ইসলামি রাষ্ট্রে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে কি?
নেতৃত্বের অধীনে লক্ষ্য অর্জনে অধীনস্তদের সংগঠিত, প্রভাবিত ও উৎসাহিত করে এবং তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা নিয়ে কর্মতৎত্রতা পরিচালনা করা হয়।
নারী নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ ও সিদ্ধান্তঃ
উল্লেখ্য, কুরআন সুন্নাহে নারী নেতৃত্ব বৈধ বা অবৈধ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ নেই। রসুল সা.-এর যুগে কোনো নারীকে গভর্নর, বিভিন্ন অভিযানে দলনেতা বা বিচারিক নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন বলে প্রমাণিত নয়। খোলাফায়ে রাশিদীনের যুগেও তাই। এজন্য পরবর্তী আলিমগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ করেছেন।
তাদের মতামতসমূহ প্রধানত ছয় ধরনের:
প্রথম অভিমত: সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব অবৈধ, কারো মতে হারাম।
দ্বিতীয় অভিমত: সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ।
তৃতীয় অভিমত: মজলিশে শুরা ব্যবস্থায় বা যৌথ নেতৃত্বে নারীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বসহ সকল ক্ষেত্রের নেতৃত্ব বৈধ।
চতুর্থ অভিমত: বিশেষ অবস্থা বা প্রেক্ষাপটে নারীর রাষ্ট্রপ্রধানসহ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বৈধ।
পঞ্চম অভিমত: বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ।
ষষ্ঠ অভিমত : গোটা জাতির উপর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ। নিম্নে এসব পর্যালোচনা করা হলো:
প্রথম অভিমত: সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব অবৈধ বরং হারাম (অধিকাংশ আলিম)
অধিকাংশ আলিমের মতে সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব জায়েয নয় তথা বৈধ নয়। কারো কারো মতে এটা হারাম তথা তাদেরকে নেতা নিয়োগ করা হালাল নয়। এসব মতের সমর্থনকারীগণ কয়েক ধরনের দলিল উপস্থাপন করেন। সেগুলো হলো:
ক. আল কুরআন থেকে দলিল
১. আল্লাহর বাণী:"পুরুষগণ নারীদের কাউয়াম (পরিচালক)- এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে একজনকে অপরের উপর বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর পুরুষরা যেহেতু নারীর খরচ বহন করে। সেহেতু পুরুষকে তাদের উপর পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে"।"
তাদের মতে, এ আয়াতে পুরুষদেরকে স্ত্রীলোকদের 'কাউয়াম' কর্তা, পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়ক বলে ঘোষণা করা হয়। সামাজিক নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব তাদেরই।১০ এছাড়া, একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিট হলো পরিবার। আল্লাহ তাআলা যেখানে একটি মাত্র পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব অর্পণ করেননি, কোটি কোটি পরিবার নিয়ে যে রাষ্ট্র- তার দায়িত্বভার ও নেতৃত্বের বোঝা নারীর উপর তিনি কীভাবে চাপাতে পারেন? সুতরাং সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, ইসলামে সামাজিক, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নারীদের জন্য নয়।"
২. আল্লাহর বাণী: 'আর নারীদের উপর পুরুষের এক ধরনের প্রাধান্য রয়েছে'। এ আয়াতে দারাজাত বা প্রাধান্য নেতৃত্বের।
৩. আল্লাহর বাণী:" তোমরা (নারীরা) তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং বিগত কালের চরম জাহেলিয়াতের ন্যায় প্রশাধনী মেখে উন্মুক্তভাবে জনসম্মুখে বাইরে বেরিও না"।
তারা বলেন, নারী তার স্বামীর ঘরে রাণী। ঘর দেখাশোনা, ঘরোয়া কাজের ব্যবস্থাপনা, সন্তানদের লালন-পালন ও সুযোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা প্রভৃতি তার দায়িত্ব। ঘরের বাইরের জীবন সংগ্রাম, চেষ্টা সাধনা ও দৌড়াদৌড়ি থেকে মুক্ত হয়ে নারী তার ঘর সামলাবে, ঘর সংশোধন করবে, জাতির ভবিষ্যতে সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলবে। এটাই তার মূল ও মৌলিক দায়িত্ব। সুতরাং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং দেশ শাসন নারীদের কর্মসীমা বহির্ভূত।"
তাদের মতে সামাজিক, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসনে আসীন হলে নারীকে প্রায় সবসময় বাইরে যেতে ও থাকতে হবে। প্রয়োজনেই কেবল ঘরে আসা সম্ভব হবে। বাধ্য হয়ে আল্লাহর বিধানের উল্টোটাই সে করবে। এতে আল্লাহর পুরো ব্যবস্থাটাই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তাই ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েয নেই।
৪. আল্লাহর বাণী: "আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজের নিষেধ করবে"।
এ আয়াতের প্রেক্ষিতে তাদের বক্তব্য হলো: মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে নামায কায়েমের প্রধান দায়িত্ব সরকার প্রধানের। তিনি নিজে নামাযী হবেন এবং জাতির ইমামতি করবেন। শরিআহতে এটা স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বসম্মত বিধান যে, নামাযে পুরুষদের ইমামতি করা নারীর জন্য জায়েয নেই।"
খ. হাদিস থেকে দলিল প্রমাণ
১. হযরত আবু বাকারাহ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেন, "যে জাতি তাদের বিষয়াদির উপর নারীদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করে, সে জাতি কখনো কল্যাণ পাবে না, সফল ও সার্থক হবে না"।
তাদের মতে, এ হাদিস রাষ্ট্রে নারী নেতৃত্ব জায়েয না হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল। অধিকাংশ আলিম সার্বিক কর্তৃত্ব প্রয়োগে নারী নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাওকানী রহ. বলেন, হাদিসের ভাষ্য মতে তাদের নেতৃত্বে বসানো হালাল নয়, তথা হারাম। কেননা যে বিষয় আবশ্যিকভাবে অকল্যাণ ডেকে আনে তা পরিহার করাও আবশ্যিক (ওয়াজিব)"। তিনি আরো বলেন, "সফলতা বা কল্যাণ তিরোহিত হওয়ার বিষয়টির চেয়ে প্রচণ্ড ধমকি আর কিছু নেই"।
২. জাবির ইবন সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, "সে জাতির কখনো কল্যাণ হবে না, যাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক হলো একজন নারী"।" তবে হাদিসটিতে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী থাকায় এটি দুর্বল বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
৩. আবু বকর রা. বর্ণিত, মহানবি সা. বলেন, 'পুরুষরা ধ্বংস হয়েছে, যখন তারা নারীর আনুগত্য করেছে, পুরুষরা ধ্বংস হয়েছে যখন তারা নারীর আনুগত্য করেছে'। তাদের মতে হাদিসটিতে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, হাদিস যাচাইকারী শুআইব আরনাউথ বলেন: হাদিসটির সনদে বাক্কার ইবন আবদিল আযীয (আবু বাকারাহ রা.-এর নাতি) একজন দুর্বল রাবী। এজন্য হাদিসটি দুর্বল। কিন্তু হাকিম স্বীয় 'মুস্তাদরাকে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। ২৪
৪. মহানবি সা. বলেন, বিচারক তিনজন। তন্মধ্যে একজন জান্নাতে, আর দু'জন দোযখে। যিনি জান্নাতে তিনি সেই পুরুষ ব্যক্তি, যে সত্য জানলো এবং সে মোতাবেক ফয়সালা দিল। আর যে পুরুষ সত্য জেনেও ফয়সালায় যুলম করলো সে দোযখে। আর যে পুরুষ অজ্ঞতা সত্ত্বেও ফয়সালা দিল সেও দোযখে"।
শাওকানী উল্লেখ করেন, এ হাদিসে বিচারক হিসেবে বার বার শুধু পূরুষ ব্যক্তি )رح( বলা হয়েছে। তাই এর দ্বারা নারী বিচারক হবে না তাই বুঝানো হয়েছে।
৫. বর্ণিত হাদিস, একদা আবু যর বলেন, হে আল্লাহর রসুল সা.! আপনি আমাকে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব দিবেন কি? তখন তিনি বললেন, হে আবু যর! তুমি দুর্বল। আর ঐ দায়িত্বটি আমানত। এটির হক বা দাবি যারা পুরণ করে এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তারা ব্যতীত অন্যদের জন্য এটি কিয়ামতের দিন অপমান ও অনুসুচনার উপলক্ষ্য হবে"।২৬
