ইসলামে গান-বাদ্য হারাম—কুরআন, হাদীস ও সালাফদের স্পষ্ট দলিলসমূহ
ইদানীং কিছু মানুষ দাবি করে থাকে যে ইসলামে গান-বাদ্যের হারাম হওয়ার কোন স্পষ্ট দলিল নেই। কিন্তু কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবা-তাবেয়ীদের ব্যাখ্যা এবং চার ইমামের ফিকহ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এত স্পষ্ট যে, এ দাবি বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গত।
এখন আমরা দলিলগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করি।
কুরআন করীমের স্পষ্ট দলিল
১. সুরা লুকমান : আয়াত ৬
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ
অর্থ:
“মানুষের কেউ কেউ রয়েছে যারা লাহওয়াল হাদীস (মনোমুগ্ধকর অর্থহীন কথা) ক্রয় করে, যেন জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং আল্লাহর দীনকে ঠাট্টা-বিদ্রূপে পরিণত করতে পারে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।”
শানে নুযূল (কারণে অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা)
নজর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে এক গায়িকা দাসী কিনে এনে তাকে গান-বাজনা পরিবেশনের দায়িত্ব দেয়। কেউ যখন কুরআন শুনতে চাইত, সে বলত—
“মুহাম্মদ তোমাদের নামাজ-রোজা আর কষ্টের কথা বলেন। বরং এসো, গান শুনো, জীবন উপভোগ কর।”
এর প্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয়। (মাআরিফুল কুরআন ৭/৪)
সাহাবা ও তাবেয়ীদের সরাসরি ব্যাখ্যা
‘লাহওয়াল হাদীস’ বলতে গান—এ কথা বহু সাহাবীর ইজমা-সদৃশ বক্তব্য।
ইবনে মাসউদ রা. বলেন: “আল্লাহর কসম! এখানে গানই বোঝানো হয়েছে।”
একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
– ইবনে আব্বাস রা.
– ইবনে উমর রা.
– সাঈদ ইবনে জুবাইর
– হাসান বসরী
— তাফসীর ইবনে কাসীর ৩/৪৪১
শয়তানের আওয়াজ = গান-বাদ্য
আল্লাহ বলেন—
“তুমি (ইবলিস) তোমার আওয়াজ দিয়ে তাদেরকে বিপথে টান।” (সূরা ইসরা : ৬৪)
ব্যাখ্যায়—
ইবনে আব্বাস রা.: “পাপের দিকে ডাকে এমন সবকিছুই শয়তানের আওয়াজ।”
মুজাহিদ রাহ.: “এর অর্থ গান ও বাদ্যযন্ত্র।”
ইবনুল কাইয়্যিম রাহ.: “পাপের প্রতি আহ্বানে সর্বোচ্চ শক্তিশালী উপাদান হল গান-বাদ্য।”
— ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯
গান-বাদ্যের ক্ষতি—সালাফদের দৃষ্টিতে
ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. গান-বাদ্যের যে ক্ষতিগুলোর আলোচনা করেছেন, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো—
নিফাকের উৎস
ব্যভিচারের প্রেরণা
চিন্তাশক্তির অবরোধ
কুরআন থেকে গাফেল করা
আখিরাত ভুলিয়ে দেওয়া
গোনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি
জিহাদী চেতনা ধ্বংস
— ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭
সহীহ হাদীসসমূহের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা
১. গায়িকা দাসী ও গান শিক্ষার হারাম হওয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“তোমরা গায়িকা দাসী ক্রয়-বিক্রয় করো না, তাদের গান শিক্ষা দিও না। এতে কোন কল্যাণ নেই। এদের উপার্জন হারাম।”
— তিরমিযী: ১২৮২, ইবনে মাজাহ: ২১৬৮
২. বাদ্যযন্ত্র মদের মতো হালাল মনে করা হবে
“আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে পান করবে। তাদের মাথার উপর গায়িকা নারীদের গান ও বাদ্যযন্ত্র বাজবে। আল্লাহ তাদেরকে ভূমিতে ধ্বসিয়ে দেবেন।”
— ইবনে মাজাহ: ৪০২০
৩. গান থেকে নিফাক জন্মায়
ইবনে মাসউদ রা. বলেন—
“যেমন পানি তৃণলতা জন্মায়, গান মানুষের অন্তরে নিফাক জন্মায়।”
— ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩
৪. সহীহ বুখারীর দলিল (সুস্পষ্ট হারাম)
রাসূল ﷺ বলেন—
“আমার উম্মতের এমন লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল করবে।”
— সহীহ বুখারী: ৫৫৯০
৫. বাদ্যযন্ত্র উচ্ছেদ করার নির্দেশ
“আল্লাহ আমাকে হিদায়াত ও রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ এবং জাহেলি প্রথা ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন।”
— মুসনাদে আহমদ
সাহাবাদের বাস্তব আমল
ইবনে উমর রা.
