ইসলাম কেন একমাত্র সত্য দ্বীন: কুরআন, নবুয়ত ও পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের সাক্ষ্য
নাস্তিক ও সন্দেহবাদীরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলে—ইসলামই যদি আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম হয়, তবে তার প্রমাণ কী? সব ধর্মই তো নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে। তাহলে হযরত মুহাম্মদ (সা.) কি কেবল একজন সাধারণ মানুষ বা গতানুগতিক নৈতিক আদর্শ প্রচারক নন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আবেগে নয়, বরং যুক্তি, ঐশী গ্রন্থের সাক্ষ্য এবং ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণ করাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি। ইসলাম নিজেকে শুধু একটি নতুন ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং পূর্ববর্তী সকল সত্য নবী ও বিশুদ্ধ ধর্মের ধারাবাহিকতা এবং পূর্ণতা হিসেবে ঘোষণা করেছে। কুরআন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে—হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের পর পূর্ববর্তী সকল শরীয়ত রহিত হয়েছে এবং চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ দ্বীন হিসেবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইসলাম: কেবল ধর্ম নয়, পরিপূর্ণ দ্বীন
ইসলাম শুধু কিছু আচার-অনুশীলনের নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—দ্বীন। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
إن الدين عند الله الإسلام
‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৯)
আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
ومن يبتغ غير الإسلام دينا فلن يقبل منه وهو في الآخرة من الخاسرين
‘যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করে, তবে তা কখনোই গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)
এই আয়াতদ্বয় প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো আপেক্ষিক সত্য নয়; বরং এটি একমাত্র চূড়ান্ত ও সার্বজনীন সত্য দ্বীন।
মুহাম্মদ (সা.): কেবল ধর্মগুরু নন, জীবনের সর্বক্ষেত্রের আদর্শ
কুরআন মাজীদ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কেবল ধর্ম প্রচারক হিসেবে নয়, বরং মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছে:
لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة لمن كان يرجو الله واليوم الآخر وذكر الله
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব: ২১)
তিনি নবুয়ত লাভের পর জীবনের যে কোনো ভূমিকায়—ইবাদতে, পরিবারে, সমাজে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায়—সবকিছুই করেছেন নবী হিসেবে। কুরআন ঘোষণা করেছে:
وما ينطق عن الهوى
إن هو إلا وحي يوحى
‘তিনি মনগড়া কথা বলেন না; তা তো কেবল ওহী, যা তাঁর প্রতি নাযিল করা হয়।’ (সূরা নাজম: ৩–৪)
অতএব, রাসূল (সা.)-এর অনুসরণ কেবল নামাজ-রোজা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করাই ঈমানের দাবি।
কুরআনের ব্যাখ্যাকার হিসেবে রাসূল (সা.)
আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.)-কে শুধু কুরআন পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে পাঠাননি; বরং কুরআনের একমাত্র প্রামাণিক ব্যাখ্যাকার হিসেবেও প্রেরণ করেছেন। তাঁর কথা, কাজ ও নীরব সম্মতিই হাদীস, যা কুরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা। হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন—‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রই ছিল কুরআন।’
দীনদারি ও দুনিয়াদারি: ইসলামে কোনো দ্বৈততা নেই
সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ইবাদতকে দীনদারি আর জীবনযাপনকে দুনিয়াদারি মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামে এই বিভাজন নেই। আল্লাহর হুকুম ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী করা প্রতিটি কাজই ইবাদত। আর এই নীতির ভিত্তিই হলো কালেমা তাইয়্যেবা—
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’।
এই কালেমা ঘোষণা করে—হুকুম একমাত্র আল্লাহর, আর সেই হুকুম পালনের একমাত্র পদ্ধতি রাসূল (সা.)-এর তরিকা।
ইসলামকে খণ্ডিতভাবে গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা
يا أيها الذين آمنوا ادخلوا في السلم كآفة ولا تتبعوا خطوات الشيطان إنه لكم عدو مبين
সূরা বাকারা ২০৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন—‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর।’
আরও বলা হয়েছে:
أفتؤمنون ببعض الكتاب وتكفرون ببعض
‘তবে কি তোমরা কিতাবের এক অংশে ঈমান রাখো আর অন্য অংশ অস্বীকার করো?’ (সূরা বাকারা: ৮৫)
ইসলাম আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই ইসলামের বিধান মানাই প্রকৃত ইসলাম গ্রহণ।
কুরআন বোঝার চেষ্টা: ঈমানের দাবি
কুরআন তিলাওয়াত নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। তবে কুরআন বোঝার চেষ্টা করা ফরজ দায়িত্ব। যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রয়োজনে বিদেশি ভাষা শেখে, অথচ আখিরাতের মুক্তির জন্য কুরআন বোঝার চেষ্টা করে না—তা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী
বাইবেল, বেদ, গীতা ও পুরাণ—প্রায় সব ধর্মগ্রন্থেই একজন চূড়ান্ত ও বিশ্বনবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী পাওয়া যায়। বাইবেলের ‘মূসার সদৃশ নবী’, বেদের ‘নরাশংস’, গীতার বিশ্বরূপ মহাপুরুষ কিংবা পুরাণের ‘মহামদ’—সব ভবিষ্যদ্বাণী এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে।
সার্বজনীন নবুয়তের কুরআনিক ঘোষণা
وَإِن مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ
‘এমন কোনো জাতি নেই, যাদের কাছে সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি।’ (সূরা ফাতির: ২৫)
অতএব ভারতবর্ষসহ প্রতিটি সভ্যতাতেই নবীদের আগমন ঘটেছে। কিন্তু শেষ ও চূড়ান্ত নবী হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমেই সব ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা লাভ করেছে।
উপসংহার
উপরোক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট—পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে যে চূড়ান্ত নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, তা একমাত্র রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমেই পূর্ণ হয়েছে। তাঁর মাধ্যমে শরীয়ত পূর্ণতা পেয়েছে এবং ইসলামই চূড়ান্ত সত্য দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমাদের কর্তব্য—এই মহান নবীর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করা এবং তাঁর প্রতি অধিকহারে দরুদ প্রেরণ করা। আল্লাহ তাআলা যেন সমগ্র মানবজাতিকে এই চূড়ান্ত সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দান করেন—আমিন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