সরিয়াসিস (Psoriasis): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও জীবনযাপন | Complete Guide 2026

 

Psoriasis/সরিয়াসিস

সরিয়াসিস (Psoriasis): কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও জীবনযাপন | Complete Guide 2026


সরিয়াসিস (Psoriasis) কী, কেন হয়, লক্ষণ, প্রকারভেদ, চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস, প্রতিরোধ ও আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। চিকিৎসকের পরামর্শভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বাংলা গাইড।

Primary Keyword

সরিয়াসিস

Secondary Keywords

  • Psoriasis
  • সরিয়াসিসের চিকিৎসা
  • সরিয়াসিসের লক্ষণ
  • Psoriasis Treatment
  • Plaque Psoriasis
  • Psoriatic Arthritis
  • Skin Disease
  • Autoimmune Skin Disease

LSI Keywords

  • ত্বকের দীর্ঘস্থায়ী রোগ
  • সোরিয়াসিস
  • ত্বকের লাল দাগ
  • সাদা খোসা ওঠা
  • ত্বকের প্রদাহ
  • Autoimmune Disease
  • Biological Therapy
  • Skin Plaques

সরিয়াসিস (Psoriasis) কী?

সরিয়াসিস (Psoriasis) হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী, অটোইমিউন এবং প্রদাহজনিত ত্বকের রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) ভুলবশত সুস্থ ত্বকের কোষকে আক্রমণ করে। এর ফলে ত্বকের নতুন কোষ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দ্রুত তৈরি হতে থাকে। সাধারণত সুস্থ ত্বকের কোষ ২৮–৩০ দিনে নবায়ন হয়, কিন্তু সরিয়াসিসে এই প্রক্রিয়া মাত্র ৩–৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়। ফলে মৃত কোষগুলো ঝরে পড়ার আগেই নতুন কোষ জমতে থাকে এবং ত্বকে মোটা, উঁচু, লালচে এবং রূপালি-সাদা আঁশযুক্ত (Silvery Scale) প্লাক (Plaque) তৈরি হয়।

সরিয়াসিস সংক্রামক নয়। অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলেই অন্য কারও এই রোগ হয় না। এটি ছোঁয়াচে নয় এবং একই প্লেট, তোয়ালে বা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ২–৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের সরিয়াসিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও এই রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। নারী ও পুরুষ উভয়ই সমানভাবে আক্রান্ত হতে পারেন। সাধারণত ১৫–৩৫ বছর এবং ৫০–৬০ বছর বয়সে রোগটি বেশি দেখা যায়, তবে শিশুদেরও হতে পারে।

সরিয়াসিস কেন হয়?

সরিয়াসিসের সুনির্দিষ্ট একটি কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, জেনেটিক (Genetic) এবং ইমিউনোলজিক (Immunologic) কারণ একসঙ্গে কাজ করে এই রোগের সৃষ্টি করে।

যদি পরিবারের কোনো সদস্যের সরিয়াসিস থাকে, তাহলে অন্য সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

ইমিউন সিস্টেমের টি-লিম্ফোসাইট (T-cell) অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন প্রদাহজনক রাসায়নিক (Cytokines), বিশেষ করে TNF-α, IL-17, IL-23 নিঃসরণ করে। এর ফলে ত্বকের কোষ অস্বাভাবিক দ্রুত বিভাজিত হয় এবং প্লাক তৈরি হয়।

সরিয়াসিসের ঝুঁকির কারণ

নিচের কারণগুলো রোগটি শুরু করতে বা বাড়িয়ে দিতে পারে—

১. বংশগত কারণ (Genetic Predisposition)

পরিবারে বাবা, মা, ভাই বা বোনের কারও সরিয়াসিস থাকলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

২. মানসিক চাপ (Stress)

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা সরিয়াসিসের নতুন আক্রমণ শুরু করতে পারে কিংবা পুরোনো রোগকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

৩. সংক্রমণ (Infections)

বিশেষ করে Streptococcal throat infection শিশু ও কিশোরদের মধ্যে Guttate Psoriasis শুরু করতে পারে।

৪. ত্বকে আঘাত (Koebner Phenomenon)

কাটা, পোড়া, আঁচড়, ট্যাটু, অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো আঘাতের স্থানে নতুন সরিয়াসিসের ক্ষত তৈরি হতে পারে। এটিকে Koebner Phenomenon বলা হয়।

৫. কিছু ওষুধ

কিছু ওষুধ সরিয়াসিস বাড়িয়ে দিতে পারে, যেমন—

  • Lithium
  • Beta-blockers
  • Antimalarial drugs
  • Interferon
  • হঠাৎ করে দীর্ঘদিনের স্টেরয়েড বন্ধ করা

