• অধিকাংশ মানুষ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু সেই সঙ্গে শিরকও করে। {১২:১০৬}
• কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কুফুরি করে তারা- আর মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। এরাই সৃষ্টির অধম। {৯৮:৬}
• আর তাদের বেশিরভাগ অনুমান/ধারণা (ظَنًّاۗ) ছাড়া অনুসরণ করে (يَتَّبِعُ) না; নিশ্চয়ই সত্যের (ٱلْحَقِّ) ক্ষেত্রে অনুমান/ধারণা (ٱلظَّنَّ) কোনো কাজ করে না…{১০:৩৬}
• যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না…{১৭:৩৬}
• যারা বিবেক বুদ্ধি খাটায় না, আল্লাহ তাদের উপর গুমরাহী চাপিয়ে দেন/ অপবিত্রতা স্থাপন করে দেন/ আযাব চাপিয়ে দেন। {১০:১০০}
• যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তাতে যাউত্তম তা গ্রহণ করে। এরাই সেসব লোক, যাদের আল্লাহ্ হিদায়াত করেছেন এবং তারাই বুদ্ধিমান লোক। {৩৯:১৮}
স্নায়ু যুদ্ধের সময় অ্যামেরিকানদের মুখে প্রায়ই একটা কথা শোনা যেত, ‘ র্যাডিকাল ন্যাশনালিস্ট’। সেই দিনগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে র্যাডিকাল ন্যাশনালিস্টদের কবল থেকে রক্ষা করা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিল অ্যামেরিকা। অ্যামেরিকার অস্তিত্বের প্রতি র্যাডিকাল ন্যাশনালিস্টরা কেন হুমকি, সেটা নিয়েও শোনা যেতো অনেক কথা। কিন্তু ‘র্যাডিকাল ন্যাশনালিস্ট’ নামের এ দানব আসলে কী ছিল?
শাব্দিকভাবে এর অর্থ হয় চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ। কিন্তু অ্যামেরিকান সাম্রাজ্যের কাছে র্যাডিকাল শব্দের একটা বিশেষ অর্থ ছিল। র্যাডিকাল মানে হল ‘আমাদের কথা শোনে না’। অ্যামেরিকার আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করা যেকোন দেশ, দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তি এই সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘র্যাডিকাল’। তার রক্ত হালাল।
একইভাবে সাম্রাজ্যবাদের অভিধানে বিশেষ এক অর্থ ছিল ‘আগ্রাসনের’। আগ্রাসন মানে প্রতিরোধ। সাম্রাজ্যবাদী লুটপাট, হত্যা, সামরিক অভিযান চালানো অ্যামেরিকা শান্তিকামী, আগ্রাসী না। কিন্তু অ্যামেরিকান আগ্রাসন প্রতিরোধের চেষ্টা যে করে সে অবশ্যই, অতি অবশ্যই আগ্রাসী।
আজকের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যুগে প্রায় হুবহু ব্যবহার করা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার এই ফর্মূলা। শুধু চরমপন্থী জাতীয়বাদের জায়গায় ইসলামী চরমপন্থা (র্যাডিকাল ইসলাম) আর ‘আগ্রাসন’ এর জায়গায় এসেছে ‘সন্ত্রাস’। নিজেদের চিরাচরিত উদ্ভাবনী স্বভাব বজায় রেখে এই নতুন শব্দগুলো দিয়ে অ্যামেরিকা তৈরি করেছে ভালো-খারাপ মুসলিমের নতুন নতুন সংজ্ঞাও।
মডারেট, ‘ভালো মুসলিম’ হল আজ্ঞাবহ মুসলিম। যে অ্যামেরিকাকে ভালো পায়। অ্যামেরিকা যতোটুকু মেনে নেবে তার ইসলাম ততোটুকুই। অ্যামেরিকা যা পছন্দ করে না সেটা তার কাছে চরমপন্থা, সন্ত্রাস, জঙ্গিপনা। দু বেলা দু মুঠো খেয়েপরে অ্যামেরিকার কাছ থেকে শান্তিকামী, সভ্য, ভব্য খেতাব নিয়ে রাতে নিশ্চিতে ঘুমোতে পারলেই সে খুশি। হাউস নিগার। ডিনার টেবিলের পাশে মনিবের ছুড়ে দেয়া ছিটেফোঁটা খাবারের টুকরোর জন্য উদগ্রীব চোখে তাকিয়ে অনবরত লেজ নাড়াতে থাকা গর্বিত, সাম্রাজ্যপ্রেমী মডারেট কুকুর।