তাদের মতে এ হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, দুর্বলদেরকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেয়া যায় না। আর নারীরা শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে দুর্বল।
৬. সাহাবিগণের বক্তব্য: আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. বলেন: "তাদেরকে (নারীদেরকে) সেভাবে পিছনে রাখ, যেভাবে আল্লাহ তাদেরকে পিছনে রেখেছেন"।২৭
আল মাওয়ারদী বলেন: "যেহেতু তাদেরকে পিছনে রাখা ওয়াজিব, সেহেতু তাদেরকে (নেতৃত্ব দিয়ে) আগে বাড়িয়ে দেয়াও হারাম হয়েছে"।
গ. ইজমা থেকে দলিল
কুরআন-সুন্নাহর এসব সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে সর্বযুগে গোটা উম্মাহর অধিকাংশ নারী নেতৃত্বকে নাজায়েয বলেই অভিমত ব্যক্ত করে এসেছেন। এটি হলো ইজমায়ে উম্মাত। ইজমায়ে উম্মাত শরিআহতের একটি অকাট্য দলিল।
ঘ. সৃষ্টিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি
প্রথমত:
তাদের মতে নারী পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত পার্থক্য রয়েছে। তাদেরকে হাদিসে বলা হয়েছে তারা: আকল তথা বুদ্ধিগত স্বল্পতা ও ধর্মপালনে ঘাটতি যুক্ত ناقصات عقل و دین(। তাদের দু'জনের সাক্ষী একজন পুরুষের সাক্ষীর সমান। তারা পূর্ণ মাসের সালাত ও সিয়াম পালন করতে পারে না হায়েযের কারণে।
দ্বিতীয়ত:
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে ভবিষৎ প্রজন্ম গড়ার তথা সন্তান লালন পালনের কঠিন দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এজন্য তাদের যুক্তি বিদ্যা কম দিয়ে আবেগ মমতা বেশি দেয়া হয়েছে। তারা দ্রুত ভুলে যায়। তারা নেতৃত্বের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে পড়লে মানবসমাজে আদর যত্নে সন্তান লালন পালনের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বিঘ্নিত হবে।
তৃতীয়ত:
তাদের মতে শরিআহর বিধানের আলোকে নারীসমাজ নেতৃত্বের সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়।
এরূপ ক'টি সীমাবদ্ধতা নিম্নরূপ:
১. নারীরা কোনো অবস্থাতেই নামাযে ইমামতি করতে পারবে না।
২. যাঁর উপর জামাআতে নামায পড়া ওয়াজিব নয়।
৩. যিনি কখনো জামাআতে শামিল হলেও সব পুরুষের পেছনেই তাঁকে দাঁড়াতে হয়।
৪. যাঁর প্রতি মাসে হায়েয তথা কিছুদিন এমন অবস্থা হয়, যখন মসজিদে প্রবেশ করা তাঁর জন্য নাজায়েয থাকে।
৫. যাঁর উপর জুমা ফরয নয়।
৬. যাঁর পক্ষে কোনো জানাযার সাথে যাওয়া জায়েয নয়।
৭. কোনো মুহরম সাথে না নিয়ে সফরে যাওয়া যাঁর জন্য নিষেধ। এমনকি মুহরেম না পেলে আমৃত্যু হজ পর্যন্ত করা জায়েয নেই। এ অবস্থায় বদল হজের অসীয়ত করে যেতে হয়।
৮. যাঁর উপর জিহাদ ফরয নয়।
৯. বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে যাওয়া যাঁর জন্য জায়েয নয়।
১০. এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত যিনি পরিবার প্রধান হতে পারেন না। ১
মালেকি মাযহাবের ফকীহ ইবনুল আরাবী বলেন: "নারী এমন নয়, যে মজলিশে বের হতে পারে, পুরুষের সাথে মুক্ত মেলামেশা করতে পারে, একজন সমকক্ষ আরেকজন সমকক্ষের ন্যায় আলোচনা করতে পারে, কারণ সে যদি যুবতী হয়, তার দিকে দৃষ্টি দেয়া, কথা বলা হারাম। তিনি যদি সতী সাধ্বী বৃদ্ধা মহিলাও হন, তিনি তো পুরুষদের সাথে একই মজলিশে একত্রিত হতে পারেন না, ঠেসাঠেসি করে ভীড় জমাতে পারেন না"।
অবৈধ মতের দাবির পক্ষে দলিলসমূহের পর্যালোচনা:
প্রথমত:
আয়াতে قوامون শব্দটি قوام এর অর্থ রক্ষক। এটা পারিবারিক ক্ষেত্রে। এজন্য ভরণ পোষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুরুষের উপর। পরিবারের বাইরে কোনো নারীর ভরণপোষনের কথা বলা হয়নি।
দ্বিতীয়ত:
ঘরে অবস্থান করার জন্য আল কুরআনের নির্দেশটি রসুল সা.-এর স্ত্রীগণের জন্য নির্দিষ্ট। এ নির্দেশ সার্বিক নয়। এরূপ অনেক বিশেষ নীতিমালা রয়েছে। যেমন আল কুরআনের একই সুরায় এসেছে, সাধারণ নারীগণের ব্যাভিচারে যে শাস্তি হবে মহানবি সা.-এর স্ত্রীগণের সেরূপ ক্ষেত্রে ঐ শাস্তির দ্বিগুণ দিতে হবে।
তৃতীয়ত:
পুরুষকে নেতৃত্বে প্রাধান্য দেয়া মানে নারীকে নেতৃত্ব থেকে একেবারে বঞ্চিত করা নয়।
চতুর্থত:
এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ একমাত্র হযরত আবু বাকারাহ রা. থেকে বর্ণিত। এছাড়া, এ হাদিসের সনদেও ত্রুটি রয়েছে।
পঞ্চমত:
আর আবু বাকারাহ রা.-এর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য প্রদান করা হয় যে, তিনি তায়েফ অভিযানের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, এটি মহানবি সা.-এর সময়কালের শেষ পর্যায়ে। এটি রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত। এর ভাষ্য শরিয়াতের একটি মৌলিক বিষয় সংশ্লিষ্ট। অথচ হাদিসটি ২৫ বছর পর্যন্ত আর কেউ জানতেন না। শুধু আবু বাকারাহ রা. ২৫ বছর পর বললেন।
মাও. আকরম খাঁ বলেন, হাদিসটির ভাষাতে অসংলগ্নতা (ইদতিরাব) রয়েছে।.... ৩৬ হিজরিতে উম্মাহর মাঝে বিবাদের এক ক্রান্তি কালে অনুষ্ঠিত জামাল যুদ্ধে হাজার হাজার সাহাবি রা. অংশগ্রহণ করলেন। তারা কেউই হাদিসটি সম্পর্কে জানলেন না। সেই সময়কার বর্ণিত এবং গোত্রগত প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেওয়াতগুলোর মূল্যমর্যাদা নির্ধারণের সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।৪
কারো মতে, এ হাদিস বর্ণনা দ্বারা হযরত আয়েশা রা.-কে হেয় করাই উদ্দেশ্য। ইবন হাজার আসকালানী উল্লেখ করেন: ইবন বাত্তাল এক সুত্রে মুহাল্লাব থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: "আবু বাকারাহ বর্ণিত হাদিসটি বাহ্যত হযরত আয়েশা রা. যা করলেন সে বিষয়ে তাঁর মতামতকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি ইঙ্গিত করে"।৩৫
কারো মতে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এটি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বর্ণিত। এছাড়া, আবু বাকারাহ রা.-কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে উমর রা. বেত্রাঘাতের দণ্ড আরোপ করেছিলেন। যারা এ দন্ডে দন্ডিত তাদের সাক্ষ্য শরিয়াতে গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপ হাদিসও গ্রহণযোগ্য নয়। এ রূপ অনেক সমালোচনা করা হয়।
কিন্তু এর উত্তরে বলা হয়: হাদিসটি সহিহ বুখারিতে এসেছে, যার উপর গোটা উম্মাহ আলিমগণের অধিকাংশ ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। এছাড়া, সাক্ষ্য দেয়া ও হাদিস বর্ণনা করার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। উম্মাহর অধিকাংশ ফকীহগণ এ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই হাদিসটিকে শাষ বা দুর্লভ বলা ঠিক নয়। এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও প্রচলিত। আর মহানবি সা.-এর সাহাবিগণ বিশ্বস্ত। সম্ভবত এজন্য শায়খ মুহাম্মদ গায্যালি বলেছেন, হাদিসটি সনদ ও মতনের দিক দিয়ে সহিহ। তবে এটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাথে জড়িত। তিনি বলেন: “রসুল সা. সত্য কথাই বলেছেন। এটা ছিল সেখানকার পুরো পরিস্থিতির চিত্রায়ন। সে সময়ের পারস্যে যদি মজলিশে শুরাভিত্তিক ব্যবস্থা থাকতো, আর গোল্ড মাইর নামে ইহুদি নারীর মত শাসক থাকতো যে কিনা ইসরাইল শাসন করেছে, তাহলে সেখানকার পারস্যের বিষয় অন্য রকম মন্তব্য হতো।..." তিনি আরো বলেন: "মহানবি সা. মক্কায় সুরা নামাল মানুষকে পাঠ করে শুনিয়েছেন। সেখানে তাদের কাছে সাবা রাণীর কিস্সাও বর্ণনা করেন, যে নারী স্বীয় প্রজ্ঞা ও প্রখর মেধায় তার জাতিকে সফলতা ও নিরাপত্তার দিকে পরিচালনা করেন। আর এটা অসম্ভব যে, সেখানে সে নবি সা. তাঁর হাদিসে এমন হুকুম দিবেন যা কুরআনের ঐ ওহির বিরোধী হয়!! কোনো জাতি কী ব্যর্থ হয়েছে এ ধরনের উৎকৃষ্ট মানের একজন নারীর নেতৃত্বে"?!
