আন্তর্জাতিক প্রতারক ডেভিড বেনগুরিয়ন
ডেভিড বেন-গুরিয়ন, জায়োনিস্ট রাষ্ট্রগঠন ও ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতি: রাজনৈতিক কৌশল, রাষ্ট্রীয় বয়ান ও নাকবার ইতিহাস
ভূমিকা
ডেভিড বেন-গুরিয়ন আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি হিসেবে পরিচিত। ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে তিনি স্বাধীনতা, রাষ্ট্রগঠন ও ইহুদি জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, সমালোচনামূলক ইতিহাসচর্চায় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা গভীর বিতর্কের বিষয়। বিশেষত ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তুচ্যুতি, ১৯৪৮ সালের নাকবা (Nakba), Plan Dalet এবং জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনার পরবর্তী সামরিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বেন-গুরিয়নের ভূমিকা নিয়ে বহু ইতিহাসবিদ প্রশ্ন তুলেছেন।
এই আলোচনায় বেন-গুরিয়নের রাজনৈতিক কৌশলকে নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক আইন, উপনিবেশবাদ ও জাতিগত বাস্তুচ্যুতির আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে।
১. ধর্মীয় বয়ান ও জায়োনিস্ট রাজনৈতিক কৌশল
বেন-গুরিয়ন ব্যক্তিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিবিদ ছিলেন। বহু গবেষক উল্লেখ করেছেন যে তিনি প্রচলিত ধর্মীয় জীবনযাপন অনুসরণ করতেন না। তবুও জায়োনিস্ট আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনে বাইবেলীয় ঐতিহাসিক দাবিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়।
ইতিহাসবিদ Shlomo Sand এবং Avi Shlaim-এর মতে, জায়োনিস্ট আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার খ্রিস্টান সমাজের ধর্মীয় সহানুভূতি অর্জন করা। “Promised Land” বা “Biblical Homeland” ধারণা আন্তর্জাতিক সমর্থন গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এখানে সমালোচকরা যুক্তি দেন যে:
আধুনিক রাষ্ট্রগঠনকে ধর্মীয় ঐতিহাসিক অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল,
অথচ একই ভূখণ্ডে শতাব্দীব্যাপী বসবাসরত ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত হয়।
রেফারেন্স:
Shlomo Sand, The Invention of the Jewish People
Avi Shlaim, The Iron Wall
২. “A Land Without a People”: রাজনৈতিক মিথ ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা
জায়োনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে প্রায়শই যুক্ত একটি স্লোগান ছিল:
“A land without a people for a people without a land.”
যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ স্লোগানের ব্যবহার ও প্রসার নিয়ে বিতর্ক আছে, সমালোচকরা দাবি করেন যে এই ধারণা ফিলিস্তিনের বিদ্যমান আরব জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য করে দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল।
অটোমান ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলের নথি অনুযায়ী:
ফিলিস্তিনে কৃষিভিত্তিক গ্রাম,
নগরকেন্দ্র,
আরব বণিক শ্রেণি,
এবং সুসংগঠিত সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল।
১৯৪৫ সালের British Mandate statistics অনুযায়ী ফিলিস্তিনে আরব জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
ইতিহাসবিদ Rashid Khalidi এই প্রক্রিয়াকে “denial of native political existence” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রেফারেন্স:
Rashid Khalidi, The Hundred Years’ War on Palestine
British Mandate Census Records
৩. Plan Dalet ও নাকবা বিতর্ক
১৯৪৮ সালের যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতি আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি।
Plan Dalet কী?