আর র্যাডিকাল মুসলিম হল অ্যামেরিকার কথা না শোনা দুষ্ট মুসলিম। ঐ মুসলিম যে অ্যামেরিকান সাম্রাজ্যবাদ আর সন্ত্রাসবাদকে মেনে নেয় না।
ইসলামের বিরুদ্ধে নব্য ক্রুসেইডে যারা অ্যামেরিকার দলে তারা মডারেট, ভালো মুসলিম। যারা অ্যামেরিকান ক্রুসেইডের বিরোধিতা করে তারা র্যাডিকাল, খারাপ মুসলিম।অর্থাদ মডারেট মুসলমান হলো আমেরিকার আজ্ঞা পালন কারী গৃহপালিত কুত্তা।
মডারেট মুসলিম হলো সেই ধরনের মুসলিম, যাদের কার্যকলাপের ভেতরে ইসলামের কোন চিন্হ নেই। অথবা, তারা ইসলাম বহির্ভূত কার্যকলাপ করে। সহজ ভাষায় বললে, তারা নামে মুসলিম, কাজে কাফের (বা মুশরিক)। কাফের ও মুশরিক কথাগুলো অপমানজনক বলে, সেটার একটি সুন্দর নাম দিয়েছে - মডারেট মুসলিম।
মুসলিম নামধারী কিন্তু কার্যত অমুসলিম, এমন মানুষকে বলে - মডারেট মুসলিম। যাদের কার্যকলাপে মুসলিম প্রমান পাওয়া যায়, তাদের নাম দিয়েছে - প্র্যাকটিসিং মুসলিম।
আমাদের সমাজে যেটা হচ্ছে, সেটা এতক্ষণ বলেছি। এখন বলবো - কি হওয়া উচিত ছিলো।
সাধু সন্ন্যাসীরা হিমালয়ে গিয়ে তপস্যা করে, জঙ্গলে গিয়ে থাকে। এভাবে তারা জীবনটা উপভোগ করার সুযোগ হারায়। যীশু একজন মানুষ হলেও, তাকে ঈশ্বর বানিয়ে ফেলেছে। গির্জার নান আর মন্দিরের সেবাদাসী মেয়েরা আজীবন কুমারী থেকে মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
মোট কথা - স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ত্যাগ না করলে, বড় ধার্মিক হওয়া যায় না। এটাই হচ্ছে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি। এটা হলো চরমপন্থা (extremism)। ইসলাম আমাদের স্বাভাবিক থাকতে শিখিয়েছে। ইসলাম শিখিয়েছে, কাজকর্ম করে, বিয়ে-শাদি করে, বড় ধার্মিক হওয়া যায়। ইসলাম আমাদের মধ্যমপন্থায়, স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে শিখিয়েছে। ইসলাম একটি মধ্যপন্থী (moderate) ধর্ম।
কাজকর্ম করে, বিয়ে-শাদি করে, বড় ধার্মিক হয় কিভাবে? প্রতিটি কাজ আল্লাহর দেওয়া নিয়ম অনুসারে করতে হবে। কি করতে হবে? আল্লাহর দেওয়া নিয়মে কাজ করতে হবে। চুপ করে বসে ধ্যান করলে হবে না। কাজ করতে হবে। ওই কাজ করাটাই প্র্যাকটিস (practice)।
- ইসলাম একটি মধ্যপন্থী (moderate) ধর্ম। ইসলাম হলো প্র্যাকটিস (practice) করার ধর্ম।
আসলে, মডারেট মুসলিম এবং প্র্যাকটিসিং মুসলিম বলে কিছু নেই। ইসলাম এমনিতেই মডারেটেড সর্বকালের জন্য এবং প্র্যাকটিসিং ধর্ম।
আল্লাহ কুরআনে যে বিধিনিদেশগুলি দিয়েছেন সেগুলি পরিপূর্ণভাবেই পালন করার চেষ্টা প্রতিটি মুসলমানকে করতে হবে; এখানে আধাআধি বা তথাকথিত মধ্যপন্থা অবলম্বনের কোনো অবকাশ নেই।
মানবজীবন সৃষ্টির লক্ষ্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
"He Who created Death and Life, that He may try which of you is best in deed: and He is the Exalted in Might, Oft-Forgiving." ( Al Quran # 67:2)
"যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।" ( আল কুরআন# ৬৭:২)