এজন্য বর্তমানে অনেকের মতে সম্ভবত মহানবি সা.-এর উদ্দেশ্য ছিল এটা বুঝানো যে, পারস্যবাসীরা নারীদেরকে নেতা বানিয়েও সফল হবে না। এর ভাষ্য সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বা এটি সার্বিক নয়। এটা মহানবি সা.-এর কোনো নির্দেশ ছিল না যে, 'তোমরা নারীদেরকে নেতা বানাবে না'।
অপরদিকে এসব বক্তব্যও সমালোচিত হয়েছে। বলা হয়, হাদিসটির ভাষ্য সার্বিকভাবে প্রযোজ্য। কেননা শরিআহর মূলনীতি অনুসারে দলিলের ভাষ্য দ্বারা কি বুঝাচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য। বিশেষ العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب) 1 হাদিসে জাতি )قوم(, কর্তৃত্ব )أمر( সাধারণভাবে এসেছে। এটি অনির্দিষ্টজ্ঞাপক )نكرة( শব্দ। এগুলো থেকে প্রমাণিত যে, হাদিসের ভাষ্য বিশেষ ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং সার্বজনীন ও সর্বব্যাপী )عام(।
এ বক্তব্যের পর্যালোচনায় ড. কারযাভী বলেন: এটা ঠিক যে, অধিকাংশ উসূলবিদদের মতে, কোনো বক্তব্যের ভাষ্য বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং সার্বিক'। কিন্তু এ মূলনীতির সাথে সকলে একমত নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. ও ইবন উমর রা. ঘটনার প্রেক্ষাপটের আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়াকে অধিক পছন্দ করতেন। অন্যথায় বিভিন্ন ধরনের ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, বক্তব্য অসংলগ্ন হয়। যেমনিভাবে খারেজীদের হারুরিয়া উপদলসহ আরো কিছু সংখ্যক ব্যক্তি যে সব আয়াত মুশরিকদের বিষয়ে অবতীর্ণ হয়, সেগুলোকে মু'মিনদের উপর আরোপ করে'।
তিনি আরো বলেন, মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ প্রায় একমত যে, উপরোক্ত হাদিসটি নারীকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব তথা আল ইমামাতুল কুবরার পদে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাদিসটি যে প্রেক্ষাপট নিয়ে, সেটা তাই প্রমাণ করে। আর সেটা হয় যদি কোনো নারীকে সমগ্র মুসলমানদের নেতা বা ইমাম বানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ১৯২৪ খ্রি. কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক উসমানী খিলাফতের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার পর সে ধরনের ইমামত বা নেতৃত্ব মুসলিম উম্মাহর মাঝে নেই। অতএব অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। হাদিসের ভাষ্য অনুসারে কোনো নারীকে যদি রাষ্ট্রপ্রধান বা সম্রাজ্ঞী সদৃশ বানিয়ে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই হাদিসটি সকল ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন অঞ্চলে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নারী নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের বিরোধিতায় কেউ কেউ বলেন, বর্তমানে আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহ অতীতের বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনের মতো।০
এ হাদিসের পর্যালোচনায় অনেকে বলেছেন, নারীরা নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে বা সর্ব সময়ে ব্যর্থ এটা ঠিক নয়। তাদের কেউ কেউ কখনো কখনো সফল হতে পারে। এমনকি কুরআনে এরূপ একজন নারী নেত্রীর কথা উল্লেখ আছে। যিনি পরামর্শ ভিত্তিতে কাজ করতেন এবং নিজ প্রজ্ঞায় স্বজাতিকে এক ভয়াবহ যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।১
কারো মতে হাদিসটি উপদেশমূলক। এটি হুকুমমূলক নয়। অন্যথায় নারীনেতৃত্ব অবৈধ হলে মহানবি সা. মুসলমানদের জন্য করণীয় হিসেবে আরো সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে হুকুম বলে দিতেন।
একইভাবে হযরত জাবির ইবন সামুরাহ রা.-এর বর্ণনাটির সনদে হায়ছামীর মতে একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। সেহেতু এটি দুর্বল হাদিস।
ষষ্ঠত:
সকল নারী দুর্বল এ কথাটি কোনো হাদিসে সরাসরি বা স্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই। তাই অন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তির সাথে কিয়াস বা তুলনা করে সিদ্ধান্ত দেয়া সঠিক হবে না।
সপ্তমত:
অবৈধতার উপর ইজমা হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়, তাও সঠিক নয়। তাহলে মতবিরোধ হলো কী করে? অতীতে অনেক আলিম বৈধতার পক্ষেও ছিলেন।
অষ্টমত:
নারীরা কোনো অবস্থাতেই সালাতে ইমামতি করতে পারবে না এ কথাটি সঠিক নয়। উম্মে ওয়ারাকাহ বিনতি নাওফাল রা.-কে তার ঘরে সালাতে ইমামতির জন্য মহানবি সা. অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, সেখানে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি আযান দিত। রসুল সা. যুগেও আয়েশা রা. ও উম্মে সালামাহ রা. মহিলাদের নিয়ে ঘরে জামাতে সালাতে ইমামতি করেছেন। তবে সামনে না গিয়ে কাতারের ভিতরে থেকেছেন। মহানবি সা. নিজেও তা দেখেছেন ও অনুমোদন দিয়েছেন।
নবমত:
হযরত আয়েশা রা. উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্গত মুজতাহিদ সাহাবি। তিনি জামাল যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে ঘর থেকে বের হয়েছেন। কেউ হিজাব অবলম্বন করে বের হলে আল কুরআনের দৃষ্টিতে দোষণীয় নয়। দলবদ্ধ হয়ে বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিমানে নারীদের মাহরিম ছাড়া একা হজসহ অন্যান্য উদ্দেশ্যে বের হওয়া বা ভ্রমণকে অনেক আলিম বৈধ বলেছেন। সমাজের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতে পারে। রসুল সা. অন্য হাদিসে নারীদের নিরাপদ একাকী ভ্রমণের ভবিষৎ বাণী দিয়েছেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, মহানবি সা. আদী ইবন হাতিম রা.-এর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: 'হে আদী! তোমার জীবন যদি দীর্ঘ হয়, তা হলে তুমি অবশ্যই দেখবে হীরাত থেকে হাওদাজে মহিলা সফর করবে আর এভাবে কাবায় এসে তাওয়াফ করবে, রাস্তায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না'।
এজন্য তাবেঈ হাসান বাসরী, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ (এক বর্ণনায়), ইমাম গাযযালি, মাওয়াদী, ইবন তাইমিয়াসহ অনেক আলিম মাহরিম ব্যতীত নারীর হজে বা সফর বৈধ বলেছেন অন্যান্য একাধিক বিশ্বস্ত নারীদের সাথে বের হওয়া বা নিরাপত্তা বিধানের শর্তে। এক হাদিসে এক দিনের বা এক রাত্রের সফরের ভ্রমণে মাহরিম থাকার কথা বলা হয়। অন্য বর্ণনায় দুই বা তিন দিনের কথাও আছে। ৪৯
আজকে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিমানে মক্কা বা একটি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কয়েক ঘন্টা প্রয়োজন। পূর্ণ দিবসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে নারী নেতৃত্ব বৈধ মনে করার পথে বাধা থাকে না।