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

৬. ধূমপান ও অ্যালকোহল

ধূমপান এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

৭. স্থূলতা (Obesity)

অতিরিক্ত ওজনের মানুষের মধ্যে সরিয়াসিস বেশি দেখা যায়। একই সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে।

৮. আবহাওয়া

শীতকালে রোগ সাধারণত বেড়ে যায়, কারণ ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বক বেশি শুষ্ক হয়ে পড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে গ্রীষ্মকালে সূর্যালোকের কারণে উপসর্গ কিছুটা কমে যায়।

৯. হরমোনের পরিবর্তন

বয়ঃসন্ধি, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে রোগের তীব্রতা বাড়তে বা কমতে পারে।

১০. অন্যান্য রোগ

সরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নিম্নোক্ত রোগগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি—

  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস
  • হৃদরোগ
  • স্থূলতা
  • ফ্যাটি লিভার
  • মেটাবলিক সিনড্রোম
  • বিষণ্নতা
  • উদ্বেগজনিত সমস্যা

এ কারণে সরিয়াসিসকে শুধু ত্বকের রোগ হিসেবে নয়, বরং একটি Systemic Inflammatory Disease হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

সরিয়াসিস কি ছোঁয়াচে?

না। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়। স্পর্শ, করমর্দন, আলিঙ্গন, একই বিছানা ব্যবহার, একই প্লেটে খাওয়া বা একসঙ্গে বসবাসের মাধ্যমে সরিয়াসিস ছড়ায় না। তাই সরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে দূরে সরিয়ে রাখা বা বৈষম্য করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

সরিয়াসিস সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেকেই মনে করেন সরিয়াসিস একটি ছত্রাকজনিত বা জীবাণুজনিত রোগ। বাস্তবে এটি একটি অটোইমিউন রোগ। আবার অনেকে ভাবেন এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে সরিয়াসিস সম্পূর্ণ নির্মূল করার চিকিৎসা নেই, তবে আধুনিক ওষুধ, ফোটোথেরাপি এবং বায়োলজিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর উপসর্গ দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা যায়।

সরিয়াসিস (Psoriasis)-এর লক্ষণ, প্রকারভেদ, রোগ নির্ণয় ও জটিলতা


সরিয়াসিসের লক্ষণ (Symptoms of Psoriasis)

সরিয়াসিসের লক্ষণ সব রোগীর ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে ছোট ছোট দাগ দেখা যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে শরীরের বড় অংশজুড়ে মোটা প্লাক তৈরি হতে পারে। রোগটি সাধারণত দীর্ঘদিন থাকে এবং মাঝে মাঝে বেড়ে যায় (Flare-up), আবার কিছু সময়ের জন্য কমে যেতে পারে (Remission)।

সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ

  • ত্বকে লালচে উঁচু দাগ (Plaque)
  • দাগের ওপর রূপালি-সাদা আঁশ (Silvery Scale)
  • তীব্র শুষ্কতা
  • চুলকানি
  • জ্বালাপোড়া অনুভূতি
  • ত্বক ফেটে যাওয়া
  • ফাটল থেকে রক্ত পড়া
  • ব্যথা বা অস্বস্তি
  • ত্বক শক্ত হয়ে যাওয়া

শরীরের কোন কোন স্থানে বেশি হয়?

সরিয়াসিস শরীরের যেকোনো স্থানে হতে পারে। তবে নিচের স্থানগুলোতে বেশি দেখা যায়—

  • মাথার ত্বক (Scalp)
  • কনুই
  • হাঁটু
  • কোমর
  • নিতম্ব
  • হাত
  • পা
  • নখ
  • হাতের তালু
  • পায়ের তলা
  • মুখ (কম দেখা যায়)
  • যৌনাঙ্গ
  • কান

মাথায় সরিয়াসিস (Scalp Psoriasis)

মাথার ত্বকে সরিয়াসিস খুবই সাধারণ।

লক্ষণ

  • অতিরিক্ত খুশকির মতো আঁশ
  • মাথায় তীব্র চুলকানি
  • চুলের গোড়ায় মোটা সাদা খোসা
  • মাথার ত্বক লাল হয়ে যাওয়া
  • চুল আঁচড়ানোর সময় রক্তপাত
  • সাময়িকভাবে চুল পড়ে যাওয়া

অনেকেই একে সাধারণ খুশকি ভেবে ভুল করেন। কিন্তু সাধারণ খুশকির তুলনায় স্ক্যাল্প সরিয়াসিসে আঁশ অনেক বেশি মোটা এবং ত্বক লাল হয়ে থাকে।

নখের সরিয়াসিস (Nail Psoriasis)