বিশ্বাসীদেরকে তাই নিজেদেরকে মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন এবং কর্মে শ্রেষ্ঠ হিসেবে তৈরী করতে চাইলে অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং মানবতার সেবায় আত্মত্যাগী হতে হবেI কুরআনে শুধু মাত্র একটি রাস্তার কথাই বলা হয়েছে; তাহলো, সিরাতুল মুস্তাকীম বা সোজা রাস্তা, যা হচ্ছে রসূলুল্লাহর আদর্শ বা কুরআন।
কুরআনের ২:১৪৩ নং আয়াতে أُمَّةً وَسَطًا- ummatau wasatan বাক্যাংশটি অনুবাদকেরা middle nation, moderate nation, just nation, justly balanced nation বা balanced nation ইত্যাদি নানাভাবে অনুবাদ করেছেন। তবে balanced nation অনুবাদটিই যথোপযুক্ত। আয়াতটির ইংরেজি অনুবাদ নিচে উল্লেখ করছি:
"And as such, We have made you a balanced nation so that you may be witness over the people, and that the messenger may be witness over you…… " (Al Quran# 2:143)
এর বঙ্গানুবাদ নিম্নরূপ:
"এবং এরূপেই আমি তোমাদেরকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতি হিসেবে তৈরী করেছি যাতে তুমি লোকদের জন্য উদাহরণ হতে পার এবং রসূল তোমার জন্য উদাহরন………"
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন ভারসাম্যপূর্ণ জাতি বলতে কি বোঝায় ?
প্রথমে আসা যাক একজন ভারসাম্য সম্পন্ন মানুষ কাকে বলে।ধরা যাক কেউ একজন নামাজ, রোজা, দান খয়রাত সবই করেন, আবার সেই সাথে ঘুষ, সুদ, গালিগালাজ, ব্যভিচারও করেন; তাহলে আপনি কি তাকে balanced বা ভারসাম্যপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী বলতে পারেন?অবশ্যই নয়।
কুরআনের পরিভাষায় এদেরকে মুনাফিক বলা হয়- যারা কুরআনের একাংশ, যা তাদের পছন্দ তা অনুসরণ করে, আর যা পছন্দ নয় তা বাতিল করে; এবং এই উদ্দেশ্যে তারা তাদের পছন্দনীয় কোনো ধর্ম গুরুকে অনুসরণ করে। আল্লাহ এদের সম্পর্কে কুরআনে বলেন :
"...তবে কি তোমরা গ্রন্থের (কুরআনের) কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।" (আল কুরআন # ২:৮৫)
Balanced বা ভারসাম্যপূর্ণ লোক আপনি তাকেই বলবেন যার মধ্যে সমস্ত মানবিক গুণাবলীই সমভাবে বিকশিত। আল্লাহ ২:১৪৩ নং আয়াতে এটাই বুঝিয়েছেন যে তোমাকে সবাই রাসূলুল্লাহর আদর্শে গড়া একজন মানুষ বলেই মনে করবে, আর তোমার আদর্শগুরু হবেন রাসূলুল্লাহ(সা:)। এটাই হচ্ছে মুসলিম জাতি হিসেবে তোমাদের বৈশিষ্ট্য।
যদিও অনেকে এই আয়াতের 'ব্যাখ্যায়' মুসলমানদেরকে মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে নিজেদেরকে গড়ার ইঙ্গিত দেন কিন্তু মধ্যপন্থা কি এ বিষয়ে তাদের ধারণা মোটেই সুস্পষ্ট নয়। আল্লাহ বলেন:
"যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।" ( আল কুরআন # ৩৩:২১)
ইসলামে তাই নম্রপন্থী, মধ্যপন্থী অথবা চরমপন্থী বলে কোনো কিছু নেই। আপনাকে নিজেকে শুদ্ধভাবে রাসূলুল্লাহর আদর্শে গড়ার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা করে যেতে হবে। সেটাই একমাত্র পন্থা, কর্মে শ্রেষ্ঠ হবার একমাত্র উপায়। ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