4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: সেপ্টেম্বর 2025 > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

চূড়ান্ত পথভ্রষ্ট হিন্দুরাই মূর্তিপূজা করে, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রের ঘোষনা

মূর্তি পূজা হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ 


১) ঈশ্বর মাত্র একজন; দ্বিতীয় কেউ নেই।
ছান্দগ্য উপনিষদের: অধ্যায় ০৬ অনুঃ ২ পরিঃ ০১।
২) সবশক্তিমান ঈশ্বরের কোন বাবা মা নেই। তার কোন প্রভু নেই। তার চেয়ে বড় কেউ নেই।
শ্বেতাসত্র উপনিষদের: অধ্যায় ০৬ অনুঃ ০৯।
৩) তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে; যারা প্রাকৃতিক বন্তুর পূঁজা করে। যেমনঃ আগুন, গাছ, সাপ ইত্যাদি।
যযুবেদ অধ্যায় ৪০ অনুঃ ০9
৪) সবশক্তিমান ঈশ্বরের মত কেউ নেই ( তার কোন প্রতিমূর্তি নেই, প্রতিমা নেই, রুপক নেই, ভাস্কর্য নেই)।
শ্বেতাসত্র উপনিষদের: অধ্যায় ০৪ অনুঃ ১৯।
৫) সবশক্তিমান ঈশ্বরকে কেউ দেখতে পাই না।
শ্বেতাসত্র উপনিষদের: অধ্যায় ০৪ অনুঃ ১০ পরিঃ ২০।
৬) যাদের বিচার বুদ্ধি কেড়ে নিয়েছে জাগতিক আকাঙ্খা তারাই অপদেবতার পূজা করে।
ভগবত গীতা : অধ্যায় ০৭ অনুঃ ২০।


৭) লোকে জানে আমি কখনও জন্মাইনি ও উদ্ভূত হয়নি; আমি এই বিশ্বজগতের সবময় প্রভু
ভগবত গীতা : অধ্যায় ১০ অনুঃ ০৩।


৮) সবশক্তিমান ঈশ্বরের কোন মূর্তি নেই।
যযুবেদ অধ্যায়ঃ ৩২ অনুঃ ০৩


৯) তারা আরো বেশি অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে; যারা মানুষের তৈরী বস্তুর পূঁজা করে। যেমন- মাটির পতুল, ভাস্কর্য ইত্যাদি।
যযুবেদ অধ্যায় ৪০ অনুঃ ০9


১০) সৃষ্টিকর্তা সুমহান
গ্রন্থঃ ২০ খন্ডঃ ৫৮ মন্ত্রঃ ৩।


১১) সত্য একটাই; ঈশ্বর একজনই, জ্ঞানীরা ইশ্বরকে ডেকে থাকেন অনেক নামে।
ঋগবেদের গ্রন্থঃ ০১ অনুঃ ৬৪ পরিঃ ৪৬।


১২) সবশক্তিমান ঈশ্বর নিরাকার ও পবিত্র।
যযুবেদ অধ্যায় ৪০ অনুঃ ০৮।


১৩) ঈশ্বর বাদে আর কারো উপাসনা কর না; শুধুমাত্র তার উপসনা কর যিনি সুমহান ঈশ্বর।
ঋগবেদ গ্রন্থঃ ০৮ খন্ডঃ ০১ মন্ত্রঃ ০১।


আর ব্রক্ষাসূত্র বলেঃ ঈশ্বর মাত্র একজনই; দ্বিতীয় কউ নেই। কেউ নেই, কেউ নেই আর কেউ কখনও ছিলোও না।


(যজুর্বেদ ৩২/৩, মহর্ষির ভাষ্য সহিত)


ন তস্য প্রতিমা অস্তি য়স্য নাম মহদ্ য়শঃ।
হিরণ্যগর্ভ ইত্যেষ মা মা হিংসীদিত্যেষা য়স্মান্ন জাত ইত্যেষঃ।।

অনুবাদ: যাঁর মহান প্রসিদ্ধ যশ রয়েছে সেই পরমাত্মার কোনো প্রতিমা নেই। “হিরণ্যগর্ভ” আদি মন্ত্রে, “মা মা হিংসীত্” এই মন্ত্রে ও “য়স্মান্ন জাত” এই মন্ত্রে সেই পরমাত্মার বর্ণন রয়েছে।
মহর্ষির ভাষ্য “ন নিষেধে তস্য পরমেশ্বরস্য প্রতিমা প্রতিমীয়তে য়য়া তৎপরিমাপকং সদৃশং তোলনসাধকং প্রকৃতিরাকৃতিরবা অস্তি বর্ততে” অর্থাৎ সেই পরমেশ্বরের তুল্য পরিমাণ সদৃশ সাধক প্রতিকৃতি বা মূর্তি কিছুই নেই।
সম্প্রদায়বাদী সেই গোঁড়াদের দাবি এই মন্ত্রে প্রতিমা শব্দ দ্বারা নাকি মূর্তিকে বোঝায় নি, কেবল উপমা বা তুলনা অর্থে বুঝিয়েছে। তাদের দাবি পুরাতন ভাষ্যকাররা নাকি এমন কোনো অর্থ করে যাননি, মহর্ষি দয়ানন্দই কেবল এই অর্থ করেছেন।
বেশ দেখুন তাদের আদরণীয় উবট ও মহিধর কি ভাষ্য করেছে,


যজুর্বেদ ৩২/৩, উবট ও মহিধর ভাষ্য সহিত

“ন তস্য পুরুষস্য প্রতিমা প্রতিমানভূতং কিঞ্চিদ্বিদ্যতে”(উবট)
এবং
“তস্য পুরুষস্য প্রতিমা প্রতিমানমুপমানং কিঞ্চিদ্বস্তু নাস্তি”(মহিধর)

অর্থাৎ সেই পুরুষের প্রতিমা, তুলনা বা উপমা কিছুই নেই।

উভয়েই বলছেন প্রতিমা নেই।
এই মন্ত্র দ্বারা যেমন প্রমাণ হয় ঈশ্বরের তুল্য কিছু নেই, তেমনি তাঁর প্রতিমা বা মূর্তি নেই। প্রতিমা অর্থ যে মূর্তি হয় তা মানতে নারাজ পণ্ডিতম্মন্যরা। মূর্তি শব্দ অবৈদিক দেখে বেদে মূর্তি শব্দ নেই, সে স্থলে আছে প্রতিমা। প্রতিমা অর্থ যে মূর্তি তা বৈদিক কোষেও উল্লেখিত আছে।




দেখা যায় প্রতিমা=উপমা দেখাতে তারা সাধারণ বাংলা অভিধান ইউজ করে৷ অথচ একটি বিখ্যাত প্রাচীন অভিধান অমরকোষ এ প্রতিমার ৮ প্রতিশব্দ আছে যা মূর্তি নির্দেশ করে৷ অমরকোষ ২.১০.৩৫
প্রতিমানং প্রতিবিম্বং প্রতিমা প্রতিয়াতনা প্রতিচ্ছায়া।
প্রতিকৃতিরর্চা পুংসি প্রতিনিধিরুপমোপমানং স্যাত্।।




চলুন বৈদিক ঈশ্বরের সাকার নিরাকার কি আকার সে নিয়ে বেদ উপনিষদ কি বলে তা দেখে নিই:
যজুর্বেদ ৪০/৮ বলছে ঈশ্বর অকায়ম(সর্বপ্রকার শরীররহিত)।



আচার্য শঙ্করের ভাষ্য দেখুন, তিনিও বলছেন সেই আত্মা(পরমাত্মা) স্থুল, সূক্ষ্ম শরীর বিবর্জিত

ঈশ উপনিষদ ৮, শঙ্কর ভাষ্য,




এবার তাহলে প্রশ্ন রইল, যার কোনো শরীরই নেই তাঁর মূর্তি বা প্রতিমা আপনারা কিভাবে তৈরি করবেন? 