দশমত:
নারীকে প্রধানত ঘরে অবস্থান করতে বলা হয় পারিবারিক দায়িত্ব বিশেষত সন্তান-সন্ততি লালন পালনে অধিক গুরুত্ব দেয়ার জন্য। যাদের সন্তান সাবালক হয়ে গেছে, নিজের কাজ নিজে করতে সক্ষম, সেই সব নারীর ক্ষেত্রে উক্ত নির্দেশ প্রযোজ্য নয়।
দ্বিতীয় অভিমত: সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ:
অতীতে ফকীহগণের মধ্যে কেউ কেউ সাধারণভাবে নারী নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বকে সঠিক বা সহিহ বলেছেন:
হানাফি ফকীহ ইবন নুজাইম (৯২৬হি ৯৭০হি.) বলেন "সে নারীর সালতানাত সহিহ তথা সঠিক। মিসরের সালতানাতে এক নারী অধিষ্ঠিত হয়েছিল। যার নাম শাজারাতুর দুরা। যিনি ছিলেন বাদশা সালিহ ইবন আইয়্যুব এর দাসী"। পরবর্তীতে বধূ।
ইবন জারীর তাবারীও সকল ক্ষেত্রে নারীর শাসন বা হুকুমতকে বৈধ বলেছেন। ইবন রুশদ বলেন: "তাবারী বলেন, 'প্রত্যেক ক্ষেত্রে বা সকল বিষয়ে নারী হাকিম (সিদ্ধান্ত প্রদান কারী) বা শাসক হওয়া বৈধ"।
আধুনিককালে কিছু আলিম ও আধুনিকতাবাদী মুসলিম বুদ্ধিজীবিদের মতে রাষ্ট্র প্রধান হওয়া (ইমামত) সহ সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ। মিসরের শায়খ মুহাম্মদ আল গায্যালি সহ আরো অনেক আলিম এ মত পোষণ করেন। শায়খ মুহাম্মদ আল গায্যালি আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার নারীদের দিকে ইশারা করে বলেন: "তারা (আমেরিকা অস্ট্রেলিয়াবাসীরা) যদি সম্মত হয় যে, নারীদেরকে শাসক অথবা বিচারক কিংবা মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূত হোক, তারা যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। আর আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আর সেটা হলো নারীর এ সমস্ত পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বৈধ"।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গীয় অঞ্চলে মাও. আকরম খাঁ ইসলামের খিলাফতের বিধান মতে নারী পুরুষ উভয়ে যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে সৃষ্টিগত দিক দিয়ে নারীরা মাতৃত্বের স্বরূপে এবং পুরুষরা আল্লাহর হুকুমত পরিচালন ও সংরক্ষণে সক্ষম। উভয়ের সৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কখনো এর তারতম্য তথা ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা যায় না। কুরআন সুন্নাহেও এরূপ তারতম্য না হওয়ার পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। লাহোরের প্রফেসর রফীউল্লাহ শিহাব, জাভীদ জামাল দাসকাভী সহ আরো অনেকে।
এমত পোষণকারীগণও কয়েক ধরনের দলিল পেশ করেন। যেমন:
১. আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আ'মলকারীর আ'মল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ"।৫৭
এতে বুঝা যাচ্ছে, কাজে কর্মে নারী পুরুষের সমঅধিকার। তাই নারীরাও পূরুষের মত নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার রয়েছে।
২. আল্লাহর বাণী: "তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের খিলাফত প্রদান করবেন"।
তাদের মতে এখানে খিলাফত লাভের যোগ্যতার জন্য দুটি শর্ত করা হয়, তা হলো: ইমান ও আমাল সালিহ বা নেক কাজ। এখানে নারী পুরুষ পার্থক্য করা হয়নি।
৩. আল্লাহর বাণী: "আর মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা একে অপরের সহযোগী বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজে নিষেধ করে, আর সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে"।"
এ আয়াতে মু'মিনদেরকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা হয়নি। আর নেতৃত্বও একটি রাজনৈতিক তৎপরতা। এখানে নারী পুরুষ সমান।৬০
৪. সাবা সম্রাজ্ঞীর প্রজ্ঞার প্রশংসা: ইয়ামানে প্রাচীনকালে সোলায়মান আ.-এর সমসাময়িক সাবা অঞ্চলে এক প্রতাপশালী নারী শাসন করেছেন। আল কুরআনে বর্ণিত, সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ বলে: 'আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন'।
তৎকালীন আল কুদস নগরীতে ইসরাইল রাষ্ট্রনায়ক সোলায়মান আ. এ নারীকে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। এ বিষয়ে দম্ভ প্রদর্শন না করার জন্য সতর্ক করেন। তখন এ সম্রাজ্ঞী কিছু খোজ খবর নিয়ে নিজ সভাসদকে ডেকে চিঠির কথা বলেন এবং পরামর্শ নিলেন। তারা রাষ্ট্রদূত হোক, তারা যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। আর আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আর সেটা হলো নারীর এ সমস্ত পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বৈধ"।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গীয় অঞ্চলে মাও. আকরম খাঁ ইসলামের খিলাফতের বিধান মতে নারী পুরুষ উভয়ে যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে সৃষ্টিগত দিক দিয়ে নারীরা মাতৃত্বের স্বরূপে এবং পুরুষরা আল্লাহর হুকুমত পরিচালন ও সংরক্ষণে সক্ষম। উভয়ের সৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কখনো এর তারতম্য তথা ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা যায় না। কুরআন সুন্নাহেও এরূপ তারতম্য না হওয়ার পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। লাহোরের প্রফেসর রফীউল্লাহ শিহাব, জাভীদ জামাল দাসকাভী সহ আরো অনেকে।
এমত পোষণকারীগণও কয়েক ধরনের দলিল পেশ করেন। যেমন:
১. আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আ'মলকারীর আ'মল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ"।৫৭
এতে বুঝা যাচ্ছে, কাজে কর্মে নারী পুরুষের সমঅধিকার। তাই নারীরাও পূরুষের মত নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার রয়েছে।
২. আল্লাহর বাণী: "তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের খিলাফত প্রদান করবেন"।
তাদের মতে এখানে খিলাফত লাভের যোগ্যতার জন্য দুটি শর্ত করা হয়, তা হলো: ইমান ও আমাল সালিহ বা নেক কাজ। এখানে নারী পুরুষ পার্থক্য করা হয়নি।
৩. আল্লাহর বাণী: "আর মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা একে অপরের সহযোগী বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজে নিষেধ করে, আর সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে"।"
এ আয়াতে মু'মিনদেরকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা হয়নি। আর নেতৃত্বও একটি রাজনৈতিক তৎপরতা। এখানে নারী পুরুষ সমান।
৪. সাবা সম্রাজ্ঞীর প্রজ্ঞার প্রশংসা: ইয়ামানে প্রাচীনকালে সোলায়মান আ.-এর সমসাময়িক সাবা অঞ্চলে এক প্রতাপশালী নারী শাসন করেছেন। আল কুরআনে বর্ণিত, সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ বলে: 'আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন'।
