4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: ইসলামে গান-বাদ্য হারামের দলিল নাই? > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫

ইসলামে গান-বাদ্য হারামের দলিল নাই?

গান–বাদ্য প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি ও ইসলামের সুস্পষ্ট অবস্থা

সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট—বিশেষত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুসারী—এমন দাবি উত্থাপন করছেন যে কুরআন ও হাদীসে নাকি গান ও বাদ্যযন্ত্র হারাম হওয়ার কোনো স্পষ্ট দলীল নেই। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুতরাং গান শোনা এখন জায়েয। কেউ কেউ হয়তো অজ্ঞতাবশত এ ধরনের কথা বলছেন, আবার কেউ জেনেশুনেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় মূলত তাদের জন্য হিদায়াতের দোয়া করা।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি যুক্তিও প্রায়ই শোনা যায়—যে ড. ইউসুফ কারযাভী নাকি বাদ্যসহ গানকে জায়েয বলেছেন। আবার কেউ বলেন, প্রাচীন আরবে দফ ছিল একমাত্র বাদ্যযন্ত্র, আধুনিক যুগে তার উন্নত সংস্করণই আজকের বাদ্যযন্ত্র। এমনকি কেউ কেউ তো বিয়ে-শাদিতে গান-বাজনাকে সুন্নত বলেও দাবি করে বসেন।

এই বিভ্রান্তির বাস্তব প্রভাব যে কতটা গভীর, তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। আমার এক ছাত্র একদিন এসে বলল, “উস্তাদ, বাদ্যসহ গান জায়েয বলা হয়েছে—এ কথা শোনার পর গানের প্রতি আমার সংকোচ কেটে গেছে। এখন শুনতে বেশ আনন্দ লাগে।” তার কথা শুনে আমি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করলাম—এ অবস্থায় তার কাছে কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে প্রিয় শিল্পীর গানই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। আর এটিই তো শয়তানের মূল উদ্দেশ্য—আল্লাহর বান্দাকে কুরআন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।

এ কারণেই সাহাবায়ে কেরামের একজন, হযরত আবু বকর রা., গান-বাজনাকে ‘শয়তানের বাঁশি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাস্তবতা হলো, এই বাঁশির প্রভাব যেকোনো রূপকথার বাঁশিওয়ালার চেয়েও ভয়াবহ।


কুরআনের আলোকে গান-বাজনা

আল্লাহ তাআলা সূরা লুকমানে আখিরাতমুখী মুমিনদের প্রশংসার পর দুনিয়ামুখী লোকদের প্রসঙ্গে বলেন—

“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার কথা ক্রয় করে, যেন আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।”
(সূরা লুকমান: ৬)

তাফসীরকারগণ উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পেছনে নযর ইবনে হারিস নামক এক ব্যক্তির ঘটনা রয়েছে। সে বিদেশ থেকে এক গায়িকা দাসী এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করেছিল। কেউ কুরআন শুনতে চাইলে সে গায়িকাকে দিয়ে গান গাওয়াত এবং বলত—কুরআন শুনে নামাজ-রোজা ও ত্যাগের কথা শোনার চেয়ে গান শুনে জীবন উপভোগ করাই ভালো। এই প্রেক্ষাপটেই আয়াতটি নাযিল হয়।


সাহাবী ও তাবেয়ীদের ব্যাখ্যা

এই আয়াতে ব্যবহৃত “লাহওয়াল হাদীস” সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা অত্যন্ত স্পষ্ট।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. শপথ করে বলেছেন—এ দ্বারা গানকেই বোঝানো হয়েছে। একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইবনে আব্বাস রা. ও ইবনে উমর রা.। তাবেয়ী সাঈদ ইবনে যুবাইর ও হাসান বসরী রাহ.ও বলেছেন—এই আয়াত গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে, যা মানুষকে কুরআন থেকে গাফেল করে।

কুরআনের আরেক আয়াতে ইবলিসকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে—

“তুই তোর আওয়াজ দ্বারা যাকে পারিস বিভ্রান্ত কর।”
(সূরা ইসরা: ৬৪)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রা. বলেন—যে সব বিষয় মানুষকে গুনাহের দিকে আহ্বান করে, তাই শয়তানের আওয়াজ। তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. স্পষ্টভাবে বলেন—এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকেই বোঝানো হয়েছে।


