ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠন: গোপন চুক্তি, বিভক্তি ও আধুনিক সংকটের ইতিহাস
ভূমিকা
বিশ শতকের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য ছিল বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্মীয় গুরুত্ব, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং পরবর্তীতে তেলের বিশাল মজুদ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৮) মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দেয়। এই সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এমন এক কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল গ্রহণ করে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর বিদ্যমান।
ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনটি—
- অটোমান সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত করা,
- ভারত ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা রক্ষা করা,
- মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও কৌশলগত অঞ্চলগুলোর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্রিটিশরা একই সময়ে আরব জাতীয়তাবাদীদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়, ফরাসিদের সঙ্গে গোপনে অঞ্চল ভাগাভাগির চুক্তি করে এবং ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠারও সমর্থন দেয়। এই বহুমুখী ও পরস্পরবিরোধী নীতিই পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা
“ইউরোপের অসুস্থ মানুষ”
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে অটোমান সাম্রাজ্যকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো “Sick Man of Europe” বলে অভিহিত করত। সাম্রাজ্যটি সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবুও তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল—
- বর্তমান তুরস্ক
- ইরাক
- সিরিয়া
- লেবানন
- ফিলিস্তিন
- জর্ডান
- হিজাজ অঞ্চল
- আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা
যুদ্ধ শুরু হলে অটোমানরা জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পক্ষে যোগ দেয়। ফলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও তাদের মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে অটোমানদের বিরুদ্ধে নতুন কৌশল নিতে শুরু করে।
হুসাইন–ম্যাকমোহন চুক্তি (১৯১৫–১৯১৬): স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি
আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান
অটোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে ধীরে ধীরে আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তা গড়ে উঠছিল। ব্রিটিশরা এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চায়।
গোপন যোগাযোগ
মিশরে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার
Henry McMahon
মক্কার শরীফ
Hussein bin Ali
এর সঙ্গে গোপন চিঠিপত্র আদান-প্রদান শুরু করেন।
স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি
ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দেয়—
- আরবরা যদি অটোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে,
- তাহলে যুদ্ধের পর একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।
আরবরা বিশ্বাস করেছিল, এই রাষ্ট্রে সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন এবং আরব উপদ্বীপের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আরব বিদ্রোহ
১৯১৬ সালে “Arab Revolt” শুরু হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা
T. E. Lawrence
তিনি আরব গোত্রগুলোকে একত্রিত করতে এবং অটোমানদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করেন।
বিদ্রোহের ফলাফল
- অটোমান রেললাইন ধ্বংস করা হয়,
- যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়,
- ব্রিটিশদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে অগ্রসর হওয়া সহজ হয়।
সাইকস–পিকট চুক্তি (১৯১৬): মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগির গোপন নকশা
আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগির পরিকল্পনা করছিল।
চুক্তির পরিকল্পনাকারী
- Mark Sykes
- François Georges-Picot
চুক্তির মূল বিষয়
এই চুক্তি অনুযায়ী—
ফ্রান্সের প্রভাবাধীন অঞ্চল
- সিরিয়া
- লেবানন
- দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ার অংশ
ব্রিটেনের প্রভাবাধীন অঞ্চল
- ইরাক
- জর্ডান
- হাইফা বন্দর
- বসরা অঞ্চল
ফিলিস্তিন
ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে রাখার পরিকল্পনা করা হয়।
কেন এটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?
এই চুক্তি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশরা একই সময়ে—
- আরবদের স্বাধীনতার আশ্বাস দিচ্ছিল,
- আবার ফরাসিদের সঙ্গে গোপনে অঞ্চল ভাগাভাগি করছিল।
চুক্তি ফাঁস হওয়া
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পর নতুন সরকার গোপন কূটনৈতিক নথি প্রকাশ করে দেয়। তখন সাইকস-পিকট চুক্তি বিশ্ববাসীর সামনে আসে।
আরব নেতারা বুঝতে পারেন, তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন আসলে উপনিবেশবাদী কৌশলের অংশ ছিল।
বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭): ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি
ঘোষণার পটভূমি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপীয় জায়নবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন
Theodor Herzl
তাদের লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
বেলফোর ঘোষণা
১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
Arthur Balfour
একটি চিঠির মাধ্যমে ফিলিস্তিনে “Jewish National Home” প্রতিষ্ঠার সমর্থন জানান।
আরবদের দৃষ্টিতে বিশ্বাসঘাতকতা
সমস্যা ছিল—
- একই ভূমি সম্পর্কে ব্রিটিশরা আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
