ত্রিপুরা রাজার গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড স্বপ্ন: পার্বত্যাঞ্চলসহ ১১ জেলা গিলে খাওয়ার আগ্রাসী ষড়যন্ত্র...
প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেব বর্মা, এই নামটি শুনলেই মনে পড়ে ত্রিপুরার এক প্রাক্তন তথাকথিত রাজপরিবারের সদস্য, যিনি আজকাল রাজনীতির মাঠে 'বুবাগ্রা' নামে পরিচিত। কিন্তু এই 'বুবাগ্রা'র পিছনে লুকিয়ে আছে এক উগ্রবাদী মানসিকতা, যা শুধু ত্রিপুরার সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশের ভূখণ্ড দখলের স্বপ্ন দেখছে। জন্ম নেওয়া নয়াদিল্লির একটি বিলাসবহুল পরিবেশে, বর্তমানে আগরতলার উজ্জয়ন্ত প্রাসাদে বাসকারী এই কথিত 'মহারাজা', যিনি আসলে কোনো রাজত্বের অধিকারী নন, আজ TIPRA Motha পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। এই পার্টি, যা বির্তিক Indigenous Progressive Regional Alliance নামে পরিচিত, তার মাধ্যমে তিনি 'গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড' (Greatertipraland) নামক এক বিভ্রান্তিকর দাবি তুলে ধরেছেন, যা বাংলাদেশের ১১টি জেলাকে গিলে খাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এই ব্লগে আমি তার উৎপত্তি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক উস্কানিমূলক কথাবার্তা, ফেসবুক পোস্ট এবং মানচিত্রের মাধ্যমে তার আগ্রাসী মুখোশ খুলে ধরব। এটি শুধু একজন ব্যক্তির সমালোচনা নয়, বরং একটি জাতীয় হুমকির সতর্কবাণী।
প্রদ্যোতের জন্ম ৪ জুলাই, ১৯৭৮ সালে নয়াদিল্লিতে। তার বাবা কিরীট বিক্রম কিশোর দেব বর্মা এবং মা বিভু কুমারী দেবী, একটি কথিত রাজপরিবারের সদস্য হলেও, ত্রিপুরার মাটির সঙ্গে তার সরাসরি যোগসূত্র কতটা? তিনি শিলংয়ের সেন্ট এডমন্ডস কলেজ এবং নর্থ-ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু ত্রিপুরার উপজাতি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তার জন্মগত সম্পর্ক কোথায়? তিনি জার্নালিস্ট, ব্যবসায়ী এবং সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে TNT-The Northeast Today ম্যাগাজিনের এডিটরও ছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে TIPRA Motha-র চেয়ারম্যান হয়ে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, এবং ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (TTAADC) মেম্বার। তার কনস্টিটুয়েন্সি তাকারজালা-জম্পুইজালা। এই পদগুলো তার জন্য একটা ছদ্মবেশ, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ষড়যন্ত্র। তার দাদু বীর বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা ছিলেন ত্রিপুরার কথিত শেষ রাজা, কিন্তু প্রদ্যোতের চাচা জিষ্ণু দেব বর্মা বা বোন প্রগ্যা দেববর্মা এবং কৃতি দেবী দেবর্মানের মতো পরিবারের সদস্যরাও এই উগ্রবাদী পথে যোগ দেননি। তাহলে প্রদ্যোত কেন এতটা আগ্রাসী?
