মসজিদে নববী লুন্ঠনের ইতিহাস

 


১৮০৪-১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের (আলে সৌদ) মদিনা বিজয় এবং মসজিদে নববীর ধনভাণ্ডার থেকে মূল্যবান সামগ্রী অপসারণের ঘটনা ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে অত্যন্ত বিতর্কিত একটি অধ্যায়। এই ঘটনাকে কেউ “সংস্কারমূলক পদক্ষেপ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আবার অনেকে একে “লুণ্ঠন” বা “পবিত্র স্থানের অবমাননা” বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিষয়টি বোঝার জন্য সে সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ওয়াহাবি আন্দোলনের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের বিবরণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রথম সৌদি রাষ্ট্র মূলত মুহাম্মদ ইবনে সৌদ এবং মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জোটের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। আঠারো শতকের শেষভাগে আরব উপদ্বীপে এই শক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের সরল আকীদা ও ইবাদতব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের দৃষ্টিতে “বিদআত” ও “শিরক”-সংশ্লিষ্ট প্রথাগুলো দূর করা। এই মতাদর্শের ভিত্তিতেই তারা হিজাজ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে এবং ১৮০৪ সালে মক্কা ও ১৮০৫ সালে মদিনা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

মদিনা দখলের পর মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে সংরক্ষিত বহু মূল্যবান সম্পদের ওপর নতুন শাসকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারকের সংলগ্ন স্থানে দীর্ঘ শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসক, সুলতান, বাদশাহ ও ধনী ব্যক্তিদের দেওয়া বিপুল উপঢৌকন জমা ছিল। উসমানীয় সুলতান, মিসরের শাসক, ভারতীয় মুসলিম নবাব এবং অন্যান্য মুসলিম রাজপরিবারের পাঠানো বহু মূল্যবান সামগ্রী সেখানে সংরক্ষিত ছিল। এসব সম্পদের মধ্যে ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার, হীরা-পান্না খচিত তরবারি, অলংকৃত মোমদান, মূল্যবান পাথরে সজ্জিত পানির পাত্র, বিরল মুদ্রা, অলঙ্কৃত কোরআনের কপি এবং রাজকীয় উপঢৌকন হিসেবে প্রেরিত সামগ্রী।

সমসাময়িক ইউরোপীয় পর্যটক ও ঐতিহাসিক Johann Ludwig Burckhardt তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ করেন যে, মসজিদে নববীর ভাণ্ডারে বিপুল পরিমাণ সম্পদ সঞ্চিত ছিল এবং সৌদি বাহিনী সেগুলোর বড় অংশ সরিয়ে নেয়। একই ধরনের বিবরণ পাওয়া যায় উসমানীয় ও আরব ঐতিহাসিকদের লেখাতেও। যদিও সম্পদের সঠিক পরিমাণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবুও অধিকাংশ গবেষক একমত যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল্যবান সামগ্রী মদিনা থেকে অপসারণ করা হয়েছিল।

এই পদক্ষেপের পেছনে সৌদি-ওয়াহাবি নেতৃত্ব কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করে। প্রথমত, তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী কবর, মাজার বা পবিত্র স্থানের সঙ্গে অতিরিক্ত জাঁকজমক, অলঙ্কার বা সম্পদ যুক্ত করা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী ছিল। তারা মনে করতেন, এসব কর্মকাণ্ড মুসলমানদের মধ্যে অতিরিক্ত ভক্তি বা কবরপূজার প্রবণতা তৈরি করতে পারে, যা তাওহীদের বিশুদ্ধ ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মসজিদে নববী ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থানে জমা হওয়া অলঙ্কার ও ধনসম্পদ অপসারণকে তারা “ধর্মীয় সংস্কার” হিসেবে দেখেছিল।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতাও এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথম সৌদি রাষ্ট্র তখন একাধিক সামরিক সংঘাতে জড়িত ছিল এবং তাদের প্রশাসন ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল। ফলে মসজিদে নববীর ধনভাণ্ডারের সম্পদকে তারা রাষ্ট্রীয় তহবিল বা বায়তুল মালের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি এই অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রয়োজনও সম্পদ অপসারণের একটি বড় কারণ ছিল।

ঘটনাটি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে Ottoman Empire-এর শাসকগোষ্ঠী এটিকে পবিত্র নগরীর মর্যাদাহানি হিসেবে বিবেচনা করে। উসমানীয় সুলতানরা নিজেদেরকে হারামাইন শরিফাইনের (মক্কা-মদিনার) রক্ষক মনে করতেন। ফলে মদিনায় এই ধরনের পদক্ষেপ তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আরব, তুরস্ক, মিসর ও ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ বহু মানুষের কাছে এই উপহার ও অলঙ্কারগুলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিল।

পরবর্তীতে উসমানীয় সাম্রাজ্য মিসরের শাসক Muhammad Ali Pasha-কে আরব উপদ্বীপে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। তাঁর পুত্র Ibrahim Pasha-র নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে ১৮১৮ সালে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের পতন ঘটে এবং হিজাজ অঞ্চল পুনরায় উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর লুণ্ঠিত বা সরিয়ে নেওয়া সম্পদের কিছু অংশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়, যদিও ইতিহাসবিদদের মতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ততদিনে হারিয়ে যায়, বিক্রি হয়ে যায় অথবা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

আধুনিক ইতিহাসচর্চায় এই ঘটনাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য রয়েছে। সৌদি ও ওয়াহাবি ধারার লেখকরা সাধারণত একে ধর্মীয় সংস্কার ও তাওহীদের শুদ্ধিকরণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যদিকে উসমানীয়পন্থী এবং বহু ঐতিহ্যবাদী মুসলিম ঐতিহাসিক এটিকে স্পষ্ট লুণ্ঠন হিসেবে দেখেন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক বা সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং ইসলামী ইতিহাসে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, ক্ষমতার রাজনীতি এবং পবিত্র স্থানসমূহের মর্যাদা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র

  1. Travels in Arabia — Johann Ludwig Burckhardt
  2. The Wahhabi Mission and Saudi Arabia — David Commins
  3. A History of Saudi Arabia — Madawi Al-Rasheed
  4. The Arabian Frontier of the British Raj
  5. উসমানীয় ও আরব ঐতিহাসিকদের সমসাময়িক বিবরণ এবং হিজাজ অঞ্চলের ইতিহাসবিষয়ক গবেষণা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইসলামে সূফীবাদ নামক কুফুরী ভ্রান্তি

মাও: মওদূদীর ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে ৮৫ বছর যাবত ভারতবর্ষের আলেমদের বিতর্কের কারন

স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ লুটের হিসাব

আহলে হাদিসের ভন্ডামীর আদ্যোপান্ত

ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর শালী তালাক

দেশের জন্য সব হারানো বেগম খালেদা জিয়ার সফল সংগ্রামী জীবন

জয়বাংলা একটি পাকিস্তানি হাইব্রিড স্লোগান

প্রকৃত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী নিজামী নয় আওয়ামিলীগ, তাদের বিচার চাই