প্রায় ৫০% রোগীর নখ আক্রান্ত হতে পারে।

লক্ষণ

  • নখে ছোট ছোট গর্ত (Pitting)
  • নখ মোটা হয়ে যাওয়া
  • নখের রং পরিবর্তন
  • নখ ভেঙে যাওয়া
  • নখ বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া (Onycholysis)
  • নখের নিচে ময়লা জমার মতো পরিবর্তন

নখ আক্রান্ত হলে ভবিষ্যতে Psoriatic Arthritis হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়।

Psoriatic Arthritis

প্রায় ২০–৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ত্বকের পাশাপাশি জয়েন্টেও প্রদাহ হতে পারে।

লক্ষণ

  • জয়েন্টে ব্যথা
  • সকালে জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা
  • আঙুল ফুলে যাওয়া
  • হাঁটু ব্যথা
  • গোড়ালিতে ব্যথা
  • কোমরে ব্যথা
  • চলাফেরায় অসুবিধা

সময়মতো চিকিৎসা না করলে স্থায়ী জয়েন্ট বিকৃতি হতে পারে।

সরিয়াসিসের প্রকারভেদ (Types of Psoriasis)

১. Plaque Psoriasis

এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন।

বৈশিষ্ট্য

  • মোটা লাল প্লাক
  • রূপালি সাদা আঁশ
  • কনুই ও হাঁটুতে বেশি
  • দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়

প্রায় ৮০–৯০% রোগী এই ধরনের সরিয়াসিসে আক্রান্ত।

২. Guttate Psoriasis

সাধারণত শিশু ও তরুণদের মধ্যে দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য

  • ছোট ছোট ফোঁটার মতো দাগ
  • শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে
  • Streptococcal গলার সংক্রমণের পর শুরু হতে পারে

৩. Inverse Psoriasis

শরীরের ভাঁজযুক্ত স্থানে দেখা যায়।

আক্রান্ত স্থান

  • বগল
  • কুঁচকি
  • স্তনের নিচে
  • নিতম্বের ভাঁজ

এখানে সাধারণত আঁশ কম থাকে, কিন্তু লালভাব ও প্রদাহ বেশি থাকে।

৪. Pustular Psoriasis

এটি তুলনামূলক বিরল হলেও গুরুতর হতে পারে।

বৈশিষ্ট্য

  • সাদা পুঁজভর্তি ফুসকুড়ি
  • চারপাশে লাল ত্বক
  • জ্বর হতে পারে
  • দুর্বলতা দেখা দিতে পারে

৫. Erythrodermic Psoriasis

এটি সরিয়াসিসের সবচেয়ে গুরুতর ধরন এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

লক্ষণ

  • শরীরের অধিকাংশ অংশ লাল হয়ে যায়
  • প্রচণ্ড চুলকানি
  • তীব্র ব্যথা
  • শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
  • ডিহাইড্রেশন
  • সংক্রমণের ঝুঁকি

এই অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

৬. Nail Psoriasis

শুধুমাত্র নখেও সরিয়াসিস হতে পারে।

৭. Palmoplantar Psoriasis

হাতের তালু ও পায়ের তলায় হয়।

লক্ষণ

  • মোটা চামড়া
  • ব্যথাযুক্ত ফাটল
  • হাঁটতে অসুবিধা
  • কাজ করতে সমস্যা

সরিয়াসিসের তীব্রতা

চিকিৎসকরা সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করেন।

Mild

  • শরীরের ৩% এর কম অংশ আক্রান্ত।

Moderate

  • ৩–১০% অংশ আক্রান্ত।

Severe

  • ১০% এর বেশি অংশ আক্রান্ত অথবা মুখ, হাত, পা কিংবা যৌনাঙ্গ আক্রান্ত।

রোগ নির্ণয় (Diagnosis)

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ রোগীর ইতিহাস এবং ত্বক পরীক্ষা করেই রোগ নির্ণয় করতে পারেন।

রোগীর ইতিহাস

চিকিৎসক সাধারণত জানতে চান—

  • কতদিন ধরে সমস্যা
  • পরিবারের কারও আছে কি না
  • কোন ওষুধ খাচ্ছেন
  • মানসিক চাপ আছে কি না
  • গলা ব্যথার ইতিহাস
  • ধূমপানের অভ্যাস
  • অ্যালকোহল গ্রহণ করেন কি না

শারীরিক পরীক্ষা

চিকিৎসক লক্ষ্য করেন—

  • প্লাকের অবস্থান
  • আঁশের ধরন
  • নখের পরিবর্তন
  • মাথার ত্বক
  • জয়েন্ট আক্রান্ত হয়েছে কি না

Auspitz Sign

সরিয়াসিসে আঁশ আলতো করে তুলে ফেললে নিচে ছোট ছোট রক্তবিন্দু দেখা যেতে পারে।

এটিকে Auspitz Sign বলা হয়।

Koebner Phenomenon

ত্বকে নতুন আঘাতের স্থানে নতুন সরিয়াসিসের ক্ষত তৈরি হওয়াকে Koebner Phenomenon বলা হয়।

এটি সরিয়াসিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

Skin Biopsy

রোগ নির্ণয়ে সন্দেহ থাকলে Skin Biopsy করা হতে পারে।

মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়—

  • Epidermal Hyperplasia
  • Parakeratosis
  • Munro Microabscess
  • Elongated Rete Ridge
  • Dilated Capillaries

কোন রোগের সঙ্গে মিল থাকতে পারে?

