4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: 2025 > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বাউল নামের ফাউল আর আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিদের পরিত্যাজ্য

 

ইদানীং বাউলদের ফাউল আচরন আর সৃষ্টি কর্তার সাথে বেয়াদবীর সীমা অতিক্রম করেছে। আগের যুগে আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিরা যেরকম আচরন করত সেরকম আচরনই এই বাউলরা করছে। বাউলদের চরিত্র আর জাহেলিয়াতের আমলের কবওূের চরিত্র যেন হুবহু মিল!! আলকোরআনে এসকল ভ্রান্তদের বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছে।

আল্লাহতালা বলেন,

وَ الشُّعَرَآءُ یَتَّبِعُهُمُ الْغَاوٗنَؕ 

আর কবিরা! তাদের পেছনে চলে পথভ্রান্ত যারা।

(আশ-শুআরা, আয়াত: ২২৪)

অর্থাৎ কবি বা বর্তমান বাউলদের সাথে যারা থাকে ও চলাফেরা করে তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যাদেরকে চলাফেরা করতে তোমরা দেখছো তাদের থেকে স্বভাবে-চরিত্রে, চলনে-বলনে, অভ্যাসে-মেজাজে সম্পূর্ণ আলাদা। উভয় দলের ফারাকটা এতই সুস্পষ্ট যে, এক নজর দেখার পর যে কোন ব্যক্তি উভয় দলের কোনটি কেমন তা চিহ্নিত করতে পারে। একদিকে আছে একান্ত ধীর-স্থির ও শান্ত-শিষ্ঠ আচরণ, ভদ্র ও মার্জিত রুচি এবং সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীতি। প্রতিটি কথায় ও কাজে আছে দায়িত্বশীলতার অনুভূতি। আচার-ব্যবহারে মানুষের অধিকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি। লেনদেনে চূড়ান্ত পর্যায়ের আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা।

কথা যখনই বলা হয় শুধুমাত্র কল্যাণ ও ন্যায়ের জন্যই বলা হয়, অকল্যাণ বা অন্যায়ের একটি শব্দও কখনো উচ্চারিত হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, এদেরকে দেখে পরিষ্কার জানা যায়, এদের সামনে রয়েছে একটি উন্নত ও পবিত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের নেশায় এরা রাতদিন সংগ্রাম করে চলছে এবং এদের সমগ্র জীবন একটি উদ্দেশ্যে উৎসর্গীত হয়েছে। অন্যদিকে অবস্থা হচ্ছে এই যে, সেখানে কোথাও প্রেম চর্চা ও শরাব পানের বিষয় আলোচিত হচ্ছে এবং শ্রোতৃবর্গ লাফিয়ে লাফিয়ে তাতে বাহবা দিচ্ছে। কোথাও কোন দেহপশারিণী অথবা কোন পুরনারী বা গৃহ-ললনার সৌন্দর্যের আলোচনা চলছে এবং শ্রোতারা খুব স্বাদ নিয়ে নিয়ে তা শুনছে "কোথাও অশ্লীল কাহিনী বর্ণনা করা হচ্ছে এবং সমগ্র সমাবেশের উপর যৌন কামনার প্রেত চড়াও হয়ে বসেছে। কোথাও মিথ্যা ও ভাঁড়ামির আসর বসেছে এবং সমগ্র মাহফিল ঠাট্টা-তামাশায় মশগুল হয়ে গেছে। কোথাও কারোর দুর্নাম গাওয়া ও নিন্দাবাদ করা হচ্ছে এবং লোকেরা তাতে বেশ মজা পাচ্ছে। কোথাও কারো অযথা প্রশংসা করা হচ্ছে এবং শাবাশ ও বাহবা দিয়ে তাকে আরো উসকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আবার কোথাও কারো বিরুদ্ধে শত্রুতা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং তা শুনে মানুষের মনে আগুন লেগে যাচ্ছে। এসব মজলিসে কবির কবিতা শোনার জন্য যে বিপুল সংখ্যক লোক জমায়েত হয় এবং বড় বড় কবিদের পেছনে যেসব লোক ঘুরে বেড়ায় তাদেরকে দেখে কোন ব্যক্তি একথা অনুভব না করে থাকতে পারে না যে, এরা হচ্ছে নৈতিকতার বন্ধনমুক্ত, আবেগ ও কামনার স্রোতে ভেসে চলা এবং ভোগ ও পাপ-পংকিলতার পূজারী অর্ধ-পাশবিক একটি নরগোষ্ঠি দুনিয়ায় মানুষের যে কোন উন্নত জীবনাদর্শ ও লক্ষ্যও থাকতে পারে এ চিন্তা কখনো এদের মন-মগজ স্পর্শও করতে পারে না।

এ দু'দলের সুস্পষ্ট পার্থক্য ও ফারাক যদি কারো নজরে না পড়ে তাহলে সে অন্ধ।

আর যদি সবকিছু দেখার পরও কোন ব্যক্তি নিছক সত্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ঈমানকে বেমালুম হজম করে একথা বলতে থাকে যে মুহাম্মাদ এবং তাঁর আশেপাশে যারা সমবেত হয়েছে তারা কবি ও কবিদের সাংগোপাংগদের মতো, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তারা মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে নির্লজ্জতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে।


اَلَمْ تَرَ اَنَّهُمْ فِیْ كُلِّ وَادٍ یَّهِیْمُوْنَۙ 

তুমি কি দেখো না তারা উপত্যকায় উপত্যকায় উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়

(আশ-শুআরা, আয়াত: ২২৫)

এখনে তাদের নিজস্ব আজগুবি চিন্তার ও বাকশক্তি ব্যবহার করার কোন একটি নির্ধারিত পথ নেই। বরং চিন্তার পাগলা ঘোড়া বল্লাহারা অশ্বের মতো পথে-বিপথে, মাঠে-ঘাটে সর্বত্র উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ায়। আবেগ, কামনা-বাসনা বা স্বার্থের প্রতিটি নতুন ধারা তাদের কণ্ঠ থেকে একটি নতুন বিষয়ের রূপে আবির্ভূত হয়।

চিন্তা ও বর্ণনা করার সময় এগুলো সত্য ও ন্যায়সঙ্গত কিনা সেদিকে দৃষ্টি রাখার কোন প্রয়োজনই অনুভব করা হয় না। কখনো একটি তরংগ জাগে, তখন তার স্বপক্ষে জ্ঞান ও নীতিকথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে দেয়া হয়। আবার কখনো দ্বিতীয় তরংগ জাগে, সেই একই কণ্ঠ থেকে এবার একেবারেই পুতিগন্ধময় নীচ, হীন ও নিম্নমুখী আবেগ উৎসারিত হতে থাকে। কখনো কারোর প্রতি সন্তুষ্ট হলে তাকে আকাশে চড়িয়ে দেয়া হয় আবার কখনো নারাজ হলে সেই একই ব্যক্তিকেই পাতালের গভীর গর্ভে ঠেলে দেয়া হয়। কোন কুঞ্জুশকে হাতেম এবং কোন পুরুষকে বীর রুস্তম গণ্য করতে তাদের বিবেকে একটুও বাধে না যদি তার সাথে তাদের কোন স্বার্থ জড়িত থাকে। পক্ষান্তরে কেউ যদি তাদেরকে কোন দুঃখ দিয়ে থাকে তার পবিত্র জীবনকে কলঙ্কিত করার এবং তার ইজ্জত-আবরু ধূলায় মিশিয়ে দেবার বরং তার বংশধারার নিন্দা করার ব্যাপারে তারা একটুও লজ্জা অনুভব করে না। আল্লাহ বিশ্বাস ও নাস্তিক্যবাদ, বস্তুবাদিতা ও আধ্যাত্মিকতা, সদাচার ও অসদাচার, পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ও অপবিত্রতা-অপরিচ্ছন্নতা, গাম্ভীর্য ও হাস্য-কৌতুক এবং প্রশংসা ও নিন্দাবাদ সবকিছু একই কবির একই কাব্যে পাশাপাশি দেখা যাবে। কবিদের এ পরিচিত বৈশিষ্ট্য যারা জানে তারা কেমন করে এ  করে এ কুরআনের বাহককে কবিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারে? কারণ তাঁর ভাষণ মাপাজোকা, তাঁর বক্তব্য দ্ব্যর্থহীন, তাঁর পথ একেবারে সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত এবং সত্য, সততা ন্যায় ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করা ছাড়া তাঁর কণ্ঠ থেকে অন্য কোন কথাই বের হয়নি। কুরআন মজীদের অন্য এক জায়গায় নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে, কবিত্বের সাথে তাঁর প্রকৃতি ও মেজাজের আদৌ কোন সম্পর্ক নেইঃ

وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشَّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ

"আমি তাঁকে কবিতা শিখাইনি এবং এটা তাঁর করার মতো কাজও নয়।” (ইয়াসিন, ৬৯)

এটি এমন একটি সত্য ছিল, যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ব্যক্তিগতভাবে জানতেন তাঁরা সবাই একথা জানতেন। নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছেঃ কোন একটি কবিতাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরোপুরি মুখস্থ ছিল না। কথাবার্তার মাঝখানে কোন কবির ভালো কবিতার চরণ তাঁর মুখে এলেও তা অনুপযোগীভাবে পড়ে যেতেন অথবা তার মধ্যে শব্দের হেরফের হয়ে যেতো। হযরত হাসান বাসরী বলেন, একবার ভাষণের মাঝখানে তিনি এক কবিতার চরণ এভাবে পড়লেনঃ

كفى بالاسلام والشيب للمرء ناهيا

হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! চরণটি হবে এ রকম,

كفى الشيب والاسلام للمرء ناهيا

একবার তিনি আব্বাস ইবনে মিরদাস সুলামীকে জিজ্ঞেস করলেন, এ কবিতাটা কি তোমার?

أَتَجْعَلُ نَهْبِي وَنَهْبَ الْعُبَيْدِ وَبَيْنَ وَالْأَقْرَعِ

وعُيَيْنَةَ

আব্বাস বললেন, শেষ বাক্যাংশটি ওভাবে নয়, বরং এভাবে হবে بَيْنَ عُيَيْنَةَ وَالْأَقْرَعِ একথায় রসূলুল্লাহ তো উভয়ের এক। বললেন, কিন্তু অর্থ

হযরত আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞেস করা হয়, নবী কি কখনো নিজের ভাষণের মধ্যে কবিতা ব্যবহার করতেন? তিনি বলেন, কবিতার চেয়ে বেশী তিনি কোন জিনিসকে ঘৃণা করতেন না। তবে কখনো কখনো তিনি বনী কায়েসের কবিতা পড়তেন। কিন্তু প্রথমটা শেষে এবং শেষেরটা প্রথম দিকে পড়ে ফেলতেন। হযরত আবু বকর (রা.) বলতেন, হে আল্লাহর রসূল! এভাবে নয় বরং এভাবে। তখন তিনি বলতেন, "আমি কবি নই এবং কবিতা পাঠ করা আমার কাজ নয়।" আরবের কবিতা অঙ্গনে যে ধরনের বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটেছিল তা ছিল যৌন আবেদন ও অবৈধ প্রেমচর্চা অথবা শরাব পান কিংবা গোত্রীয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও যুদ্ধবিগ্রহ বা বংশীয় ও বর্ণগত অহংকার। কল্যাণ ও সুকৃতির কথার স্থান সেখানে অতি অল্পই ছিল। এছাড়া মিথ্যা, অতিরঞ্জন, অপবাদ, নিন্দাবাদ, অযথা প্রশংসা, আত্মগর্ব, তিরস্কার, দোষারোপ, পরিহাস ও মুশরিকী অশ্লীল পৌরানিকতা তো এ কাব্যধারার শিরায় শিরায় প্রবাহিত ছিল। তাই এ কাব্য সাহিত্য সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রায় ছিলঃ

لأنْ يَمْتَلِئَ جَوْفُ أَحَدِكُمْ قَيْحًا خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمْتَلِى شِعْرًا

"তোমাদের কারো পেট পুঁজে ভরা থাকা কবিতায় ভরা থাকার চেয়ে ভালো। তবুও যে কবিতায় কোন ভালো কথা থাকতো তিনি তার প্রশংসা করতেন। তাঁর উক্তি امن شعره وكفر قلبه :

"তার কবিতা মু'মিন কিন্তু অন্তর কাফের।" একবার একজন সাহাবী একশোটা ভালো ভালো কবিতা তাঁকে শুনান এবং তিনি চলে যেতে থাকলে বলেনঃ هیه অর্থাৎ "আরো শুনাও।"



وَ اَنَّهُمْ یَقُوْلُوْنَ مَا لَا یَفْعَلُوْنَۙ 

এবং এমনসব কথা বলে যা তারা করে না?