তৎকালীন আল কুদস নগরীতে ইসরাইল রাষ্ট্রনায়ক সোলায়মান আ. এ নারীকে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। এ বিষয়ে দম্ভ প্রদর্শন না করার জন্য সতর্ক করেন। তখন এ সম্রাজ্ঞী কিছু খোজ খবর নিয়ে নিজ সভাসদকে ডেকে চিঠির কথা বলেন এবং পরামর্শ নিলেন। তারা বলল, আমরা শক্তিশালী। অস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিরোধ করব। তবে সর্বময় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আপনার। কিন্তু সম্রাজ্ঞী দ্বিমত করে বললেন, শক্তিশালী রাজারা কোনো এলাকায় প্রবেশ করলে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের অপদস্ত করে। তখন তিনি উপটৌকন পাঠিয়ে তাকে অধিকতর পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
সোলায়মান আ. তার আনুগত্য না মেনে উপটৌকন পাঠানোকে পছন্দ করেননি। ফলে যুদ্ধের হুমকি দেন। এতে সম্রাজ্ঞী সশরীরে সোলায়মান আ.-এর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর অধীনস্ততা মেনে নিয়ে তার সাথে সন্ধি করে গোটা সাবা জাতিকে ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেন। এসব কাজে এ সম্রাজ্ঞীর অনন্য প্রজ্ঞার কথা ফুটে উঠেছে। সোলায়মান আ. তাকে অপসারণ করেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই।
এভাবে আল কুরআনেও তার প্রজ্ঞাপূর্ণ, দূরদর্শী ও পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছে। উপরোক্ত মতানুসারীগণ বলেন, এতে বুঝা যায়, নারী নেতৃত্ব অবৈধ নয়। ৩৬৩
তবে এ যুক্তিটিও সমালোচিত হয়েছে। আল্লামা আলুসী বলেন: "এ আয়াতে এমন কিছু নেই যা প্রমাণ করে যে, নারী সম্রাজ্ঞী হওয়া জায়েয। আর কাফির জাতির কোনো কাজের দ্বারা উক্ত মতের পক্ষে কোনো দলিল হয় না"।
আলুসীর এ কথা দ্বারা বুঝা যায়, তার সময়েও আয়াতটি নারী সাম্রাজ্ঞী হওয়ার বৈধতার পক্ষে দলিল হিসেবে কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন।
মোটকথা, যেহেতু আল কুরআনে ঐ নারীর কথা এসেছে এবং তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গণতান্ত্রিকতা তুলে ধরে প্রশংসা করা হয়েছে এবং একইভাবে নবি সোলায়মান আ. ঐ মহিলার শাসন স্থিতাবস্থায় রেখেছেন, সেহেতু এটাকে নারী নেতৃত্বের পক্ষে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা অমূলক নয়। তবে নেতৃত্বটি কোন পর্যায়ের ছিল, সেটা বিবেচ্য। কারণ ঐ নারী সোলায়মান আ.-এর বশ্যতা স্বীকার করা এবং পরবর্তীতে তাঁর সাম্রাজ্যের অধীনে থেকে শাসন চালানোর দ্বারা সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করেননি। পরবর্তীতে সে নারীর ক্ষমতা বা নেতৃত্ব ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক।
৫. মুনাফিক নারীরা সংঘবদ্ধভাবে সমাজবিরোধী কাজ করবে, আর মু'মিন নারীরা নিরবে শুধু দেখবে তা সঠিক নয়। ইরশাদ হয়েছে, "মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা একে অপরের অংশ, তারা মন্দ কাজের আদেশ দেয়, আর ভাল কাজ থেকে নিষেধ করে"।
৬. খোলাফায়ে রাশিদীনের যুগ: উমর রা. শিফা নামে এক মহিলাকে বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দিয়ে ছিলেন। তার এ কর্তৃত্ব সার্বজনীন ছিল। নারী পুরুষ সকলের উপর এ মহিলা কর্তৃত্ব করেছেন।
৭. উষ্ট্র যুদ্ধে হযরত আয়েশা রা.-এর নেতৃত্ব: তিনি মুসলমানদের তৃতীয় খলিফা উসমান রা.-এর হত্যার বিচারের দাবিতে মক্কা থেকে সাহাবি ও তাবেঈগণকে সংগঠিত করেন ও তাদের সামনে বক্তব্য প্রদান করেন। এমনকি বিভিন্ন গোত্র প্রদানদের নিকট চিঠি দিয়েও তাদেরকে প্রভাবিত ও একত্রিত করেন। ফলে আলি রা.-এর অনুসারীদের সাথে ৩৬ হিজরি/ ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় অনুষ্ঠিত হয় জামাল বা উষ্ট্র যুদ্ধ।
তিনি আলি রা. তাঁর সাথে পত্র বিনিময় করে শেষ পর্যায়ে উভয়ে সন্ধির প্রস্তাবে একমত হন। তবে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু মুনাফিকের চক্রান্তে উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের দ্বারা ভোর বেলায় হঠাৎ আক্রমণে কিছু লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আয়েশা রা. পর্দায় থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে হযরত আলি রা.-এর দ্রুত পদক্ষেপে ও আয়েশা রা.-এর মদিনায় ফিরে যাওয়ার শর্তে যুদ্ধ প্রশমিত হয়। যাহোক, জামাল যুদ্ধে আয়েশা রা.-এর সাথে ত্রিশ হাজার সৈন্য সমাবেশ ঘটে। যাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন সাহাবি, অন্যরা ন্যূনতম পক্ষে তাবেঈ। তিনি তাদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তাঁর সামষ্টিক নেতৃত্ব, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব সবই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। এসব পদক্ষেপে তাঁর সাথে অংশগ্রহণকারী এ বিশাল সংখ্যক সাহাবি ও তাবেঈন কোনো আপত্তি করেছেন বলে প্রমাণ নেই। এসব প্রমাণ করে নারী নেতৃত্ব বৈধ।
এ দলিলের পর্যালোচনায় বলা হয়, হযরত আয়েশা রা.-এর নেতৃত্ব একচ্ছত্র ছিল না। তাঁর সহযোগী ছিল হযরত যুবায়ের রা. ও তালহা রা.। তাছাড়া, এ নেতৃত্ব ছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে। কারণ ঐ ঘটনার পর তিনি নেতৃত্ব প্রদানমূলক আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
৮. ঐতিহাসিক প্রমাণ: ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক মুসলিম নারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তারা সরকার প্রধান বা কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। তারা ইতিহাসের ক্রান্তি লগ্নে জাতির নেতৃত্বের হাল ধরে তাদের জাতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন ও জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখেন। তন্মধ্যে: খারেজীদের হারুরী শাবীবাহ উপদল নেতা হিসেবে গাযালাহ (মৃ.৭৭হি./৬৯৬ খ্রি.) নেতৃত্ব, মিসরের ফাতেমী শাসনামলে সিতুল মুলুক (৯৭০-১০২৩ খ্রি.), হিন্দুস্থানের সুলতানা রাজিয়া বিনতে সুলতান ইলতুৎমিশ (৬৩৪-৬৩৭হি./ ১২৩৬-১২৪০ খ্রি.), মিসরের শাজারাতুদ দুররা (১২৪৯-১২৫০ খ্রি.), ভুপালের রাণী সেকান্দর বেগম (১৮১৬-১৮৬৮ খ্রি.), পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনযীর ভুট্টো (১৯৮৮-১৯৯০ খ্রি., ১৯৯৩-১৯৯৬ খ্রি.), বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ২০০১-২০০৬ খ্রি.) এবং সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১ খ্রি., ২০০৯ বর্তমান), তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থানসো সিলার (১৯৯৩-১৯৯৬খি.), ইন্দোনেশিয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকার্ণ পুত্রী (২০০১-২০০৪ খ্রি.), সেনেগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মামে মেডিউর বুয়ে (২০০২-২০০২ খ্রি.), প্রমুখ। এসব প্রমাণ করে মুসলিম সমাজে নারীরাও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। আলিমগণ কেউই এসব ঐতিহাসিক মুসলিম নারী নেত্রীদের নেতৃত্বের বিরোধিতা করেননি। তাই এটা প্রমাণ করে নারী নেতৃত্বের দাবিটি বাস্তবসম্মত।
