বাংলাদেশের পুকুরগুলো উত্তর-দক্ষিণে লম্বা হয় কেন?

 




বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে বা পুরোনো রাজবাড়িগুলোতে খেয়াল করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ বড় পুকুর বা দীঘিই উত্তর-দক্ষিণে লম্বা করে খনন করা হয়েছে। এটি কিন্তু কোনো কাকতালীয় বিষয় বা কেবলই অন্ধবিশ্বাস নয়; এর পেছনে রয়েছে চমৎকার ভৌগোলিক, বৈজ্ঞানিক ও আবহাওয়াজনিত কারণ।
মূল কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
 ১. সূর্যের আলো এবং সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis)
আমাদের দেশ উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ায় সূর্য পূর্ব দিকে উঠে সামান্য দক্ষিণ ঘেঁষে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়।
 পুকুর যদি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা হয়, তবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যের আলো পুরো পুকুরের পানির ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে যাতায়াত করে।
  এর ফলে পুকুরের প্রতিটি কোণায় সমানভাবে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায়।
  পর্যাপ্ত আলো পাওয়ার কারণে পানির তলদেশে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (এককোষী জলজ উদ্ভিদ ও শ্যাওলা) ভালোভাবে সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে, যা মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরিতে এবং পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
২. বাতাসের প্রবাহ এবং অক্সিজেনের মিশ্রণ
বাংলাদেশের জলবায়ুর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে বছরের বেশিরভাগ সময় (বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে) বাতাস দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয় (দক্ষিণা বাতাস)।
 পুকুর উত্তর-দক্ষিণে লম্বা হলে দক্ষিণের বাতাস পুকুরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পুরো দৈর্ঘ্য বরাবর বাধাহীনভাবে বয়ে যেতে পারে।
 
বাতাস যখন পানির ওপর দিয়ে এভাবে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে, তখন পানিতে ছোট ছোট ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এই ঢেউ পানির সাথে বাতাসের অক্সিজেন মিশতে (Aeration) সরাসরি সাহায্য করে। পুকুর পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা হলে বাতাস পাড়ে বাধা পেয়ে এই সুবিধা কমে যেত।
 ৩. ঢেউয়ের আঘাত থেকে পাড় রক্ষা
দক্ষিণা বাতাস যখন উত্তর-দক্ষিণে লম্বা পুকুরের ওপর দিয়ে যায়, তখন ঢেউগুলো মূলত উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে আঘাত করে। যেহেতু উত্তর ও দক্ষিণ দিকটা প্রস্থে ছোট (ছোট পাড়), তাই ঢেউয়ের ধাক্কায় পাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বা জায়গার পরিমাণ অনেক কম থাকে। পূর্ব-পশ্চিমমুখী লম্বা পুকুর হলে দীর্ঘ পূর্ব ও পশ্চিম পাড় জুড়ে ঢেউ আছড়ে পড়ত, ফলে পুকুরের বড় পাড়গুলো দ্রুত ভেঙে যেত।
একটি ঐতিহাসিক তথ্য:
বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পাল ও সেন আমলে (বৌদ্ধ ও হিন্দু শাসনামলে) খনন করা পুকুর বা দীঘিগুলো মূলত এই বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় (সূর্য প্রণাম বা সূর্যমুখী) চিন্তা থেকে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা করা হতো। পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলে বা মোগল আমলে অনেক সময় ধর্মীয় অজুখানা বা স্থাপত্যশৈলীর নকশার খাতিরে কিছু পূর্ব-পশ্চিমমুখী পুকুরও খনন করা হয়েছিল।

তবে আধুনিক মৎস্য চাষের বিজ্ঞানও (Aquaculture) কিন্তু এই পুরোনো নিয়মটাকেই সমর্থন করে। বর্তমানে মাছ চাষের জন্য পুকুর কাটার সময়ও বিশেষজ্ঞদের প্রথম পরামর্শ থাকে—পুকুরটি যেন উত্তর-দক্ষিণে লম্বা হয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইসলামে সূফীবাদ নামক কুফুরী ভ্রান্তি

মাও: মওদূদীর ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে ৮৫ বছর যাবত ভারতবর্ষের আলেমদের বিতর্কের কারন

স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ লুটের হিসাব

আহলে হাদিসের ভন্ডামীর আদ্যোপান্ত

ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর শালী তালাক

দেশের জন্য সব হারানো বেগম খালেদা জিয়ার সফল সংগ্রামী জীবন

জয়বাংলা একটি পাকিস্তানি হাইব্রিড স্লোগান

প্রকৃত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী নিজামী নয় আওয়ামিলীগ, তাদের বিচার চাই