সরিয়াসিসকে অনেক সময় নিচের রোগগুলোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়—

  • একজিমা
  • Seborrheic Dermatitis
  • Tinea (দাদ)
  • Lichen Planus
  • Pityriasis Rosea
  • Cutaneous Lupus
  • Chronic Contact Dermatitis

সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সরিয়াসিসের জটিলতা

চিকিৎসা না করলে বা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

Psoriatic Arthritis

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা।

Metabolic Syndrome

  • স্থূলতা
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস
  • উচ্চ কোলেস্টেরল

হৃদরোগ

গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর সরিয়াসিসে আক্রান্ত রোগীদের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি।

মানসিক সমস্যা

অনেক রোগী ভোগেন—

  • আত্মবিশ্বাসের অভাব
  • উদ্বেগ
  • বিষণ্নতা
  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
  • ঘুমের সমস্যা

চোখের সমস্যা

কিছু রোগীর হতে পারে—

  • Uveitis
  • Conjunctivitis
  • Blepharitis

সংক্রমণ

চুলকানোর কারণে ত্বকে ক্ষত তৈরি হলে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হতে পারে।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিম্নোক্ত অবস্থায় দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

  • শরীরের বড় অংশ আক্রান্ত হলে
  • জয়েন্টে ব্যথা শুরু হলে
  • জ্বরের সঙ্গে ত্বক লাল হয়ে গেলে
  • পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা দিলে
  • চোখ আক্রান্ত হলে
  • ওষুধে কাজ না করলে
  • গর্ভাবস্থায় রোগ বেড়ে গেলে
  • শিশু আক্রান্ত হলে

এই পর্যন্ত সারসংক্ষেপ

  • সরিয়াসিসের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো Plaque Psoriasis
  • রোগটি শুধু ত্বক নয়, নখ ও জয়েন্টও আক্রান্ত করতে পারে।
  • এটি সংক্রামক নয়।
  • সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
  • জয়েন্টের ব্যথা বা শরীরের বড় অংশ আক্রান্ত হলে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সরিয়াসিসের চিকিৎসা (Treatment of Psoriasis)

সরিয়াসিসের চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য

বর্তমানে সরিয়াসিস সম্পূর্ণ নিরাময়ের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগকে দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা, উপসর্গ কমানো এবং রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব।

চিকিৎসা নির্ভর করে—

  • রোগের ধরন
  • আক্রান্ত ত্বকের পরিমাণ
  • রোগীর বয়স
  • নখ বা জয়েন্ট আক্রান্ত হয়েছে কি না
  • পূর্বের চিকিৎসার ফলাফল
  • অন্যান্য শারীরিক রোগের উপস্থিতি

সাধারণত চিকিৎসা চার ভাগে বিভক্ত—

  1. Topical Therapy (ত্বকে লাগানোর ওষুধ)
  2. Phototherapy (আলোক চিকিৎসা)
  3. Systemic Therapy (মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশনের ওষুধ)
  4. Biologic Therapy (লক্ষ্যভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসা)

Topical Therapy (ত্বকে লাগানোর চিকিৎসা)

মৃদু ও মাঝারি মাত্রার সরিয়াসিসে Topical Therapy-ই প্রথম পছন্দ।

১. Moisturizer (ময়েশ্চারাইজার)

সব ধরনের সরিয়াসিস রোগীর জন্য নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপকারিতা

  • ত্বকের শুষ্কতা কমায়।
  • চুলকানি কমায়।
  • আঁশ নরম করে।
  • ফাটল কমায়।
  • অন্যান্য ওষুধ ভালোভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।

কী ধরনের ময়েশ্চারাইজার ভালো?