একবার বাঁশির শব্দ শুনে তিনি দুই কানে আঙুল ঢুকিয়ে নিলেন, যতক্ষণ না শব্দ শেষ হয়। এবং বললেন—
“রাসূল ﷺ-ও এভাবেই করেছিলেন।”
— মুসনাদে আহমদ ৪৫৩৫; আবু দাউদ: ৪৯২৪
ঘণ্টা-ঘুঙুর সম্পর্কে সতর্কতা
হযরত আয়েশা রা. বলেন—
“যে ঘরে ঘণ্টি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।”
— আবু দাউদ: ৪২৩১
রাসূল ﷺ বলেন—
“ঘণ্টা শয়তানের বাদ্যযন্ত্র।”
— সহীহ মুসলিম: ২১১৪
চার ইমামের ফিকহী সিদ্ধান্ত
ইমাম মালেক রাহ.
“গান-বাদ্য কেবল ফাসিকরা করে।” — কুরতুবী ১৪/৫৫
ইমাম শাফেয়ী রাহ.
“গান-বাদ্য শুননেওয়ালা ফাসেক; তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।”
— ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯
ইমাম আহমদ রাহ.
“বাদ্য ছাড়াই গান মাকরূহে তাহরীমী; বাদ্যসহ হলে হারাম।”
— আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮
ইমাম আবু হানীফা রাহ.
তাঁর কঠোরতম অবস্থান:
গান-বাদ্য হারাম, এবং এ কাজে লিপ্ত ব্যক্তি ফাসেক।
দফের (দাফ) বিধান—বাদ্যযন্ত্র নয়
হাদীসে ওলীমা ঘোষণা করার জন্য শুধু দফের অনুমতি এসেছে।
আসল দফ—
একপাশ খোলা
সুরেলা বা আকর্ষণীয় নয়
প্লাস্টিকের পাত্রের মতো ভোঁতা শব্দ
আওনুল বারী ২/৩৫৭ অনুসারে,
“যখন দফের আওয়াজ সুরেলা হয়ে যায়, তখন তা আর দফ থাকে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হয় এবং হারাম হয়।”
সুফীদের কাওয়ালি-যুক্তি খণ্ডন
কিছু সুফী দুটি বালিকার দফ বাজানোর হাদীসকে দলিল মনে করেন।
কিন্তু—
আয়েশা রা. স্বয়ং বলেছেন:
“তারা গায়িকা ছিল না, কোনো গান গায়নি।” — ফাতহুল বারী ২/৪৪২ইমাম কুরতুবী বলেন:
বর্তমান যুগের সুরেলা বাদ্যসহ কাওয়ালি সম্পূর্ণ হারাম। — তাফসীর কুরতুবী ১৪/৫৪জুনাইদ বাগদাদী রাহ. কাওয়ালি শোনা বন্ধ করেছিলেন।
বিশদ তাফসীর: লাহওয়াল হাদীস = গান-বাদ্য
ইবনে হিশাম, ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ইকরিমা, হাসান বসরী প্রমুখ একমত—
লাহওয়াল হাদীস = গান
ইবনে জারীর, ইবনে আবি শাইবাহ, হাকেম, বায়হাকী—
সবখানেই একই ব্যাখ্যা।
হাদীস:
“গায়িকা দাসীর কেনাবেচা, গান শেখানো, দান গ্রহণ—সবই হারাম।”
— তিরমিযী, ইবনে আবি হাতেম
আরেক হাদীস—
“গায়িকার গান শুনলে কিয়ামতে তার কানে গরম সীসা ঢালা হবে।”
— ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন
গান-বাদ্যের পেছনে শয়তানের কৌশল
ইতিহাসে দেখা যায়—
কাফিররা সব যুগে জনগণকে গান-বাদ্য, নাটক, গল্পে মাতিয়ে সত্য থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে।
নজর ইবনে হারিসের উদাহরণ তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
আজও একই কৌশল:
গান
নাচ
চলচ্চিত্র
বদচরিত্র প্রসারকারী শিল্পসংস্কৃতি
এসবের মাধ্যমে মানুষকে কুরআন, আখিরাত ও নৈতিকতার চিন্তা থেকে বিচ্যুত করা হয়।
শেষ কথা
কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবা-তাবেয়ীদের বক্তব্য, চার ইমামের ফিকহ—সব মিলিয়ে এক সিদ্ধান্তই স্পষ্ট:
গান-বাদ্য ইসলামে হারাম।
এ বিষয়ে দলিল এতই প্রাবল্যপূর্ণ যে, এর পর আর কোনো দলিলের প্রয়োজন নেই।
আশা করি আর দলিল লাগবে না।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