(আশ-শুআরা, আয়াত: ২২৬)


এটি হচ্ছে কবি কিংবা বাউলদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। নবী (সা.) সম্পর্কে তাঁর প্রত্যেক পরিচিত জন জানতেন, তিনি যা বলতেন তাই করতেন এবং যা করতেন তাই বলতেন। তাঁর কথা ও কর্মের সামঞ্জস্য এমনই একটি জাজ্বল্যমান সত্য ছিল যা তাঁর আশেপাশের সমাজের কেউ অস্বীকার করতে পারতো না। অথচ সাধারণ কবিদের সম্পর্কে সবাই জানতো যে, তারা বলতেন এক কথা এবং করতেন অন্য কিছু। তাদের কবিতায় দানশীলতার মাহাত্ম এমন উচ্চ কণ্ঠে প্রচারিত হবে যেন মনে হবে তাদের চেয়ে বড় আর কোন দাতা নেই। কিন্তু তাদের কাজ দেখলে বুঝা যাবে তারা বড়ই কৃপণ। বীরত্বের কথা তারা বলবেন কিন্তু নিজেরা হবেন কাপুরুষ। অমুখাপেক্ষিতা, অল্পে তুষ্টি ও আত্মমর্যাদাবোধ হবে তাদের কবিতার বিষয়বস্তু কিন্তু নিজেরা লোেভ, লালসা ও আত্ম বিক্রয়ের শেষ সীমানাও পার হয়ে যাবেন। অন্যের সামান্যতম দুর্বলতাকেও কঠোরভাবে পাকড়াও করবেন কিন্তু নিজেরা চরম দুর্বলতার মধ্যে হাবুডুবু খাবেন।

অতএব ইসলামে এসকল ভ্রান্ত কবি আর বাউলরা পরিত্যাজ্য।

শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫

যে ভাবে আগে থেকেই ভূমিকম্পের আগাম বার্তা পেতে পারেন

 



অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ভূমিকম্প সতর্কতা বা আর্থকোয়েক অ্যালার্ট চালু করার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো। 


এই ফিচারটি গুগল দ্বারা চালিত এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার কাছাকাছি হওয়া ভূমিকম্প সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাঠায়। 


চালু করার ধাপসমূহ:

সেটিংস (Settings) খুলুন: আপনার অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মূল সেটিংস অ্যাপটি খুলুন।


অবস্থান (Location) অপশনে যান: সেটিংস মেনুতে 'Location' বা 'অবস্থান' খুঁজে বের করে ট্যাপ করুন। 


অবস্থান পরিষেবা (Location services) নির্বাচন করুন: 'Location' মেনুতে গিয়ে 'Location services' বা 'অবস্থান পরিষেবা' অপশনটি খুঁজুন। 


ভূমিকম্প সতর্কতা (Earthquake alerts) চালু করুন: 'Location services'-এর অধীনে 'Earthquake alerts' বা 'ভূমিকম্প সতর্কতা' অপশন দেখতে পাবেন।  এটিতে ট্যাপ করুন।


টগল সুইচ অন (ON) করুন: স্ক্রিনের উপরের দিকে থাকা টগল সুইচটি ট্যাপ করে চালু (ON) করে দিন।

সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ বিলীনে নিপীড়নের একাল-সেকাল

 



হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ বিলীনে নিপীড়নের একাল-সেকাল, ইতিহাসের বয়ান!

-------------------------------------------------------


'বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ নিয়ে গবেষণা করা শ্রী নরেশ কুমার মনে করেন, বৌদ্ধবাদের বিরোধিতা ও একইসাথে ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যবাদের পুনর্স্থাপনের জন্যে, ব্রাহ্মণ পুনর্জাগরণীরা তিন ধাপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন।


প্রথম ধাপে তারা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর অত্যাচারের অভিযান শুরু করেন। এরপরে তারা বৌদ্ধ ধর্মের ভালো দিকগুলো আত্মস্থ করে নেয় যাতে করে "নীচু" জাতের বৌদ্ধদের মন জয় করা যায়। কিন্তু বাছাইকৃত আত্মীকরণের এই ধাপে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয় তা নিশ্চিত রাখা হয়। বৌদ্ধবাদ ধ্বংস প্রকল্পের শেষধাপে – 'গৌতম বুদ্ধ হিন্দু বিধাতা বিষ্ণুর আরেকটি অবতার ছাড়া আর কিছুই নন' – এই ধারণা চালু করে তা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে বুদ্ধকে ব্রাহ্মণ্যবাদের সর্বদেবতার মন্দিরের অগুন্তি ঈশ্বরের সামান্য একটিমাত্র-তে পরিণত করা হয়। অবশেষে, বৌদ্ধরা মূলত শুদ্র আর অচ্ছুত হিসেবে জাতপ্রথায় আত্মীকৃত হলেন – আর এভাবেই নিজ জন্মভূমিতেই বৌদ্ধরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগলেন।


নরেশ কুমার বলেন, "বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে চলা এই নির্মূলাভিযানকে বৈধতা দিতে ব্রাহ্মণ্য লেখাগুলোতে বৌদ্ধদের প্রচণ্ডভাবে তিরস্কার করা হয়।

 মনুসংহিতায় মনু বলেন, "কেউ যদি বুদ্ধকে স্পর্শ করে […] তবে সে স্নান করে নিজেকে শুচি-শুদ্ধ করে নেবে।"

 অপরাকা তার গ্রন্থে একই ধরণের আদেশ দেন। ব্রাদ্ধ হরিত ঘোষণা করেন যে বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করাই পাপ, যা কেবল আচারিক স্নানের মাধ্যমে স্খলিত হতে পারে। এমনকি সাধারণ জনগণের জন্যে লেখা নাটিকা কিংবা পুথিগুলোতেও ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা বুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘৃণার অর্গল ছড়িয়েছেন। প্রাচীন নাটিকা 'মৃচ্ছাকথিকা'তে (পর্ব ৭), নায়ক চারুদত্ত এক বৌদ্ধ সন্তকে হেঁটে আসতে দেখে, বন্ধু মৈত্রীয়কে ক্রোধক্তিতে বলেন – 'আহ্‌! কী অশুভ দৃশ্য – এক বৌদ্ধ সন্ত দেখছি আমাদের দিকেই আসছে।''


"ছয় শতকের গোড়ার দিক থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে স্থানীয় রাজাদের উত্থান হতে থাকে এবং স্থানীয় রাজাদের হাতেই বাংলা এবং উত্তর ভারত শাসিত হতে থাকে। সাত শতকের শুরুতে (৬০১ খ্রিস্টাব্দে) পশ্চিম বঙ্গে হিন্দু রাজা শশাঙ্কের আবির্ভাব হয়। তার শাসনকাল ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। শশাঙ্ক ছিলেন চরম বৌদ্ধ বিদ্ধেষী। শশাঙ্কের নিষ্ঠুর অত্যাচারে অনেক বাঙালি বৌদ্ধ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

( R .C. Majumdar, বাংলা দেশের ইতিহাসঃ প্রাচীন যুগ, ১৯৮৮, পৃঃ১২৮।)


রাজা শশাঙ্কের বৌদ্ধনীতি সম্পর্কে রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ‘সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্ত যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের পর্যন্ত যে না হত্যা করিবে, সে প্রাণদন্ডে দণ্ডিত হইবে-রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ। (শ্রীচারু বন্দোপাধ্যায়, রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান, পৃষ্ঠা ১২৪)


'হিউয়েন সাং  শশাঙ্কের কয়েকটি বৌদ্ধ ধর্মবিরোধী কাজকর্মের উদাহরণ তুলে ধরেন,


*কুশীনগর বৌদ্ধবিহার থেকে বৌদ্ধদেরকে তাড়িয়ে সমূলে বৌদ্ধধর্মের বিনাশ ঘটান।


*পাটলিপুত্রে বুদ্ধের পদচিহ্ন অঙ্কিত এক খণ্ড পাথর গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করেন।


*গয়ার বোধিবৃক্ষ (বোধিবৃক্ষঃ যে গাছের নিচে কঠোর  তপস্যার ফলে সিদ্ধার্থ বোধি প্রাপ্ত হন। তাই গাছটি বৌদ্ধদের কাছে পবিত্রতম বলে বিবেচিত ছিল) কেটে মাটি খুঁড়ে এর শিকড়গুলো কেটে ফেলে বাকি যা ছিল সব আগুনে পোড়ান।


*নিকটবর্তী বৌদ্ধ মন্দির থেকে বুদ্ধমূর্তি সরিয়ে সেখানে শিবের মূর্তি প্রতিস্থাপন করেন।'


কুশিনগর বা হার্রাম্বাতে গৌতম বুদ্ধ মারা যান বিধায় এটি বৌদ্ধদের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান। এই নামকরা শহরের চাকচিক্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ব্রাহ্মণরা এই কুৎসা রটায় যে এই শহরে মৃত্যু হলে সে সরাসরি নরকে চলে যাবে কিংবা পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাবে – কিন্তু ব্রাহ্মণীয় পবিত্র নগর কাশিতে মৃত্যু হলে সে সরাসরি স্বর্গে চলে যাবে।"


সবার প্রিয় 'কৌটিল্যে'র বৌদ্ধ ও নিচু বর্ণের হিন্দুদের সম্পর্কে একটি মন্তব্য!


'অর্থশাস্ত্র গ্রন্থের রচয়িতা ব্রাহ্মণ বর্ণের চাণক্য ঘোষণা করেন,

 "যদি কেউ শক্য (বৌদ্ধ), অজিবিকাশ, শুদ্র বা নিষ্ক্রান্ত ব্যক্তিদের ঈশ্বর বা পূর্ব-পুরুষদের পূণ্যার্থে উৎসর্গিত ভোজসভায় যোগদান করে – তবে তার উপর একশ পানা অর্থদণ্ড আরোপিত হবে।"


ওডিশার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরটি মূলত একটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল। পরবর্তীতে হিন্দুরা তা জোরপূর্বক দখল করে নিজেদের ধর্মীয় স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

জগন্নাথ মন্দির বিষয়ে  বিখ্যাত শিল্প ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ স্টেলা ক্র্যামরিশ (Stella Kramrisch) লিখেছেন:

“The image of Jagannath is clearly non-Brahmanic and has Buddhist affinities.”

— Stella Kramrisch, "The Hindu Temple", Volume 2, p. 324।


বিখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর “History and Culture of the Indian People” গ্রন্থে লিখেছেন:

"It is highly probable that the cult of Jagannath is originally a Buddhist one which was gradually assimilated by Hinduism."

— R.C. Majumdar, "History and Culture of the Indian People", Volume 3, p. 505

শুধু দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদই নয়, জগন্নাথ মন্দিরটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

স্বামী বিবেকানন্দ নিজেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর "বাণী ও রচনা" গ্রন্থের ৫ম খণ্ডে (পৃষ্ঠা ১৫৮) লিখেছেন:

 "যাহারা ভারতের ইতিহাস কিছুমাত্র জানেন, তাহাদের নিকট পুর্বোক্ত বিবৃতি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পুস্তকখানি আগাগোড়া প্রতারণা। কারণ জগন্নাথ-মন্দির একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির। আমরা ঐটিকে এবং অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দির করিয়া লইয়াছি।"

— স্বামী বিবেকানন্দ, বাণী ও রচনা ৫/১৫৮।


জগন্নাথ মন্দির দখল স্রেফ কোন স্থাপনা দখল মনে করলে ভুল হবে। এটি নির্দিষ্ট কোন জনপদ হতে পুরোপুরিভাবে বৌদ্ধ নিধনের পর মন্দির পুনর্গঠন এবং দেবতার রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে বৌদ্ধ প্রভাব সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চেষ্টা হয়।


ড.দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, “যে জনপদে (পূর্ববঙ্গ) একর কোটির অধিক বৌদ্ধ এবং ১৫৫০ ঘর ভিক্ষু বাস করিত, সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই। যে পূর্ব ভারত বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান লীলাকেন্দ্র ছিল, তথায় বৌদ্ধ ধর্মের যে অস্তিত্ব ছিল, তাহাও ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক চেষ্টায় অধুনা আবিস্কৃত হইতেছে”। 

(প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা ১‌১-১২)


ড. দীনেশ চন্দ্র সেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন ........

" ....বৌদ্ধগণ এতটা উৎপীড়িত হইয়াছিল যে তাহারা মুসলমানদের পূর্বকৃত শত অত্যাচার ভুলিয়া বিজয়ীগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলন এবং মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয় ভগবানের দানস্বরূপ মনে করিয়াছিল। শূন্যপুরাণের ‘নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক অধ্যায়ে দেখা যায়-তাহারা (বৌদ্ধরা) মুসলমানদিগকে ভগবানের ও নানা দেবদেবীর অবতার মনে করিয়া তাহাদের কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলনে নিতান্ত আনন্দিত হইয়াছিল।….ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে....

(ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৫২৮)


এদেশে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের পুনর্ভ্যুদয়ে বিজিত বৌদ্ধদিগের প্রতি যেরূপ কঠোর নিপীড়ন চলিয়াছিলো, তাহাতে বৈষ্ণবেরা যদি সেই সকল হতভাগ্যের জন্য স্বীয় সমাজের দ্বার উদঘটনা না করিতেন, তবে সেই শ্রেণীর সকলেই মুসলমান হইয়া যাইতো।

 (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-১০)।।


হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ নিপীড়ন ও মন্দির দখল এখনো বন্ধ হয়নি। 


২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ভারতের বিহারের মহাবোধি মন্দির, যেটা বৌদ্ধ দের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী, মহাবোধি মন্দির হলো সেই স্থান যেখানে গৌতম বুদ্ধ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। ২৬০ খ্রিষ্টপূর্বে সম্রাট অশোক বুদ্ধ গয়া সফরের পর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, যা বুদ্ধের আত্মপ্রকাশের প্রায় ২০০ বছর পর।

১৩শ শতাব্দীতে অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এর অবস্থা পাল্টাতে শুরু করে। ১৩শ থেকে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত মন্দিরটি অনেকটা পরিত্যক্ত ছিল। ১৫৯০ সালে এক হিন্দু সাধু মন্দিরে এসে বসবাস করতে শুরু করেন, যেখানে তিনি পূজা-অর্চনা করতেন। পরবর্তীতে সেখানে বুদ্ধ গয়া মন্দির নামে একটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকে মন্দিরটি তাদের উত্তরাধিকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

বিহারের বুদ্ধ গয়া মন্দির ১৯৪৯ সালের একটি রাজ্য আইনের অধীনে গত ৭৬ বছর ধরে একটি ৮ সদস্যের কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কমিটিতে ৪ জন হিন্দু ও ৪ জন বৌদ্ধ সদস্য রয়েছেন। ভারতের সকল ধর্ম নিজ নিজ ধর্মীয় স্থানগুলোর দেখাশোনা ও পরিচালনা করে, তাহলে হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজন কেন একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থানের কমিটিতে যুক্ত হচ্ছেন? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে ও তারা এমন কিছু ধর্মীয় আচরণ ও অনুষ্ঠান করছে যা বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