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদও বলছে, “তাঁর কোনও প্রতিরূপ বা প্রতিমা নেই”(৪/১৯) এবং “সনাতনের কোন রূপ নেই যা চক্ষুর গোচর হয়, দৃষ্টির দ্বারাও তাঁকে কেও দেখে না”(৪/২০)।




কঠ উপনিষদেও ১/২/২২ এ বলা হচ্ছে ব্রহ্ম প্রাণীগণের শরীরে থেকেও শরীর রহিত,

কঠ উপনিষদের ১/৩/১৫ তে আরও বলা হয়েছে, পরমাত্মা অরূপম বা রূপহীন, কেবল সেই পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারলেই মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/১০-এও একই কথা বলা হয়েছে।

একই কথা বলছে তৈত্তিরীয় উপনিষদের ব্রহ্মানন্দবল্লীর সপ্তম অনুবাক,



মুণ্ডক উপনিষদ ২/১/২ তো বলেই দিচ্ছে, সেই দিব্য পুরুষ অমূর্ত বা মূর্তিহীন
সেই পরমেশ্বরের মূর্তি তো দূরে থাক, 


শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/৯ বলছে সেই ঈশ্বরের কোনও চিহ্নবিশেষও নেই,


১. না তাস্তে প্রাতীমা আস্থি ( যজুর্বেদ ৩২ অধ্যায় ৩ নং অনুচ্ছেদ )
অর্থাৎ ঈশ্বরের কোন প্রতি মূর্তি নেই ।

“যাদের মন ঝড় কামনা বাসনার ধারা বিক্ষিপ্ত/বিকৃত তারা অন্য দেব দেবীর স্মরনাগত হয় এবং তাদের সেই স্বভাব অনুসারে নিয়ম পালন করে দেবতাদের উপাসনা করে।” (গীতার সপ্তম অধ্যের ২০ নাম্বার শ্লোক)



২. যারা নিজের বিবেক বুদ্ধি হারিয়েছে তাঁরাই মূর্তি পূজা করে ( ভগবৎ গীতা অধ্যায় ৭, অনুচ্ছেদ ২০ নম্বর ) ।
রেফারেন্স সহ দিলাম ।
৩. হিন্দুরা অনেক দেব দেবির পুজা করলেও হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ গুলোতে হিন্দুদের কেবল মাত্র এক জন ইশ্বরের উপাসনা করতে বলা হয়েছে॥
বেদের ‘ব্রহ্ম সুত্র’ তে আছে “একম ব্রহ্মা দ্বৈত্য নাস্তি নহিনা নাস্তি কিঞ্চন” অর্থাৎ ইশ্বর এক তার মত কেউ নেই কেউ নেই সামান্যও নেই । আরও আছে “সে একজন তারই উপাসনা কর” (ঋকবেদ ২;৪৫;১৬)।
“একম এবম অদ্বৈত্তম” অর্থাৎ সে একজন তাঁর মত আর দ্বিতীয় কেউ নেই (ঋকবেদ ১;২;৩) ।
“এক জনেই বিশ্বের প্রভু” (ঋকবেদ ১০;১২১;৩) ।
৪. হিন্দু ধর্মে মুর্তি পুজা করতে নিষেধ করা হয়েছে॥
ভগবত গীতা – অধ্যায় ৭ – স্তব ২০ – [ যাদের বোধশক্তি পার্থিব আকাঙক্ষার মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে গেছে শুধু তারাই উপদেবতার নিকটে উপাসনা করে। ]
৫. ভগবত গীতা – অধ্যায় ১০ – স্তব ৩ –
[ তারা হচ্ছে বস্তুবাদি লোক ,তারা উপদেবতার উপাসনা করে ,তাই তারা সত্যিকার স্রস্টার উপাসনা করে না।]
৬. যজুর্বেদ – অধ্যায় ৪০- অনুচ্ছেদ ৯ –
[ অন্ধতম প্রভিশান্তি ইয়ে অশম্ভুতি মুপাস্তে – যারা অশম্ভুতির পুজা করে তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। তারা অধিকতর অন্ধকারে পতিত হয় শাম মুর্তির পুজা করে । অশম্ভুতি হল – প্রাকৃতিক বস্তু যেমন- বাতাস,পানি,আগুন । শাম মুর্তি হল – মানুষের তৈরী বস্তু যেমন – চেয়ার ,টেবিল ,মূর্তি ইত্যাদি।]
এরকম আরো অনেক রেফারেন্স আছে যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে হিন্দু ধর্মে মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ।
জানি , হিন্দুরা মূর্তি দিয়ে পূজা নিষিদ্ধের এইসব কথা বা রেফারেন্স কখনো মানতে চাইবে না , একটা কথা , যে জেগে জেগে ঘুমায় , তাকে ঘুম থেকে জাগানো খুব কঠিন ।

শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ইন্তিফাদা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট



১৯৬৪ সালের ২৮ মে আল-কুদস শহরে ফিলিস্তিনি কংগ্রেস বসে। এই কংগ্রেসে ফিলিস্তিন মুক্তিসংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। গঠিত হয় ফিলিস্তিন মুক্তিবাহিনী 'পিএলও'। পরবর্তীতে ইয়াসির আরাফাতের আল-ফাতাহ 'পিএও-ই' যোগ দিলে এটি হয়ে উঠে তার সামরিক বাহিনী।

১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে মিসরের সামরিক বাহিনী অতর্কিত সুয়েজ খাল অতিক্রম করে অলঙ্ঘনীয় বলে খ্যাত ইসরাঈলের বারলেভ প্রতিরক্ষা লাইন ভেঙে ফেলে এবং সিনাই মরুভূমি ও দখলকৃত ইসরাঈলি ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে। পূর্বদিক থেকে একই সময় সিরিয় বিমানবাহিনী ইসরাঈলের উপর হামলা চালায়। যুদ্ধের প্রথম কয়েকদিনে ইহুদিবাদের শত শত জঙ্গিবিমান ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়। নিহত হয় কয়েক হাজার ইসরাঈলি। শূণ্যে মিলিয়ে যায় ইসরাঈলের অপরাজেয় হওয়ার রূপকথা। যুদ্ধের পরবর্তী দিনগুলোতে ক্রুসেডার যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের দ্রুত সামরিক সহায়তা ও সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সিরিয় সেনাবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতায় যুদ্ধের গতি ইহুদিদের পক্ষে মোড় নেয়। অন্যান্য আরব দেশ এই যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা না রাখায় মিসর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। ইসরাঈলি সামরিক বাহিনি হেলিবোর্ডের মাধ্যমে সুয়েজ খালের পশ্চিমে মিসরের অভ্যন্তরের একটি ছোট্ট এলাকায় সৈন্য নামিয়ে তা অবরোধ করতে সক্ষম হয়। অবশেষে ক্রুসেডার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কায়রো থেকে ৬০১ কিলোমিটার দূরত্বে যুদ্ধাবসানের জন্য আলোচনা শুরু হয় এবং সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে।

রমজানের যুদ্ধ ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদীদের দখলদারী প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। দুই পক্ষের সমরাস্ত্র, লজিস্টিক ও ক্ষয়-ক্ষতি থেকে এর আন্দাজ করা হয়। ১৯ দিন ব্যাপী স্থায়ী এ যুদ্ধে তিন হাজারের অধিক ইহুদি সন্ত্রাসী নিহত হয়। আহত হয় ৯ হাজারের মতো। জায়নবাদীদের প্রায় ১০৬৩টি ট্যাঙ্ক, ৪০৭টি সাঁজোয়া, ৩৮৭টি জঙ্গিবিমান ও এয়ারক্রাফট ধ্বংস হয়। ভিন্ন দিকে মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের নিহত সৈন্যের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। ৩৪১টি এয়ারক্রাফট ও ১৯টি নেভাল ভ্যাসেলসহ ধ্বংস হয় ২২৫০টি ট্যাঙ্ক। সমরশক্তির দিক থেকে শুধু মিসরই ইসরাঈল থেকে প্রায় দুই গুণ ছিল। সিরিয়া ও অন্যান্য আরব দেশের হিশেব করলে জায়নবাদীদের সঙ্গে তাদের সামরিক সক্ষমতার অনুপাত দাঁড়ায় ৩:১।

ইন্তেফাদা; বিপ্লবের নয়া তরিকা। সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানির প্রচেষ্টায় মুসলিম দেশগুলোতে যে জাগরণ আন্দোলনের সৃষ্টি হয় তা মিসরে মুহাম্মাদ আবদুহু ও সাইয়্যেদ কুতুবের মাধ্যমে নতুনত্ব লাভ করে। এই জাগরণ আন্দোলনের পরোক্ষ ফলাফল আল্লামা ইকবালের মতো মনীষীদের মাধ্যমে পাক-ভারতে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, আলজেরিয়াতে ১৯৬২ সালের বিপ্লব প্রভৃতি।