- আবার ইহুদি জাতীয় আবাসভূমিকেও সমর্থন করেছিল।
এই দ্বৈত নীতি পরবর্তীতে ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।
ম্যান্ডেট ব্যবস্থা: উপনিবেশবাদের নতুন রূপ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে
League of Nations
“Mandate System” চালু করে।
আনুষ্ঠানিক যুক্তি
বলা হয়—
- আরব অঞ্চলগুলো এখনো স্বশাসনের জন্য প্রস্তুত নয়,
- তাই ইউরোপীয় শক্তিগুলো “অভিভাবক” হিসেবে শাসন করবে।
বাস্তবতা
ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে যায়
- ইরাক
- জর্ডান
- ফিলিস্তিন
ফরাসি নিয়ন্ত্রণে যায়
- সিরিয়া
- লেবানন
আরবদের কাছে এটি ছিল উপনিবেশবাদের নতুন সংস্করণ।
বিভাজন ও শাসনের নীতি (Divide and Rule)
অনেক গবেষকের মতে, ব্রিটিশরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সীমান্ত তৈরি করেছিল যা ভবিষ্যতে সংঘাত সৃষ্টি করবে।
কৃত্রিম সীমান্ত
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সীমান্ত ছিল সরলরেখার মতো। এগুলো স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা না করেই আঁকা হয়।
এর ফলাফল
- কুর্দিরা চারটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়,
- শিয়া–সুন্নি দ্বন্দ্ব বাড়ে,
- গোত্রীয় বিভাজন জটিল হয়।
আল সৌদ রাজপরিবার ও ব্রিটিশ সংযোগ
ইবনে সৌদের উত্থান
Abdulaziz Ibn Saud
আরব উপদ্বীপে ধীরে ধীরে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেন।
১৯১৫ সালের দারিন চুক্তি
ব্রিটিশরা ইবনে সৌদের সঙ্গে সমঝোতা করে।
চুক্তির বিষয়বস্তু
- ব্রিটিশরা অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেবে,
- ইবনে সৌদ অটোমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন,
- ব্রিটিশরা তার ভূখণ্ডকে সুরক্ষা দেবে।
হাশেমী বনাম আল সৌদ
ব্রিটিশরা একই সময়ে—
- শরীফ হুসাইন,
- এবং ইবনে সৌদ
উভয় পক্ষকেই সমর্থন দিচ্ছিল।
পরে ইবনে সৌদের শক্তি বাড়লে ব্রিটিশরা বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করে তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
সৌদি আরব, জায়নবাদ ও ইসরায়েল প্রশ্ন
বিতর্কের সূচনা
অনেক আরব জাতীয়তাবাদী লেখক দাবি করেন—
- সৌদি নেতৃত্ব ফিলিস্তিন ইস্যুতে যথেষ্ট সক্রিয় ছিল না,
- পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
বাস্তবতা
ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী,
Abdulaziz Ibn Saud
প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।
তবে সামরিক ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতার কারণে সৌদি আরব বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তেল, সুয়েজ খাল ও ব্রিটিশ ভূ-রাজনীতি
তেলের গুরুত্ব
বিশ শতকের শুরুতে শিল্প বিপ্লব ও সামরিক প্রযুক্তিতে তেলের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে—
- ইরাকের মসুল অঞ্চল,
- পারস্য উপসাগর,
- আরব উপদ্বীপ
ব্রিটিশদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুয়েজ খাল
Suez Canal
ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের “লাইফলাইন”।
কারণ এটি ইউরোপ থেকে ভারত ও এশিয়ায় দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করত।
আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের শিকড়
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের বহু সংকটের পেছনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য সংকট
- ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাত
- সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ
- ইরাকের সাম্প্রদায়িক সংঘাত
- কুর্দি রাষ্ট্রের দাবি
- লেবাননের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বনাম বাস্তব ইতিহাস
ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো কী বলে?
- ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত করেছে,
- আল সৌদ পরিবারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে,
- জায়নবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে,
- আরব ঐক্য নষ্ট করেছে।
ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন
মূলধারার ইতিহাসবিদদের মতে বাস্তবতা আরও জটিল।
এখানে কাজ করেছে—
- সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ,
- স্থানীয় গোত্রীয় রাজনীতি,
- ধর্মীয় মতপার্থক্য,
- আরব জাতীয়তাবাদ,
- অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা,
- তেলভিত্তিক ভূ-রাজনীতি।
উপসংহার
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কূটনীতি, গোপন চুক্তি, সামরিক জোট এবং পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।
হুসাইন–ম্যাকমোহন চুক্তি, সাইকস–পিকট চুক্তি, বেলফোর ঘোষণা এবং ম্যান্ডেট ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক অস্থিতিশীল বাস্তবতা তৈরি হয় যার প্রভাব আজও বিদ্যমান।
তবে বর্তমান সংকটের জন্য শুধুমাত্র ব্রিটিশদের দায়ী করলে ইতিহাসের জটিলতা উপেক্ষা করা হবে। স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা, আরব বিশ্বের বিভক্তি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, শীতল যুদ্ধ, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং আধুনিক ভূ-রাজনীতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তথ্যসূত্র
- A Peace to End All Peace — David Fromkin
- The Arab Awakening — George Antonius
- The Modern Middle East — James L. Gelvin
- The Question of Palestine — Edward Said
- Saudi Arabia: A Kingdom in Peril
- Lawrence and the Arabs
- The Ottoman Empire: The Great Powers and the Straits Question
- British National Archives — Middle East Papers
- League of Nations Mandate Documents
- United Nations Historical Archives on Palestine

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