4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ বিলীনে নিপীড়নের একাল-সেকাল > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ বিলীনে নিপীড়নের একাল-সেকাল

 



হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ বিলীনে নিপীড়নের একাল-সেকাল, ইতিহাসের বয়ান!

-------------------------------------------------------


'বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ নিয়ে গবেষণা করা শ্রী নরেশ কুমার মনে করেন, বৌদ্ধবাদের বিরোধিতা ও একইসাথে ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যবাদের পুনর্স্থাপনের জন্যে, ব্রাহ্মণ পুনর্জাগরণীরা তিন ধাপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন।


প্রথম ধাপে তারা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর অত্যাচারের অভিযান শুরু করেন। এরপরে তারা বৌদ্ধ ধর্মের ভালো দিকগুলো আত্মস্থ করে নেয় যাতে করে "নীচু" জাতের বৌদ্ধদের মন জয় করা যায়। কিন্তু বাছাইকৃত আত্মীকরণের এই ধাপে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয় তা নিশ্চিত রাখা হয়। বৌদ্ধবাদ ধ্বংস প্রকল্পের শেষধাপে – 'গৌতম বুদ্ধ হিন্দু বিধাতা বিষ্ণুর আরেকটি অবতার ছাড়া আর কিছুই নন' – এই ধারণা চালু করে তা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে বুদ্ধকে ব্রাহ্মণ্যবাদের সর্বদেবতার মন্দিরের অগুন্তি ঈশ্বরের সামান্য একটিমাত্র-তে পরিণত করা হয়। অবশেষে, বৌদ্ধরা মূলত শুদ্র আর অচ্ছুত হিসেবে জাতপ্রথায় আত্মীকৃত হলেন – আর এভাবেই নিজ জন্মভূমিতেই বৌদ্ধরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগলেন।


নরেশ কুমার বলেন, "বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে চলা এই নির্মূলাভিযানকে বৈধতা দিতে ব্রাহ্মণ্য লেখাগুলোতে বৌদ্ধদের প্রচণ্ডভাবে তিরস্কার করা হয়।

 মনুসংহিতায় মনু বলেন, "কেউ যদি বুদ্ধকে স্পর্শ করে […] তবে সে স্নান করে নিজেকে শুচি-শুদ্ধ করে নেবে।"

 অপরাকা তার গ্রন্থে একই ধরণের আদেশ দেন। ব্রাদ্ধ হরিত ঘোষণা করেন যে বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করাই পাপ, যা কেবল আচারিক স্নানের মাধ্যমে স্খলিত হতে পারে। এমনকি সাধারণ জনগণের জন্যে লেখা নাটিকা কিংবা পুথিগুলোতেও ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা বুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘৃণার অর্গল ছড়িয়েছেন। প্রাচীন নাটিকা 'মৃচ্ছাকথিকা'তে (পর্ব ৭), নায়ক চারুদত্ত এক বৌদ্ধ সন্তকে হেঁটে আসতে দেখে, বন্ধু মৈত্রীয়কে ক্রোধক্তিতে বলেন – 'আহ্‌! কী অশুভ দৃশ্য – এক বৌদ্ধ সন্ত দেখছি আমাদের দিকেই আসছে।''


"ছয় শতকের গোড়ার দিক থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে স্থানীয় রাজাদের উত্থান হতে থাকে এবং স্থানীয় রাজাদের হাতেই বাংলা এবং উত্তর ভারত শাসিত হতে থাকে। সাত শতকের শুরুতে (৬০১ খ্রিস্টাব্দে) পশ্চিম বঙ্গে হিন্দু রাজা শশাঙ্কের আবির্ভাব হয়। তার শাসনকাল ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। শশাঙ্ক ছিলেন চরম বৌদ্ধ বিদ্ধেষী। শশাঙ্কের নিষ্ঠুর অত্যাচারে অনেক বাঙালি বৌদ্ধ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

( R .C. Majumdar, বাংলা দেশের ইতিহাসঃ প্রাচীন যুগ, ১৯৮৮, পৃঃ১২৮।)


রাজা শশাঙ্কের বৌদ্ধনীতি সম্পর্কে রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ‘সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্ত যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের পর্যন্ত যে না হত্যা করিবে, সে প্রাণদন্ডে দণ্ডিত হইবে-রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ। (শ্রীচারু বন্দোপাধ্যায়, রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান, পৃষ্ঠা ১২৪)