কলমেঃ 

মঈন উদ্দিন চিশতী,

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

মুসলিম বিজ্ঞানীদের আড়াল করার চক্রান্ত

 



মুসলিম বিজ্ঞানীদের আড়াল করার চক্রান্ত : ল্যাটিন অনুবাদে নাম পরিবর্তন।


স্বর্ণযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীদের সবগুলাে বই ল্যাটিনসহ অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়। তবে অনূদিত গ্রন্থগুলােতে পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের নামও ল্যাটিনে অনুবাদ করা হয়। অন্য যে কোনাে ভাষায় কোনাে লেখকের বই অনুবাদ করার সময় কেবলমাত্র বইয়ের বিষয়বস্তু অনুবাদ করা হয়। কখনাে লেখকের নাম অনুবাদ করা হয়। । লেখকের নাম অনুবাদ করার এমন অদ্ভুত উদাহরণ ইতিহাসে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর সব দেশের কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের নাম অক্ষত রেখে অনুবাদ কর্ম সম্পাদন করা হলেও স্বর্ণযুগের মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের নাম অক্ষত রাখা হয়নি।


ল্যাটিন ভাষায় মুসলিম পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের নাম বিকৃত করার এই হীন প্রচেষ্টা অধ্যাপক সারটনের উক্তিকে সত্য বলে প্রমাণ করছে। 

আরবী গ্রন্থগুলাে ইউরােপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হলেও গ্রন্থকারের ল্যাটিন নাম দেখে বুঝার উপায় নেই যে, তারা মুসলমান। প্রত্যেক মুসলমান গ্রন্থকারের নাম আরবীতে লম্বাচুরা হলেও ল্যাটিন ভাষায় তাদের নাম দেয়া হয়েছে, একটি মাত্র শব্দে। আবার অনেল অনুবাদকারী অনেক বই নিজের নামে ও পান্ডুলিপিটি প্রদানকারীরার নামেও প্রকাশ করে এমনকি ভারত শাসন করার সময় ভারতীয় বিভিন্ন বই জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা ও সম্পদ একই ভাবে ব্রিটিশরা লূট করে। 


নিচে তাদের কাজের মাত্র অল্প কিছু উদাহরণ বুঝার জন্য, 


ইবনে সিনার পুরাে নাম আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় তার নাম ‘আভিসিনা’ (Avicenna)।


বীজগণিতের জনক খাওয়ারিজমির পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মােহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি। ল্যাটিন ভাষায় তার নাম ‘এলগােরিজম’ (Algorism)।


ইবনে বাজ্জাহর পুরাে নাম আবু বকর মােহাম্মদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে আল-সায়িগ। কিন্তু তার ল্যাটিন নাম ‘অ্যাভামপেস (Avempace)।


আল-ফরগানি আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মােহাম্মদ ইবনে কাছির হলাে আলফরগানির পূর্ণ নাম। কিন্তু ল্যাটিনে তার নাম ‘আলফ্রাগানাস’ (Alfraganus)।


পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র অঙ্কনকারী আল-ইদ্রিসীর পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মােহাম্মদ ইবনে মােহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইদ্রিস আল-শরীফ আল-ইদ্রিসী। কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় তিনি ‘দ্রেসেস’ (Dreses) নামে পরিচিত।


শুধু ইবনে সিনা, খাওয়ারিজমি, ইবনে বাজ্জাহ, আল-ফরগানি কিংবা আল-ইদ্রিসী নয়, সব মুসলিম বিজ্ঞানীর প্রতি ল্যাটিন ইউরােপ এ অবিচার করেছে।


মুসলিম বিজ্ঞানীদের শুধু নামের বিকৃতি নয়, খােদ তাদের পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের কারাে কারাে ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, তারা আদৌ মুসলমান নন, জরােস্ত্রীয় অথবা ইহুদী কিংবা ইউরােপীয়। রসায়নের জনক জাবির হাইয়ান এমন এক অপপ্রচারের শিকার। ইউরােপের কোনাে কোনাে ঐতিহাসিক দাবি করছেন, জাবির ইবনে হাইয়ান ছাড়া আরেকজন জাবির ছিলেন। তার নাম ‘জিবার’ এবং এ জিবার হলেন ইউরােপীয় ।


বীজগণিতের জনক আল-খাওয়ারিজমি সম্পর্কেও অনুরূপ কথা বলা হচ্ছে। কোনাে কোনাে ঐতিহাসিক তাকে জরােস্ত্রীয় হিসাবে দাবি করছেন। খাওয়ারিজমির বিপরীতে আরেকজন ‘খাওয়ারিজমি’র অস্তিত্ব আবিষ্কার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে দ্বিতীয় খাওয়ারিজমি হলেন গণিতে প্রথম শূন্য ব্যবহারকারী।


পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়কারী আলফরগানিও ষড়যন্ত্রের শিকার। তার পরিচয় নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি করে বলা হচ্ছে, ফরগানি হলেন দু’জন।


এমনি আরাে কতভাবে বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান অস্বীকার অথবা তাদের অবদানকে খাটো করার হীন চক্রান্ত চালানাে হচ্ছে তার শেষ নেই। অনেক জ্ঞানী ও আলেমদেরকে আটকে রাখা হয়েছিল  এবং হত্যা করে ফেলা হয়েছিল।

 আমরা সবাই একনামে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও ও নিউটনের মতাে ইউরােপীয় বিজ্ঞানীদের চিনি, চিনি না কেবল তাদের গুরু ইবনে বাজ্জাহ, ইবনে রুশদ অথবা নাসিরুদ্দিন তুসিকে। 

এভাবেই অরা ইতিহাসের সেরা প্রতারণা গুলো করে গিয়েছে এবং এখনো করেই চলেছে।

আমরা না চিনলেও ইতিহাস থেকে তারা হারিয়ে যাবেন না। 

বিজ্ঞান যতদিন টিকে থাকবে মুসলিম বিজ্ঞানীরাও ততদিন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন ।


– সাহাদত হোসেন খান

শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

ইসলামি রাষ্ট্রে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে কি?

 


ইসলামি রাষ্ট্রে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে কি? 

নেতৃত্বের অধীনে লক্ষ্য অর্জনে অধীনস্তদের সংগঠিত, প্রভাবিত ও উৎসাহিত করে এবং তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা নিয়ে কর্মতৎত্রতা পরিচালনা করা হয়।

নারী নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ ও সিদ্ধান্তঃ
উল্লেখ্য, কুরআন সুন্নাহে নারী নেতৃত্ব বৈধ বা অবৈধ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ নেই। রসুল সা.-এর যুগে কোনো নারীকে গভর্নর, বিভিন্ন অভিযানে দলনেতা বা বিচারিক নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন বলে প্রমাণিত নয়। খোলাফায়ে রাশিদীনের যুগেও তাই। এজন্য পরবর্তী আলিমগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ করেছেন। 

তাদের মতামতসমূহ প্রধানত ছয় ধরনের:

প্রথম অভিমত: সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব অবৈধ, কারো মতে হারাম।

দ্বিতীয় অভিমত: সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ।

তৃতীয় অভিমত: মজলিশে শুরা ব্যবস্থায় বা যৌথ নেতৃত্বে নারীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বসহ সকল ক্ষেত্রের নেতৃত্ব বৈধ।

চতুর্থ অভিমত: বিশেষ অবস্থা বা প্রেক্ষাপটে নারীর রাষ্ট্রপ্রধানসহ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বৈধ।

পঞ্চম অভিমত: বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ।

ষষ্ঠ অভিমত : গোটা জাতির উপর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ। নিম্নে এসব পর্যালোচনা করা হলো:

প্রথম অভিমত: সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব অবৈধ বরং হারাম (অধিকাংশ আলিম)

অধিকাংশ আলিমের মতে সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব জায়েয নয় তথা বৈধ নয়। কারো কারো মতে এটা হারাম তথা তাদেরকে নেতা নিয়োগ করা হালাল নয়। এসব মতের সমর্থনকারীগণ কয়েক ধরনের দলিল উপস্থাপন করেন। সেগুলো হলো:

ক. আল কুরআন থেকে দলিল

১. আল্লাহর বাণী:"পুরুষগণ নারীদের কাউয়াম (পরিচালক)- এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে একজনকে অপরের উপর বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর পুরুষরা যেহেতু নারীর খরচ বহন করে। সেহেতু পুরুষকে তাদের উপর পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে"।"

তাদের মতে, এ আয়াতে পুরুষদেরকে স্ত্রীলোকদের 'কাউয়াম' কর্তা, পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়ক বলে ঘোষণা করা হয়। সামাজিক নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব তাদেরই।১০ এছাড়া, একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিট হলো পরিবার। আল্লাহ তাআলা যেখানে একটি মাত্র পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব অর্পণ করেননি, কোটি কোটি পরিবার নিয়ে যে রাষ্ট্র- তার দায়িত্বভার ও নেতৃত্বের বোঝা নারীর উপর তিনি কীভাবে চাপাতে পারেন? সুতরাং সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, ইসলামে সামাজিক, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নারীদের জন্য নয়।"

২. আল্লাহর বাণী: 'আর নারীদের উপর পুরুষের এক ধরনের প্রাধান্য রয়েছে'। এ আয়াতে দারাজাত বা প্রাধান্য নেতৃত্বের।

৩. আল্লাহর বাণী:" তোমরা (নারীরা) তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং বিগত কালের চরম জাহেলিয়াতের ন্যায় প্রশাধনী মেখে উন্মুক্তভাবে জনসম্মুখে বাইরে বেরিও না"।

তারা বলেন, নারী তার স্বামীর ঘরে রাণী। ঘর দেখাশোনা, ঘরোয়া কাজের ব্যবস্থাপনা, সন্তানদের লালন-পালন ও সুযোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা প্রভৃতি তার দায়িত্ব। ঘরের বাইরের জীবন সংগ্রাম, চেষ্টা সাধনা ও দৌড়াদৌড়ি থেকে মুক্ত হয়ে নারী তার ঘর সামলাবে, ঘর সংশোধন করবে, জাতির ভবিষ্যতে সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলবে। এটাই তার মূল ও মৌলিক দায়িত্ব। সুতরাং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং দেশ শাসন নারীদের কর্মসীমা বহির্ভূত।"

তাদের মতে সামাজিক, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসনে আসীন হলে নারীকে প্রায় সবসময় বাইরে যেতে ও থাকতে হবে। প্রয়োজনেই কেবল ঘরে আসা সম্ভব হবে। বাধ্য হয়ে আল্লাহর বিধানের উল্টোটাই সে করবে। এতে আল্লাহর পুরো ব্যবস্থাটাই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তাই ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েয নেই।

৪. আল্লাহর বাণী: "আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজের নিষেধ করবে"।

এ আয়াতের প্রেক্ষিতে তাদের বক্তব্য হলো: মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে নামায কায়েমের প্রধান দায়িত্ব সরকার প্রধানের। তিনি নিজে নামাযী হবেন এবং জাতির ইমামতি করবেন। শরিআহতে এটা স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বসম্মত বিধান যে, নামাযে পুরুষদের ইমামতি করা নারীর জন্য জায়েয নেই।"

খ. হাদিস থেকে দলিল প্রমাণ

১. হযরত আবু বাকারাহ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেন, "যে জাতি তাদের বিষয়াদির উপর নারীদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করে, সে জাতি কখনো কল্যাণ পাবে না, সফল ও সার্থক হবে না"।

তাদের মতে, এ হাদিস রাষ্ট্রে নারী নেতৃত্ব জায়েয না হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল। অধিকাংশ আলিম সার্বিক কর্তৃত্ব প্রয়োগে নারী নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাওকানী রহ. বলেন, হাদিসের ভাষ্য মতে তাদের নেতৃত্বে বসানো হালাল নয়, তথা হারাম। কেননা যে বিষয় আবশ্যিকভাবে অকল্যাণ ডেকে আনে তা পরিহার করাও আবশ্যিক (ওয়াজিব)"। তিনি আরো বলেন, "সফলতা বা কল্যাণ তিরোহিত হওয়ার বিষয়টির চেয়ে প্রচণ্ড ধমকি আর কিছু নেই"।

২. জাবির ইবন সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, "সে জাতির কখনো কল্যাণ হবে না, যাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক হলো একজন নারী"।" তবে হাদিসটিতে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী থাকায় এটি দুর্বল বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

৩. আবু বকর রা. বর্ণিত, মহানবি সা. বলেন, 'পুরুষরা ধ্বংস হয়েছে, যখন তারা নারীর আনুগত্য করেছে, পুরুষরা ধ্বংস হয়েছে যখন তারা নারীর আনুগত্য করেছে'। তাদের মতে হাদিসটিতে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হাদিস যাচাইকারী শুআইব আরনাউথ বলেন: হাদিসটির সনদে বাক্কার ইবন আবদিল আযীয (আবু বাকারাহ রা.-এর নাতি) একজন দুর্বল রাবী। এজন্য হাদিসটি দুর্বল। কিন্তু হাকিম স্বীয় 'মুস্তাদরাকে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। ২৪

৪. মহানবি সা. বলেন, বিচারক তিনজন। তন্মধ্যে একজন জান্নাতে, আর দু'জন দোযখে। যিনি জান্নাতে তিনি সেই পুরুষ ব্যক্তি, যে সত্য জানলো এবং সে মোতাবেক ফয়সালা দিল। আর যে পুরুষ সত্য জেনেও ফয়সালায় যুলম করলো সে দোযখে। আর যে পুরুষ অজ্ঞতা সত্ত্বেও ফয়সালা দিল সেও দোযখে"।

শাওকানী উল্লেখ করেন, এ হাদিসে বিচারক হিসেবে বার বার শুধু পূরুষ ব্যক্তি )رح( বলা হয়েছে। তাই এর দ্বারা নারী বিচারক হবে না তাই বুঝানো হয়েছে।