৯. শরিআহর আইন প্রণয়নে মূলনীতি হলো: সাধারণভাবে মূলত সবকিছু বৈধ, যদি শরিআহ কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত না হয়। তাই কুরআন হাদিসে কোথাও নারী নেতৃত্ব নিষেধ নেই। সেখানে বলা নেই যে, নারীদেরকে নেতৃত্ব দিবে না বা নেতা বানাবে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই নারী নেতৃত্ব বৈধ।
ক. নারীগণও সমাজের অংশ। এটি পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতা প্রসূত নেতৃত্ব সৃষ্টি হতে পারে। তাদের বংশানুক্রমিক প্রভাবও থাকতে পারে। যা নেতৃত্ব অর্জন ও প্রয়োগে প্রভাব বিস্তার করে। তাই তারা সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
খ. নারীরা সৎ ও মেধাবী হতে পারে।
গ. নিষেধ এসেছে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব চর্চার ক্ষেত্রে। কিন্তু শুধু এ ক্ষেত্রে সীমিত নয়।
ঘ. বর্তমানে প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামষ্টিক নেতৃত্ব কার্যকর। এ ধরনের নেতৃত্ব হলে যেকোনো পর্যায়ের নেতৃত্বে নারী আসতে সক্ষম।
ঙ. সার্বিক নেতৃত্বে পুরুষদেরকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই নয় যে, নারীদেরকে বঞ্চিত করা। যোগ্যতা থাকলে নারীরাও নেতৃত্বের অধিকারী হতে পারে।
তৃতীয় অভিমত: মজলিশে শুরা ব্যবস্থায় বা যৌথ নেতৃত্বে রাষ্ট্রপ্রধানের পদসহ নারীর সকল ধরনের নেতৃত্ব বৈধ
রসুল সা.-এর বাণী: কোনো যদি জাতি কখনো সফল হবে না যদি তারা নারীকে তাদের কর্তৃত্বে বসায়। এ হাদিসের হুকুম সম্পর্কে মাও. আশরাফ আলি থানভী রহ. (মৃ. ১৩৬২ হি.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি তখন ফাতওয়া দিতে গিয়ে বলেন: শাসন করার বিষয়টি তিন ধরনের:
এক. যেখানে কর্তৃত্ব পূর্ণ ও সার্বিক সার্বজনীন। যেখানে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, তার উপরে অন্য কেউ ক্ষমতাধর নেই। তার ক্ষমতা সর্বোচ্চ। সেটা কোনো নির্দিষ্ট দল বা অঞ্চলের সাথে নির্ধারিত নয়। যেমন: রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষমতা। যিনি এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ইখতিয়ার রাখেন।
দুই, যেখানে কারো পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করেন, তবে সেটা সার্বজনীন নয়। যেমন: নির্দিষ্ট একটি দলের প্রধান হওয়া।
তিন, যেখানে কারো এককভাবে পূর্ণ ও সার্বজনীন ক্ষমতা হয় না। যেমন গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতা। যেখানে শাসক মূলত মজলিশে শুরা তথা পরামর্শ কমিটির একজন সদস্য রূপে অবস্থান করেন। সেখানে মজলিশে শুরাই শাসক।
প্রথম ধরনের ব্যবস্থায় নারী শাসক হওয়া জায়েয নয়। অবশিষ্ট দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনের ব্যবস্থায় একজন নারী প্রশাসক হওয়া জায়েয। আর এটাই আবু বাকারাহ বর্ণিত উপরোক্ত হাদিসের ভাষ্য।
চতুর্থ অভিমত: বিশেষ অবস্থা বা প্রেক্ষাপটে নারীর রাষ্ট্রপ্রধান সহ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বৈধ
সৈয়দ আবুল আলাসহ বেশ কিছু আলেমের মতে যদি প্রেক্ষাপট এমন হয়, যেখানে নারীর চেয়ে অধিক প্রভাবশালী যোগ্যতর পুরুষ নেতা না থাকা বা নারী নেতৃত্বের বিকল্প না থাকা (সৈয়দ আবুল আলা)। ১৯৬৪ খ্রি. পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়্যুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকে সৈয়দ আবুল আলাসহ অনেক আলিম সমর্থন করেছিলেন। তারা চেয়ে ছিলেন, যেকোনো উপায়ে আইয়্যুবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। সৈয়দ আবুল আলা বলেন, এ পরিস্থিতিতে নারী নেতৃত্ব বৈধ হওয়াতে কোনো বাধা নেই। ২
পঞ্চম অভিমত: বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ
অনেক আলিমের মতে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ। যেমন:
ক. বিচারিক কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে: মুসলিম ফকীহগণের অধিকাংশের মতে বিচারিক কাজে নারীদের নিয়োগ বৈধ নয়। তবে অনেকের মতে নারীদের বিচারিক কাজ বৈধ। এমতটি হলো হাসান আল বাসরী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক (এক বর্ণনায়), মালেকি মাযহাবের ইমাম ইবনুল কাসিম, ৪ ইমাম ইবন জারীর তাবারী, ইমাম ইবন হাযাম প্রমুখের। তবে ইমাম আবু হানিফার মতে যেসব ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য বৈধ, সেসব তাদের বিচার কাজও বৈধ। যেমন: ব্যবসায়িক লেনদেন, পারিবারিক আদালতে ইত্যাদি।
অনেকে বর্ণনা করেন যে, ইবন জারীর তাবারীর মতে সার্বিক ক্ষেত্রে নারী বিচারক হতে পারে এবং হওয়া বৈধ।
মালেকি মাযহাবের ফকীহ ইবন রুশদ উল্লেখ করেন: "তাবারী বলেন: প্রতিটি ক্ষেত্রে সাধারণভাবেই একজন নারী হাকিম (বিচারক) হওয়া জায়েয"।
মালেকি মাযহাবের ফকীহ ও ব্যাখ্যাকার ইবন আবী মারয়াম এর বর্ণনা মতে ইমাম ইবনুল কাসিম আল মালেকি মনে করতেন, সার্বিক ক্ষেত্রে নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া বৈধ। ইবন আবদিস সালাম বলেন, সম্ভবত তিনি হাসান বাসরী ও তাবারীর ন্যায় নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়াকে সাধারণভাবেই বৈধ মনে করতেন। অবশ্য ইবন যারকূনের বর্ণনা মতে ইবনুল কাসিম এর মতটি ছিল ইমাম আবু হানিফার মতো। তিনি মনে করতেন, যে সব ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য বৈধ, সেখানে বিচার করাও বৈধ। মালেকি মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল হাত্তাব এ বর্ণনাটি অধিক গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
শাফেঈ মাযহাবের শায়খ উপাধীধারী আবুল ফারজ ইবন তিরার-এর মতে সকল ক্ষেত্রে বিচারিক কাজে নারীদের কর্তৃত্ব বৈধ। তিনি বলেন: 'এর পক্ষে দলিল হলো হুকুম আহকাম চালুর উদ্দেশ্য হলো বিচারক কর্তৃক হুকুম-আহকাম কার্যকর করা, বিভিন্ন পক্ষের দলিল শ্রবণ করা, বাদী-বিবাদীর মাঝে বিবাদ মিমাংসা করা। আর এসব কাজ একজন পুরুষের পক্ষে যেমনিভাবে সম্ভব, নারীর পক্ষেও সম্ভব'।
ইবন হাযম নারীদেরকে খিলাফতের আসনে বসানো জায়িয মনে না করলেও সকল ক্ষেত্রে তাদের বিচার কাজ বৈধ বলেছেন। তাঁর মতে সকল ক্ষেত্রে নারীরা সাক্ষ্য দিতে পারে। আর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বিশ্বস্ত হওয়া শর্ত। আর কিছু নয়। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ নেই। যে কারো পক্ষে ও বিপক্ষে প্রত্যেক বিশস্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য"।