'হিউয়েন সাং  শশাঙ্কের কয়েকটি বৌদ্ধ ধর্মবিরোধী কাজকর্মের উদাহরণ তুলে ধরেন,


*কুশীনগর বৌদ্ধবিহার থেকে বৌদ্ধদেরকে তাড়িয়ে সমূলে বৌদ্ধধর্মের বিনাশ ঘটান।


*পাটলিপুত্রে বুদ্ধের পদচিহ্ন অঙ্কিত এক খণ্ড পাথর গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করেন।


*গয়ার বোধিবৃক্ষ (বোধিবৃক্ষঃ যে গাছের নিচে কঠোর  তপস্যার ফলে সিদ্ধার্থ বোধি প্রাপ্ত হন। তাই গাছটি বৌদ্ধদের কাছে পবিত্রতম বলে বিবেচিত ছিল) কেটে মাটি খুঁড়ে এর শিকড়গুলো কেটে ফেলে বাকি যা ছিল সব আগুনে পোড়ান।


*নিকটবর্তী বৌদ্ধ মন্দির থেকে বুদ্ধমূর্তি সরিয়ে সেখানে শিবের মূর্তি প্রতিস্থাপন করেন।'


কুশিনগর বা হার্রাম্বাতে গৌতম বুদ্ধ মারা যান বিধায় এটি বৌদ্ধদের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান। এই নামকরা শহরের চাকচিক্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ব্রাহ্মণরা এই কুৎসা রটায় যে এই শহরে মৃত্যু হলে সে সরাসরি নরকে চলে যাবে কিংবা পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাবে – কিন্তু ব্রাহ্মণীয় পবিত্র নগর কাশিতে মৃত্যু হলে সে সরাসরি স্বর্গে চলে যাবে।"


সবার প্রিয় 'কৌটিল্যে'র বৌদ্ধ ও নিচু বর্ণের হিন্দুদের সম্পর্কে একটি মন্তব্য!


'অর্থশাস্ত্র গ্রন্থের রচয়িতা ব্রাহ্মণ বর্ণের চাণক্য ঘোষণা করেন,

 "যদি কেউ শক্য (বৌদ্ধ), অজিবিকাশ, শুদ্র বা নিষ্ক্রান্ত ব্যক্তিদের ঈশ্বর বা পূর্ব-পুরুষদের পূণ্যার্থে উৎসর্গিত ভোজসভায় যোগদান করে – তবে তার উপর একশ পানা অর্থদণ্ড আরোপিত হবে।"


ওডিশার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরটি মূলত একটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল। পরবর্তীতে হিন্দুরা তা জোরপূর্বক দখল করে নিজেদের ধর্মীয় স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

জগন্নাথ মন্দির বিষয়ে  বিখ্যাত শিল্প ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ স্টেলা ক্র্যামরিশ (Stella Kramrisch) লিখেছেন:

“The image of Jagannath is clearly non-Brahmanic and has Buddhist affinities.”

— Stella Kramrisch, "The Hindu Temple", Volume 2, p. 324।


বিখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর “History and Culture of the Indian People” গ্রন্থে লিখেছেন:

"It is highly probable that the cult of Jagannath is originally a Buddhist one which was gradually assimilated by Hinduism."

— R.C. Majumdar, "History and Culture of the Indian People", Volume 3, p. 505

শুধু দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদই নয়, জগন্নাথ মন্দিরটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

স্বামী বিবেকানন্দ নিজেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর "বাণী ও রচনা" গ্রন্থের ৫ম খণ্ডে (পৃষ্ঠা ১৫৮) লিখেছেন:

 "যাহারা ভারতের ইতিহাস কিছুমাত্র জানেন, তাহাদের নিকট পুর্বোক্ত বিবৃতি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পুস্তকখানি আগাগোড়া প্রতারণা। কারণ জগন্নাথ-মন্দির একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির। আমরা ঐটিকে এবং অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দির করিয়া লইয়াছি।"

