বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের ভূ-রাজনীতি: ২০০৫, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক, ২০০৫ সালের বোমা হামলা, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালের কৌশলগত বাস্তবতা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা।

চীন-বাংলাদেশ,ভারত


 ভূ-রাজনীতি, ট্রানজিট এবং বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান নয়; বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিদের দাবার বোর্ড। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব-দ্বীপটি যুগে যুগে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) স্বার্থের টানাপোড়েনে পিষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-দিল্লি-বেইজিং—এই ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের রসায়ন বাংলাদেশের ক্ষমতা বদল, স্থায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার গতিপথ নির্ধারণ করে এসেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুটি ভিন্ন যুগের দুটি ভিন্ন চীন সফর এবং তার সমসাময়িক আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহ গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রথমটি ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চীন সফর এবং তার সমান্তরালে দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা। দ্বিতীয়টি ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর, তার আকস্মিক সংক্ষিপ্তকরণ এবং এর পরপরই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার পতন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, যখন প্রায় দুই দশক পর একটি গণতান্ত্রিক বা গণ-আকাঙ্ক্ষার সরকার এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব (তারেক রহমান) পুনরায় চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের এক নতুন দিগন্তে পা বাড়াচ্ছেন, ঠিক তখনই ইতিহাসের সেই চেনা ছক, চেনা অস্থিরতা এবং একই ধরনের নেপথ্য কুশীলবদের ‘নাটাই’ নাড়ানোর গুঞ্জন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।

এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে আমরা দেখব কীভাবে দিল্লির প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশের সরকারগুলোকে চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে, এবং কীভাবে তথাকথিত "কাকতালীয়" ঘটনাগুলো আসলে একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক নকশার অংশ।

 ১. ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট: খালেদা জিয়ার চীন সফর এবং দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা

২০০৫ সালের আগস্ট মাসটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। তৎকালীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চীন সফরে যান। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের কাছ থেকে এক বিশাল বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতার আশ্বাস নিশ্চিত করা। বিশেষ করে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষায় চীনের সাথে একটি বড় সড় কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল।

 বেইজিংয়ে চুক্তি এবং ঢাকার বিস্ফোরণ

খালেদা জিয়া যখন বেইজিংয়ে অবস্থান করছিলেন এবং সফরের দ্বিতীয় দিনে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই (১৭ আগস্ট ২০০৫) এক নজিরবিহীন ও সুপরিকল্পিত হামলায় কেঁপে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশ। মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টি জেলায় (মুন্সিগঞ্জ বাদে) প্রায় ৫০০টি পয়েন্টে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এই হামলার দায় স্বীকার করে এবং ঘটনাস্থলগুলোতে ইসলামি শাসন কায়েমের লিফলেট ছড়ানো হয়। কিন্তু এই হামলার টাইমিং বা সময়জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

 ভূ-রাজনৈতিক ফলাফল: চুক্তি বাতিল ও সফর স্থগিত

ইসলাম কায়েম বা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার নামে এই বোমা হামলা চালানো হলেও, এর তাৎক্ষণিক এবং সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে।

 চুক্তি বাতিল: নিরাপত্তার এই চরম বিপর্যয়ের মুখে চীনের সাথে বাংলাদেশের সেই পরিকল্পিত ঐতিহাসিক ও বড় সড় কৌশলগত চুক্তিটি ঝুলে যায় এবং কার্যত বাতিল হয়ে যায়। বেইজিং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

 সফর সংক্ষিপ্তকরণ:দেশের এই নজিরবিহীন সংকটের মুখে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার গুরুত্বপূর্ণ চীন সফর মাঝপথেই স্থগিত করতে বাধ্য হন এবং দ্রুত দেশে ফিরে আসেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ইসলাম কায়েম করা ছিল না; বরং বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে একটি "জঙ্গি রাষ্ট্র" হিসেবে তুলে ধরা এবং চীনের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। এই ঘটনার নেপথ্যে যে আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থা ও দিল্লির অদৃশ্য সুতো ছিল, তা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, বাংলাদেশ চীনের বেল্টের দিকে ঝুঁকে পড়ুক, তা দিল্লি কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।

২. ২০২৪ সালের শেখ হাসিনার চীন সফর এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান

ইতিহাসের চাকা ঘুরে প্রায় দুই দশক পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আরেকটি নাটকীয় চীন সফরের সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। ততদিনে বাংলাদেশে টানা ১৫ বছর ধরে শাসন করে আসছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, যার সরকারকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক মহল দিল্লির প্রকাশ্য সমর্থনে টিকে থাকা একটি সরকার হিসেবে বিবেচনা করত।