৫. বর্ণিত হাদিস, একদা আবু যর বলেন, হে আল্লাহর রসুল সা.! আপনি আমাকে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব দিবেন কি? তখন তিনি বললেন, হে আবু যর! তুমি দুর্বল। আর ঐ দায়িত্বটি আমানত। এটির হক বা দাবি যারা পুরণ করে এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তারা ব্যতীত অন্যদের জন্য এটি কিয়ামতের দিন অপমান ও অনুসুচনার উপলক্ষ্য হবে"।২৬

তাদের মতে এ হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, দুর্বলদেরকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেয়া যায় না। আর নারীরা শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে দুর্বল।

৬. সাহাবিগণের বক্তব্য: আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. বলেন: "তাদেরকে (নারীদেরকে) সেভাবে পিছনে রাখ, যেভাবে আল্লাহ তাদেরকে পিছনে রেখেছেন"।২৭

আল মাওয়ারদী বলেন: "যেহেতু তাদেরকে পিছনে রাখা ওয়াজিব, সেহেতু তাদেরকে (নেতৃত্ব দিয়ে) আগে বাড়িয়ে দেয়াও হারাম হয়েছে"।

গ. ইজমা থেকে দলিল

কুরআন-সুন্নাহর এসব সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে সর্বযুগে গোটা উম্মাহর অধিকাংশ নারী নেতৃত্বকে নাজায়েয বলেই অভিমত ব্যক্ত করে এসেছেন। এটি হলো ইজমায়ে উম্মাত। ইজমায়ে উম্মাত শরিআহতের একটি অকাট্য দলিল।
ঘ. সৃষ্টিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি

প্রথমত:

তাদের মতে নারী পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত পার্থক্য রয়েছে। তাদেরকে হাদিসে বলা হয়েছে তারা: আকল তথা বুদ্ধিগত স্বল্পতা ও ধর্মপালনে ঘাটতি যুক্ত ناقصات عقل و دین(। তাদের দু'জনের সাক্ষী একজন পুরুষের সাক্ষীর সমান। তারা পূর্ণ মাসের সালাত ও সিয়াম পালন করতে পারে না হায়েযের কারণে।

দ্বিতীয়ত:

সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে ভবিষৎ প্রজন্ম গড়ার তথা সন্তান লালন পালনের কঠিন দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এজন্য তাদের যুক্তি বিদ্যা কম দিয়ে আবেগ মমতা বেশি দেয়া হয়েছে। তারা দ্রুত ভুলে যায়। তারা নেতৃত্বের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে পড়লে মানবসমাজে আদর যত্নে সন্তান লালন পালনের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বিঘ্নিত হবে।

তৃতীয়ত:

তাদের মতে শরিআহর বিধানের আলোকে নারীসমাজ নেতৃত্বের সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়।

এরূপ ক'টি সীমাবদ্ধতা নিম্নরূপ:

১. নারীরা কোনো অবস্থাতেই নামাযে ইমামতি করতে পারবে না।

২. যাঁর উপর জামাআতে নামায পড়া ওয়াজিব নয়।

৩. যিনি কখনো জামাআতে শামিল হলেও সব পুরুষের পেছনেই তাঁকে দাঁড়াতে হয়।

৪. যাঁর প্রতি মাসে হায়েয তথা কিছুদিন এমন অবস্থা হয়, যখন মসজিদে প্রবেশ করা তাঁর জন্য নাজায়েয থাকে।

৫. যাঁর উপর জুমা ফরয নয়।

৬. যাঁর পক্ষে কোনো জানাযার সাথে যাওয়া জায়েয নয়।

৭. কোনো মুহরম সাথে না নিয়ে সফরে যাওয়া যাঁর জন্য নিষেধ। এমনকি মুহরেম না পেলে আমৃত্যু হজ পর্যন্ত করা জায়েয নেই। এ অবস্থায় বদল হজের অসীয়ত করে যেতে হয়।

৮. যাঁর উপর জিহাদ ফরয নয়।

৯. বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে যাওয়া যাঁর জন্য জায়েয নয়।

১০. এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত যিনি পরিবার প্রধান হতে পারেন না। ১

মালেকি মাযহাবের ফকীহ ইবনুল আরাবী বলেন: "নারী এমন নয়, যে মজলিশে বের হতে পারে, পুরুষের সাথে মুক্ত মেলামেশা করতে পারে, একজন সমকক্ষ আরেকজন সমকক্ষের ন্যায় আলোচনা করতে পারে, কারণ সে যদি যুবতী হয়, তার দিকে দৃষ্টি দেয়া, কথা বলা হারাম। তিনি যদি সতী সাধ্বী বৃদ্ধা মহিলাও হন, তিনি তো পুরুষদের সাথে একই মজলিশে একত্রিত হতে পারেন না, ঠেসাঠেসি করে ভীড় জমাতে পারেন না"। 

অবৈধ মতের দাবির পক্ষে দলিলসমূহের পর্যালোচনা:

প্রথমত:

আয়াতে قوامون শব্দটি قوام এর অর্থ রক্ষক। এটা পারিবারিক ক্ষেত্রে। এজন্য ভরণ পোষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুরুষের উপর। পরিবারের বাইরে কোনো নারীর ভরণপোষনের কথা বলা হয়নি।

দ্বিতীয়ত:

ঘরে অবস্থান করার জন্য আল কুরআনের নির্দেশটি রসুল সা.-এর স্ত্রীগণের জন্য নির্দিষ্ট। এ নির্দেশ সার্বিক নয়। এরূপ অনেক বিশেষ নীতিমালা রয়েছে। যেমন আল কুরআনের একই সুরায় এসেছে, সাধারণ নারীগণের ব্যাভিচারে যে শাস্তি হবে মহানবি সা.-এর স্ত্রীগণের সেরূপ ক্ষেত্রে ঐ শাস্তির দ্বিগুণ দিতে হবে।

তৃতীয়ত:

পুরুষকে নেতৃত্বে প্রাধান্য দেয়া মানে নারীকে নেতৃত্ব থেকে একেবারে বঞ্চিত করা নয়।

চতুর্থত:

এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ একমাত্র হযরত আবু বাকারাহ রা. থেকে বর্ণিত। এছাড়া, এ হাদিসের সনদেও ত্রুটি রয়েছে।

পঞ্চমত:

আর আবু বাকারাহ রা.-এর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য প্রদান করা হয় যে, তিনি তায়েফ অভিযানের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, এটি মহানবি সা.-এর সময়কালের শেষ পর্যায়ে। এটি রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত। এর ভাষ্য শরিয়াতের একটি মৌলিক বিষয় সংশ্লিষ্ট। অথচ হাদিসটি ২৫ বছর পর্যন্ত আর কেউ জানতেন না। শুধু আবু বাকারাহ রা. ২৫ বছর পর বললেন।

মাও. আকরম খাঁ বলেন, হাদিসটির ভাষাতে অসংলগ্নতা (ইদতিরাব) রয়েছে।.... ৩৬ হিজরিতে উম্মাহর মাঝে বিবাদের এক ক্রান্তি কালে অনুষ্ঠিত জামাল যুদ্ধে হাজার হাজার সাহাবি রা. অংশগ্রহণ করলেন। তারা কেউই হাদিসটি সম্পর্কে জানলেন না। সেই সময়কার বর্ণিত এবং গোত্রগত প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেওয়াতগুলোর মূল্যমর্যাদা নির্ধারণের সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।৪

কারো মতে, এ হাদিস বর্ণনা দ্বারা হযরত আয়েশা রা.-কে হেয় করাই উদ্দেশ্য। ইবন হাজার আসকালানী উল্লেখ করেন: ইবন বাত্তাল এক সুত্রে মুহাল্লাব থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: "আবু বাকারাহ বর্ণিত হাদিসটি বাহ্যত হযরত আয়েশা রা. যা করলেন সে বিষয়ে তাঁর মতামতকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি ইঙ্গিত করে"।৩৫

কারো মতে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এটি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বর্ণিত। এছাড়া, আবু বাকারাহ রা.-কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে উমর রা. বেত্রাঘাতের দণ্ড আরোপ করেছিলেন। যারা এ দন্ডে দন্ডিত তাদের সাক্ষ্য শরিয়াতে গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপ হাদিসও গ্রহণযোগ্য নয়। এ রূপ অনেক সমালোচনা করা হয়।

কিন্তু এর উত্তরে বলা হয়: হাদিসটি সহিহ বুখারিতে এসেছে, যার উপর গোটা উম্মাহ আলিমগণের অধিকাংশ ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। এছাড়া, সাক্ষ্য দেয়া ও হাদিস বর্ণনা করার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। উম্মাহর অধিকাংশ ফকীহগণ এ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই হাদিসটিকে শাষ বা দুর্লভ বলা ঠিক নয়। এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও প্রচলিত। আর মহানবি সা.-এর সাহাবিগণ বিশ্বস্ত। সম্ভবত এজন্য শায়খ মুহাম্মদ গায্যালি বলেছেন, হাদিসটি সনদ ও মতনের দিক দিয়ে সহিহ। তবে এটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাথে জড়িত। তিনি বলেন: “রসুল সা. সত্য কথাই বলেছেন। এটা ছিল সেখানকার পুরো পরিস্থিতির চিত্রায়ন। সে সময়ের পারস্যে যদি মজলিশে শুরাভিত্তিক ব্যবস্থা থাকতো, আর গোল্ড মাইর নামে ইহুদি নারীর মত শাসক থাকতো যে কিনা ইসরাইল শাসন করেছে, তাহলে সেখানকার পারস্যের বিষয় অন্য রকম মন্তব্য হতো।..." তিনি আরো বলেন: "মহানবি সা. মক্কায় সুরা নামাল মানুষকে পাঠ করে শুনিয়েছেন। সেখানে তাদের কাছে সাবা রাণীর কিস্সাও বর্ণনা করেন, যে নারী স্বীয় প্রজ্ঞা ও প্রখর মেধায় তার জাতিকে সফলতা ও নিরাপত্তার দিকে পরিচালনা করেন। আর এটা অসম্ভব যে, সেখানে সে নবি সা. তাঁর হাদিসে এমন হুকুম দিবেন যা কুরআনের ঐ ওহির বিরোধী হয়!! কোনো জাতি কী ব্যর্থ হয়েছে এ ধরনের উৎকৃষ্ট মানের একজন নারীর নেতৃত্বে"?!

এজন্য বর্তমানে অনেকের মতে সম্ভবত মহানবি সা.-এর উদ্দেশ্য ছিল এটা বুঝানো যে, পারস্যবাসীরা নারীদেরকে নেতা বানিয়েও সফল হবে না। এর ভাষ্য সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বা এটি সার্বিক নয়। এটা মহানবি সা.-এর কোনো নির্দেশ ছিল না যে, 'তোমরা নারীদেরকে নেতা বানাবে না'।

অপরদিকে এসব বক্তব্যও সমালোচিত হয়েছে। বলা হয়, হাদিসটির ভাষ্য সার্বিকভাবে প্রযোজ্য। কেননা শরিআহর মূলনীতি অনুসারে দলিলের ভাষ্য দ্বারা কি বুঝাচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য। বিশেষ العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب) 1 হাদিসে জাতি )قوم(, কর্তৃত্ব )أمر( সাধারণভাবে এসেছে। এটি অনির্দিষ্টজ্ঞাপক )نكرة( শব্দ। এগুলো থেকে প্রমাণিত যে, হাদিসের ভাষ্য বিশেষ ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং সার্বজনীন ও সর্বব্যাপী )عام(।

এ বক্তব্যের পর্যালোচনায় ড. কারযাভী বলেন: এটা ঠিক যে, অধিকাংশ উসূলবিদদের মতে, কোনো বক্তব্যের ভাষ্য বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং সার্বিক'। কিন্তু এ মূলনীতির সাথে সকলে একমত নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. ও ইবন উমর রা. ঘটনার প্রেক্ষাপটের আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়াকে অধিক পছন্দ করতেন। অন্যথায় বিভিন্ন ধরনের ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, বক্তব্য অসংলগ্ন হয়। যেমনিভাবে খারেজীদের হারুরিয়া উপদলসহ আরো কিছু সংখ্যক ব্যক্তি যে সব আয়াত মুশরিকদের বিষয়ে অবতীর্ণ হয়, সেগুলোকে মু'মিনদের উপর আরোপ করে'।

তিনি আরো বলেন, মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ প্রায় একমত যে, উপরোক্ত হাদিসটি নারীকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব তথা আল ইমামাতুল কুবরার পদে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাদিসটি যে প্রেক্ষাপট নিয়ে, সেটা তাই প্রমাণ করে। আর সেটা হয় যদি কোনো নারীকে সমগ্র মুসলমানদের নেতা বা ইমাম বানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ১৯২৪ খ্রি. কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক উসমানী খিলাফতের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার পর সে ধরনের ইমামত বা নেতৃত্ব মুসলিম উম্মাহর মাঝে নেই। অতএব অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। হাদিসের ভাষ্য অনুসারে কোনো নারীকে যদি রাষ্ট্রপ্রধান বা সম্রাজ্ঞী সদৃশ বানিয়ে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই হাদিসটি সকল ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন অঞ্চলে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নারী নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের বিরোধিতায় কেউ কেউ বলেন, বর্তমানে আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহ অতীতের বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনের মতো।০

এ হাদিসের পর্যালোচনায় অনেকে বলেছেন, নারীরা নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে বা সর্ব সময়ে ব্যর্থ এটা ঠিক নয়। তাদের কেউ কেউ কখনো কখনো সফল হতে পারে। এমনকি কুরআনে এরূপ একজন নারী নেত্রীর কথা উল্লেখ আছে। যিনি পরামর্শ ভিত্তিতে কাজ করতেন এবং নিজ প্রজ্ঞায় স্বজাতিকে এক ভয়াবহ যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।১

কারো মতে হাদিসটি উপদেশমূলক। এটি হুকুমমূলক নয়। অন্যথায় নারীনেতৃত্ব অবৈধ হলে মহানবি সা. মুসলমানদের জন্য করণীয় হিসেবে আরো সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে হুকুম বলে দিতেন।

