী স্কলারদের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে যে গাছপালা, নদী, পাহাড়, ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, প্রাকৃতিক দৃশ্য কিংবা অন্যান্য প্রাণহীন বস্তুর ছবি অঙ্কন বা ধারণ করা বৈধ।

অর্থাৎ বিতর্ক ও আলোচনার মূল বিষয় সবসময়ই প্রাণীর প্রতিকৃতি বা মানবমূর্তিকেন্দ্রিক ছবি।

আধুনিক যুগে প্রয়োজনীয় ছবির ব্যবহার

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই ছবি ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যেমন—

  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • পাসপোর্ট
  • ড্রাইভিং লাইসেন্স
  • শিক্ষা সনদ
  • ব্যাংকিং কার্যক্রম
  • নিরাপত্তা যাচাই
  • অপরাধ দমন

এ ধরনের প্রয়োজনীয়তার কারণে সমকালীন অনেক আলেম ও ইসলামী গবেষক ছবিকে "জরুরত" বা "হাজত"-এর ভিত্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন।

কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে—

"জরুরত যতটুকু, অনুমতি ততটুকু।"

অর্থাৎ প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে ছবিকে প্রচারণা, সৌন্দর্য প্রদর্শন, ব্যক্তিপূজা বা রাজনৈতিক প্রচারের উপকরণে পরিণত করা হলে সেই বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

ছবি-সংবলিত পোস্টার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, নেতা, সম্ভাব্য প্রার্থী কিংবা সংগঠনের নেতাদের ছবি দিয়ে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন, ঈদ মোবারক, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা নানা উপলক্ষে পোস্টার ছাপানোর একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হলো—

এগুলোর কতটুকু বাস্তব প্রয়োজন?

কতটুকু জনকল্যাণমূলক?

আর কতটুকু ব্যক্তিপ্রচার?

যদি কোনো ব্যক্তি নির্বাচনের প্রার্থী হন, তাহলে নির্বাচনের সময় সীমিত পরিসরে ভোটারদের পরিচিতির জন্য কিছু প্রচারণা করা বাস্তবতার অংশ হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের বহু মাস বা বছর আগে থেকেই ছবি-সংবলিত পোস্টার লাগিয়ে ব্যক্তিকে পরিচিত করার প্রবণতা কি সত্যিই প্রয়োজনীয়?

কোনো ইসলামী দল বা সংগঠন যদি শরীয়তকে নিজেদের আদর্শ বলে দাবি করে, তাহলে তাদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকবে যে তারা সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকেও দূরে থাকবে।

কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন

যারা ছবি-সংবলিত পোস্টারের পক্ষে যুক্তি দেন, তাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা যেতে পারে—

প্রথমত, দলীয় সিদ্ধান্ত কি কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশনার বিকল্প হতে পারে?

দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তিকে পরিচিত করার জন্য কি ছবি ছাড়া আর কোনো মাধ্যম নেই?

তৃতীয়ত, জনসম্পৃক্ততা, সামাজিক কাজ, গণসংযোগ, দাওয়াতি কার্যক্রম ও জনসেবার মাধ্যমে কি জনপ্রিয়তা অর্জন সম্ভব নয়?

চতুর্থত, যদি কোনো নেতাকে জনগণ চিনেই না, তাহলে সেই নেতাকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করার পেছনের যুক্তি কী?

পঞ্চমত, শরীয়তের একটি বিতর্কিত বিষয়কে শিথিল করার পরিবর্তে জনসম্পৃক্ত ও পরিচিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা কি অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হতো না?

ষষ্ঠত, যদি দলীয় প্রয়োজনে শরীয়তের একটি নিষেধাজ্ঞা বা আপত্তিকর বিষয়কে সহজভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য বিষয়েও একই ধরনের দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কি নেই?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবির প্রসঙ্গ

কিছু ভাই আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আমি তাদের প্রতি সম্মানের সঙ্গে বলতে চাই, বর্তমান ডিজিটাল যুগে পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা এবং অ্যাকাউন্ট সুরক্ষার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ছবি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োজনের পর্যায়ে বিবেচনা করি।

তবে প্রয়োজনের কারণে কোনো কাজ করা আর সেটিকে গর্বের সঙ্গে প্রচার করা—দুইটি ভিন্ন বিষয়।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যারা ছবি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি করেন, তাদের অনেকেই নিজেরা নিয়মিত ব্যক্তিগত ছবি, পারিবারিক ছবি এমনকি পর্দাহীন অবস্থার ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। সুতরাং সমালোচনা করার আগে নিজের অবস্থানও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

উপসংহার

আমার এ লেখার উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয় এবং কোনো দলের বিরোধিতা করাও নয়। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করা।

আমরা সবাই ভুল করতে পারি। কিন্তু একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো দল, ব্যক্তি, আবেগ কিংবা সাংগঠনিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিজের অবস্থান যাচাই করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার, মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চেনার, হারামকে হারাম এবং হালালকে হালাল হিসেবে মানার তাওফিক দান করুন।

আল্লাহ আমাদের অন্তরে ইখলাস, ন্যায়পরায়ণতা ও সহীহ বুঝ দান করুন।

আমীন।

লেখক: চিকিৎসক, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইসলামে সূফীবাদ নামক কুফুরী ভ্রান্তি

মাও: মওদূদীর ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে ৮৫ বছর যাবত ভারতবর্ষের আলেমদের বিতর্কের কারন

স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ লুটের হিসাব

আহলে হাদিসের ভন্ডামীর আদ্যোপান্ত

ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর শালী তালাক

দেশের জন্য সব হারানো বেগম খালেদা জিয়ার সফল সংগ্রামী জীবন

জয়বাংলা একটি পাকিস্তানি হাইব্রিড স্লোগান

প্রকৃত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী নিজামী নয় আওয়ামিলীগ, তাদের বিচার চাই