  • Petroleum Jelly
  • Paraffin-based Cream
  • Ceramide Cream
  • Urea Cream (চিকিৎসকের পরামর্শে)
  • Glycerin Cream

ব্যবহারের নিয়ম

  • গোসলের ৩–৫ মিনিটের মধ্যে লাগানো সবচেয়ে ভালো।
  • দিনে অন্তত ২–৩ বার ব্যবহার করুন।
  • শীতকালে আরও বেশি ব্যবহার করুন।

২. Topical Corticosteroid (স্টেরয়েড ক্রিম)

স্টেরয়েড সরিয়াসিসের প্রদাহ কমাতে সবচেয়ে কার্যকর ওষুধগুলোর একটি।

সাধারণ উদাহরণ

  • Hydrocortisone
  • Mometasone
  • Betamethasone
  • Clobetasol Propionate

উপকারিতা

  • লালভাব কমায়।
  • চুলকানি কমায়।
  • প্রদাহ কমায়।
  • প্লাক পাতলা করে।

সতর্কতা

  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার করবেন না।
  • মুখ, কুঁচকি ও বগলে শক্তিশালী স্টেরয়েড ব্যবহার করবেন না।
  • দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ত্বক পাতলা হয়ে যেতে পারে।

৩. Vitamin D Analogues

এগুলো ত্বকের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে পরিচিত ওষুধ—

  • Calcipotriol
  • Calcitriol

এগুলো একা অথবা স্টেরয়েডের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।

সুবিধা

  • দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক নিরাপদ।
  • স্টেরয়েডের প্রয়োজন কমায়।
  • প্লাক কমাতে কার্যকর।

৪. Calcineurin Inhibitors

মুখ, চোখের চারপাশ, যৌনাঙ্গ ও ত্বকের ভাঁজযুক্ত স্থানে স্টেরয়েডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

উদাহরণ

  • Tacrolimus
  • Pimecrolimus

উপকারিতা

  • ত্বক পাতলা করে না।
  • সংবেদনশীল স্থানে নিরাপদ।
  • দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করা যায় (চিকিৎসকের পরামর্শে)।

৫. Salicylic Acid

এটি একটি Keratolytic Agent।

কাজ

  • মোটা আঁশ নরম করে।
  • মৃত কোষ দূর করে।
  • অন্য ওষুধের কার্যকারিতা বাড়ায়।

সতর্কতা

বড় অংশে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা উচিত নয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।

৬. Coal Tar

বর্তমানে তুলনামূলক কম ব্যবহার হলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উপকারী।

উপকারিতা

  • প্রদাহ কমায়।
  • চুলকানি কমায়।
  • কোষের অতিরিক্ত বৃদ্ধি কমায়।

অসুবিধা

  • গন্ধ রয়েছে।
  • কাপড়ে দাগ লাগতে পারে।
  • সূর্যের আলোতে সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে।

Topical Combination Therapy

অনেক সময় চিকিৎসক একাধিক ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করতে বলেন।

যেমন—

  • Calcipotriol + Betamethasone
  • Steroid + Salicylic Acid
  • Steroid + Moisturizer

এতে চিকিৎসার ফলাফল সাধারণত আরও ভালো হয়।

চিকিৎসার সময় যে বিষয়গুলো মানতেই হবে

  • ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না।
  • নিজের ইচ্ছামতো স্টেরয়েড পরিবর্তন করবেন না।
  • নিয়মিত ফলো-আপ করুন।
  • একই সঙ্গে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার চালিয়ে যান।

এই অংশের সারসংক্ষেপ

মৃদু ও মাঝারি সরিয়াসিসের চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো Topical Therapy। ময়েশ্চারাইজার, স্টেরয়েড, Vitamin D Analogues, Calcineurin Inhibitors এবং Salicylic Acid সঠিকভাবে ব্যবহার করলে অধিকাংশ রোগীর উপসর্গ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে সব ওষুধই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।


সরিয়াসিসের আধুনিক চিকিৎসা (Phototherapy, Systemic Therapy ও Biologic Therapy)


Phototherapy (আলোক চিকিৎসা)

যেসব রোগীর শরীরের তুলনামূলক বড় অংশে সরিয়াসিস রয়েছে অথবা শুধুমাত্র ক্রিমে ভালো ফল পাওয়া যায় না, তাদের ক্ষেত্রে Phototherapy একটি কার্যকর চিকিৎসা।

এতে নির্দিষ্ট মাত্রার Ultraviolet (UV) আলো ব্যবহার করা হয়, যা ত্বকের প্রদাহ কমায় এবং অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন ধীর করে।

Phototherapy-এর ধরন

১. Narrowband UVB (NB-UVB)

এটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং নিরাপদ ফোটোথেরাপি।

সুবিধা:

  • Plaque Psoriasis-এ ভালো ফল দেয়।
  • শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায় (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)।
  • দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক নিরাপদ।

২. PUVA Therapy

এতে Psoralen ওষুধের সঙ্গে UVA আলো ব্যবহার করা হয়।

এটি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বর্তমানে সীমিতভাবে ব্যবহৃত হয়।

Systemic Therapy (মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশনের ওষুধ)