একইভাবে হযরত জাবির ইবন সামুরাহ রা.-এর বর্ণনাটির সনদে হায়ছামীর মতে একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। সেহেতু এটি দুর্বল হাদিস।

ষষ্ঠত:

সকল নারী দুর্বল এ কথাটি কোনো হাদিসে সরাসরি বা স্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই। তাই অন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তির সাথে কিয়াস বা তুলনা করে সিদ্ধান্ত দেয়া সঠিক হবে না।

সপ্তমত:

অবৈধতার উপর ইজমা হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়, তাও সঠিক নয়। তাহলে মতবিরোধ হলো কী করে? অতীতে অনেক আলিম বৈধতার পক্ষেও ছিলেন। 

অষ্টমত:

নারীরা কোনো অবস্থাতেই সালাতে ইমামতি করতে পারবে না এ কথাটি সঠিক নয়। উম্মে ওয়ারাকাহ বিনতি নাওফাল রা.-কে তার ঘরে সালাতে ইমামতির জন্য মহানবি সা. অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, সেখানে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি আযান দিত। রসুল সা. যুগেও আয়েশা রা. ও উম্মে সালামাহ রা. মহিলাদের নিয়ে ঘরে জামাতে সালাতে ইমামতি করেছেন। তবে সামনে না গিয়ে কাতারের ভিতরে থেকেছেন। মহানবি সা. নিজেও তা দেখেছেন ও অনুমোদন দিয়েছেন। 

নবমত:

হযরত আয়েশা রা. উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্গত মুজতাহিদ সাহাবি। তিনি জামাল যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে ঘর থেকে বের হয়েছেন। কেউ হিজাব অবলম্বন করে বের হলে আল কুরআনের দৃষ্টিতে দোষণীয় নয়। দলবদ্ধ হয়ে বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিমানে নারীদের মাহরিম ছাড়া একা হজসহ অন্যান্য উদ্দেশ্যে বের হওয়া বা ভ্রমণকে অনেক আলিম বৈধ বলেছেন। সমাজের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতে পারে। রসুল সা. অন্য হাদিসে নারীদের নিরাপদ একাকী ভ্রমণের ভবিষৎ বাণী দিয়েছেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, মহানবি সা. আদী ইবন হাতিম রা.-এর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: 'হে আদী! তোমার জীবন যদি দীর্ঘ হয়, তা হলে তুমি অবশ্যই দেখবে হীরাত থেকে হাওদাজে মহিলা সফর করবে আর এভাবে কাবায় এসে তাওয়াফ করবে, রাস্তায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না'। 

এজন্য তাবেঈ হাসান বাসরী, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ (এক বর্ণনায়), ইমাম গাযযালি, মাওয়াদী, ইবন তাইমিয়াসহ অনেক আলিম মাহরিম ব্যতীত নারীর হজে বা সফর বৈধ বলেছেন অন্যান্য একাধিক বিশ্বস্ত নারীদের সাথে বের হওয়া বা নিরাপত্তা বিধানের শর্তে। এক হাদিসে এক দিনের বা এক রাত্রের সফরের ভ্রমণে মাহরিম থাকার কথা বলা হয়। অন্য বর্ণনায় দুই বা তিন দিনের কথাও আছে। ৪৯

আজকে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিমানে মক্কা বা একটি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কয়েক ঘন্টা প্রয়োজন। পূর্ণ দিবসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে নারী নেতৃত্ব বৈধ মনে করার পথে বাধা থাকে না।

দশমত:

নারীকে প্রধানত ঘরে অবস্থান করতে বলা হয় পারিবারিক দায়িত্ব বিশেষত সন্তান-সন্ততি লালন পালনে অধিক গুরুত্ব দেয়ার জন্য। যাদের সন্তান সাবালক হয়ে গেছে, নিজের কাজ নিজে করতে সক্ষম, সেই সব নারীর ক্ষেত্রে উক্ত নির্দেশ প্রযোজ্য নয়।

দ্বিতীয় অভিমত: সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ:

অতীতে ফকীহগণের মধ্যে কেউ কেউ সাধারণভাবে নারী নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বকে সঠিক বা সহিহ বলেছেন:

হানাফি ফকীহ ইবন নুজাইম (৯২৬হি ৯৭০হি.) বলেন "সে নারীর সালতানাত সহিহ তথা সঠিক। মিসরের সালতানাতে এক নারী অধিষ্ঠিত হয়েছিল। যার নাম শাজারাতুর দুরা। যিনি ছিলেন বাদশা সালিহ ইবন আইয়্যুব এর দাসী"। পরবর্তীতে বধূ।

ইবন জারীর তাবারীও সকল ক্ষেত্রে নারীর শাসন বা হুকুমতকে বৈধ বলেছেন। ইবন রুশদ বলেন: "তাবারী বলেন, 'প্রত্যেক ক্ষেত্রে বা সকল বিষয়ে নারী হাকিম (সিদ্ধান্ত প্রদান কারী) বা শাসক হওয়া বৈধ"। 

আধুনিককালে কিছু আলিম ও আধুনিকতাবাদী মুসলিম বুদ্ধিজীবিদের মতে রাষ্ট্র প্রধান হওয়া (ইমামত) সহ সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ। মিসরের শায়খ মুহাম্মদ আল গায্যালি সহ আরো অনেক আলিম এ মত পোষণ করেন। শায়খ মুহাম্মদ আল গায্যালি আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার নারীদের দিকে ইশারা করে বলেন: "তারা (আমেরিকা অস্ট্রেলিয়াবাসীরা) যদি সম্মত হয় যে, নারীদেরকে শাসক অথবা বিচারক কিংবা মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূত হোক, তারা যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। আর আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আর সেটা হলো নারীর এ সমস্ত পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বৈধ"।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গীয় অঞ্চলে মাও. আকরম খাঁ ইসলামের খিলাফতের বিধান মতে নারী পুরুষ উভয়ে যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে সৃষ্টিগত দিক দিয়ে নারীরা মাতৃত্বের স্বরূপে এবং পুরুষরা আল্লাহর হুকুমত পরিচালন ও সংরক্ষণে সক্ষম। উভয়ের সৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কখনো এর তারতম্য তথা ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা যায় না। কুরআন সুন্নাহেও এরূপ তারতম্য না হওয়ার পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। লাহোরের প্রফেসর রফীউল্লাহ শিহাব, জাভীদ জামাল দাসকাভী সহ আরো অনেকে।

এমত পোষণকারীগণও কয়েক ধরনের দলিল পেশ করেন। যেমন:

১. আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আ'মলকারীর আ'মল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ"।৫৭

এতে বুঝা যাচ্ছে, কাজে কর্মে নারী পুরুষের সমঅধিকার। তাই নারীরাও পূরুষের মত নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার রয়েছে।

২. আল্লাহর বাণী: "তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের খিলাফত প্রদান করবেন"।

তাদের মতে এখানে খিলাফত লাভের যোগ্যতার জন্য দুটি শর্ত করা হয়, তা হলো: ইমান ও আমাল সালিহ বা নেক কাজ। এখানে নারী পুরুষ পার্থক্য করা হয়নি।

৩. আল্লাহর বাণী: "আর মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা একে অপরের সহযোগী বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজে নিষেধ করে, আর সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে"।"

এ আয়াতে মু'মিনদেরকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা হয়নি। আর নেতৃত্বও একটি রাজনৈতিক তৎপরতা। এখানে নারী পুরুষ সমান।৬০

৪. সাবা সম্রাজ্ঞীর প্রজ্ঞার প্রশংসা: ইয়ামানে প্রাচীনকালে সোলায়মান আ.-এর সমসাময়িক সাবা অঞ্চলে এক প্রতাপশালী নারী শাসন করেছেন। আল কুরআনে বর্ণিত, সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ বলে: 'আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন'। 

তৎকালীন আল কুদস নগরীতে ইসরাইল রাষ্ট্রনায়ক সোলায়মান আ. এ নারীকে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। এ বিষয়ে দম্ভ প্রদর্শন না করার জন্য সতর্ক করেন। তখন এ সম্রাজ্ঞী কিছু খোজ খবর নিয়ে নিজ সভাসদকে ডেকে চিঠির কথা বলেন এবং পরামর্শ নিলেন। তারা রাষ্ট্রদূত হোক, তারা যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। আর আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আর সেটা হলো নারীর এ সমস্ত পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বৈধ"।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গীয় অঞ্চলে মাও. আকরম খাঁ ইসলামের খিলাফতের বিধান মতে নারী পুরুষ উভয়ে যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে সৃষ্টিগত দিক দিয়ে নারীরা মাতৃত্বের স্বরূপে এবং পুরুষরা আল্লাহর হুকুমত পরিচালন ও সংরক্ষণে সক্ষম। উভয়ের সৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কখনো এর তারতম্য তথা ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা যায় না। কুরআন সুন্নাহেও এরূপ তারতম্য না হওয়ার পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। লাহোরের প্রফেসর রফীউল্লাহ শিহাব, জাভীদ জামাল দাসকাভী সহ আরো অনেকে।

এমত পোষণকারীগণও কয়েক ধরনের দলিল পেশ করেন। যেমন:

১. আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আ'মলকারীর আ'মল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ"।৫৭

এতে বুঝা যাচ্ছে, কাজে কর্মে নারী পুরুষের সমঅধিকার। তাই নারীরাও পূরুষের মত নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার রয়েছে।

২. আল্লাহর বাণী: "তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের খিলাফত প্রদান করবেন"।

তাদের মতে এখানে খিলাফত লাভের যোগ্যতার জন্য দুটি শর্ত করা হয়, তা হলো: ইমান ও আমাল সালিহ বা নেক কাজ। এখানে নারী পুরুষ পার্থক্য করা হয়নি।

৩. আল্লাহর বাণী: "আর মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা একে অপরের সহযোগী বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজে নিষেধ করে, আর সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে"।"

এ আয়াতে মু'মিনদেরকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা হয়নি। আর নেতৃত্বও একটি রাজনৈতিক তৎপরতা। এখানে নারী পুরুষ সমান।

৪. সাবা সম্রাজ্ঞীর প্রজ্ঞার প্রশংসা: ইয়ামানে প্রাচীনকালে সোলায়মান আ.-এর সমসাময়িক সাবা অঞ্চলে এক প্রতাপশালী নারী শাসন করেছেন। আল কুরআনে বর্ণিত, সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ বলে: 'আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন'। 

তৎকালীন আল কুদস নগরীতে ইসরাইল রাষ্ট্রনায়ক সোলায়মান আ. এ নারীকে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। এ বিষয়ে দম্ভ প্রদর্শন না করার জন্য সতর্ক করেন। তখন এ সম্রাজ্ঞী কিছু খোজ খবর নিয়ে নিজ সভাসদকে ডেকে চিঠির কথা বলেন এবং পরামর্শ নিলেন। তারা বলল, আমরা শক্তিশালী। অস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিরোধ করব। তবে সর্বময় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আপনার। কিন্তু সম্রাজ্ঞী দ্বিমত করে বললেন, শক্তিশালী রাজারা কোনো এলাকায় প্রবেশ করলে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের অপদস্ত করে। তখন তিনি উপটৌকন পাঠিয়ে তাকে অধিকতর পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সোলায়মান আ. তার আনুগত্য না মেনে উপটৌকন পাঠানোকে পছন্দ করেননি। ফলে যুদ্ধের হুমকি দেন। এতে সম্রাজ্ঞী সশরীরে সোলায়মান আ.-এর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর অধীনস্ততা মেনে নিয়ে তার সাথে সন্ধি করে গোটা সাবা জাতিকে ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেন। এসব কাজে এ সম্রাজ্ঞীর অনন্য প্রজ্ঞার কথা ফুটে উঠেছে। সোলায়মান আ. তাকে অপসারণ করেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই।

এভাবে আল কুরআনেও তার প্রজ্ঞাপূর্ণ, দূরদর্শী ও পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছে। উপরোক্ত মতানুসারীগণ বলেন, এতে বুঝা যায়, নারী নেতৃত্ব অবৈধ নয়। ৩৬৩

তবে এ যুক্তিটিও সমালোচিত হয়েছে। আল্লামা আলুসী বলেন: "এ আয়াতে এমন কিছু নেই যা প্রমাণ করে যে, নারী সম্রাজ্ঞী হওয়া জায়েয। আর কাফির জাতির কোনো কাজের দ্বারা উক্ত মতের পক্ষে কোনো দলিল হয় না"। 

আলুসীর এ কথা দ্বারা বুঝা যায়, তার সময়েও আয়াতটি নারী সাম্রাজ্ঞী হওয়ার বৈধতার পক্ষে দলিল হিসেবে কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন।

মোটকথা, যেহেতু আল কুরআনে ঐ নারীর কথা এসেছে এবং তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গণতান্ত্রিকতা তুলে ধরে প্রশংসা করা হয়েছে এবং একইভাবে নবি সোলায়মান আ. ঐ মহিলার শাসন স্থিতাবস্থায় রেখেছেন, সেহেতু এটাকে নারী নেতৃত্বের পক্ষে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা অমূলক নয়। তবে নেতৃত্বটি কোন পর্যায়ের ছিল, সেটা বিবেচ্য। কারণ ঐ নারী সোলায়মান আ.-এর বশ্যতা স্বীকার করা এবং পরবর্তীতে তাঁর সাম্রাজ্যের অধীনে থেকে শাসন চালানোর দ্বারা সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করেননি। পরবর্তীতে সে নারীর ক্ষমতা বা নেতৃত্ব ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক।

৫. মুনাফিক নারীরা সংঘবদ্ধভাবে সমাজবিরোধী কাজ করবে, আর মু'মিন নারীরা নিরবে শুধু দেখবে তা সঠিক নয়। ইরশাদ হয়েছে, "মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা একে অপরের অংশ, তারা মন্দ কাজের আদেশ দেয়, আর ভাল কাজ থেকে নিষেধ করে"।

