4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: জ্ঞানচুরির প্রাচীন কৌশল: মুসলিম বিজ্ঞানীদের পরিচয় বিলোপের ল্যাটিন প্রকল্প > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

জ্ঞানচুরির প্রাচীন কৌশল: মুসলিম বিজ্ঞানীদের পরিচয় বিলোপের ল্যাটিন প্রকল্প

 



মুসলিম বিজ্ঞানীদের আড়াল করার চক্রান্ত : ল্যাটিন অনুবাদে নাম পরিবর্তন।


মুসলিম বিজ্ঞানীদের আড়ালে রাখার ইউরোপীয় কৌশল: নাম বিকৃতি থেকে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা

মধ্যযুগের স্বর্ণযুগে বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চায় মুসলিম সভ্যতার অবদান ছিল বিপুল ও নির্ণায়ক। ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত, তখন মুসলিম দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ ও চিকিৎসকেরা মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণার শক্তিতে। কিন্তু পরবর্তীতে ইউরোপে এই জ্ঞানভান্ডার স্থানান্তরের সময় একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা দেখা যায়—মুসলিম বিজ্ঞানীদের পরিচয় আড়াল করা, বিশেষ করে ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে তাদের নাম বিকৃত করা।

বিশ্বজুড়ে কোনো লেখকের রচনা অনুবাদ করার ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হলো—বই অনুবাদ হবে, কিন্তু লেখকের নাম অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়। তাদের পূর্ণ আরবি নাম বাদ দিয়ে ল্যাটিনে এমনভাবে রূপ দেওয়া হয় যাতে বোঝাই না যায়—তারা ছিলেন মুসলমান। এ ধরনের ঘটনার অন্য কোনো নজির পৃথিবীর সাহিত্য-ইতিহাসে নেই। অধ্যাপক জর্জ সারটন তাই মন্তব্য করেছিলেন—ইউরোপ পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদানকে অস্পষ্ট করতে চেয়েছিল, এবং ল্যাটিন নামকরণ তারই রাজনৈতিক প্রকাশ।

আরবি রচনাগুলো যখন ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ হলো, তখন দেখা গেল—দীর্ঘ আরবি নাম সংক্ষিপ্ত এক রূপে পরিবর্তিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বহু অনুবাদক নিজেদের নামে পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করেছেন; এমনকি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় জ্ঞানসম্পদের সঙ্গে যেমন লুটতরাজ হয়েছে, তেমনি মুসলিম জ্ঞানভান্ডারের ক্ষেত্রেও আয়োজন ছিল একই।

নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ—

ইবনে সিনা—যার পূর্ণ নাম ছিল আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা, তাঁকে ইউরোপ চেনে Avicenna হিসেবে।
খাওয়ারিজমি—আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি; ল্যাটিনে তিনি Algorism, যার থেকেই “Algorithm” শব্দের উৎপত্তি।
ইবনে বাজ্জাহ—যিনি আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহিয়া আল-সায়িগ নামেই পরিচিত ছিলেন; ইউরোপে তিনি Avempace
আল-ফরগানি—আবু আল-আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাছির ফরগানি; ল্যাটিনে রূপ Alfraganus
ইদ্রিসী—বিশ্বের প্রথম নির্ভুল মানচিত্র নির্মাতা; তাঁর দীর্ঘ আরবি নাম মুছে তাঁকে করা হয়েছে Dreses

এগুলো শুধু কিছু উদাহরণ। সত্য হলো—প্রায় সকল মুসলিম বিজ্ঞানীর নাম এভাবেই বিকৃত করা হয়েছে, ώστε ইউরোপীয় পাঠক বুঝতেই না পারেন যে জ্ঞানের এই বিশাল ভাণ্ডার এসেছে মুসলিম চিন্তাশীলদের কাছ থেকে।

কিন্তু নাম বিকৃতি ছিল প্রচেষ্টার মাত্র একটি দিক। এর পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে অস্পষ্টতা ছড়ানো হয়। ইতিহাসের কিছু ইউরোপীয় লেখক দাবি করেন—মুসলিম বিজ্ঞানীদের অনেকে প্রকৃতপক্ষে মুসলিমই ছিলেন না; বরং জোরোয়াস্ট্রিয়ান, ইহুদি, কিংবা ইউরোপীয় জাতিসত্তার ছিলেন। রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান তার বড় উদাহরণ। বলা হয়—“জাবির” নামে এক ইউরোপীয় রসায়নবিদ ছিলেন, যিনি নাকি আসল আবিষ্কারের পেছনে ছিলেন—এ দাবি আজও কিছু ইউরোপীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়।

খাওয়ারিজমি নিয়েও একই অপপ্রচার। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়—তিনি নাকি মুসলিম ছিলেন না; বরং ছিলেন জোরোয়াস্ট্রিয়ান। এমনকি দাবি করা হয়—‘দ্বিতীয় খাওয়ারিজমি’ নামের আরেক ব্যক্তি গণিতে প্রথম শূন্য ব্যবহার করেন।

আল-ফরগানি—যিনি পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ে বিশ্ববিখ্যাত—তাঁর ক্ষেত্রেও একই প্রচেষ্টা দেখা যায়। বলা হয়—ফরগানি নাকি দু’জন ছিলেন, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় কার প্রকৃত কীর্তির উত্তরাধিকার কাকে দেওয়া হবে।

এইসব পরিকল্পিত বিকৃতি–তত্ত্বের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: মুসলিম সভ্যতার অগ্রণী অবদানকে পশ্চিমা ইতিহাসে আড়াল করা বা গুরুত্বহীন করে দেখানো। শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বহু আলেম ও বিজ্ঞানী রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়ে কারাবন্দি হন, অথবা হত্যা হন; ফলে মুসলিম বিশ্বের বহু জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আলোচনার বাইরে পড়ে যান।

আজ আমরা কোপার্নিকাস, নিউটন এবং গ্যালিলিওর নাম মুখস্থ করলেও খুব কম মানুষ জানেন—তাদের বহু তত্ত্ব ও গণনার ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন ইবনে বাজ্জাহ, ইবনে রুশদ এবং নাসিরুদ্দিন তুসি।
তাদের কাজই পরে ইউরোপীয় রেনেসাঁর কেন্দ্রে স্থান পেয়েছিল—কিন্তু তাদের নামধাম, পরিচয় ও ভূমিকা প্রায় মুছে ফেলা হয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলোর অন্যতম হলো এই পরিচয়-বদলের প্রক্রিয়া। ইউরোপীয় অনুবাদের পর যে নামগুলো আমাদের কাছে পরিচিত, সেগুলো আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক পর্দা—যা সরালে দেখা যায় মুসলিম সভ্যতার অবদান সভ্যতার ইতিহাসে কতটা গভীর।

তবুও, এ দৃশ্যপট পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। কারণ জ্ঞান কখনও লুকিয়ে থাকে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিজেই সত্যকে টিকিয়ে রাখে। পৃথিবীতে বিজ্ঞান যতদিন থাকবে, ততদিন থাকবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম, অবদান ও কীর্তি—যদিও তা একসময়ে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।

জ্ঞানচর্চার ইতিহাস তাই আজও প্রমাণ করে—
যে সভ্যতা বিজ্ঞানকে লালন করেছে, তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না।
আর সত্যকে বিকৃত করা যায়, কিন্তু স্থায়ীভাবে ধামাচাপা দেওয়া যায় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

  মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এ...