দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্মের চিত্র

 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্মের চিত্র

 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্মের চিত্র


দাঙ্গা, রাজনীতি ও ইহুদি কার্যকলাপের একটি ঐতিহাসিক চিত্র

১৮৯৭ সালে অনুষ্ঠিত জায়োনিস্ট কংগ্রেসে থিওডর হার্জল যে পরিকল্পনার খসড়া তুলে ধরেন, তার খুব বেশি সময় পার হওয়ার আগেই বিশ্ব রাজনীতিতে এক ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা ঘটে—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

১৯০৩ সালে কিশিনেভে ইহুদি ও অ-ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে বহু ইহুদি প্রাণ হারায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার তাদের জন্য আফ্রিকার উগান্ডায় একটি বসতি গঠনের প্রস্তাব দেয়, যা হার্জল গ্রহণ করেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ইহুদি মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে, কারণ তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল জেরুজালেম—অন্য কোনো ভূখণ্ড নয়।

এর আগে আর্জেন্টিনায় বসতি স্থাপনের প্রস্তাবও তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাহলে উগান্ডা প্রস্তাবে সম্মতি কেন? এর অল্প সময় পরই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য তখনও পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেখা যায়—উগান্ডায় না গিয়েও তারা শেষ পর্যন্ত প্যালেস্টাইনের দিকেই অগ্রসর হয়।

এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে—তারা কি আগে থেকেই যুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা রেখেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরে একটি ঐতিহাসিক সূত্র পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, American Jewish News পত্রিকায় লিটম্যান রোজেনথাল একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যেখানে ম্যাক্স নরডাউ নামক এক জায়োনিস্ট নেতার বক্তব্য তুলে ধরা হয়। নরডাউ ষষ্ঠ জায়োনিস্ট কংগ্রেসে এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন, যা পরবর্তী বিশ্বঘটনার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।

তিনি বলেন, উগান্ডা প্রস্তাব গ্রহণ আসলে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তিনি ইতালির ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে বলেন—সার্ডিনিয়া রাষ্ট্র সরাসরি তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য সেভাস্টোপল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। যুদ্ধ শেষে শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে তারা নিজেদের স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরে সফল হয়।

নরডাউ এই উদাহরণ ব্যবহার করে বোঝাতে চান—উগান্ডা গ্রহণ মানে প্যালেস্টাইন ত্যাগ নয়; বরং সেটির দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি ধাপ।

তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, সামনে একটি বৃহৎ যুদ্ধ আসছে, যার পরবর্তী শান্তি আলোচনায় ইহুদিরা তাদের লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ পাবে। ইতিহাসে পরবর্তীতে আমরা দেখি—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বেলফোর ঘোষণা এবং প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া—এই ধারাবাহিকতা বাস্তবেই ঘটেছে।

বিশ্বযুদ্ধ ও রাজনৈতিক কৌশল

১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় রাজপুত্র আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড সারাজেভোতে নিহত হন। এই ঘটনা থেকেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। দ্রুতই ইউরোপের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

এই যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে অর্থনৈতিক চাপ, রসদের সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

রাশিয়ায় বিপ্লব, ফ্রান্সে বিদ্রোহ, এবং ব্রিটেনের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে নতুন শক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে প্রবেশ করে এবং দ্রুত শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে।

এই সামরিক প্রস্তুতির পেছনে বার্নার্ড এম. বারুখ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শিল্প, অর্থনীতি ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত করে আমেরিকাকে অল্প সময়েই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন।

অর্থনীতি, যুদ্ধ ও ক্ষমতার সম্পর্ক

যুদ্ধকালীন সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহৃত হলেও সাধারণ সৈনিকদের অনেকেই প্রাপ্য সুবিধা পায়নি। অন্যদিকে কিছু গোষ্ঠী দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্থানে ধনী শ্রেণির উত্থান এই সময়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনও লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতি অসন্তোষ বৃদ্ধি পেলে রিপাবলিকানদের উত্থান ঘটে।

ঐতিহাসিক সংঘাত ও ধর্মীয় দ্বন্দ্ব

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সংঘাতের উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন—মাক্কাবিয়ান যুগে জন হাইরকানাস সামারিটানদের মন্দির ধ্বংস করেন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঘটান। একইভাবে আলেকজান্ডার জ্যানিয়াসের শাসনামলে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

ইহুদি সমাজের ভেতরেও বিভিন্ন মতবিরোধ ছিল—হিল্লেল ও শাম্মাই বিদ্যালয়ের মধ্যে সংঘর্ষ তার একটি উদাহরণ।

খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত এবং মধ্যযুগীয় সহিংসতার ঘটনাও ইতিহাসে উল্লেখিত।

যুদ্ধ অর্থনীতির একটি ধারা

ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধের সঙ্গে অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময় সামরিক বাহিনীর খাদ্য, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহে কিছু গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

Werner Sombart তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, ইউরোপের বহু যুদ্ধে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রসদ সরবরাহে সক্রিয় ছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশে এ ধরনের উদাহরণ পাওয়া যায়।

Antonio Fernandez Carvajal, Solomon Medina, Cerf Beer প্রমুখ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

একইভাবে নেপোলিয়নের যুদ্ধ কিংবা আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধেও রসদ সরবরাহকারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

উপসংহার

এই পুরো আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—ইতিহাসের ঘটনাগুলো জটিল, বহুস্তরীয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপাদানের সম্মিলিত ফল।

ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ও যুদ্ধ—এই চারটি উপাদান বহু ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে জড়িত। কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরো ইতিহাস ব্যাখ্যা করা কঠিন।

অতএব, ইতিহাস বিশ্লেষণে সতর্কতা, বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরপেক্ষ গবেষণাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইসলামে সূফীবাদ নামক কুফুরী ভ্রান্তি

মাও: মওদূদীর ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে ৮৫ বছর যাবত ভারতবর্ষের আলেমদের বিতর্কের কারন

স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ লুটের হিসাব

আহলে হাদিসের ভন্ডামীর আদ্যোপান্ত

ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর শালী তালাক

দেশের জন্য সব হারানো বেগম খালেদা জিয়ার সফল সংগ্রামী জীবন

জয়বাংলা একটি পাকিস্তানি হাইব্রিড স্লোগান

প্রকৃত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী নিজামী নয় আওয়ামিলীগ, তাদের বিচার চাই