গান-বাজনার নৈতিক ও আত্মিক ক্ষতি

সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র বহু গুনাহের সমষ্টি। এর মধ্যে রয়েছে—

  • নিফাকের বীজ বপন
  • ব্যভিচারের প্রতি প্রবণতা সৃষ্টি
  • অন্তরের ওপর পর্দা পড়া
  • কুরআনের প্রতি অনীহা
  • আখিরাত চিন্তা দুর্বল হয়ে যাওয়া
  • গুনাহের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি

এই ক্ষতিগুলোই গান-বাজনার নাজায়েয হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবুও রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে বহু হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।


হাদীসের সুস্পষ্ট ঘোষণা

রাসূলুল্লাহ ﷺ গায়িকা ক্রয়-বিক্রয়, গান শিক্ষা ও এর ব্যবসাকে হারাম ঘোষণা করে বলেছেন—

“গায়িকা ক্রয়-বিক্রয় করো না, তাদের গান শেখাও না। এসবের আয় সম্পূর্ণ হারাম।”

আরেক হাদীসে তিনি সতর্ক করে বলেন—

“আমার উম্মতের একদল লোক মদের নাম বদলে তা পান করবে, আর তাদের মাথার ওপর গান ও বাদ্যযন্ত্র বাজতে থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে ভূ-ধ্বসে গ্রাস করবেন।”

এছাড়া সহীহ বুখারীতে স্পষ্টভাবে এসেছে—এক সময় এমন লোক তৈরি হবে যারা ব্যভিচার, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।


সাহাবীদের বাস্তব আমল

সাহাবায়ে কেরাম শুধু কথায় নয়, বাস্তব জীবনেও গান-বাজনা থেকে কঠোরভাবে দূরে ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাঁশির আওয়াজ শুনে কানে আঙুল দিয়ে পথ চলেছিলেন—এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তিনি ঠিক এভাবেই করতে দেখেছেন।

হযরত আয়েশা রা. এমনকি নুপুরের আওয়াজও সহ্য করতেন না। তিনি বলতেন—যে ঘরে ঘণ্টি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।


চার ইমামের ঐক্যমত

ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল—চার ইমামই গান ও বাদ্যযন্ত্রকে হারাম বলেছেন। কেউই একে জায়েয বলেননি। কেবল বিবাহের ঘোষণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওলীমায় দফ ব্যবহারের সীমিত অনুমতি রয়েছে—তাও শর্তসাপেক্ষে এবং তা বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না।


দফ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যার জবাব

দফ একপাশ খোলা একটি সরল বস্তু, যার আওয়াজ সুরেলা নয়। মুহাদ্দিসগণ একে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে গণ্য করেননি। দফের আওয়াজ যদি সুরেলা ও আকর্ষণীয় হয়ে যায়, তবে সেটিও নাজায়েয হয়ে যাবে—এ বিষয়ে আলেমদের ঐক্যমত রয়েছে।

অতএব “দফ ছিল তৎকালীন সর্বোচ্চ বাদ্যযন্ত্র”—এই দাবি ঐতিহাসিক ও শরয়ী উভয় দিক থেকেই ভুল।


আধুনিকতার নামে বিকৃতি

আজ ইসলামের নামে যেসব ‘আধুনিক’ ফতোয়া শোনা যায়—গান-বাজনা, অবাধ মেলামেশা, দাড়ির অবমূল্যায়ন, পর্দা শিথিলকরণ—এসব আসলে ইসলামের আধুনিকতা নয়; বরং ইসলামের সীমা লঙ্ঘন।

ইসলাম নিজেই চির আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এতে যেমন বাড়াবাড়ি নেই, তেমনি শিথিলতারও অবকাশ নেই। সাহাবায়ে কেরামের জীবনই তার বাস্তব প্রমাণ।

উপসংহার

আমরা কেউই এ দাবি করতে পারি না যে, সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে আমরা ইসলাম বেশি বুঝে ফেলেছি। সুতরাং আমাদের ঈমান, আমল ও ফতোয়াকে অবশ্যই তাদের মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে।

একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি যথার্থই বলেছেন—
“আধুনিক হও, এতে দোষ নেই; কিন্তু আধুনিক হতে গিয়ে মানবিকতা হারিও না এবং শয়তানের সাথী হয়ো না।”


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

  মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এ...