মুসলিম বিশ্বের আত্মমর্যাদাহীন সরকারগুলো মুসলমানদেরকেই স্বৈরাচার বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও ইসলামি জাগরণের তাত্ত্বিক দিকটিকে ম্লান করে দেখতে বাধ্য করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে 'আরব জাতীয়তাবাদ'কে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছিল, যার প্রধান চিন্তক ছিল খ্রিষ্ট-ধর্মাবলম্বী মাইকেল আফলাক (সিরিয়া ও ইরাকের বার্থ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাদ্দাম ও হাফেজ আসাদের তাত্ত্বিক গুরু)। ফিলিস্তিনের জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংঘবদ্ধ ও সংহত হওয়ার সূত্রটি ইসলাম ছিল না, ছিল আরব জাতীয়তাবাদ। এ কারণে ফিলিস্তিনিরা ইসলামি, খ্রিষ্টীয় ও সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন মতাদর্শ নিয়ে কাজ করতো। কিন্তু এগুলো তাদেরকে তাওহিদ-বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ জিহাদে উজ্জীবিত করতে পারেনি। ইরানের শিয়ারা শাহের বিরুদ্ধে নাশকতার প্রশিক্ষণ নিতো ফিলিস্তিনি শিবিরগুলো থেকে। ফলে ফিলিস্তিনি গেরিলা গ্রুপগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। ১৯৭৮ সালে ইরানে শিয়া বিপ্লবের গতিধারা তুঙ্গে উঠলে 'আজ ইরান কাল ফিলিস্তিন' শ্লোগান ফিলিস্তিনিদের কিছুটা আশান্বিত করে। কিন্তু শিয়া বিপ্লবকেন্দ্রিক সমস্ত আশা ফিলিস্তিনিদের জন্য গুড়েবালি হয়ে থেকেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রাচ্যব্লক ও প্রগতিশীল দেশগুলো বাহ্যত ফিলিস্তিনি গেরিলা গ্রুপগুলোর পৃষ্ঠপোষক ছিল। এসব পৃষ্ঠপোষকতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা। এই দেশগুলোর কোনো একটিও ইসরাঈলের অস্তিত্ব বিরোধী ছিল না। জায়নবাদীদেরকে তারা বরং বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহায়তা দিয়েছে।

বিরুদ্ধে আন্দোলনের নূন্যতম নীতি অবস্থানও গ্রহণ করা হয়নি। সম্মেলনের সব মনোযোগ নিবন্ধ ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে আম্মানে অনুষ্ঠিত আরব শীর্ষ সম্মেলনে জায়নবাদী ইহুদিদের ছিল ইরান-ইরাকের যুদ্ধের দিকে এবং সামগ্রিকভাবে এ সম্মেলন ক্যাম্প ডেভিড লাইন ধরে এগিয়ে যায়। এদিকে ফিলিস্তিনি জাতি বছরের পর বছর অপেক্ষা করছিল আরবজগত তাদেরকে বাস্তহারা অবস্থা থেকে নাজাত দেবে। বিশেষত অধিকত ফিলিস্তিনে বসবাসরত ফিলিস্তিনি জনজস তাকিয়ে ছিল আরব সরকারগুলোর দিকে।

ফিলিস্তিনের মজলুম জাতি তাদের গেরিলা গ্রুপগুলোর ভোগ-বিলাস, বিভেদ, অনৈকা ও দলাদলির পরিপ্রেক্ষিতে এবং ফিলিস্তিনি জনতার দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার প্রতি আরব সরকারগুলোর প্রকাশ্য উদাসীনতা ও অবহেলা প্রত্যক্ষ করে আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তা-দর্শনের কার্যকারিতা এবং সরকারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন সম্পর্কে আরেকবার সব আশা-ভরসার অবসান ঘটায়। ১৯৮৭ সালের হেমন্তে অধিকৃত ফিলিস্তিনের সাধারণ জনতা ইসরাঈলের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা ঘটায়, যার নাম দেয়া হয় ইন্তিফাদা। ইন্তিফাদার অর্থ 'আন্দোলন করা, নাড়া দেয়া'। ইন্তিফাদার পূর্বপর্যন্ত তামাম আন্দোলন ও অভ্যুত্থান ছিল বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন 'ফাতাহ আন্দোলন'। এটি ১৯৮৩ সালের মে মাসে আরাফাতের নেতৃত্বাধীন আল-ফাতাহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এবার (১৯৮৭) এই ইন্তিফাদার আগে বা পরে কোনো বিশেষণ যুক্ত হয়নি। এই ইন্তিফাদা মূলত গণপ্রতিবাদ বা গণঅভ্যুত্থান। ফিলিস্তিনে জায়নবাদীদের দখলদারীর প্রতিবাদে সংঘটিত এই ইন্তিফাদার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল-

ক. বিস্মৃতির আস্তাকুঁড় থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুকে বের করা।

খ. বিশ্ব জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণ।

গ. এ অঞ্চলে ইসলামি আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে ইন্তিফাদাকে সমন্বিত করা, যা ইন্তিফাদার চেহারার সবিশেষ রূপ দান করে।

ঘ. ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানকে জরুরী পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন।

ঙ. ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপকে ঘনিষ্ঠ করা।

চ. আমেরিকা ও ইহুদিদের মনে ইসরাঈলের রাজনৈতিক শুদ্ধতা সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা।

ছ. জায়নবাদীদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকিযুক্ত করা।

জ. ফিলিস্তিনি গেরিলা দলগুলোর অভ্যন্তরীন কোন্দল ও মতভেদকে ম্লান করে আরব সরকার ও আন্তর্জাতিক সমাজকে জনমতের অনুসারী করা, যারা এতোদিন নিজ নিজ স্বার্থে ফিলিস্তিন ইস্যুকে ব্যবহার করে আসছিল।

জবরদখল ও জায়নবাদীদের সরকার প্রতিষ্ঠার চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পর ইন্তিফাদার ফলে প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনি জনগণ আক্রমণাত্মক অবস্থানে এবং ইসরাঈলিরা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকায় যেতে বাধ্য হয়।


জামায়াতের একাত্তর ইস্যু ও আদর্শিক বিচ্যুতি

 

একাত্তর! একাত্তর! একাত্তর! বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সংখ্যাটা একটা সর্বোচ্চ ম্যাজিক সংখ্যা, পৃথিবীর কোনো দেশে হয়ত এতটা সংখ্যা ভিত্তিক আদর্শের রাজনীতি নাই।আর বাংলাদেশ এই একাত্তর চেতনাকে দিয়ে একটি দলকে চাপে ফেলা হয় আর তা হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যা পাকিস্তান জামায়াতের উত্তরসূরী।


এই দলটি এমন একটি ইসলামি দল যাদের চরিত্র আর গিরগিটির চরিত্রের মধ্যে বেশ মিল। আমরা সবাই জানি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছি।এই স্বাধীন রাষ্ট্রটি জন্মের শুরুতে অনেক রাজনৈতিক দল বিরোধীতা করেছিলো যার মধ্যে সবচেয়ে বেশী বিরোধীতা করেছে জমিঈয়ত, তার পর সংখ্যা লঘু হিসাবে জামায়াত। আদতে এই সকল বিরোধীতার মূল কি ছিলো? ইচ্ছা করে পশ্চিমাদের গোলামী? হয়ত হতে পারে অথবা এটাই বাস্তবতা কিন্তু আসল কথা হলো এই বিরোধীতার পেছনে আরো কিছু কারন থাকতে পারে। এই বিষয়টি জানার পূর্বে কিছু ফ্যাক্ট জানা দরকার।

ফ্যাক্ট-১ঃ
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের পরাধীনতা হতে,কিন্তু এই পাকিস্তানের জন্মের ঘোর বিরোধী ছিলো ভারত, তার মানে ভারত পূর্ব পাকিস্তানেরও বিরোধী ছিলো।

ফ্যাক্ট-২ঃ
আওয়ামিলীগ এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলে সবাই মনে করে,কিন্তু এই আওয়ামিলীগ এর প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ষড়যন্ত্র করে ঐ ভারতেরই আগরতলায় বসে যা সাথে সাথে প্রকাশ পেয়ে যায় এবং ২০১৫ সালের পর হতে আওয়ামিলীগ এর নেতারাই প্রথম দাবী করে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র সত্য ছিলো।

ফ্যাক্ট-৩ঃ
ধর্মীয় কারনে বা ধর্মের সেতু বন্ধের ভিত্তিতে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের সাথে মিলে ব্রিটিশ হতে স্বাধীন হলেও যে রাজনৈতিক দলটি বাংলাদেশ স্বাধীনের জন্য নেতৃত্ব দানকারী ছিলো দলটি ছিলো সেক্যুলার।

ফ্যাক্ট-৪ঃ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে আরো বেশী প্রভাব বিস্তার করছিলো নাস্তিক কমিউনিস্ট পার্টি গুলো,যদিও বাংলাদেশ ধর্মের ভিত্তিতেই পাকিস্তানের অংশ হয়েছিলো।

ফ্যাক্ট-৫ঃ
২০১৩ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ভারতের দিল্লীতে গিয়ে ঘোষনা দেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভারতের লাখো সৈন্যের রক্তের বিনিময়,  বাংলাদেশের মুক্তি যোদ্ধার কথা উল্ল্যেখ করে নাই।

ফ্যাক্ট-৬ঃ
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভারতের উপহার, এতে বুঝায় বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের মানুষের কোনো অবদান নাই।

ফ্যাক্ট-৭:
বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা দেন ভারতকে যা দিয়েছি আজীবন মনে রাখবে,কি দিয়েছে তা আজও জনগন জানে না।

ফ্যাক্ট-৮ঃ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিন হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর কোনো কমান্ডার রাখা হয় নি,ভারতীয় বাহিনীর কাছে হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে।জয় পরাজয় হয় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে, বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীরা ছিলো ঠোঁটু জগন্নাথ।

ফ্যাক্ট-৯ঃ
এখনো ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে দাবী করে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে মুক্তি যোদ্ধাদের অবদান কই?মুক্তি যোদ্ধারা কি ভারতের পক্ষ হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলো?