এখানে সাক্ষ্য দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিষয়কে আলাদা করা হয়নি। তেমনি বিচারের ক্ষেত্রেও। বিচারক হওয়ার শর্তসমূহ উল্লেখ করতে যেয়ে বলেন, মুসলমান ও যিম্মীদের কোনো বিষয়ে কারো বিচার কাজ ও হুকুম জারী করা হালাল নয় একমাত্র সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যিনি মুসলিম, বালিগ, বুদ্ধিমান এবং কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান সম্পন্ন। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা বা পুরুষ হওয়ার শর্তারোপ করা হয়নি।
তবে হানাফি মাযহাবের অধিকাংশের মতে কিসাস ও হদ প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ বৈধ নয়। শারহ আদাবুল খাসসাফে রয়েছে: "কিসাস ও হাদ্দ ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে নারী বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে পারে"।
তারা কুরআন হাদিসে দলিলের উপর কিয়াস করেছেন। তাদের মতে কুরআন হাদিসে নারীদের সাক্ষ্য দেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, বৈধ বলা হয়েছে। সেহেতু যেসব ক্ষেত্রে সাক্ষ্য বৈধ, বিচার করাও বৈধ। হানাফি মাযহাবের 'হিদায়াহ' গ্রন্থে উল্লেখ: 'সকল ক্ষেত্রে নারীর বিচার কাজ বৈধ। একমাত্র দন্ডবিধি তথা হুদুদ ও কিসাসের ক্ষেত্রে ফয়সালা ব্যতীত। আর এ ক্ষেত্রে তাদের সাক্ষীর বিষয়টি বিবেচনায়'।
ইবন রুশদ বলেন, "ইমাম আবু হানিফা বলেন, সম্পদের বিষয়ে বিচার কাজে নারী বিচারক হওয়া জায়েয"।
খ. প্রশাসনিক ক্ষেত্রে: ইবন হাযম খিলাফতের বিষয়টি ব্যতীত প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীদের শাসনকে বৈধ বলেছেন। তিনি বলেন: নারীদেরকে প্রশাসনে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এটাই আবু হানিফার মত। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. শিফা নামে এক নারীকে তার স্বজাতির বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন"।
তিনি এ বিষয়ে আল কুরআন থেকে দলিলও পেশ করেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন হকদারের নিকট আমানতসমূহ পৌঁছে দিতে। আর যখন তোমরা ফয়সালা দিবে তখন ন্যায়ের সাথে ফয়সালা দিবে"।
এখানে আমানত মানে কর্তৃত্বের আমানত। ইবন হাযম বলেন: এ আয়াতের নির্দেশনা নারী পুরুষ সকলকে সার্বিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। যদি না কোনো স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে তা থেকে পৃথক করা হয়। তখন দীনের সার্বিক নির্দেশ থেকে একে প্রথক করা যাবে।
গ. ওয়াক্ত স্টেটে: হানাফি মাযহাবের দুররুল মুখতারে এসেছে, নারীর কর্তৃত্বকে বিচারিক কাজের বাইরে আরো সম্প্রসারিত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, "নারী ওয়াকফ স্টেটে নাযীর বা তদারককারী হওয়ার যোগ্য, সে ইয়াতিমদের জন্য ওসিয়্যতকারীনী হতে পারে, যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে"।
হযরত উমর রা. স্বীয় কন্যা হাফসা রা.-কে খায়বারের এক ওয়াক্ত স্টেটের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।
নারী নেতৃত্বের স্বরূপ: পরিপ্রেক্ষিত ইসলাম / আবদুর রহমান আনওয়ারী ও শামীমা নাসরিন
ঘ. পার্লামেন্টে: ড. মস্তফা সাবাঈ নারীর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বিরোধিতা করলেও তারা পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন।
৬. মন্ত্রণালয়ে: মহানবি সা. ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ওযারাত তথা মন্ত্রণালয় ছিল না। মন্ত্রী নিয়োগ ব্যবস্থা ছিল না। মাওয়ার্দী উপরোক্ত আবু বাকারাহ রা. বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে নারীকে মন্ত্রীত্ব প্রদান করাকেও অবৈধ বলেছেন। তার মতে মন্ত্রীর নিকট থেকে মতামত চাওয়া হয়, তার মাঝে দৃঢ়তা থাকা প্রয়োজন। এগুলো নারীদের মাঝে দুর্বল। বিভিন্ন বিষয় সরাসরি প্রত্যক্ষণ প্রয়োজন। যা নারীর জন্য নিষিদ্ধ'।
ড. ইউসুফ আল কারযাভী ও যায়নাব গায্যালিসহ অনেকে নারীরা মন্ত্রী হওয়ার বৈধতার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তারা বলেন, আবেগ থাকলেই মতামত ও পরামর্শ দিতে দুর্বল হবে সেটা ঠিক নয়। মহানবি সা.-এর যুগেও নারীরা পরামর্শ দিয়েছেন। আর তা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। যেমন: হুদায়বিয়ার ঘটনায় উম্মে সালামাহ রা.-এর পরামর্শ।
চ. সালাতের ইমামতিতে: পূর্বেই বলা হয়, অধিকাংশ আলিমের মতে ফরয বা নফল সালাতে নারীদের ইমামতি অবৈধ। তারা দলিল হিসেবে রসুল সা.-এর হাদিস উল্লেখ করেন। মহানবি সা. বলেন: "সাবধান! কোনো নারী কোনো পুরুষের ইমামতি করবে না"।৯৩
মাওয়ার্দী বলেন, কোনো পুরুষের জন্য জায়েয নয় কোনো নারীর ইমামতিতে সালাত আদায় করা। ইমাম শাফেঈর মতে তা করলে তাকে পুনরায় সালাত আদায় করতে হবে। এটাই সঠিক মত। এ বিষয়ে সকল ফকীহগণ একমত পোষণ করেন। একমাত্র আবু ছাওর ব্যতীত। কেননা যে সালাতে পুরুষের ইমাম হতে পারে সে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অন্য পুরুষের মত নেতা হতে পারে"।
ষষ্ঠ অভিমত: রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সবধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ
গোটা জাতির উপর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তথা খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সবধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ। যেমন: সংসদ সদস্য হওয়া, মন্ত্রী হওয়া ইত্যাদি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে তথা রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নারীকে নেতৃত্ব প্রদান করা নিষিদ্ধ। ড. ইউসুফ আল কারাযাভীসহ কিছু আলেম এ মত পোষণ করেন। তিনি বলেন: "পরিবারের গণ্ডির বাইরে কিছু পুরুষের উপর কিছু নারীর কর্তৃত্ব চালানো বিষয়ে শরিয়াতে এমন কোনো দলিল নেই যা প্রমাণ করে যে সেটা অবৈধ। বরং যা নিষিদ্ধ সেটা হলো সকল পুরুষের উপর কোনো নারীর সামগ্রিক কর্তৃত্ব" ।
এর সমর্থনে দলিল হিসেবে বলেন: সাধারণ অবস্থা থেকে এ নিষেধটি খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে আবু বাকারাহ রা. বর্ণিত হাদিসটি। যাতে রসুল সা. বলেন: "যে জাতি তাদের উপর কর্তৃত্ব নারীদেরকে প্রদান করে, সে জাতি কখনো কল্যাণ পাবে না, সফল ও সার্থক হবে না"।
এখানে أمرهم তথা তাদের কর্তৃত্ব বলে তাদের সবোর্চ্চ কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব বুঝানো হয়েছে। এটা বুঝা গেল হাদিসটি যে প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল, তার আলোকে। কারণ সেখানে পারস্য সাম্রাজ্যে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সম্পর্কে বলা হয়। অতএব, সাধারণভাবে নারী নেতৃত্ব বৈধ নয়। তবে এ হাদিসে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বকে খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যা নারীর জন্য নিষিদ্ধ।