বেইজিংয়ে শূন্য হাতে ফেরা এবং অপমান

২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে শেখ হাসিনা বেইজিং সফরে যান। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল দেশের চরম অর্থনৈতিক ও রিজার্ভ সংকট কাটাতে চীনের কাছ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারের ঋণ বা আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা। কিন্তু চীনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে চরম শীতল অভ্যর্থনা জানানো হয়। বেইজিং পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল যে, শেখ হাসিনার নাটাই সম্পূর্ণরূপে দিল্লির হাতে, এবং তিনি চীনকে কেবল দিল্লির সাথে দরকষাকষির "কার্ড" হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ফলস্বরূপ:

 চীন বাংলাদেশকে মাত্র কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সহায়তার আশ্বাস দেয়, যা ছিল প্রত্যাশার তুলনায় সামান্য।

 চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর, সফর শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগেই শেখ হাসিনা তার সফর সংক্ষিপ্ত করে হুট করে দেশে ফিরে আসেন। অফিশিয়াল কারণ হিসেবে "মেয়ের অসুস্থতা"র কথা বলা হলেও, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায় যে বেইজিংয়ের আচরণে ক্ষুব্ধ ও ব্যর্থ হয়েই তিনি ফিরে এসেছিলেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ভারতে পলায়ন

চীন সফর ব্যর্থ হওয়ার পরপরই বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে (জুলাই-আগস্ট ২০২৪) রূপ নেয়। শেখ হাসিনার সরকার নিষ্ঠুরভাবে ছাত্র-জনতার ওপর দমনপীড়ন চালালে আন্দোলন এক দফায় পরিণত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ছাত্র-জনতার লং মার্চ টু ঢাকা-র মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে করে সরাসরি ভারতের দিল্লিতে পালিয়ে যান।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়: বেইজিং যখন দেখল যে গণ-অসন্তোষে ফুটতে থাকা একটি সরকারকে ভারত কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখতে চাইছে, তখন চীন আর সেই ডুবন্ত নৌকায় বিনিয়োগ করতে রাজি হয়নি। ফলস্বরূপ, চীন সফর সংক্ষিপ্ত করে ফেরার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে এবং তিনি দিল্লির আশ্রয়ে চলে যান।

৩. বর্তমান প্রেক্ষাপট (২০২৬): তারেক রহমানের চীন সফর এবং ঢাকায় কৃত্রিম অস্থিরতা

২০০৫ সালের সেই ঘটনার দীর্ঘ ২১-২২ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর দেশে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটেছে এবং প্রায় ২০ বছর পর জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলক বা একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বেইজিংয়ের আমন্ত্রণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন।

এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশেষ করে **প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা চুক্তি**। শোনা যাচ্ছে, এই সফরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চীনের সাথে কিছু বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

"নাটাই মূলত দিল্লির হাতে": কাকতালীয় নাকি চেনা ছক?

মজার এবং চরম উদ্বেগের ব্যাপার হলো, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরের ঠিক একদিন আগে ঢাকার রাজপথে আবারও এক অদ্ভুত ও কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে। হঠাৎ করেই মাঠে নামানো হয়েছে কট্টরপন্থী হিন্দু গ্রুপ এবং সমান্তরালে কট্টরপন্থী মুসলিম গ্রুপকে।

 এক পক্ষের দাবি:এক গ্রুপ হঠাৎ করেই সংখ্যালঘুর অধিকারের দাবিতে চরম উগ্র রূপ ধারণ করেছে, এবং আলটিমেটাম দিচ্ছে যে তাদের দাবি না মানলে দেশ ধ্বংস বা অচল করে দেওয়া হবে।

 অন্য পক্ষের অবস্থান:সমান্তরালে অপর কট্টরপন্থী গ্রুপটিকেও মাঠে নামিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে।

প্রশ্ন জাগে, এই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক মাস বা বছর ধরে চুপচাপ থাকলেও, ঠিক **প্রধানমন্ত্রীর বা দেশের শীর্ষ নেতার চীন সফরের আগের দিনই** কেন রাজপথ উত্তপ্ত করতে নামল?

এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ২০০৫ সালে যেমন চীনের সাথে চুক্তি ভন্ডুল করতে ইসলাম ও জঙ্গিবাদের কার্ড খেলা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে ঠিক একইভাবে চীনের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সম্পর্ক গভীর হওয়ার আগ মুহূর্তে বাংলাদেশকে একটি "সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাপীড়িত রাষ্ট্র" বা "সংখ্যালঘুদের জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র" হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। আর এই পুরো নাটকের নাটাই মূলত দিল্লির হাতে। দিল্লি মূলত এই অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে ঢাকাকে একটি বার্তা বা 'চোখ রাঙানি' দিচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করতে চায় যে, বাংলাদেশ একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র এবং এখানে ভারতের হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্থায়িত্ব সম্ভব নয়।