উপরের আলোচনা হতে বুঝা যায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধে,যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা যারাই আঁচ করতে পেরেছে তারা সবাই পাকিস্তান নামক নেকড়ের হাত হতে মুক্ত হয়ে ভারত নামক সিংহের পেটে ঢুকার কথা অস্বীকার করেছে। আর তখন তারাই স্বাধীনতার যুদ্ধে বিরোধীতা করেছে। এখানে জামায়াতকে যতই ট্যাগ দিক জামায়াতের কোনো কিছু যাওয়া আসার কথা না।

এবার আসেন জামায়াতে ইসলামীর কথায়। তখনকার জামায়াত আর জমিঈয়ত একই কারনে পাকিস্তান হতে বিভাজিত হয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটিয়ে ভারতের করদ রাজ্যে পরিনত হতে নারাজি প্রকাশ করে। আর এই শঙ্কা ৫৪ বছর আগেই টের পেয়েছিলো তৎকালীন জমিঈয়ত-জামায়াতের বিজ্ঞ নেতারা,তারা এই বিরোধীতার জন্য পরবর্তীতে কখনো ক্ষমাই চায় নি।

কিন্তু বর্তমান জামায়তকে কেউ একাত্তর নিয়ে প্রশ্ন করলে তারা যদি/কিন্তু মিশিয়ে তাদের ৫৪ বছর আগের নেতাদের বিজ্ঞতার কথা অস্বীকার করে বসে। বর্তমান জামায়াত নেতা গুলো প্রায় সবাই গিরগিটি টাইপের।একাত্তর বিষয়ে একেক নেতা একেক সময়ে একেক মন্তব্য করে বসে। তারা একাত্তর বিষয়ে অবস্থান বার বার পরিবর্তন করছে, অথচ সাহস করে তাদের স্বাধীনতা বিরোধিতার কথা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে না শুধু মাত্র ক্ষমতার লোভে। ১৯৮৬ তে জাতীয় বেঈমানীর নির্বাচনে আওয়ামিলীগ এর সাথে জোট, ১৯৯১ সালে বিএনপির সাথে জোট, ১৯৯৬ সালো আনার আওয়ামিলীগের সাথে জোট, ২০০১ সালে বিএনপির সাথে জোট বার বার তাদের রাজনৈতিক আদর্শের কুরবানী ও আদর্শের  বলিদান দলটিকে রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরজীবিতে পরিনত করেছে। এখন নতুন কথা বলছে তারা নাকি একাত্তর বিষয়ে কখন কোথায় ক্ষমা চেয়েছে।কোথায় ক্ষমা চেয়েছে আমার জানা নাই, ক্ষমা যদি চেয়েই থাকে তাইলে সত্যিই কি একাত্তরের অপকর্মের জন্য তারা দোষী? এটা কি তারা মেনে নেবে?

জামায়াত ইসলাম প্রতিষ্ঠার আদর্শ হতেও সরে এসেছে ইদানীং। কয়েকদিন আগে এক বিবিসি স্বাক্ষাতকারে জামায়াতের সাবেক এমপি ও নায়েবে আমীর ডা.সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে প্রশ্ন করা হয় আপনারা কি ক্ষমতায় গেলে শরীয়াহ আইন জারি করবেন? তখন ডা.তাহের গাছ হতে পড়ার ভান করে বলেন এ দাবী আবার কবে করলাম? অর্থাদ জামায়াত ক্ষমতায় আসলে ইসলামি শরীয়তের আইন জারি করার বিষয়ে বদ্ধপরিকর না।

আগে তাদের দলীয় সংবিধানে ছিলো ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের দফা, এ দফাকে তারা বদল করে করেছে কল্যান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। অর্থাদ জামায়ত খিলাফত প্রতিষ্ঠার কোনো এজেন্ট নিয়ে কাজ করতে বাধ্য নয়। কল্যান রাষ্ট্র তো ইসলামি উপায় ছাড়াও অনেক উপায়েই করা যায়। তারা কোন উপায়ে করতে চায়? 

আবার দেখেন তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরের গঠন তন্ত্রের পঞ্চম দফা ছিলো ইসলামি বিপ্লব,অর্থাদ বিপ্লবের মাধ্যমে চুড়ান্ত ইসলাম প্রতিষ্ঠা, এটা তারা পরিবর্তন করে করেছে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা। 

জামায়াত যে ভারতের জুজুর ভয় দেখিয়ে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিলো এবং তাদের তখনকার সিদ্ধান্ত বাস্তবতার আলোকে যে সঠিক ছিলো তা জুলাই বিপ্লবে প্রমানও হলো তার পরও জামায়াত নেতারা ভারতের সহিত সম্পর্ক উন্নয়নে নিজ হতে প্রকাশ্যে ঘোষনা দিচ্ছে,অথচ আজও স্বাধীন পাকিস্তানকে অস্বীকার করে ইসলামি শক্তির দমন নীতিতে যে ভারত বদ্ধপরিকর সে ভারত।

একবার কেউ চিন্তা করে দেখুন জামায়াতের এই চালাকি গুলো কত সুক্ষ্ম? তারা গনতন্ত্র চর্চা করবে, ইসলামিক গনতন্ত্র নামে গনতন্ত্রকে জায়েজ করবে(এটা কৌশল,যদিও ইসলামে কৌশল করা জায়েজ আছে বৈধ উপায়ে),তারা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা না করা নিয়ে নিরব, কল্যান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে কিন্তু কোন পদ্ধতি তারা তা ব্যাখ্যা করবে না,তারা শরীয়াহ আইনের কথা শোনে আঁতকে উঠবে, সে দলটি কতটুকু ইসলামিক আর তাদের হাতে ক্ষমতা গেলে কতটুকু ইসলাম দেশে প্রতিষ্ঠা হবে এবং তারা তাদের আদর্শের উপর কতটুকু অটল তা সহজেই অনুমেয়।

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দূর্নীতির বিরুদ্ধে মানব বন্ধন ও গন থাপড়ানো কর্মসূচী পালন, অভিযুক্তরা চম্পট

 


কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দূর্নীতির বিরুদ্ধে মানব বন্ধন ও গন থাপড়ানো কর্মসূচী পালন, অভিযুক্তরা চম্পট



কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ কেনাবেচায় কোটি টাকার দুর্নীতির প্রতিবাদে মানব বন্ধন ও গন থাপড়ানো কর্মসূচী পালন হয়েছে এবং অভিযুক্তরা এসময় বিক্ষুব্ধ জনতার উপস্থিতি টের পেয়ে চম্পট দিয়েছে বলে জানা যায়। এ ঘটনায় হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ, সহকারী পরিচালক ডা. শাহজাহান,হিসাব রক্ষক মো: দেলোয়ার,পরিচালকের সহকারী জসিম উদ্দীন, কম্পিউটার অপারেটর সহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও গন থাপড়ানো কর্মসূচি পালন করেছেন নিপীড়িত নাগরিক সমাজ এবং কুমিল্লার ছাত্র-জনতা।

বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাসপাতালের ওষুধপত্র (এমএসআর) গ্রুপে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কেনাকাটায় বড় অংকের অনিয়ম ও দূ্নীতি হয়েছে। বিশেষ করে ইনজেকশন পেন্টোথাল সোডিয়াম (১ গ্রাম ডিস্ট্রিল ওয়াটার সহ) ৪ হাজার ভায়েল ক্রয় করা হয়েছে ভায়েল প্রতি এক হাজার ২৯৯ টাকা দরে, যেখানে বাজারমূল্য মাত্র ১০১ টাকা। এ অনিয়মের কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী গায়ের মূল্যের বাইরের দরের কোনো ওষুধ কেনার সুযোগ নেই।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটিতে দালালচক্র, অনিয়ম ও দুর্নীতি চললেও কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং প্রতিবারই নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসছে। এ পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে পরিচালকসহ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক ও কর্মচারীদের অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানান তারা।