— স্বামী বিবেকানন্দ, বাণী ও রচনা ৫/১৫৮।


জগন্নাথ মন্দির দখল স্রেফ কোন স্থাপনা দখল মনে করলে ভুল হবে। এটি নির্দিষ্ট কোন জনপদ হতে পুরোপুরিভাবে বৌদ্ধ নিধনের পর মন্দির পুনর্গঠন এবং দেবতার রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে বৌদ্ধ প্রভাব সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চেষ্টা হয়।


ড.দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, “যে জনপদে (পূর্ববঙ্গ) একর কোটির অধিক বৌদ্ধ এবং ১৫৫০ ঘর ভিক্ষু বাস করিত, সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই। যে পূর্ব ভারত বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান লীলাকেন্দ্র ছিল, তথায় বৌদ্ধ ধর্মের যে অস্তিত্ব ছিল, তাহাও ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক চেষ্টায় অধুনা আবিস্কৃত হইতেছে”। 

(প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা ১‌১-১২)


ড. দীনেশ চন্দ্র সেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন ........

" ....বৌদ্ধগণ এতটা উৎপীড়িত হইয়াছিল যে তাহারা মুসলমানদের পূর্বকৃত শত অত্যাচার ভুলিয়া বিজয়ীগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলন এবং মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয় ভগবানের দানস্বরূপ মনে করিয়াছিল। শূন্যপুরাণের ‘নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক অধ্যায়ে দেখা যায়-তাহারা (বৌদ্ধরা) মুসলমানদিগকে ভগবানের ও নানা দেবদেবীর অবতার মনে করিয়া তাহাদের কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলনে নিতান্ত আনন্দিত হইয়াছিল।….ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে....

(ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৫২৮)


এদেশে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের পুনর্ভ্যুদয়ে বিজিত বৌদ্ধদিগের প্রতি যেরূপ কঠোর নিপীড়ন চলিয়াছিলো, তাহাতে বৈষ্ণবেরা যদি সেই সকল হতভাগ্যের জন্য স্বীয় সমাজের দ্বার উদঘটনা না করিতেন, তবে সেই শ্রেণীর সকলেই মুসলমান হইয়া যাইতো।

 (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-১০)।।


হিন্দুত্ববাদীদের বৌদ্ধ নিপীড়ন ও মন্দির দখল এখনো বন্ধ হয়নি। 


২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ভারতের বিহারের মহাবোধি মন্দির, যেটা বৌদ্ধ দের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী, মহাবোধি মন্দির হলো সেই স্থান যেখানে গৌতম বুদ্ধ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। ২৬০ খ্রিষ্টপূর্বে সম্রাট অশোক বুদ্ধ গয়া সফরের পর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, যা বুদ্ধের আত্মপ্রকাশের প্রায় ২০০ বছর পর।

১৩শ শতাব্দীতে অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এর অবস্থা পাল্টাতে শুরু করে। ১৩শ থেকে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত মন্দিরটি অনেকটা পরিত্যক্ত ছিল। ১৫৯০ সালে এক হিন্দু সাধু মন্দিরে এসে বসবাস করতে শুরু করেন, যেখানে তিনি পূজা-অর্চনা করতেন। পরবর্তীতে সেখানে বুদ্ধ গয়া মন্দির নামে একটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকে মন্দিরটি তাদের উত্তরাধিকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

বিহারের বুদ্ধ গয়া মন্দির ১৯৪৯ সালের একটি রাজ্য আইনের অধীনে গত ৭৬ বছর ধরে একটি ৮ সদস্যের কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কমিটিতে ৪ জন হিন্দু ও ৪ জন বৌদ্ধ সদস্য রয়েছেন। ভারতের সকল ধর্ম নিজ নিজ ধর্মীয় স্থানগুলোর দেখাশোনা ও পরিচালনা করে, তাহলে হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজন কেন একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থানের কমিটিতে যুক্ত হচ্ছেন? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকজনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে ও তারা এমন কিছু ধর্মীয় আচরণ ও অনুষ্ঠান করছে যা বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


কলমেঃ 

মঈন উদ্দিন চিশতী,

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

বাউল নামের ফাউল আর আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিদের পরিত্যাজ্য

  ইদানীং বাউলদের ফাউল আচরন আর সৃষ্টি কর্তার সাথে বেয়াদবীর সীমা অতিক্রম করেছে। আগের যুগে আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিরা যেরকম আচরন করত সেরকম আচরন...