৪. দিল্লির চোখ রাঙানি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা

ভারত কখনোই চায় না বাংলাদেশ তার একক প্রভাব বলয় বা 'গ্রিপ' থেকে বের হয়ে যাক। বিগত ১৫ বছর ধরে ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহার এবং একমুখী বাণিজ্যের মাধ্যমে দিল্লি ঢাকাকে যেভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে তারা মরিয়া (Desperate) হয়ে উঠেছে।

| সাল | বাংলাদেশের শীর্ষ নেতার চীন সফর | নেপথ্য/সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ | ভূ-রাজনৈতিক ফলাফল |

|---|---|---|---|

| ২০০৫ | বেগম খালেদা জিয়া | দেশজুড়ে ১৭ আগস্ট ৬৪ জেলায় জেএমবি-র সিরিজ বোমা হামলা। | চীনের সাথে কৌশলগত বড় চুক্তি বাতিল, সফর স্থগিত। |

| ২০২৪ | শেখ হাসিনা | চীনের শীতল অভ্যর্থনা, আর্থিক সহায়তা না পাওয়া, সফর সংক্ষিপ্তকরণ। | জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে পলায়ন। |

| ২০২৬| তারেক রহমান / বর্তমান সরকার | সফরের ঠিক একদিন আগে ঢাকায় কট্টরপন্থী হিন্দু ও মুসলিম গ্রুপের রাজপথে নামা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার চেষ্টা। | চীনের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তিতে বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা (চলমান)। |

এই তালিকা স্পষ্ট করে দেয় যে, যখনই বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থে বেইজিংয়ের সাথে ভারসাম্যমূলক কূটনীতি করতে গেছে, তখনই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলা হয়েছে। ২০২৬ সালের এই সফরে ভারতের এই ডেসপারেট মুভমেন্ট বা মরিয়া আচরণ প্রমাণ করে যে তারা কতটা কোণঠাসা বোধ করছে।

 উপসংহার: দিল্লির দাওয়াত বনাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা

বর্তমান বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—দিল্লির এই চোখ রাঙানি এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অভ্যন্তরীণ সংকটকে উপেক্ষা করে কীভাবে বেইজিং সফর থেকে সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ আদায় করা যায়। কট্টরপন্থী গ্রুপগুলোকে রাজপথে নামিয়ে মূলত দিল্লির ‘দাওয়াত’ বা বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে যে, তাদের অমতে চীনের সাথে কোনো বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি করলে তার পরিণতি শুভ হবে না।

কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশ আর ২০০৫ বা ২০২৪ সালের বাংলাদেশ নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানোত্তর সচেতন বাংলাদেশ। প্রায় ২০ বছর পর জনগণের ম্যান্ডেট ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যখন কোনো নেতৃত্ব চীন সফরে যাচ্ছে, তখন প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সাথে এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। দিল্লি আমাদের সহজে তাদের গ্রিপের বাইরে যেতে দেবে না—এটাই স্বাভাবিক। তবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ দিল্লির এই আঞ্চলিক আধিপত্যবাদকে উপেক্ষা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে কি না, এবং এই চীন সফর থেকে প্রতিরক্ষাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করে দেশে ফিরতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করে এই ভূ-রাজনৈতিক চাল চালার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।


FAQ

প্রশ্ন ১: বাংলাদেশের জন্য চীনের গুরুত্ব কী?

চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের একটি প্রধান অর্থায়নকারী দেশ।

প্রশ্ন ২: ভারত কেন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি প্রধান অংশ।

প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশ কি চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করে?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

প্রশ্ন ৪: ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার দায় কে স্বীকার করেছিল?

নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি (JMB) ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

প্রশ্ন ৫: ভূ-রাজনীতি কী?

কোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণকে ভূ-রাজনীতি বলা হয়।


রেফারেন্স

Ministry of Foreign Affairs, Bangladesh

World Bank

Asian Development Bank

International Crisis Group

United Nations

South Asian Association for Regional Cooperation

Jama'atul Mujahideen Bangladesh

Bangladesh Institute of International and Strategic Studies


Focus Keyword

বাংলাদেশ চীন ভারত ভূ-রাজনীতি

Related Keywords

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

চীন সফর বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি

বঙ্গোপসাগর কৌশল

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি

তারেক রহমান চীন সফর

শেখ হাসিনা চীন সফর

খালেদা জিয়া চীন সফর



জাতীয় স্বার্থে:

ডা.বশির আহাম্মূ,এমবিবিএস 



মন্তব্যসমূহ

Featured Article

ইসলামে সূফীবাদ নামক কুফুরী ভ্রান্তি

মাও: মওদূদীর ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে ৮৫ বছর যাবত ভারতবর্ষের আলেমদের বিতর্কের কারন

স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ লুটের হিসাব

আহলে হাদিসের ভন্ডামীর আদ্যোপান্ত

ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর শালী তালাক

জয়বাংলা একটি পাকিস্তানি হাইব্রিড স্লোগান

দেশের জন্য সব হারানো বেগম খালেদা জিয়ার সফল সংগ্রামী জীবন

প্রকৃত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী নিজামী নয় আওয়ামিলীগ, তাদের বিচার চাই