যদি শরীরের ১০%-এর বেশি অংশ আক্রান্ত হয়, Psoriatic Arthritis থাকে বা Topical চিকিৎসায় উপকার না হয়, তাহলে Systemic Therapy বিবেচনা করা হয়।

১. Methotrexate

Methotrexate বহু বছর ধরে ব্যবহৃত একটি কার্যকর ওষুধ।

উপকারিতা

  • ত্বকের প্রদাহ কমায়।
  • Psoriatic Arthritis-এও কার্যকর।
  • গুরুতর Plaque Psoriasis-এ ভালো ফল দেয়।

সতর্কতা

  • নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করতে হয়।
  • লিভারের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ জরুরি।
  • গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করা যায় না।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো গ্রহণ করা উচিত নয়।

২. Cyclosporine

দ্রুত রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক সময় ব্যবহার করা হয়।

সুবিধা

  • দ্রুত কাজ শুরু করে।
  • গুরুতর সরিয়াসিসে কার্যকর।

সতর্কতা

  • কিডনির সমস্যা হতে পারে।
  • রক্তচাপ বাড়তে পারে।
  • দীর্ঘদিন ব্যবহার সাধারণত এড়ানো হয়।

৩. Acitretin

এটি একটি Retinoid জাতীয় ওষুধ।

বিশেষ করে—

  • Pustular Psoriasis
  • Palmoplantar Psoriasis

এর ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • গর্ভবতী নারী বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে এই ওষুধ ব্যবহার করা যায় না।
  • ঠোঁট ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।
  • নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

Biologic Therapy (আধুনিক লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা)

যেসব রোগীর গুরুতর সরিয়াসিস রয়েছে এবং প্রচলিত চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ফল পাওয়া যায় না, তাদের ক্ষেত্রে Biologic Therapy ব্যবহার করা হয়।

এই ওষুধগুলো শরীরের নির্দিষ্ট প্রদাহজনক প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে।

Biologic-এর প্রধান শ্রেণি

TNF-alpha Inhibitors

  • Adalimumab
  • Infliximab
  • Etanercept

IL-17 Inhibitors

  • Secukinumab
  • Ixekizumab

IL-23 Inhibitors

  • Guselkumab
  • Risankizumab

IL-12/23 Inhibitor

  • Ustekinumab

সুবিধা

  • গুরুতর রোগে অত্যন্ত কার্যকর।
  • অনেক রোগীর ত্বক প্রায় সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে।
  • Psoriatic Arthritis-এও উপকার করে।

সীমাবদ্ধতা

  • ব্যয়বহুল।
  • চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করতে হয়।
  • চিকিৎসা শুরুর আগে যক্ষ্মা (TB), হেপাটাইটিস বি/সি ইত্যাদির স্ক্রিনিং প্রয়োজন হতে পারে।

Psoriatic Arthritis-এর চিকিৎসা

জয়েন্ট আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে—

  • NSAIDs (ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে)
  • Methotrexate
  • Sulfasalazine
  • Biologic Therapy

চিকিৎসা দেরি হলে স্থায়ী জয়েন্ট ক্ষতি হতে পারে।

ঘরোয়া পরিচর্যা (Home Care)

চিকিৎসার পাশাপাশি দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • প্রতিদিন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
  • খুব গরম পানি দিয়ে গোসল করবেন না।
  • মৃদু সাবান ব্যবহার করুন।
  • ত্বক জোরে ঘষবেন না।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
  • নখ ছোট রাখুন।
  • অতিরিক্ত চুলকানো এড়িয়ে চলুন।

খাদ্যাভ্যাস (Diet)

যদিও কোনো নির্দিষ্ট খাদ্য সরিয়াসিস সম্পূর্ণ ভালো করে না, তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

বেশি খাবেন

  • বিভিন্ন রঙের শাকসবজি
  • তাজা ফল
  • সামুদ্রিক মাছ (ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ)
  • বাদাম
  • অলিভ অয়েল
  • সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার

সীমিত রাখুন

  • অতিরিক্ত চিনি
  • কোমল পানীয়
  • প্রক্রিয়াজাত খাবার
  • অতিরিক্ত লাল মাংস
  • ট্রান্স ফ্যাট

জীবনযাপনে পরিবর্তন

রোগ নিয়ন্ত্রণে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ—

  • ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।
  • অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
  • মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

ফলো-আপ কেন জরুরি?