৬. খোলাফায়ে রাশিদীনের যুগ: উমর রা. শিফা নামে এক মহিলাকে বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দিয়ে ছিলেন। তার এ কর্তৃত্ব সার্বজনীন ছিল। নারী পুরুষ সকলের উপর এ মহিলা কর্তৃত্ব করেছেন।

৭. উষ্ট্র যুদ্ধে হযরত আয়েশা রা.-এর নেতৃত্ব: তিনি মুসলমানদের তৃতীয় খলিফা উসমান রা.-এর হত্যার বিচারের দাবিতে মক্কা থেকে সাহাবি ও তাবেঈগণকে সংগঠিত করেন ও তাদের সামনে বক্তব্য প্রদান করেন। এমনকি বিভিন্ন গোত্র প্রদানদের নিকট চিঠি দিয়েও তাদেরকে প্রভাবিত ও একত্রিত করেন। ফলে আলি রা.-এর অনুসারীদের সাথে ৩৬ হিজরি/ ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় অনুষ্ঠিত হয় জামাল বা উষ্ট্র যুদ্ধ।

তিনি আলি রা. তাঁর সাথে পত্র বিনিময় করে শেষ পর্যায়ে উভয়ে সন্ধির প্রস্তাবে একমত হন। তবে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু মুনাফিকের চক্রান্তে উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের দ্বারা ভোর বেলায় হঠাৎ আক্রমণে কিছু লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আয়েশা রা. পর্দায় থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে হযরত আলি রা.-এর দ্রুত পদক্ষেপে ও আয়েশা রা.-এর মদিনায় ফিরে যাওয়ার শর্তে যুদ্ধ প্রশমিত হয়। যাহোক, জামাল যুদ্ধে আয়েশা রা.-এর সাথে ত্রিশ হাজার সৈন্য সমাবেশ ঘটে। যাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন সাহাবি, অন্যরা ন্যূনতম পক্ষে তাবেঈ। তিনি তাদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তাঁর সামষ্টিক নেতৃত্ব, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব সবই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। এসব পদক্ষেপে তাঁর সাথে অংশগ্রহণকারী এ বিশাল সংখ্যক সাহাবি ও তাবেঈন কোনো আপত্তি করেছেন বলে প্রমাণ নেই। এসব প্রমাণ করে নারী নেতৃত্ব বৈধ।

এ দলিলের পর্যালোচনায় বলা হয়, হযরত আয়েশা রা.-এর নেতৃত্ব একচ্ছত্র ছিল না। তাঁর সহযোগী ছিল হযরত যুবায়ের রা. ও তালহা রা.। তাছাড়া, এ নেতৃত্ব ছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে। কারণ ঐ ঘটনার পর তিনি নেতৃত্ব প্রদানমূলক আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

৮. ঐতিহাসিক প্রমাণ: ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক মুসলিম নারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তারা সরকার প্রধান বা কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। তারা ইতিহাসের ক্রান্তি লগ্নে জাতির নেতৃত্বের হাল ধরে তাদের জাতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন ও জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখেন। তন্মধ্যে: খারেজীদের হারুরী শাবীবাহ উপদল নেতা হিসেবে গাযালাহ (মৃ.৭৭হি./৬৯৬ খ্রি.) নেতৃত্ব, মিসরের ফাতেমী শাসনামলে সিতুল মুলুক (৯৭০-১০২৩ খ্রি.), হিন্দুস্থানের সুলতানা রাজিয়া বিনতে সুলতান ইলতুৎমিশ (৬৩৪-৬৩৭হি./ ১২৩৬-১২৪০ খ্রি.), মিসরের শাজারাতুদ দুররা (১২৪৯-১২৫০ খ্রি.), ভুপালের রাণী সেকান্দর বেগম (১৮১৬-১৮৬৮ খ্রি.), পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনযীর ভুট্টো (১৯৮৮-১৯৯০ খ্রি., ১৯৯৩-১৯৯৬ খ্রি.), বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ২০০১-২০০৬ খ্রি.) এবং সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১ খ্রি., ২০০৯ বর্তমান), তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থানসো সিলার (১৯৯৩-১৯৯৬খি.), ইন্দোনেশিয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকার্ণ পুত্রী (২০০১-২০০৪ খ্রি.), সেনেগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মামে মেডিউর বুয়ে (২০০২-২০০২ খ্রি.), প্রমুখ। এসব প্রমাণ করে মুসলিম সমাজে নারীরাও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। আলিমগণ কেউই এসব ঐতিহাসিক মুসলিম নারী নেত্রীদের নেতৃত্বের বিরোধিতা করেননি। তাই এটা প্রমাণ করে নারী নেতৃত্বের দাবিটি বাস্তবসম্মত।

৯. শরিআহর আইন প্রণয়নে মূলনীতি হলো: সাধারণভাবে মূলত সবকিছু বৈধ, যদি শরিআহ কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত না হয়। তাই কুরআন হাদিসে কোথাও নারী নেতৃত্ব নিষেধ নেই। সেখানে বলা নেই যে, নারীদেরকে নেতৃত্ব দিবে না বা নেতা বানাবে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই নারী নেতৃত্ব বৈধ।

ক. নারীগণও সমাজের অংশ। এটি পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতা প্রসূত নেতৃত্ব সৃষ্টি হতে পারে। তাদের বংশানুক্রমিক প্রভাবও থাকতে পারে। যা নেতৃত্ব অর্জন ও প্রয়োগে প্রভাব বিস্তার করে। তাই তারা সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

খ. নারীরা সৎ ও মেধাবী হতে পারে।

গ. নিষেধ এসেছে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব চর্চার ক্ষেত্রে। কিন্তু শুধু এ ক্ষেত্রে সীমিত নয়।

ঘ. বর্তমানে প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামষ্টিক নেতৃত্ব কার্যকর। এ ধরনের নেতৃত্ব হলে যেকোনো পর্যায়ের নেতৃত্বে নারী আসতে সক্ষম।

ঙ. সার্বিক নেতৃত্বে পুরুষদেরকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই নয় যে, নারীদেরকে বঞ্চিত করা। যোগ্যতা থাকলে নারীরাও নেতৃত্বের অধিকারী হতে পারে।

তৃতীয় অভিমত: মজলিশে শুরা ব্যবস্থায় বা যৌথ নেতৃত্বে রাষ্ট্রপ্রধানের পদসহ নারীর সকল ধরনের নেতৃত্ব বৈধ

রসুল সা.-এর বাণী: কোনো যদি জাতি কখনো সফল হবে না যদি তারা নারীকে তাদের কর্তৃত্বে বসায়। এ হাদিসের হুকুম সম্পর্কে মাও. আশরাফ আলি থানভী রহ. (মৃ. ১৩৬২ হি.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি তখন ফাতওয়া দিতে গিয়ে বলেন: শাসন করার বিষয়টি তিন ধরনের:

এক. যেখানে কর্তৃত্ব পূর্ণ ও সার্বিক সার্বজনীন। যেখানে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, তার উপরে অন্য কেউ ক্ষমতাধর নেই। তার ক্ষমতা সর্বোচ্চ। সেটা কোনো নির্দিষ্ট দল বা অঞ্চলের সাথে নির্ধারিত নয়। যেমন: রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষমতা। যিনি এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ইখতিয়ার রাখেন।

দুই, যেখানে কারো পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করেন, তবে সেটা সার্বজনীন নয়। যেমন: নির্দিষ্ট একটি দলের প্রধান হওয়া।

তিন, যেখানে কারো এককভাবে পূর্ণ ও সার্বজনীন ক্ষমতা হয় না। যেমন গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতা। যেখানে শাসক মূলত মজলিশে শুরা তথা পরামর্শ কমিটির একজন সদস্য রূপে অবস্থান করেন। সেখানে মজলিশে শুরাই শাসক।

প্রথম ধরনের ব্যবস্থায় নারী শাসক হওয়া জায়েয নয়। অবশিষ্ট দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনের ব্যবস্থায় একজন নারী প্রশাসক হওয়া জায়েয। আর এটাই আবু বাকারাহ বর্ণিত উপরোক্ত হাদিসের ভাষ্য। 

চতুর্থ অভিমত: বিশেষ অবস্থা বা প্রেক্ষাপটে নারীর রাষ্ট্রপ্রধান সহ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বৈধ

সৈয়দ আবুল আলাসহ বেশ কিছু আলেমের মতে যদি প্রেক্ষাপট এমন হয়, যেখানে নারীর চেয়ে অধিক প্রভাবশালী যোগ্যতর পুরুষ নেতা না থাকা বা নারী নেতৃত্বের বিকল্প না থাকা (সৈয়দ আবুল আলা)। ১৯৬৪ খ্রি. পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়্যুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকে সৈয়দ আবুল আলাসহ অনেক আলিম সমর্থন করেছিলেন। তারা চেয়ে ছিলেন, যেকোনো উপায়ে আইয়্যুবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। সৈয়দ আবুল আলা বলেন, এ পরিস্থিতিতে নারী নেতৃত্ব বৈধ হওয়াতে কোনো বাধা নেই। ২

পঞ্চম অভিমত: বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ

অনেক আলিমের মতে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ। যেমন:

ক. বিচারিক কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে: মুসলিম ফকীহগণের অধিকাংশের মতে বিচারিক কাজে নারীদের নিয়োগ বৈধ নয়। তবে অনেকের মতে নারীদের বিচারিক কাজ বৈধ। এমতটি হলো হাসান আল বাসরী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক (এক বর্ণনায়), মালেকি মাযহাবের ইমাম ইবনুল কাসিম, ৪ ইমাম ইবন জারীর তাবারী, ইমাম ইবন হাযাম প্রমুখের। তবে ইমাম আবু হানিফার মতে যেসব ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য বৈধ, সেসব তাদের বিচার কাজও বৈধ। যেমন: ব্যবসায়িক লেনদেন, পারিবারিক আদালতে ইত্যাদি।

অনেকে বর্ণনা করেন যে, ইবন জারীর তাবারীর মতে সার্বিক ক্ষেত্রে নারী বিচারক হতে পারে এবং হওয়া বৈধ। 

মালেকি মাযহাবের ফকীহ ইবন রুশদ উল্লেখ করেন: "তাবারী বলেন: প্রতিটি ক্ষেত্রে সাধারণভাবেই একজন নারী হাকিম (বিচারক) হওয়া জায়েয"। 

মালেকি মাযহাবের ফকীহ ও ব্যাখ্যাকার ইবন আবী মারয়াম এর বর্ণনা মতে ইমাম ইবনুল কাসিম আল মালেকি মনে করতেন, সার্বিক ক্ষেত্রে নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া বৈধ। ইবন আবদিস সালাম বলেন, সম্ভবত তিনি হাসান বাসরী ও তাবারীর ন্যায় নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়াকে সাধারণভাবেই বৈধ মনে করতেন। অবশ্য ইবন যারকূনের বর্ণনা মতে ইবনুল কাসিম এর মতটি ছিল ইমাম আবু হানিফার মতো। তিনি মনে করতেন, যে সব ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য বৈধ, সেখানে বিচার করাও বৈধ। মালেকি মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল হাত্তাব এ বর্ণনাটি অধিক গ্রহণযোগ্য বলেছেন। 

শাফেঈ মাযহাবের শায়খ উপাধীধারী আবুল ফারজ ইবন তিরার-এর মতে সকল ক্ষেত্রে বিচারিক কাজে নারীদের কর্তৃত্ব বৈধ। তিনি বলেন: 'এর পক্ষে দলিল হলো হুকুম আহকাম চালুর উদ্দেশ্য হলো বিচারক কর্তৃক হুকুম-আহকাম কার্যকর করা, বিভিন্ন পক্ষের দলিল শ্রবণ করা, বাদী-বিবাদীর মাঝে বিবাদ মিমাংসা করা। আর এসব কাজ একজন পুরুষের পক্ষে যেমনিভাবে সম্ভব, নারীর পক্ষেও সম্ভব'।

ইবন হাযম নারীদেরকে খিলাফতের আসনে বসানো জায়িয মনে না করলেও সকল ক্ষেত্রে তাদের বিচার কাজ বৈধ বলেছেন। তাঁর মতে সকল ক্ষেত্রে নারীরা সাক্ষ্য দিতে পারে। আর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বিশ্বস্ত হওয়া শর্ত। আর কিছু নয়। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ নেই। যে কারো পক্ষে ও বিপক্ষে প্রত্যেক বিশস্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য"।
এখানে সাক্ষ্য দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিষয়কে আলাদা করা হয়নি। তেমনি বিচারের ক্ষেত্রেও। বিচারক হওয়ার শর্তসমূহ উল্লেখ করতে যেয়ে বলেন, মুসলমান ও যিম্মীদের কোনো বিষয়ে কারো বিচার কাজ ও হুকুম জারী করা হালাল নয় একমাত্র সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যিনি মুসলিম, বালিগ, বুদ্ধিমান এবং কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান সম্পন্ন। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা বা পুরুষ হওয়ার শর্তারোপ করা হয়নি।

তবে হানাফি মাযহাবের অধিকাংশের মতে কিসাস ও হদ প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ বৈধ নয়। শারহ আদাবুল খাসসাফে রয়েছে: "কিসাস ও হাদ্দ ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে নারী বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে পারে"।

তারা কুরআন হাদিসে দলিলের উপর কিয়াস করেছেন। তাদের মতে কুরআন হাদিসে নারীদের সাক্ষ্য দেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, বৈধ বলা হয়েছে। সেহেতু যেসব ক্ষেত্রে সাক্ষ্য বৈধ, বিচার করাও বৈধ। হানাফি মাযহাবের 'হিদায়াহ' গ্রন্থে উল্লেখ: 'সকল ক্ষেত্রে নারীর বিচার কাজ বৈধ। একমাত্র দন্ডবিধি তথা হুদুদ ও কিসাসের ক্ষেত্রে ফয়সালা ব্যতীত। আর এ ক্ষেত্রে তাদের সাক্ষীর বিষয়টি বিবেচনায়'।