গত দুই বছরে প্রদ্যোতের উস্কানিমূলক কথাবার্তা বাংলাদেশের প্রতি তার বিদ্বেষকে প্রকাশ করেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার পোস্টগুলোতে চট্টগ্রাম বন্দর দখলের হুমকি, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি চাকমা, মারমা, তংচঙ্গ্যা, বম, খুমি, চাক, ম্রো, লুসাই, পাংখোয়া এবং রাখাইন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা উঠেছে। তিনি দাবি করেন যে এরা ত্রিপুরার সঙ্গে যুক্ত হতে চান, এবং 'গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড' এর অংশ হয়ে উঠবেন। কিন্তু এটা কি সত্যি? পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কখনো গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডের পক্ষে কথা বলেনি। তারা কখনো দাবি করেনি বরং কিছু তাদের জাতির সংগঠন নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে আসছে, যা বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ' এর আদলে মেনে নেয় এবং এখনো কিছু সংগঠন বিভিন্ন দাবিদাওয়া উত্থাপন করে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাসহ এই অঞ্চলগুলোতে বাঙালি জনগোষ্ঠী ৪০০০ বছর ধরে বসবাস করে আসছে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী যাযাবর, তাদের আদিনিবাস ইতিহাস অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু এরা কি বাংলাদেশের ভূখণ্ড দখলের অধিকার আছে? না, এটা প্রদ্যোতের কল্পনা, যা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে গত ১১ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.। তার ফেসবুক আইডি 'Bikram Manikya Deb Barma' থেকে এক পোস্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা দিল্লির ব্লাস্টের প্রেক্ষাপটে ISI-এর হুমকির কথা বলে। পোস্টে লেখা: "In view of what has happened in delhi blast it is becoming very clear ISI will train home grown terror amongst disgruntled youth to target India. I have reports from credible source to suggest the presence of Pakistani Generals and brigadiers in Chittagong and Dhaka. ISI is already on a recruitment drive to lure frustrated Youth of our region to wage a war against India. Politics should Take a backseat over national interest and we all need to ensure that our youth are given jobs, constitutional rights and development across. And we need to also ensure that our minorities are not just protected but also empowered in bangladesh."
এই পোস্টে তিনি চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় পাকিস্তানি জেনারেলদের উপস্থিতির কথা বলে বাংলাদেশকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন। এটা শুধু গুজব নয়, এর সঙ্গে যুক্ত একটা মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের ম্যাপ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম জেলা, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ১১টি জেলাকে লাল মার্ক করে 'গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড' নামকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই মানচিত্রটি একটা ষড়যন্ত্রের প্রতীক, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। প্রদ্যোতের এই দাবি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে আরও স্পষ্ট হয়েছে, যখন তিনি বলেন যে 'গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড' বাংলাদেশে সম্ভব, কারণ সেখানে উপজাতিদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু এটা কি তার জন্মস্থান নয়াদিল্লির কারণে তার অধিকার? না, বাংলাদেশ এক স্বাধীন ভূখণ্ড, যেখানে বাঙালিরা হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে। ত্রিপুরাদের যাযাবর জীবনযাপনের কারণে তারা কখনো এখানকার মালিক হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক, রাজনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রদ্যোতকে এক আগ্রাসী এবং সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী হিসেবে দেখেন। তার এই কথাবার্তা বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে, যা তার অধিকারের বাইরে। বাংলাদেশের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারত থেকে এমন একজন 'কথিত রাজা' বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা, কুৎসা এবং বিভ্রান্তিমূলক গুজব ছড়াতে পারছেন। এর ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। ভারতের উচিত তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, যেমন তার পার্টির ফান্ডিং কাটা বা রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা। যদি ভারত ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশকে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই মানচিত্র প্রত্যাহার এবং প্রদ্যোতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাতে হবে।
বাংলাদেশী সচেতন যুব সমাজ মনে করে, প্রদ্যোতের এই বাংলাদেশ মানচিত্র পরিবর্তন এবং ভাগের ষড়যন্ত্রের জন্য তার বিরুদ্ধে ভারতে এবং বাংলাদেশে মামলা করা উচিত। এধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজের জন্য তাকে শিক্ষা দেওয়া বাংলাদেশীদের জন্য জরুরি। তার উগ্র মানসিকতা যদি না রোধ করা হয়, তাহলে এটা শুধু সীমান্ত উত্তেজনা নয়, বরং একটা যুদ্ধের বীজ বপন করবে। বাঙালি জনগণ এই ধৃষ্টতা মেনে নেবে না, এর জবাবে 'বিষদাঁত উপড়ে ফেলা' হবে, যেমন আন্তর্জাতিক ফোরামে তার প্রচারণা উন্মোচন করে। প্রদ্যোতের স্বপ্ন ভেঙে দিতে হবে, না হলে বাংলাদেশের অখণ্ডতা বিপন্ন হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