সরিয়াসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। তাই চিকিৎসা চলাকালে নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক প্রয়োজনে—

  • ওষুধ পরিবর্তন করবেন।
  • পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করবেন।
  • রক্ত পরীক্ষা করাতে বলতে পারেন।
  • রোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন।

সরিয়াসিস প্রতিরোধ, বিশেষ পরিস্থিতিতে করণীয়, মানসিক প্রভাব, উপসংহার ও SEO তথ্য


সরিয়াসিস প্রতিরোধের উপায়

যদিও সরিয়াসিস সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি অটোইমিউন ও বংশগত রোগ, তবে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করলে রোগের প্রকোপ (Flare-up) অনেকাংশে কমানো যায়।

১. ত্বক সবসময় আর্দ্র রাখুন

শুষ্ক ত্বকে সরিয়াসিসের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। তাই—

  • প্রতিদিন ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
  • গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগান।
  • শীতকালে বিশেষ যত্ন নিন।

২. ত্বকে আঘাত এড়িয়ে চলুন

কাটা, পোড়া, আঁচড় বা অতিরিক্ত ঘর্ষণের ফলে নতুন ক্ষত তৈরি হতে পারে (Koebner Phenomenon)।

৩. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সরিয়াসিস বাড়িয়ে দেয়।

উপকারী হতে পারে—

  • নিয়মিত হাঁটা
  • মেডিটেশন
  • প্রার্থনা বা ধ্যান
  • পর্যাপ্ত ঘুম
  • পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো

৪. ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন

ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল রোগের তীব্রতা বাড়ায় এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

স্থূলতা শুধু সরিয়াসিস নয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়।

শিশুদের সরিয়াসিস

শিশুদের ক্ষেত্রেও সরিয়াসিস হতে পারে।

লক্ষণ

  • মাথার ত্বকে আঁশ
  • শরীরে ছোট ছোট লাল দাগ
  • চুলকানি
  • Guttate Psoriasis বেশি দেখা যায়

শিশুদের চিকিৎসা অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।

গর্ভাবস্থায় সরিয়াসিস

গর্ভাবস্থায় অনেক নারীর রোগ কমে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে বেড়েও যেতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

  • নিজে থেকে কোনো ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
  • Methotrexate এবং Acitretin গর্ভাবস্থায় নিষিদ্ধ।
  • গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলেও চিকিৎসককে অবশ্যই জানান।
  • নিরাপদ চিকিৎসা নির্বাচন করতে হবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে।

বয়স্কদের ক্ষেত্রে করণীয়

বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে—

  • অন্যান্য রোগ (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা) বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্বাচন করা হয়।
  • একাধিক ওষুধ গ্রহণের কারণে পারস্পরিক ওষুধের প্রতিক্রিয়া (Drug Interaction) মূল্যায়ন জরুরি।

সরিয়াসিস সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা

ভুল ধারণা ১: সরিয়াসিস ছোঁয়াচে।

সত্য: এটি মোটেও সংক্রামক নয়। স্পর্শ, করমর্দন, আলিঙ্গন বা একসঙ্গে খাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায় না।

ভুল ধারণা ২: এটি শুধুই ত্বকের রোগ।

সত্য: সরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন প্রদাহজনিত রোগ, যা নখ, জয়েন্ট এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও প্রভাবিত করতে পারে।

ভুল ধারণা ৩: ঘরোয়া উপায়েই সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।

সত্য: ঘরোয়া যত্ন উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধই রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি।

ভুল ধারণা ৪: স্টেরয়েড ক্রিম যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত ভালো।

সত্য: দীর্ঘদিন বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্টেরয়েড ব্যবহার করলে ত্বক পাতলা হওয়া, সংক্রমণসহ নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?

নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—

  • শরীরের বড় অংশ আক্রান্ত হলে
  • জয়েন্টে ব্যথা বা ফোলাভাব হলে
  • পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা দিলে
  • জ্বরের সঙ্গে ত্বকের অবস্থা খারাপ হলে
  • গর্ভাবস্থায় রোগ বেড়ে গেলে
  • শিশু আক্রান্ত হলে
  • ওষুধে কোনো উন্নতি না হলে

উপসংহার

সরিয়াসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। এটি সংক্রামক নয় এবং সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ফলো-আপ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে অপ্রয়োজনীয় ভয় ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করা সম্ভব। উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার না করে একজন নিবন্ধিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সর্বোত্তম।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. সরিয়াসিস (Psoriasis) কী?

সরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন ত্বকের রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ত্বকের কোষ দ্রুত বৃদ্ধি করে। ফলে ত্বকে লাল, মোটা এবং সাদা আঁশযুক্ত দাগ (Plaque) তৈরি হয়।

২. সরিয়াসিস কি ছোঁয়াচে?

না। সরিয়াসিস কোনো সংক্রামক রোগ নয়। স্পর্শ, করমর্দন, আলিঙ্গন, একই বিছানা বা একই বাসনপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এটি ছড়ায় না।

৩. সরিয়াসিস কেন হয়?

এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে বংশগত কারণ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক কার্যকলাপ, মানসিক চাপ, সংক্রমণ, ধূমপান, স্থূলতা এবং কিছু ওষুধ সরিয়াসিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৪. সরিয়াসিসের প্রধান লক্ষণ কী?

