ইসলামে গণতন্ত্র হারামের শরয়ী দলিল — পর্যালোচনা
গণতন্ত্রকে অনেকেই ইসলামসম্মত বা গ্রহণযোগ্য মনে করলেও ইসলামী আকীদা ও শরিয়তের আলোকে এ ব্যবস্থাটি যে সরাসরি শিরক ও কুফরীর সাথে সাংঘর্ষিক—তা বিভিন্ন দলিল দ্বারা স্পষ্ট হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের একজন সাবেক সভাপতি দাবি করেছেন যে “গণতন্ত্র হারাম”—এমন কোনো আয়াত বা শরয়ী দলিল নেই। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়।
মনে রাখতে হবে—কুরআন নাজিল হয়েছিল এমন এক যুগে, যখন ‘গণতন্ত্র’ নামে কোনো রাজনৈতিক ধারণারই অস্তিত্ব ছিল না। তাই শব্দগতভাবে “গণতন্ত্র হারাম” না থাকলেও মানুষের বানানো সকল বিধানকে যে শরিয়তে হারাম করা হয়েছে—তা কুরআন-সুন্নাহ বহু জায়গায় সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।
অর্থাৎ মানুষের তৈরি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব শাসনব্যবস্থাই ইসলামে বাতিল—যদি তা আল্লাহর বিধানের বিপরীতে দাঁড়ায়।
আমি পরামর্শ দেব—ছাত্র শিবিরের ঐ সাবেক সভাপতি এবং এই লেখার পাঠকরাও যেনো প্রথমে “খেলাফত ও মুলকিয়াত” বইটি পড়ে নেন। কারণ সেখানে ইসলামের রাজনৈতিক ধারণা ও মানুষ-নির্মিত ব্যবস্থার মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে অযথা বিতর্ক, ভুল ব্যাখ্যা বা বিভ্রান্তি এড়ানো যাবে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন—“যদি গণতন্ত্র হারাম হয়, তাহলে আজকের যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিকল্প পথ কী?”
এই প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর আলাদা করে উপস্থাপন করা হবে। আপাতত বিষয়টির মূল শরয়ী দিকগুলো দেখা যাক।
গণতন্ত্র কেন শিরক ও কুফরি — কুরআন-হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
১. সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) : কার হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা?
গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় মূলনীতি হলো—“সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”।
অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব মানুষের।
ইসলামের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট শিরক।
আল্লাহ বলেন—
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيْكٌ فِي الْمُلْكِ
“রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই।” (বনী ইসরাঈল ১৭/১১১)
তিনি আরও বলেন—
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ
“বলুন, হে আল্লাহ! রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে চান রাজত্ব ছিনিয়ে নেন।” (আলে ইমরান ৩/২৬)
আরও বলেন—
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“বরকতময় তিনি, যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব এবং যিনি সর্ববিষয়ে সর্বক্ষমতাশালী।” (মূলক ৬৭/১)
এছাড়াও—
الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ... وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيكًا
“যার হাতে আসমান-জমিনের রাজত্ব… তাঁর রাজত্বে কোনো শরিক নেই।” (ফুরক্বান ২৫/২)
➡ সরাসরি প্রমাণ—মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর।
মানুষকে সার্বভৌম বানানো মানেই আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন।
২. আইন প্রণয়ন : বিধান দেয়ার অধিকার কার?
গণতন্ত্রে আইন তৈরি করে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
তারা চাইলে কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী আইনও চালু করতে পারে এবং তা অমান্য করা অপরাধ হয়।
যেমন—
• পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স
• মদের বৈধতা
• সুদের বৈধতা
• ইসলামবিরোধী নৈতিক আইন
• আল্লাহর হারামকে হালাল করা
এসবই আল্লাহর হুকুমের জায়গায় মানুষের হুকুম বসানোর শামিল—যা শিরক ও কুফরি।
আল্লাহ বলেন—
اَلَا لَهُُ الْخَلْقُ وَالْاَمْرُ
“শুনে রাখ! সৃষ্টি তাঁর, বিধানও তাঁর।” (আ‘রাফ ৭/৫৪)
তিনি বলেন—
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“বিধান করার অধিকার কেবল আল্লাহর।” (ইউসুফ ১২/৪০)
আরও বলেন—
وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ
“আল্লাহই নির্দেশ দেন, তাঁর নির্দেশকে বাতিল করার কেউ নেই।” (রা‘দ ১৩/৪১)
➡ এটি স্পষ্ট দলিল—আইন প্রণয়নের অধিকার মানুষের নয়, কেবল আল্লাহর।
৩. বিরোধ নিষ্পত্তি : শেষ সিদ্ধান্ত কার?
গণতন্ত্রে বিরোধ নিষ্পত্তির শেষ বিচারক হলো—
সংবিধান, আদালত ও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত।
ইসলামে এ ভূমিকা একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের।
আল্লাহ বলেন—
فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ
“তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও।” (নিসা ৪/৫৯)
তিনি আরো বলেন—
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ ... أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো ফয়সালা দিলে মুমিনদের আর কোনো বিকল্প থাকে না।” (আহযাব ৩৩/৩৬)
➡ গণতন্ত্রে সিদ্ধান্তের উৎস মানুষ—ইসলামে উৎস আল্লাহ। দুটো ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত।
শেষ কথা : দাবি যিনি করেছেন, যাচাই করুন
ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতির বক্তব্য—“গণতন্ত্র হারাম এমন দলিল নেই”—
এ কথা সত্য না মিথ্যা তা কুরআনের আলোতেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
গণতন্ত্রের মূলনীতি—
• সার্বভৌমত্ব মানুষের
• আইন প্রণয়নের অধিকার মানুষের
• চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষের
আর কুরআনের মূলনীতি—
➡ সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর
➡ বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর
➡ ফয়সালার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের
এ দুটি ব্যবস্থা একে অন্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাই ইসলামের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রকে কুফরি ও শিরকি ব্যবস্থা বলা—দলিলসম্মত বক্তব্য।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