এভাবে যারা নারী নেতৃত্ব অবৈধ বলেন, তাদের দলিলের পর্যালোচনায় ড. কারযাভী আরো বলেন, নেতৃত্ব দিতে হলে, নির্বাচনে ভোট দিতে গেলে নারীদেরকে ঘর থেকে বের হতে হয়। আলিমগণের মতে প্রয়োজন ছাড়া নারীর ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। কিন্তু বাস্তবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের চেয়ে সামাজিক প্রয়োজন আরো গুরুত্বপূর্ণ। আজকে সেকুলার নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে ভোট দিয়ে সেকুলারদের ক্ষমতায় বসাচ্ছে। ইসলামের স্বার্থে শরিআহ পালনকারী নারীগণ কি ভোট দেয়া তথা সত্যের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বের হওয়া কি প্রয়োজন নয়? আল কুরআনে ঘরে অবস্থান করার বিধানটি নবি সা.-এর স্ত্রীগণের জন্য কার্যকর ছিল। অনেকের মতে এটি সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু সেটা মেনেও নিয়ে বলা যায়, একই আয়াতের অবশিষ্ট অংশ দেখা দরকার। সেখানে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত করা হয়, জাহেলী সমাজের মতো তাবাররুজ না করা তথা বেপর্দা ও অশ্লীলভাবে বের না হওয়া। অশ্লীলতা প্রদর্শন না করে বের হতে শরিআহর দৃষ্টিতে কোনো বাধা নেই। আর বাস্তবতা হলো আজকে নারী শিক্ষা দীক্ষা, চাকুরির জন্য স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিসের উদ্দেশ্যে হরহামেশা ঘর থেকে বের হচ্ছে। ১০৪
নারীরা সংসদ সদস্য হওয়ার বিরোধিতাকারীগণ যে সব যুক্তি প্রদর্শন করেন, ড. কারযাভী সেগুলোরও সমালোচনা করে বিভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তারা এর বিরোধিতায় বলেন, পার্লামেন্ট তথা মজলিশে শুরার কাজ দু'ধরনের: ক. রাষ্ট্রপ্রধানের হিসেব নিকাশ নেয়া ও তাকে বিভিন্ন কাজে জবাবদিহি করা। দুই. সুচিন্তিত মত দিয়ে আইন প্রণয়ন করা। প্রথম কাজটি মূলত রাষ্ট্রপ্রধানের উপর কর্তৃত্ব করার নামান্তর। সে একজন পুরুষ হলে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব বুঝায়। আল কুরআনে নারীদেরকে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব দেয়নি (পূর্বে উল্লেখ করা হয়)। দ্বিতীয়ত: শরিআহর বিষয়ে জ্ঞান গবেষণা তথা ইজতিহাদে পুরুষরাই অগ্রগামী।
প্রথম পর্যায়ের বক্তব্যের পর্যালোচনায় তিনি যুক্তি দেন, পার্লামেন্টে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। তাই তাদেরই প্রাধান্য থাকে। তাছাড়া, শাসককে নাসীহত করা, পরামর্শ দেয়া, ত্রুটি বিচ্যুতি ধরিয়ে দেয়াই ইসলামি রাজনীতির মূল কথা। যা আমরু বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকারের অংশ। আল কুরআনে একাজে অংশগ্রহণের জন্য নারীদেরকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে (পূর্বে বিবৃত)। মহানবি সা.ও মুসলমানদের সামষ্টিক বিষয়ে নারীর পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। যেমন: হুদায়বিয়াহর সন্ধির প্রাক্কালে উম্মে সালামাহ রা.-এর পরামর্শে তিনি পদক্ষেপ নেন। মসজিদে নববীতে খলিফা উমর রা. এক ভাষণে নারীর সর্বোচ্চ মহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে চাইলে, সেই উম্মে সালামাহ রা.-এর বিরোধিতা করে যুক্তি প্রদর্শন করেন। এসব প্রমাণ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ দেয়া ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে পারে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের বক্তব্যের পর্যালোচনায় তিনি যুক্তি দেন যে, নারী শিক্ষায় সুযোগ সুবিধা কম থাকার কারণেই তারা পিছিয়ে। কিন্তু তাই বলে জ্ঞান-গবেষণায় তাদের অবদান কম নয়। হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট অনেক বড় বড় বিদ্বান সাহাবিও ফাতাওয়া চাইতেন। কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের দ্বার নারী পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত। কেউই এ কথা বলে না যে, ইজতিহাদ করার যোগ্যতার শর্তসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো: পুরুষ হওয়া। সুতরাং এ কাজে নারীদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। এছাড়া, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক দিয়ে কোনো কোনো নারী অনেক পুরুষের চেয়েও অগ্রগামী হতে পারে। যেমন আল কুরআনে বর্ণিত সাবা রাণী এবং মহানবি সা.-এর সাহাবিগণের মধ্যে আয়েশা রা.।
একইভাবে নারী মন্ত্রীসভার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্পর্কে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দায়িত্ব সামষ্টিক, কর্তৃত্ব সকলের অংশীদারিত্বমূলক। যা একদল মানুষ কার্যকর করে, বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থার দ্বারা। আর নারী তার অংশ মাত্র। সে একচ্ছত্র শাসক হতে পারে না। তার ক্ষমতা নিরংকুশ বা একচ্ছত্র নয়। যেকোনো সময় তার ক্ষমতা চলে যেতে পারে। সার্বিক পর্যালোচনা ও চিন্তাভাবনায় দেখা যায়, কোনো জাতি উপর নারীর শাসন নয়, বরং শাসন হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বা গোষ্ঠীর ও ব্যবস্থাদির। যদিও কোনো নারী সর্বোচ্চে থাকুক না কেন। সেখানে সে নারী শাসক নয়। প্রধানমন্ত্রী শুধু এককভাবে শাসক নয়, বরং সামষ্টিকভাবে গোটা মন্ত্রী সভা হলো শাসক।
অধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত ও উপসংহার:
উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যায়, যারা নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছেন, তাদের যুক্তির মূল কেন্দ্র বিন্দু নারীর যোগ্যতা, দায়িত্ব ও হিজাব ব্যবস্থা ঠিক রাখাকে কেন্দ্র করে। বাকি দলিলসমূহ সার্বিকভাবে প্রযোজ্য নয়, অংশ বিশেষের সাথে প্রযোজ্য। আর তা হলো সর্বোচ্চ পদ তথা খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। খিলাফত বা ইমামতকে সামনে রেখে তারা সামগ্রিক নেতৃত্বের উপর হুকুম সম্প্রসারিত করেছেন। পক্ষান্তরে যারা নারী নেতৃত্বের সমর্থক তারা বলছেন, কুরআন সুন্নাহে এ বিষয়ে কোনো নিষেধ নেই। তাছাড়া, কোনো কোনো নারীর নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকতে পারে। যোগ্যতা থাকলে নারী যেকোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে। অন্যরা বিশেষ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় বা বিশেষ ক্ষেত্রে বা প্রেক্ষাপটে নারী নেতৃত্ব বৈধ বলেছেন। তন্মধ্যে যারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বৈধ বলেছেন, তারা ইমামত কুবরা তথা রাষ্ট্রপ্রধান পদে নারী নেতৃত্বকে অবৈধ ধরেই সেসব মত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে উল্লেখ করেন, নারীদেরকে রাষ্ট্রপ্রধান তথা খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেয়া জায়েয না হওয়ার বিষয়ে উলামায়ে উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