১৯৪৮ সালের মার্চে হাগানাহ Plan Dalet (Plan D) নামে একটি সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ইসরায়েলি “New Historians” — বিশেষত Ilan Pappé — যুক্তি দেন যে এই পরিকল্পনা ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের সংগঠিত উচ্ছেদের নীলনকশা।
অন্যদিকে Benny Morris-এর মতো ইতিহাসবিদরা বলেন:
Plan Dalet মূলত সামরিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল,
যদিও যুদ্ধ চলাকালে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও গ্রাম ধ্বংস সংঘটিত হয়।
নাকবা (Nakba)
১৯৪৮ সালের যুদ্ধে আনুমানিক ৭ লক্ষের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। শত শত গ্রাম ধ্বংস বা খালি হয়ে যায়। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে “Nakba” বা “মহাবিপর্যয়” নামে অভিহিত করে।
দেইর ইয়াসিন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল এবং বহু ইতিহাসবিদের মতে তা গণভীতি ও পলায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রেফারেন্স:
Ilan Pappé, The Ethnic Cleansing of Palestine
Benny Morris, The Birth of the Palestinian Refugee Problem
Walid Khalidi, All That Remains
৪. জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা ও সীমানা সম্প্রসারণ
১৯৪৭ সালের UN Resolution 181 ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেয়।
বেন-গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করলেও, পরবর্তী যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল জাতিসংঘ নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেয়।
১৯৪৯ সালের armistice lines অনুযায়ী:
ইসরায়েল ম্যান্ডেট ফিলিস্তিনের প্রায় ৭৮% অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে,
যা মূল জাতিসংঘ প্রস্তাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সমালোচক ইতিহাসবিদরা দাবি করেন যে জায়োনিস্ট নেতৃত্বের একটি অংশ শুরু থেকেই বৃহত্তর ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করত।
রেফারেন্স:
Simha Flapan, The Birth of Israel: Myths and Realities
UN Resolution 181 Archives
৫. ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও “Right of Return”
১৯৪৮ সালের পর জাতিসংঘ Resolution 194–এ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন বা ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়।
তবে ইসরায়েলি নেতৃত্ব ব্যাপক হারে শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতা করে। বেন-গুরিয়ন যুক্তি দেন যে:
শরণার্থীদের ফিরে আসা নতুন রাষ্ট্রের demography পরিবর্তন করবে,
এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে।
ফলস্বরূপ:
বহু ফিলিস্তিনি স্থায়ীভাবে শরণার্থী হয়ে যায়,
তাদের সম্পত্তি “Absentee Property Laws”–এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
এই প্রশ্ন আজও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সবচেয়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি।
রেফারেন্স:
UN Resolution 194
Nur Masalha, Expulsion of the Palestinians
উপসংহার
ডেভিড বেন-গুরিয়নের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গভীরভাবে দ্বৈত প্রকৃতির।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা; কিন্তু বহু ফিলিস্তিনি ও সমালোচনামূলক ইতিহাসবিদের কাছে তিনি এমন এক রাষ্ট্রগঠনের স্থপতি, যার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল:
বাস্তুচ্যুতি,
সামরিক শক্তি,
জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন,
এবং রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের ওপর।
এই ইতিহাসকে বোঝার জন্য একপাক্ষিক জাতীয়তাবাদী বয়ান নয়, বরং দলিলভিত্তিক, বহুমাত্রিক ও মানবাধিকারকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি (Selected Bibliography)
Pappé, Ilan. The Ethnic Cleansing of Palestine. Oneworld, 2006.
Morris, Benny. The Birth of the Palestinian Refugee Problem Revisited. Cambridge University Press, 2004.
Khalidi, Rashid. The Hundred Years’ War on Palestine. Metropolitan Books, 2020.
Shlaim, Avi. The Iron Wall: Israel and the Arab World. Penguin, 2001.
Sand, Shlomo. The Invention of the Jewish People. Verso, 2009.
Masalha, Nur. Expulsion of the Palestinians. Institute for Palestine Studies, 1992.
Flapan, Simha. The Birth of Israel: Myths and Realities. Pantheon, 1987.
United Nations General Assembly Resolution 181 (1947).
United Nations General Assembly Resolution 194 (1948).

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