নিপীড়িত নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ও ইনকিলাব মঞ্চ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহবায়ক ফারুক আল নাহিয়ানের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টি কুমিল্লা মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান, এবি পার্টি কুমিল্লা মহানগরের যুগ্ন আহ্বায়ক ইনকিলাব মঞ্চ কুমিল্লা মহানগরের আহ্বায়ক গোলাম মোহা. সামদানী,লেখক,চিকিৎসক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী  ডা. বশির আহাম্মদডা. ইমরানআফজাল হোসেনওমর ফারুখ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য ও এনসিপি নেতা খালিদ হোসেনআব্বাসউদ্দিনসহ ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।

বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।


উপস্থিত জনতা গন থাপড়ানো কর্মসূচীর অংশ হিসাবে পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচলকের কার্য্যলয়ে গিয়ে অভিযুক্ত কাউকেই উপস্থিত পায় নি।

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ভারতের মুসলিম গনহত্যার পোস্টমর্টেম

 


দেশের বৃহত্তম ধর্মীয়-সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও, ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়গুলো প্রায়শই হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা সহিংস আক্রমণ ও হামলার শিকার হয়েছে। অতীতে, এই আক্রমণগুলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে বিবেচিত ছিল এবং হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল। তবে,বাবরীর মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরে হিন্দুত্ববাদ উত্থানের সাথে সাথে আক্রমণগুলো আরও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে,রাষ্ট্র-অনুমোদিত কার্যক্রমের আকার নিয়েছে। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাবলীতে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রায় ১০০০০ মুসলিম নিহত হয়।


কারণঃ

মুসলিম বিরোধী সহিংসতার শেকড়গুলি মধ্যযুগে ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক ইসলাম বিজয়ের প্রতি ভারতের অতীব বিরক্তি১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পরে (যা মুসলিম ব্যবসায়ী ও তৎকালীন শাসকগণ দ্বারা ভাল পরিমাপে সক্ষম হয়েছিল) ব্রিটিশ উপনিবেশকারীদের ব্যবহৃত রাজনৈতিক দখল ফিরে পাওয়ার জন্য বিভক্তকরণের নীতির মাঝে নিহিত। এর ফলে ভারতের সহিংস বিভাজন একটা ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দেয় এবং এক বিশাল হিন্দু ভারতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী সহ প্রতিষ্ঠা হয়।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার একটি প্রধান কারণ হলো হিন্দু-জাতীয়তাবাদী দলগুলির বিস্তার, যেগুলি রাষ্ট্রীয় সয়ং সেবক সংঘের রাজনৈতিক ছাতার পাশাপাশি বা তার অধীনে কাজ করে।  বর্তমান বিজেপি সরকারও আরএসএসের একটি অনুমোদিত এবং বিনায়ক দামোদর সভাকর এবং এমএস গোলওয়ালকারের হিন্দুত্ববাদী জীবনবিজ্ঞানের অনুসরণ করে। আরএসএস এবং অন্যান্য হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সংগঠনের মতাদর্শী হিসাবে বিবেচিত, সাভারকর এবং গোলওয়ালকর হওটলার এবং মসোলিনি এবং তাদের নাৎসিবাদ এবং ফ্যাসিবাদ বিধিগুলোর খোলামেলা প্রশংসক ছিলেন।গোলওয়ালকারের লেখায় এটি স্পষ্ট হয়। হিটলারের নাজি-জার্মানি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে গোলওয়ালেকার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন: "জাতির গর্ব এর সর্বোচ্চতম হয়ে এখানে প্রকাশিত হয়েছে। জার্মানি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতিগুলোর পক্ষে ভিন্ন সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠীর সাথে একত্রিভূত হওয়া কতটা অসম্ভব তাও দেখিয়ে দিয়েছে, যা শিখতে ও লাভ অর্জনে হিন্দুস্তানে ব্যবহার করার জন্য একটি উত্তম পাঠ।" প্রাক্তন-বিজেপি নেতা এল কে আদভানি রাম রথযাত্রার মাধ্যমে হিন্দুত্ব-আদর্শকে ভারতীয় রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে গেছেন বলে মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর সহিংস আক্রমণ বেড়েছে। পণ্ডিতদের যুক্তি রয়েছে যে, মুসলিমবিরোধী বক্তব্য, রাজনীতি এবং নীতি হিন্দুত্ববাদী-নেতাদের বিশেষত বিজেপির পক্ষে উপকারী প্রমাণিত হয়েছে এবং তাই বলা যেতে পারে এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রেরণা।


শুরুর ইতিহাসঃ

 হিন্দুদের দ্বারা মুসলিমদের উপর হানাদার হামলার আকারে প্রায়শই মুসলমানদের উপর সহিংসতা সংঘটিত হয়। ] এই আক্রমণগুলিকে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসাবে চিহ্নিত করা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এক অংশ হিসাবে দেখা যায় এবং বিংশ শতাব্দীতে পুরো বিশ্ব জুড়ে ইসলামো ফোবিয়ার উত্থানের সাথেও যুক্ত রয়েছে। বেশিরভাগ ঘটনা ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যে ঘটেছে, অন্যদিকে দক্ষিণে সাম্প্রদায়িক মনোভাব অনেক কম উচ্চারণ করা হয়।  সবচেয়ে বড় ঘটনার মধ্যে রয়েছে ১৯৪৬ সালে পূর্ব কলকাতার নোয়াখালী দাঙ্গার পরে ১৯৪৬ সাল বিহার ও গরমুখেশ্বরে গ্রেট কলকাতা হত্যাকান্ড, ১৯৪৭ সালে জম্মুতে মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞ, হায়দরাবাদে অপারেশন পোলোর পরে মুসলমানদের ব্যাপকহারে হত্যা, ১৯৫০ সালে বরিশাল দাঙ্গা ও ১৯৬৪ সালে পূর্ব-পাকিস্তান দাঙ্গার পরে কলকাতায় মুসলিম দাঙ্গা,১৯৬৯ সালের গুজরাট দাঙ্গা, ১৯৮৪ ভীভান্দি দাঙ্গা, ১৯৮৫ গুজরাত দাঙ্গা, ১৯৮৯ ভাগলপুর দাঙ্গা, বোম্বাই দাঙ্গা, ১৯৮৩ সালে নেলি এবং ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা ২০১৩ সালে মুজাফফরনগর দাঙ্গা ও ২০২০ সালে দিল্লি দাঙ্গা।

সংঘাতের এই নিদর্শনগুলি দেশভাগের পর থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কয়েক ডজন গবেষণা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণ-সহিংসতার ঘটনাগুলির দলিল করেছে।  ১৯৫০ সাল থেকে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছে।  সরকারী পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৫৪ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে এবং ১৯৬৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ৬,৯৩৩ জন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ৫৩০ জন হিন্দু এবং ১৫৯৮ জন ছিল মুসলিম, মোট ৩,৯৯৯ জন সহিংসতার ঘটনায় মারা গিয়েছিল। 

১৯৮৯ সালে, ভারতবর্ষের উত্তর জুড়ে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রবীণ স্বামী বিশ্বাস করেন যে পর্যায়ক্রমিক এই সহিংসতা "ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসকে আঘাত করেছে" এবং কাশ্মীর বিরোধের ক্ষেত্রে জম্মু ও কাশ্মীরের ভারতের কারণকে বাধা দিয়েছে।

২০১৩ সালে ইন্ডিয়াস্পেন্ড জানিয়েছে যে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতে গরু জাগ্রত সহিংসতার শিকার হওয়া ৮৪% মুসলমান ছিলেন এবং মে ২০১৪ এর পরে এই হামলার প্রায় ৯৯% মুসলমান ছিল বলে জানানো হয়েছিল।


প্রভাবঃ

এই সহিংসতার শেকড়গুলি ভারতের ইতিহাসে রয়েছে যেসব কারণে তা হল -মধ্যযুগে ভারতবর্ষের ইসলামী আধিপত্যের প্রতি ক্রুদ্ধ বিরক্তি থেকে শুরু করে, দেশটির ব্রিটিশ উপনিবেশকারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা, মুসলিম পাকিস্তান ও ভারতবর্ষের সহিংস বিভাজন এবং একটি বৃহত্তর কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিম জনসংখ্যা সহ ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা।  কিছু বিদ্বান মুসলিম বিরোধী সহিংসতার ঘটনাগুলি রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং তাদেরকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা গনহত্যা বা "সংগঠিত রাজনৈতিক গণহত্যা" সহ একধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ বলে অভিহিত করেছেন  নিছক " দাঙ্গা " ছাড়া অন্যরা যুক্তি দেখান যে, যদিও তাদের সম্প্রদায় বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে, তবে কিছু মুসলমান অত্যন্ত সফল হয়েছে, যে সহিংসতাটি ততটা ব্যাপকভাবে দেখা যায় না, তবে স্থানীয় সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছুটা শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ রয়েছে, এবং এমন অনেক শহর রয়েছে যেখানে মুসলিম ও হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রায় কোনও ঘটনা ছাড়াই এক সাথে শান্তিতে বাস করে। 