ইবন রুশদ বলেন, "ইমাম আবু হানিফা বলেন, সম্পদের বিষয়ে বিচার কাজে নারী বিচারক হওয়া জায়েয"। 

খ. প্রশাসনিক ক্ষেত্রে: ইবন হাযম খিলাফতের বিষয়টি ব্যতীত প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীদের শাসনকে বৈধ বলেছেন। তিনি বলেন: নারীদেরকে প্রশাসনে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এটাই আবু হানিফার মত। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. শিফা নামে এক নারীকে তার স্বজাতির বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন"।

তিনি এ বিষয়ে আল কুরআন থেকে দলিলও পেশ করেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন হকদারের নিকট আমানতসমূহ পৌঁছে দিতে। আর যখন তোমরা ফয়সালা দিবে তখন ন্যায়ের সাথে ফয়সালা দিবে"। 

এখানে আমানত মানে কর্তৃত্বের আমানত। ইবন হাযম বলেন: এ আয়াতের নির্দেশনা নারী পুরুষ সকলকে সার্বিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। যদি না কোনো স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে তা থেকে পৃথক করা হয়। তখন দীনের সার্বিক নির্দেশ থেকে একে প্রথক করা যাবে।

গ. ওয়াক্ত স্টেটে: হানাফি মাযহাবের দুররুল মুখতারে এসেছে, নারীর কর্তৃত্বকে বিচারিক কাজের বাইরে আরো সম্প্রসারিত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, "নারী ওয়াকফ স্টেটে নাযীর বা তদারককারী হওয়ার যোগ্য, সে ইয়াতিমদের জন্য ওসিয়্যতকারীনী হতে পারে, যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে"।

হযরত উমর রা. স্বীয় কন্যা হাফসা রা.-কে খায়বারের এক ওয়াক্ত স্টেটের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।

নারী নেতৃত্বের স্বরূপ: পরিপ্রেক্ষিত ইসলাম / আবদুর রহমান আনওয়ারী ও শামীমা নাসরিন

ঘ. পার্লামেন্টে: ড. মস্তফা সাবাঈ নারীর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বিরোধিতা করলেও তারা পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন।

৬. মন্ত্রণালয়ে: মহানবি সা. ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ওযারাত তথা মন্ত্রণালয় ছিল না। মন্ত্রী নিয়োগ ব্যবস্থা ছিল না। মাওয়ার্দী উপরোক্ত আবু বাকারাহ রা. বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে নারীকে মন্ত্রীত্ব প্রদান করাকেও অবৈধ বলেছেন। তার মতে মন্ত্রীর নিকট থেকে মতামত চাওয়া হয়, তার মাঝে দৃঢ়তা থাকা প্রয়োজন। এগুলো নারীদের মাঝে দুর্বল। বিভিন্ন বিষয় সরাসরি প্রত্যক্ষণ প্রয়োজন। যা নারীর জন্য নিষিদ্ধ'। 

ড. ইউসুফ আল কারযাভী ও যায়নাব গায্যালিসহ অনেকে নারীরা মন্ত্রী হওয়ার বৈধতার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তারা বলেন, আবেগ থাকলেই মতামত ও পরামর্শ দিতে দুর্বল হবে সেটা ঠিক নয়। মহানবি সা.-এর যুগেও নারীরা পরামর্শ দিয়েছেন। আর তা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। যেমন: হুদায়বিয়ার ঘটনায় উম্মে সালামাহ রা.-এর পরামর্শ।

চ. সালাতের ইমামতিতে: পূর্বেই বলা হয়, অধিকাংশ আলিমের মতে ফরয বা নফল সালাতে নারীদের ইমামতি অবৈধ। তারা দলিল হিসেবে রসুল সা.-এর হাদিস উল্লেখ করেন। মহানবি সা. বলেন: "সাবধান! কোনো নারী কোনো পুরুষের ইমামতি করবে না"।৯৩

মাওয়ার্দী বলেন, কোনো পুরুষের জন্য জায়েয নয় কোনো নারীর ইমামতিতে সালাত আদায় করা। ইমাম শাফেঈর মতে তা করলে তাকে পুনরায় সালাত আদায় করতে হবে। এটাই সঠিক মত। এ বিষয়ে সকল ফকীহগণ একমত পোষণ করেন। একমাত্র আবু ছাওর ব্যতীত। কেননা যে সালাতে পুরুষের ইমাম হতে পারে সে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অন্য পুরুষের মত নেতা হতে পারে"। 


ষষ্ঠ অভিমত: রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সবধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ

গোটা জাতির উপর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তথা খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সবধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ। যেমন: সংসদ সদস্য হওয়া, মন্ত্রী হওয়া ইত্যাদি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে তথা রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নারীকে নেতৃত্ব প্রদান করা নিষিদ্ধ। ড. ইউসুফ আল কারাযাভীসহ কিছু আলেম এ মত পোষণ করেন। তিনি বলেন: "পরিবারের গণ্ডির বাইরে কিছু পুরুষের উপর কিছু নারীর কর্তৃত্ব চালানো বিষয়ে শরিয়াতে এমন কোনো দলিল নেই যা প্রমাণ করে যে সেটা অবৈধ। বরং যা নিষিদ্ধ সেটা হলো সকল পুরুষের উপর কোনো নারীর সামগ্রিক কর্তৃত্ব" ।

এর সমর্থনে দলিল হিসেবে বলেন: সাধারণ অবস্থা থেকে এ নিষেধটি খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে আবু বাকারাহ রা. বর্ণিত হাদিসটি। যাতে রসুল সা. বলেন: "যে জাতি তাদের উপর কর্তৃত্ব নারীদেরকে প্রদান করে, সে জাতি কখনো কল্যাণ পাবে না, সফল ও সার্থক হবে না"।

এখানে أمرهم তথা তাদের কর্তৃত্ব বলে তাদের সবোর্চ্চ কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব বুঝানো হয়েছে। এটা বুঝা গেল হাদিসটি যে প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল, তার আলোকে। কারণ সেখানে পারস্য সাম্রাজ্যে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সম্পর্কে বলা হয়। অতএব, সাধারণভাবে নারী নেতৃত্ব বৈধ নয়। তবে এ হাদিসে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বকে খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যা নারীর জন্য নিষিদ্ধ। 

এভাবে যারা নারী নেতৃত্ব অবৈধ বলেন, তাদের দলিলের পর্যালোচনায় ড. কারযাভী আরো বলেন, নেতৃত্ব দিতে হলে, নির্বাচনে ভোট দিতে গেলে নারীদেরকে ঘর থেকে বের হতে হয়। আলিমগণের মতে প্রয়োজন ছাড়া নারীর ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। কিন্তু বাস্তবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের চেয়ে সামাজিক প্রয়োজন আরো গুরুত্বপূর্ণ। আজকে সেকুলার নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে ভোট দিয়ে সেকুলারদের ক্ষমতায় বসাচ্ছে। ইসলামের স্বার্থে শরিআহ পালনকারী নারীগণ কি ভোট দেয়া তথা সত্যের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বের হওয়া কি প্রয়োজন নয়? আল কুরআনে ঘরে অবস্থান করার বিধানটি নবি সা.-এর স্ত্রীগণের জন্য কার্যকর ছিল। অনেকের মতে এটি সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু সেটা মেনেও নিয়ে বলা যায়, একই আয়াতের অবশিষ্ট অংশ দেখা দরকার। সেখানে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত করা হয়, জাহেলী সমাজের মতো তাবাররুজ না করা তথা বেপর্দা ও অশ্লীলভাবে বের না হওয়া। অশ্লীলতা প্রদর্শন না করে বের হতে শরিআহর দৃষ্টিতে কোনো বাধা নেই। আর বাস্তবতা হলো আজকে নারী শিক্ষা দীক্ষা, চাকুরির জন্য স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিসের উদ্দেশ্যে হরহামেশা ঘর থেকে বের হচ্ছে। ১০৪

নারীরা সংসদ সদস্য হওয়ার বিরোধিতাকারীগণ যে সব যুক্তি প্রদর্শন করেন, ড. কারযাভী সেগুলোরও সমালোচনা করে বিভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তারা এর বিরোধিতায় বলেন, পার্লামেন্ট তথা মজলিশে শুরার কাজ দু'ধরনের: ক. রাষ্ট্রপ্রধানের হিসেব নিকাশ নেয়া ও তাকে বিভিন্ন কাজে জবাবদিহি করা। দুই. সুচিন্তিত মত দিয়ে আইন প্রণয়ন করা। প্রথম কাজটি মূলত রাষ্ট্রপ্রধানের উপর কর্তৃত্ব করার নামান্তর। সে একজন পুরুষ হলে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব বুঝায়। আল কুরআনে নারীদেরকে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব দেয়নি (পূর্বে উল্লেখ করা হয়)। দ্বিতীয়ত: শরিআহর বিষয়ে জ্ঞান গবেষণা তথা ইজতিহাদে পুরুষরাই অগ্রগামী।

প্রথম পর্যায়ের বক্তব্যের পর্যালোচনায় তিনি যুক্তি দেন, পার্লামেন্টে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। তাই তাদেরই প্রাধান্য থাকে। তাছাড়া, শাসককে নাসীহত করা, পরামর্শ দেয়া, ত্রুটি বিচ্যুতি ধরিয়ে দেয়াই ইসলামি রাজনীতির মূল কথা। যা আমরু বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকারের অংশ। আল কুরআনে একাজে অংশগ্রহণের জন্য নারীদেরকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে (পূর্বে বিবৃত)। মহানবি সা.ও মুসলমানদের সামষ্টিক বিষয়ে নারীর পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। যেমন: হুদায়বিয়াহর সন্ধির প্রাক্কালে উম্মে সালামাহ রা.-এর পরামর্শে তিনি পদক্ষেপ নেন। মসজিদে নববীতে খলিফা উমর রা. এক ভাষণে নারীর সর্বোচ্চ মহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে চাইলে, সেই উম্মে সালামাহ রা.-এর বিরোধিতা করে যুক্তি প্রদর্শন করেন। এসব প্রমাণ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ দেয়া ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে পারে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের বক্তব্যের পর্যালোচনায় তিনি যুক্তি দেন যে, নারী শিক্ষায় সুযোগ সুবিধা কম থাকার কারণেই তারা পিছিয়ে। কিন্তু তাই বলে জ্ঞান-গবেষণায় তাদের অবদান কম নয়। হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট অনেক বড় বড় বিদ্বান সাহাবিও ফাতাওয়া চাইতেন। কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের দ্বার নারী পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত। কেউই এ কথা বলে না যে, ইজতিহাদ করার যোগ্যতার শর্তসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো: পুরুষ হওয়া। সুতরাং এ কাজে নারীদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। এছাড়া, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক দিয়ে কোনো কোনো নারী অনেক পুরুষের চেয়েও অগ্রগামী হতে পারে। যেমন আল কুরআনে বর্ণিত সাবা রাণী এবং মহানবি সা.-এর সাহাবিগণের মধ্যে আয়েশা রা.।

একইভাবে নারী মন্ত্রীসভার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্পর্কে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দায়িত্ব সামষ্টিক, কর্তৃত্ব সকলের অংশীদারিত্বমূলক। যা একদল মানুষ কার্যকর করে, বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থার দ্বারা। আর নারী তার অংশ মাত্র। সে একচ্ছত্র শাসক হতে পারে না। তার ক্ষমতা নিরংকুশ বা একচ্ছত্র নয়। যেকোনো সময় তার ক্ষমতা চলে যেতে পারে। সার্বিক পর্যালোচনা ও চিন্তাভাবনায় দেখা যায়, কোনো জাতি উপর নারীর শাসন নয়, বরং শাসন হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বা গোষ্ঠীর ও ব্যবস্থাদির। যদিও কোনো নারী সর্বোচ্চে থাকুক না কেন। সেখানে সে নারী শাসক নয়। প্রধানমন্ত্রী শুধু এককভাবে শাসক নয়, বরং সামষ্টিকভাবে গোটা মন্ত্রী সভা হলো শাসক। 

অধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত ও উপসংহার:

উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যায়, যারা নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছেন, তাদের যুক্তির মূল কেন্দ্র বিন্দু নারীর যোগ্যতা, দায়িত্ব ও হিজাব ব্যবস্থা ঠিক রাখাকে কেন্দ্র করে। বাকি দলিলসমূহ সার্বিকভাবে প্রযোজ্য নয়, অংশ বিশেষের সাথে প্রযোজ্য। আর তা হলো সর্বোচ্চ পদ তথা খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। খিলাফত বা ইমামতকে সামনে রেখে তারা সামগ্রিক নেতৃত্বের উপর হুকুম সম্প্রসারিত করেছেন। পক্ষান্তরে যারা নারী নেতৃত্বের সমর্থক তারা বলছেন, কুরআন সুন্নাহে এ বিষয়ে কোনো নিষেধ নেই। তাছাড়া, কোনো কোনো নারীর নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকতে পারে। যোগ্যতা থাকলে নারী যেকোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে। অন্যরা বিশেষ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় বা বিশেষ ক্ষেত্রে বা প্রেক্ষাপটে নারী নেতৃত্ব বৈধ বলেছেন। তন্মধ্যে যারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বৈধ বলেছেন, তারা ইমামত কুবরা তথা রাষ্ট্রপ্রধান পদে নারী নেতৃত্বকে অবৈধ ধরেই সেসব মত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে উল্লেখ করেন, নারীদেরকে রাষ্ট্রপ্রধান তথা খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেয়া জায়েয না হওয়ার বিষয়ে উলামায়ে উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে।





বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫

গনতন্ত্র হারামের শরয়ী দলিল

 


"ইসলামে গনতন্ত্র হারামের শরয়ী দলিল"


গণতন্ত্র কেন শিরক, কুফরী?

বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের সাবেক এক সভাপতি বলেছেন গনতন্ত্র হারাম এরকম আয়াত বা দলিল নাকি নাই। মনে রাখবেন কোরআন নাজিলের বহু বছর পরে গনতন্ত্র নামক জাহেলিয়াতের আগমন,  তাই গনতন্ত্র সরাসরি শব্দিক ভাবে হারাম না থাকরার কারনে মানুষের তৈরী বিধান গনতন্ত্র জায়েজ হয়ে যায় না, এখানে শুধু গনতন্ত্র নয়, মানুষের তৈরী অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানুষের তৈরী সকল বিধানই হারাম করা হয়েছে।


আমি অনুরোধ করবো এই ছাত্র শিবিরের সাবেক এই সভাপতি যেনো "খেলাফত ও মুলকিয়াত" বইটি পড়ে তার পর পরবর্তীতে এই বিষয়ে মন্তব্য করেন এবং এই লেখার পাঠকরাও যেন ঐ বইটি পড়ে আমার লেখার বিষয়ে মন্তব্য করেন তাইলে খামোখা বিতর্ক এড়ানো যাবে, ভুল মেসেজ এড়ানো যাবে,কারন ঐ বইয়ে আপনাদের রাজনীতির আদর্শিক নেতা আরো বিস্তারিত লিখেছেন।


আবার অনেকে এই লেখার পড়ার পর মন্তব্য করবেন যে তাইলে গনতন্ত্র হারাম হলে বর্তমানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপায় কি? বিকল্প কি? হ্যাঁ আমি এই বিকল্প নিয়ে বিষদ আলোচনা করবো এই লেখাটি পড়ুন আগে, মন্তব্য করুন প্রান খুলে।


গণতন্ত্রের মূলনীতিসমূহ সুস্পষ্টভাবে শিরক এবং কুফরী হিসাবে প্রতীয়মান হওয়া দলিল সমূহ নীচে পেশ করা হলো। চলুন দেখি আল কোরআন কি বলেঃ


(১) সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে : 

গণতন্ত্রের মূল কথা জনগণের সার্বভৌমত্ব। অর্থাৎ সকল ক্ষমতার মালিক সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। একথা নিঃসন্দেহে শিরক।

 কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيْكٌ فِي الْمُلْكِ ‘রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই’ (বনী ইসরাঈল ১৭/১১১)।

 

তিনি আরো বলেন, قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ ‘

তুমি বল, হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন’ (আলে ইমরান ৩/২৬)। 


অন্যত্র তিনি বলেন, تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 

‘বরকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান’ (মূলক ৬৭/১)।


মহান আল্লাহ আরো বলেন,الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُنْ 

‘যার হাতে রয়েছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব। যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেন না এবং তাঁর রাজত্বে কোন শরীক নেই’ (ফুরক্বান ২৫/২)।


আল্লাহর বাণী থেকে বুঝা গেল আল্লাহই সকল ক্ষমতার মালিক। মানুষকে ক্ষমতার মালিক বা উৎস বানানো তাঁর সাথে শরীক স্থাপনের শামিল, যা স্পষ্ট শিরক।


(২) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে : 

গণতন্ত্রে আইন-বিধান রচনার চূড়ান্ত ক্ষমতা অর্পণ করা হয় পার্লামেন্ট সদস্যদের উপর। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যেটা বলবে, যে বিষয়ে সম্মত হবে সেটাই হবে দেশের সর্বোচ্চ আইন, যার বিরোধিতা করা আইনত অপরাধ। গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কুরআন-সুন্নাহর উপরে স্থান দেওয়া হয়। 


সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী আইন তৈরী করতে পারে, এমনকি আল্লাহর আইনকে বাতিলও করতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স দেওয়া, মদের লাইসেন্স দেওয়া, সূদের বৈধতা দেওয়া, ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে নিষিদ্ধ করা, ১৬ বছর বয়স পারস্পরিক সম্মতিতে যেনা করলে তার বৈধতা দেওয়া, স্বামীর অনুমতিতে স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে ব্যভিচার করলে তার বৈধতা দেওয়া, যাত্রা, সিনেমাহলে প্রকাশ্যে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার চর্চাকে অনুমোদন দেওয়া ইত্যাদি। এ ধরনের নীতিমালা নিঃসন্দেহে আল্লাহর বরুবিয়্যাতের (ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের) ক্ষেত্রে শিরক এবং স্পষ্ট কুফরী। 


কেননা আল্লাহ বলেন, اَلَا لَهُُ الْخَلْقُ وَالْاَمْرُ 

‘শুনে রাখ! সৃষ্টি যার হুকুম চলবে তার’ (আ‘রাফ ৭/৫৪)।

তিনি আরো বলেন,إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ- 

‘আল্লাহ ব্যতীত কারু বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ব্যতীত তোমরা অন্য কারু ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (ইউসুফ ১২/৪০)।

তিনি আরো বলেন, وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ 

‘আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পিছনে নিক্ষেপ করার কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’ (রা‘দ ১৩/৪১)।


(৩) বিরোধ মিমাংসার ক্ষেত্রে : 

গণতন্ত্রে যেকোন মতবিরোধ বা বিতর্কের চূড়ান্ত মিমাংসাকারী বানানো হয় সংবিধান ও এর ধারা সমূহ এবং পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে। এটা একটা স্পষ্ট কুফরী। 

মহান আল্লাহ বলেন,فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا- 

‘অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমরা বিতন্ডা কর, তাহ’লে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম’ (নিসা ৪/৫৯)।


তিনি আরো বলেন,وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا- 

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফায়ছালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর সে বিষয়ে নিজস্ব কোন ফায়ছালা দেওয়ার এখতিয়ার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, সে ব্যক্তি স্পষ্ট ভ্রান্তিতে পতিত হবে’ (আহযাব ৩৩/৩৬)।


এখন ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি যে কথা বলেছে সে কথা সত্য কিনা নিজেরাই যাচাই করুন।

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

১৭ নভেম্বর ভয়াল নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস


 

১৭ নভেম্বর ভয়াল নানিয়ারচর গ-ণ-হ-ত্যা দিবস: এত বছর পরও বিচার চায় নানিয়ারচরের ভুক্তভোগীরা


আজ ১৭ নভেম্বর, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি কালো দিন। ১৯৯৩ সালের এই কালো দিনে রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বাঙ্গালীদের উপর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী তথা আজকের জেএসএস সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা পরিচালনা করে। এই গণহত্যার ৩২ বছর আজ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নানিয়ারচর গণহত্যাটি ১৯তম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।


এই গণহত্যাকে পার্বত্য বাঙ্গালীরা ভুলে গেছে। এইভাবেই ৩২টি বছর কেটে গেছে। এই গণহত্যায় ৪৯ জনের অধিক নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়। বাঙ্গালী মা-বোনদের জেএসএস সন্ত্রাসীরা গণধর্ষণ করে হত্যা করে। আহত হয় প্রায় ১৫০/২০০ জন।


কী ঘটেছিলো সেই দিন?


সন্তুর জেএসএস সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য বাঙ্গালীকে নিধন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী শূন্য করবে এবং পাহাড়কে সন্ত্রাসে পরিণত করে রাজত্ব কায়েম করবে। তারা সেই স্বপ্ন নিয়ে বাঙ্গালী গণহত্যায় মেতে উঠেছিল সেসময়৷ এই গণহত্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩৫ হাজার বাঙ্গালী নিহত হয়। এরা সবাই নিরস্ত্র বাঙ্গালী ছিল।


গণহত্যার পর নানিয়ারচর থেকে প্রায় ২১৮ পরিবার সমতলে ভয়ে ফিরে যান। সেদিন রাস্ট্র-প্রশাসন তাদেরকে নিরাপদ দিতে ব্যর্থ হয়৷ সন্ত্রাসে পরিণত হয় সমগ্র নানিয়ারচর সহ পার্বত্য চট্টগ্রাম। বাঙ্গালীরা প্রাণের ভয়ে দিগদিগন্তে ছুঁড়তে থাকে। সেইদিনের লোমহর্ষক ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়।


সেদিন ছিল সাপ্তাহিক হাটবাজারের দিন, বুধবার (১৭ নভেম্বর)। তাই স্বভাবিকভাবে দুর-দূরান্ত থেকে বাজারে এসেছিল শত শত বাঙালী, শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। সকালের দিকে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার আহমেদ মিয়া ও বুড়িঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফসহ পার্বত্য গণপরিষদের ব্যানারে একটি মিছিল স্থানীয় লাইবেরী প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় যাদের প্রধান দাবীগুলো ছিল: শান্তিবাহিনীর হাত থেকে নানিয়ারচরের নিরীহ বাঙালীদের বাঁচাও, লঞ্চঘাটের যাত্রী ছাউনি দিতে হবে ও সেনাবাহিনীর ৪০ ইবি রেজিমেন্টের সেনাছাউনি স্থাপন করতে হবে।


কয়েক হাজার বাঙালী ছাত্র-জনতার মিচ্ছিলে তখন সারা নানিয়ারচর উজ্জীবিত। মিচ্ছিল থেকে গনতন্ত্র ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবী উচ্চকন্ঠে জানানো হচ্ছিল। মিচ্ছিলটি শান্তিপুর্ণভাবে শহরের রাস্তা প্রদক্ষিন শেষে কৃষি ব্যাংক এর সামনে সমাবেশ করে।


মিছিল প্রতিহত করার জন্য হামলা করে বেতছড়ি, ছয়কুড়িবিল, মাইচ্ছড়ি, গবছড়ি, তৈচাকমা, যাদুকাছড়া, বগাছড়ি, বড়াদম, বুড়িঘাট, কাঁঠালতলী, শৈলেশ্বরী, নানাক্রুম, সাবেক্ষ্যং, এগারাল্যাছড়া, বাকছড়ি, কেঙ্গালছড়ি থেকে আগত উগ্র উপজাতিরা শান্তিবাহিনীর নেতৃত্বে হামলা করে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল বাঙালীদের ১শ ৩২টি ঘর বাড়ি।


ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায়, সন্তু লারমা নিজেই এই গণহত্যার নেতৃত্ব দেন। সন্তু লারমা, ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা ও বীরেন্দ্র চাকমা নেতৃত্বে ৭৭ জন জেএসএস সন্ত্রাসী গণহত্যায় অংশ নেন। সন্তু লারমার বাড়ি ছিল এই নানিয়ারচর উপজেলায়। সন্তু নিজেই ১৩ মাসের নুর কায়েদা নামের এক মেয়ে শিশুকে পিষে হত্যা করে এবং তার মাকে ধর্ষণ করে যৌনাঙ্গে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।


আহত বাঙালীদেরকে আহত অবস্থায়ই কাপুরুষেরা অনেক পশুর মত জবাই করে হত্যা করেছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে সেদিন বাঙালীরা কাপ্তাই লেকের পানিতে ঝাঁপ দিলেও জনসংহতি সমিতির শান্তিবাহিনী ও উগ্র পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নামক হায়নার নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। যারা দোকানে, বাড়িতে লুকিয়ে ছিল তাদেরকে টেনে হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়েছে অথবা পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পাশের বাঙালীদের গ্রামগুলি লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই সময় রাঙ্গামাটি থেকে আসা লঞ্চ পৌঁছালে সেখানেও হামলা করে অনেক নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হতাহত করা হয়। আনিসুজ্জামান নামক এক মৌলভীকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়। এভাবে প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় বাঙালীদের উপর।


১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর গণহত্যাটি ঘটনার মাধ্যমে কয়েক ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে ৪৯ জনের অধিক নারী, শিশু, আবাল বৃদ্ধ বনিতা নিরস্ত্র নিরীহ বাঙ্গালীকে হত্যা করে, অধিকাংশ লাশগুলোকে গুম করা হয়েছে এবং আহত করা হয়েছে আরও শতাধিকের অধিক, অপহরণ করা হয়েছে আরো শত শত বাঙ্গালীকে। ২০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণ ভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল বাঙালীদের ১শ ৩২টি ঘর বাড়ি। গৃহহীন হয়েছেন প্রায় শহস্রাধীক পরিবার। এরা লাশগুলোকে গুম করে আত্মীয়-স্বজনকে ফেরত না দিয়ে বা কবর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে একত্রে পুড়িয়ে ফেলে মুসলিম ধর্মীয় রীতিকে অবমাননা করে।


বাঙ্গালী লেখক না থাকায় এসব নৃশংস গণহত্যা ও বর্বরোচিত ঘটনাগুলো বরাবরের মত ইতিহাস থেকে মুছে গিয়েছে। তৎকালীন গণমাধ্যম জেএসএস সন্ত্রাসীদের ভয়ে সত্য প্রকাশ করতো না। এমনকি তাদের পাহাড়ে প্রবেশে ছিলো কঠোর সেন্সর আরোপ।


তবে, নানা প্রতিকূলতা ভেদ করে এ খবর দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল।


সুরুজ মিয়া (৮১) ইসলামপুর, ফয়জ আলী (৭৯) বেতছড়ি ও আনোয়ার মোল্লা (৮৪) তারা নানিয়ারচর গণহত্যার পরের দিন মৃত্যুর ভয়ে এলাকা ছেড়ে ময়মনসিংহ ভালুকা চলে যান। তারা সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। নৃশংস গণহত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার তারা জ্ঞান হারিয়েছেন। তারা বাঙ্গালী গণহত্যার বিচার চেয়েছেন এবং নিহতদের পরিবারগুলোর সদস্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বাউল নামের ফাউল আর আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিদের পরিত্যাজ্য

  ইদানীং বাউলদের ফাউল আচরন আর সৃষ্টি কর্তার সাথে বেয়াদবীর সীমা অতিক্রম করেছে। আগের যুগে আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিরা যেরকম আচরন করত সেরকম আচরন...