লালচে উঁচু দাগ, রূপালি-সাদা আঁশ, তীব্র চুলকানি, শুষ্ক ত্বক, ত্বক ফেটে যাওয়া এবং কখনও কখনও জয়েন্টে ব্যথা—এসব সরিয়াসিসের সাধারণ লক্ষণ।

৫. সরিয়াসিস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?

বর্তমানে সরিয়াসিস সম্পূর্ণ নিরাময়ের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আধুনিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে রোগ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

৬. সরিয়াসিসের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা কী?

রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। Topical Cream, Phototherapy, Systemic ওষুধ এবং Biologic Therapy বর্তমানে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি।

৭. সরিয়াসিসে কী খাওয়া উচিত?

ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম এবং পর্যাপ্ত পানি উপকারী। অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উচিত।

৮. মানসিক চাপ কি সরিয়াসিস বাড়ায়?

হ্যাঁ। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সরিয়াসিসের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।

৯. সরিয়াসিস কি শিশুদের হতে পারে?

হ্যাঁ। শিশুদেরও সরিয়াসিস হতে পারে। বিশেষ করে Guttate Psoriasis শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। চিকিৎসা অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।

১০. সরিয়াসিসে কি গোসল করা যাবে?

অবশ্যই। তবে খুব গরম পানি ব্যবহার না করে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করুন এবং গোসলের পরপরই ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

১১. সরিয়াসিস কি জয়েন্টে সমস্যা করতে পারে?

হ্যাঁ। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে Psoriatic Arthritis হতে পারে, যার ফলে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব এবং শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

১২. কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?

যদি শরীরের বড় অংশ আক্রান্ত হয়, জয়েন্টে ব্যথা শুরু হয়, পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা দেয়, জ্বর আসে অথবা ওষুধে কোনো উন্নতি না হয়, তাহলে দ্রুত একজন নিবন্ধিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


সম্পর্কিত নিবন্ধ (Internal Links)

  • https://dr-bashir.blogspot.com/2026/07/
  • httpsdr-bashir.blogspot.comangla.html/
  • https://dr-bashir.blogspot.com/2026/06/
  • httpsdr-bashir.blogspot.comqgoogle-medical-information-safety-guide-bangla.html
  • https://dr-bashir.blogspot.com/2026/06/httopsdr-bashir.blogspot.comtment-bangla.html
  • https://dr-bashir.blogspot.com/2026/06/httpsdr-bashir.blogspot.coma.html
  • https://dr-bashir.blogspot.com/2026/06/httpsdr-bashir.blogspot.coma.html
  • https://dr-bashir.blogspot.com/2026/06/httpsdr-bashir.blogspot.combangladesher-chatro-songothoner-koroniya.html

নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (References)

  1. World Health Organization (WHO)
  2. American Academy of Dermatology (AAD)
  3. National Institute for Health and Care Excellence (NICE)
  4. Mayo Clinic
  5. Fitzpatrick's Dermatology in General Medicine
  6. Rook's Textbook of Dermatology
  7. British Association of Dermatologists (BAD)

লেখক পরিচিতি

ডা. বশির আহাম্মদ
চিকিৎসক | স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক | সাংবাদিক | আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী

তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণভিত্তিক, সহজবোধ্য ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নিয়মিত বিভিন্ন রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে লিখে থাকেন। তাঁর লেখাগুলো আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা ও স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক সূত্রের আলোকে প্রস্তুত করা হয়।

মেডিকেল ডিসক্লেইমার

এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। আপনার বা আপনার পরিবারের কারও সরিয়াসিস বা অন্য কোনো ত্বকের সমস্যা থাকলে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে ওষুধ শুরু, পরিবর্তন বা বন্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।


মন্তব্যসমূহ

Featured Article

ইসলামে সূফীবাদ নামক কুফুরী ভ্রান্তি

মাও: মওদূদীর ভ্রান্ত আকীদা নিয়ে ৮৫ বছর যাবত ভারতবর্ষের আলেমদের বিতর্কের কারন

স্বাধীনতার যুদ্ধে সহায়তার নামে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ লুটের হিসাব

আহলে হাদিসের ভন্ডামীর আদ্যোপান্ত

ঈমান আনায়নের পর প্রথম কাজ মুসলমানদের ভূমি রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর শালী তালাক

জয়বাংলা একটি পাকিস্তানি হাইব্রিড স্লোগান

দেশের জন্য সব হারানো বেগম খালেদা জিয়ার সফল সংগ্রামী জীবন

প্রকৃত বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী নিজামী নয় আওয়ামিলীগ, তাদের বিচার চাই