রাজনৈতিক দলের ভূমিকা:

অনেক সামাজিক বিজ্ঞানী মনে করেন যে এই সহিংসতার অনেকগুলি কাজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমর্থিত, বিশেষত হিন্দু  হিন্দুত্ববাদ  স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা,রাষ্ট্রীয় সয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এর সাথে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলি এবং সংগঠনগুলি। বিশেষত, বিদ্বানরা বিজেপি এবং শিবসেনা এই সহিংসতার ঘটনাগুলিতে জটিলতার জন্য দোষ দিয়েছেন  এবং বৃহত্তর নির্বাচনী কৌশলটির অংশ হিসাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যবহারের জন্য।  উদাহরণস্বরূপ, রাহেল ধুতিওয়ালা এবং মাইকেল বিগসের গবেষণায় বলা হয়েছে যে, বিজেপি যে অঞ্চলে ইতিমধ্যে শক্তিশালী সে অঞ্চলের তুলনায় বিজেপি-র কঠোর নির্বাচনী বিরোধিতার মুখোমুখি হত্যাকাণ্ড অনেক বেশি।  ১৯৮৯ সালে, ভারতের উত্তরে মুসলমানদের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং স্থানীয় ও রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। সমাজ ও নৃবিজ্ঞানী স্ট্যানলে জ্যারাজা তাম্বিয়াহ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ১৯৮৯ সালে৷ ভাগলপুর , ১৯৮৭ সালে হাশিমপুরা এবং ১৯৮০ সালে মুরাদাবাদের সহিংসতা সংগঠিত হত্যাকাণ্ড ছিল। রাম পুননিয়ানের মতে, ১৯৯০-এর দশকের সহিংসতার কারণে শিবসেনা নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল এবং ২০০২ সালের সহিংসতার পরে গুজরাতে বিজেপি জয় পেয়েছিল। জ্ঞান প্রকাশ অবশ্য সতর্ক করেছেন যে গুজরাতে বিজেপির পদক্ষেপগুলি পুরো ভারতের সাথে সমান হবে না, এবং এই কৌশলটি দেশব্যাপী মোতায়েনের ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদ আন্দোলন সফল হয়েছিল কিনা তা এখনও দেখা যায়।  সব মিথ্যাচার প্রচার এগুলো, উপরিউক্ত বক্তব্য আংশিক সত্য অধিক মিথ্যা। 


অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কারণ:

হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মুসলমানদের দ্বারা ভারতের ঐতিহাসিক পরাধীনতা সহিংসতার অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে। তারা অনুভব করে যে, দেশভাগের পর থেকেই ভারতীয় মুসলমানরা পাকিস্তানের সাথে জোটবদ্ধ এবং সম্ভবত মূলতঃ উগ্রপন্থী, অতএব, অতীতের ভুলগুলির পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য এবং হিন্দুদের তাদের গর্ব পুনরুদ্ধার করতে হিন্দুদের অবশ্যই প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।    মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ উর্বরতার হার হিন্দু ডানপন্থীদের বক্তৃতাগুলিতে একটি পুনরাবৃত্তি মূলক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবি, মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ জন্মের হার হিন্দুদের তাদের দেশের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার পরিকল্পনার একটি অংশ।   

এই সহিংসতার প্রকোপের জন্য প্রদত্ত আরেকটি কারণ হ'ল অর্থনীতি সম্প্রসারণের ফলে নিম্ন বনের উর্ধ্বমুখী গতিশীলতা। সহিংসতা শ্রেণী উত্তেজনার বিকল্পে পরিণত হয়েছে। জাতীয়তাবাদীরা নিম্নবর্গের দাবির সাথে মোকাবিলা করার পরিবর্তে মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের তাদের ধর্মের কারণে "পুরোপুরি ভারতীয়" হিসাবে দেখেনি,  এবং যারা এই আক্রমণ চালিয়েছে তাদেরকে "বীর" হিসাবে চিত্রিত করেছে যা থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠকে রক্ষা করছে " বিরোধী নাগরিক"দের থেকে।  মুসলমানদের সন্দেহ হিসাবে দেখা হয় এবং দেশভাগের সময় সহিংসতার পরেও অশুচি-ইচ্ছার কারণে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ওমর খালিদির মতে: "মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য মুসলিম বিরোধী সহিংসতার পরিকল্পনা ও সম্পাদন করা হয় এবং সেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পশ্চাদপদতার চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে তাদেরকে হিন্দু সমাজের নিম্ন স্তরে অন্তর্ভুক্ত করে।"


শিবসেনা যেহেতু প্রথমদিকে মহারাষ্ট্রের  মানুষের পক্ষে কথা বলেছিল বলে দাবি করেছিল, কিন্তু তাড়াতাড়ি মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার বিষয়ে তাদের বক্তব্যকে রীতিমতো পরিণত করার কারণ হিসাবেও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ দেওয়া হয়েছে। শিবসেনা ১৯৮৪ সালে ভায়বান্দি শহরে এবং ১৯৯২ এবং ১৯৯৩ সালে মোম্বাইয়ের সহিংসতায় আবারো সংঘর্ষে জড়িত ছিল। ১৯৭১ এবং ১৯৮৬ সালে সেনা কর্তৃক সহিংসতা প্ররোচিত হয়েছিল। সুদীপ্ত কবিরাজ এর কথা হল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এখনও মধ্যযুগীয় সময়ে শুরু হওয়া ধর্মীয় কেন্দলে জড়িত। 

মুসলিম বিরোধী সহিংসতা ভারতের বাইরে বসবাসকারী হিন্দুদের একটি সুরক্ষা ঝুঁকি তৈরি করে। ১৯৫০ এর দশক থেকে ভারতে মুসলিম বিরোধী সহিংসতার প্রতিক্রিয়া হিসাবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ হিন্দুদের উপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়েছে। বোম্বায় ১৯৯২ সালের সহিংসতার পরে বৃরিটেন দুবাই এবং থাইলেন্ড হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ করা হয়েছিল। এই পুনরাবৃত্তি সহিংসতা একটি কঠোরভাবে প্রচলিত রীতিতে পরিণত হয়েছে যা মুসলিম এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। 

জামায়াতে ইসলামী হিন্দ এই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, কারণ এটি বিশ্বাস করে যে এই সহিংসতা কেবলমাত্র মুসলমানদের উপরই নয়, পুরো ভারতকেই প্রভাবিত করে এবং এই দাঙ্গাগুলি ভারতের অগ্রগতির ক্ষতি করছে। গুজরাতে, ১৯৯৯ এবং ১৯৯৩ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সম্পর্কিত ঘটনাগুলিতে সন্ত্রাসবাদী ও বিশৃঙ্খলামূলক কর্মকাণ্ড (প্রতিরোধ) আইন (টিএডিএ) ব্যবহার করা হয়েছিল। এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তারকৃতদের বেশিরভাগই মুসলমান ছিলেন। বিপরীতে, বোম্বাই দাঙ্গার সময় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা চালানো হয়েছিল তার পরে টিএডিএ ব্যবহার করা হয়নি। 


জনসংখ্যার উপাত্ত:

বিজেপি রাজনীতিবিদরা এবং অন্যান্য দলের নেতারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভারতীয় নির্বাচনে জনসংখ্যাতত্ত্বরা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। বিজেপি বিশ্বাস করে যে কোনও নির্বাচনী এলাকার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা যত বেশি, ততই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অনুরোধ মেনে নেওয়ার কেন্দ্রবাদী দলগুলির সম্ভাবনা তত বেশি, যা তাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের সাথে মুসলমানদের "সেতু নির্মাণের" সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। যেমন, এই যুক্তি অনুসারে "মুসলিম তুষ্ট" সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মূল কারণ।  সুসান এবং লয়েড রুডলফ যুক্তি দিয়েছিলেন যে হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের প্রতি আগ্রাসনের কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য।বৈশ্বিকীকরন এবং বিদেশী সংস্থাগুলির বিনিয়োগের কারণে ভারতের অর্থনীতি প্রসারিত হওয়ার কারণে, হিন্দু জনগণের প্রত্যাশাগুলি সুযোগগুলির সাথে মিলে নি। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তখন হিন্দুদের সমস্যার উৎস হিসাবে মুসলমানদের উপলব্ধি উৎসাহিত করেছিল। 

কাশ্মীর ও পাকিস্তানে হিন্দু-বিরোধী এবং ভারতবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির পদক্ষেপগুলি ভারতে মুসলিম বিরোধী অনুভূতিকে আরও শক্তিশালী করেছে, যা হিন্দু অধিকারকে শক্তিশালী করেছে।হিন্দুত্ববাদী বক্তৃতা মুসলমানদেরকে বিশ্বাসঘাতক এবং রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসাবে চিত্রিত করেছে, যাদের দেশপ্রেম সন্দেহ হয়।  সুমিত গাঙ্গুলি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সন্ত্রাসবাদের উত্থান কেবল আর্থ-সামাজিক কারণকেই দায়ী করা যায় না, বরং হিন্দুত্ববাদী শক্তি দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার জন্যও দায়ী করা যায়। 


১৯৬৪ সালে কলকাতা:

মধ্যে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল, ৪৩৮ জন আহত হয়েছিল। ৭০০০ এরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ৭০ হাজারেরও বেশি মুসলমান তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে এবং ৫৫,০০০ ভারতীয় সেনা তাদের সুরক্ষা দিয়েছে। এই দাঙ্গার পরে কলকাতার মুসলমানরা আগের চেয়ে আরও বেশি ঘৃণ্য হয়ে উঠল।পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং সেখান থেকে শরণার্থীদের প্রবাহ দ্বারা দাঙ্গা উস্কে দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়।পশ্চিম বঙ্গ এ গ্রামেও সহিংসতা দেখা গেছে। 

১৯৮৩ সালে নেলী গণহত্যা:

১৯৮৩ সালে আসাম রাজ্যে নেলি গনহত্যা  ঘটনা ঘটে। নেলি নামে একটি গ্রামে বাঙালি বংশোদ্ভূত প্রায় ১,৮০০ মুসলমানকে লালুং উপজাতির লোকেরা (তিওয়া নামেও পরিচিত) হত্যা করেছিল।অসম আন্দোলনের  কর্মকাণ্ডের ফলে এটি ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর গণহত্যার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্থ নারী ও শিশু রয়েছে। 

এই ঘটনার জন্য উদ্ধৃত একটি কারণ হ'ল এটি অভিবাসন নিয়ে বিরক্তি বাড়ানোর ফলে ঘটেছিল। আসাম আন্দোলন অবৈধ অভিবাসীদের নাম নির্বাচনী নিবন্ধ থেকে এবং তাদের রাজ্য থেকে বিতাড়নের উপর জোর দিয়েছিল। এই আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন ছিল যা ১৯৮১ এবং ১৯৮২ সালের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। 

এই আন্দোলনের দাবি করা হয়েছিল যে ১৯৫১ সাল থেকে যারা অবৈধভাবে রাজ্যে প্রবেশ করেছে তাকে নির্বাসন দেওয়া হোক। কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য ১৯৭১ সালের একটি কাট অফের তারিখের উপর জোর দিয়েছিল। ১৯৮২ সালের শেষের দিকে, কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনকে ডেকেছিল এবং এই আন্দোলনকে জনগণ এটি বর্জন করার আহ্বান জানিয়েছিল, যার ফলে ব্যাপক সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছিল। 

নেলি গণহত্যার বিষয়ে তিওয়ারি কমিশনের সরকারী প্রতিবেদন এখনও একটি নিবিড়ভাবে রক্ষিত গোপনীয় বিষয় (কেবল তিনটি অনুলিপি বিদ্যমান)। ৬০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি ১৯৮৪ সালে আসাম সরকারকে জমা দেওয়া হয়েছিল এবং কংগ্রেস সরকার ( হিতেশ্বর সাইকীয়া) এটিকে প্রকাশ্যে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং পরবর্তী সরকারগুলিও তার অনুসরণ করেছিল।অসম ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট এবং অন্যরা তিওয়ারি কমিশনকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য আইনি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে ঘটনার কমপক্ষে ২৫ বছর পরে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত ন্যায়বিচার সরবরাহ করা যায়। 

তখন থেকে উচ্চ অসমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নজির নেই। 


১৯৬৯ থেকে ১৯৮৯:

১৯৬৯ সালের গুজরাত দাঙ্গার সময় অনুমান করা হয় যে ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছে।  ১৯৭০ এর ভাওয়ান্দি দাঙ্গা ছিল মুসলিম বিরোধী সহিংসতার একটি উদাহরণ যা ৭ ই মে থেকে ৮ ই মে ভারতের ভিবান্দি, জলগাঁও এবং মাহাদ শহরে সংঘটিত হয়েছিল। সেখানে মুসলিম মালিকানাধীন সম্পদের ব্যাপক পরিমাণে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হয়েছিল। ১৯৮০ সালে মুরাদাবাদে আনুমানিক ২,৫০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। সরকারী হিসাবে আনুমানিক ৪০০ এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের অনুমান ১৫০০ থেকে ২০০০ এর মধ্যে। স্থানীয় পুলিশকে সহিংসতার পরিকল্পনার জন্য সরাসরি জড়িত করা হয়েছিল।  ১৯৮৯ সালে ভাগলপুরে,অযোধ্যা বিতর্কেের ফলে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ সহিংস হামলায় প্রাণ হারান বলে ধারণা করা হয়,  এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সতর্ক করে শক্তি প্রদর্শন করার জন্য ভিএইচপি নেতাকর্মীদের দ্বারা মিছিল করা নিয়ে যে উত্তেজনা হয়েছিল, তার ফলস্বরূপ বলে মনে করা হয় । 

১৯৮৭ সালে হাশিমপুরা গণহত্যা:

১৯৮৭ সালের ২২ শে মে, ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মিরাট শহরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় হাশিমপুরা গণহত্যা ঘটেছিল, যখন প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্টাবুলারি (পিএসি) -এর ১৯ জন সদস্যকে হাশিমপুরা মহল্লা ( লোকাল ) থেকে ৪২ জন মুসলিম যুবককে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শহর, তারা ট্রাকে করে গাজিয়াবাদ জেলার মুরাদ নগরের নিকটে, উপকণ্ঠে নিয়ে যায়, যেখানে তাদের গুলি করা হয়েছিল এবং তাদের মৃতদেহ জলের খালে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। কিছু দিন পরে খালগুলিতে লাশগুলি ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গেল। ২০০০ সালের মে মাসে ১৯ আসামির মধ্যে ১৬ জন আত্মসমর্পণ করে এবং পরে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়, যদিও ৩ জন ইতিমধ্যে মারা গিয়েছিল। ২০০২ সালে৷ ভারতের সুপ্রীমকোর্ট  এই মামলার বিচার গাজিয়াবাদ  থেকে দিল্লীর তিস হাজারী কমপ্লেক্সের একটি দায়রা আদালতে স্থানান্তরিত করে, যেখানে এটি ছিল সবচেয়ে পুরানো বিচারাধীন মামলা। ২১ শে মার্চ ২০১৫-তে, ১৯৮৭ সালের হাশিমপুরা গণহত্যা মামলার আসামি ১৬ জনকেই পর্যাপ্ত প্রমাণের কারণে তিস হাজারী আদালত খালাস দিয়েছিল।  আদালত জোর দিয়েছিল যে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা অভিযুক্ত পিএসি কর্মীদের কাউকেই চিনতে পারেনি। ৩১ শে অক্টোবর, ২০১৮তে দিল্লি হাইকোর্ট পিএসির ১৬ জন কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাদের বিচারকাজের রায়কে শঢ়ঢ়ঢ়শশশশশশঢ়শশ করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দণ্ডিত করেছে।


১৯৯২ সালের বোম্বাই দাঙ্গা:

হিন্দুতৃববাীদের দ্বারা বাবরীর মসজিদ ধ্বংসের ফলে ১৯৯২ সালের বোম্বাই দাঙ্গা সরাসরি হয়েছিল।  দ্য হিন্দু ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে গরি উইন্টার নামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুসারে, "আনুষ্ঠানিকভাবে, পুলিশের দ্বারা জনতা দাঙ্গা ও গুলি চালিয়ে ৯০০ মানুষ মারা গিয়েছিলেন, ২,০৩৬ জন আহত এবং হাজার হাজার অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।" বিবিসির সংবাদদাতা তোরাল ভারিয়া দাঙ্গাগুলিকে "একটি পূর্বপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন যা ১৯৯০ সাল থেকে চলছে, এবং বলেছিল যে মসজিদ ধ্বংস "চূড়ান্ত উসকানি"। 

বেশ কয়েকটি পণ্ডিত একইভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে দাঙ্গাগুলি অবশ্যই পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং হিন্দু দাঙ্গাকারীদেরকে জনগণের সংশ্লিষ্টতাবিহীন উৎস থেকে মুসলিম বাড়ির অবস্থান ও ব্যবসায়ের তথ্য সম্পর্কে প্রবেশ দেওয়া হয়েছিল। এই সহিংসতা শিবসেনা,বাল ঠাকুরের নেতৃত্বে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল দ্বারা প্রচারিত হয়েছে বলে প্রচারিত হয়। বিশেষ শাখার একজন উচ্চ পদস্থ সদস্য ভি.দেশমুখ দাঙ্গার তদন্তের দায়িত্ব কমিশনের কাছে প্রমাণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে বুদ্ধি ও প্রতিরোধে ব্যর্থতা রাজনৈতিক অমান্য যে অযোধ্যা মসজিদটি সুরক্ষিত থাকবে, যে পুলিশ শিবসেনার সহিংসতা চালাতে সক্ষমতার বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন ছিল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্ররোচিত করেছিল তার কারণেই এটি হয়েছিল।


২০০২ সালে গুজরাত সহিংসতা:

দেশ বিভাগের পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায় গুজরাটে সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে।২০০২ সালে "ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস" হিসাবে চিহ্নিত একটি ঘটনায়  হিন্দু উগ্রবাদীরা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছিল। 

এই ঘটনার সূচনা পয়েন্টটি ছিল গোদরা ট্রেন পোড়ানো যা মুসলমানরা করেছিল বলে অভিযোগ ছিল। এই ঘটনার সময়, অল্প বয়সী মেয়েদের যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল, পোড়ানো বা কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।  এই ধর্ষণগুলি ক্ষমতাসীন বিজেপি দ্বারা ক্ষমা করা হয়েছিল, যাদের হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ২ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণ হয়েছিল।  মৃত্যুর সংখ্যা পরিসংখ্যানগুলি সরকারী হিসেব অনুসারে ৭৯০ জন মুসলিম এবং ২৫৪ জন হিন্দু নিহত হওয়া সহ ২ হাজার মুসলমান মারা গেছে।  এরপরে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধেও এই সহিংসতা শুরু করার এবং তাদের প্রতিবেদনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল, যেমন পুলিশ এবং সরকারী আধিকারিকরা ছিলেন যারা দাঙ্গাকারীদের নির্দেশ দিয়েছিল এবং উগ্রপন্থীদেরকে মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তির তালিকা দিয়েছিল। 

এই সহিংসতায় রাষ্ট্রীয় জটিলতার জন্য যে মল্লিকা সারাভাই অভিযোগ করেছিলেন, তাকে বিজেপি কর্তৃক মানব পাচারের জন্য হয়রানি করা, ভয় দেখানো ও মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।  সহিংসতা প্রতিরোধে আরও হস্তক্ষেপ না করার জন্য তিন পুলিশ অফিসারকে সফলভাবে তাদের ওয়ার্ডে দাঙ্গা ছড়িয়ে দেওয়ার পরে বিজেপি তাদের শাস্তিমূলক বদলি দিয়েছে।  ব্রাসের মতে, প্রমাণ থেকে প্রাপ্ত একমাত্র উপসংহার যা একটি পদ্ধতিগত পোগ্রোমের দিকে ইঙ্গিত করে যা "ব্যতিক্রমী বর্বরতা এবং অত্যন্ত সমন্বিত ছিল" দ্বারা চালিত হয়েছিল। 

২০০৭ সালে, তেহেলকা ম্যাগাজিনটি " সত্য: গুজরাত ২০০২ " প্রকাশ করেছিল, যে প্রতিবেদনটি রাজ্য সরকারকে সহিংসতায় জড়িত করেছিল এবং দাবি করেছিল যে যাকে যাকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিশোধের কাজ বলা হয়েছিল, বাস্তবে এটি ছিল "রাষ্ট্র-অনুমোদিত পোগ্রোম"।  হিউম্যান রাইট ওয়াচের মতে, ২০০২ সালে গুজরাতে সহিংসতা পূর্ব পরিকল্পনা ছিল এবং পুলিশ এবং রাজ্য সরকার এই সহিংসতায় অংশ নিয়েছিল।  ২০১২ সালে মোদী সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক নিযুক্ত একটি বিশেষ তদন্তকারী দল সহিংসতায় জড়িত থাকার বিষয়টি থেকে সাফ হয়ে যায়। মুসলিম সম্প্রদায়ের "ক্রোধ ও অবিশ্বাস" নিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা গেছে এবং তিস্তা সেতালভাদ বলেছেন যে তাদের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার ছিল বলে আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ হিন্দু, দলিত এবং আদিবাসীদের দ্বারা ব্যতিক্রমী বীরত্বের কাজ সম্পর্কে রিপোর্ট করেছে, যারা মুসলমানদেরকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল।


মুজাফফরনগর সহিংসতা

২০১৩ সালে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মুজাফফরনগর জেলায় হিন্দু ও মুসলমান দুটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘটেছিল। এই দাঙ্গার ফলে ৪২ জন মুসলমান ও ২০ হিন্দুসহ কমপক্ষে ৬২ জন মারা গিয়েছিল এবং ২০০ জন আহত হয়েছে এবং ৫০,০০০ এরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।

২০২০ সালে দিল্লির দাঙ্গা:

২০২০ সালের দিল্লীর দাঙ্গা, যার ফলে ৫৩ জন নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি গুরুতর আহত হয়েছিল,সমালোচকদের দ্বারা মুসলিম বিরোধী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দু অংশ হিসাবে দেখা যায় এমন একটি নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা।  দাঙ্গাগুলি কেউ কেউ পোগ্রোম হিসাবে উল্লেখ করেছেন।


২০০২ সালের সহিংসতার সময় সংঘটিত গুলবার্গ সোসাইটি গণহত্যার উপর ভিত্তি করে পারজানিয়া ছবিটি গুজরাতে সিনেমা হল দ্বারা অন্য দাঙ্গা ছড়ানোর ভয়ে বয়কট করেছিল। ছবিতে হিন্দু উগ্রবাদীদের দ্বারা পরিবারগুলিকে তাদের ঘরে বাঁচিয়ে রাখা, গণধর্ষণ করার পরে নারীদের আগুন দেওয়া এবং শিশুদের টুকরো টুকরো করার মতো নৃশংসতার নথি দেওয়া হয়েছে। 

রাকেশ শর্মা কর্তৃক ফাইনাল সল্যুশন ২০০২ সালে গুজরাতের সহিংসতা সম্পর্কিত একটি সেরা ডকুমেন্টারি গুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়। কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র প্রসংশাপত্র বোর্ড এই ছবিটি নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু, ২০০৪ সালে চেয়ারম্যান অনুপম খের একটি শংসাপত্র দিয়েছিলেন যা একটি অনুমতি দেয় অসম্পূর্ণ সংস্করণ স্ক্রিন করার।

আসল ওহাবী ও আহলে হাদীস একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

 



আসল ওহাবী ও আহলে হাদীস  একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

অদৃশ্যের সংবাদাতা আমাদের আক্বা ও মাওলা সরকার-ই দু’জাহান সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইসলামের স্বচ্ছ উদ্যানে (সুন্নী দুনিয়ায়) ‘বাহাত্তর ফির্কারূপী’ যেসব জাহান্নামী আগাছা জন্মাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছেন তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওহাবী-খারেজী সম্প্রদায়। আর এ ওহাবী সম্প্রদায়ের নতুন নাম ও নব-সংস্করণ হচ্ছে ‘আহলে হাদীস’। কারণ এ মহাভ্রান্ত ‘আহলে হাদীস’-এর আক্বীদা বা তথাকথিত ধর্ম বিশ্বাস ও অপকর্মগুলো ওহাবীসম্প্রদায়ের মূল গুরু ‘মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব নজদী’রই অনুরূপ। মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা, তাঁর মহান হাবীব ও আহলে বায়ত এবং আউলিয়া-ই কেরামের মানহানি ইত্যাদি তো আছেই, মাযহাব, ইজতিহাদ ও তাক্বলীদের গুরুত্বকে অস্বীকার বরং এর বিরুদ্ধে চরম বেয়াদবী প্রদর্শন ইত্যাদির ধারনা দেখলে সবাই একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, ‘আহলে হাদীস’ নামের এ ভ্রান্ত সম্প্রদায় ইবনে ওয়াহ্হাব নজদীর অন্যতম পরম স্বপ্ন (মাযহাবের বিরোধিতা) বাস্তবায়নের জন্যই এখন আদাজল খেয়ে লেগেছে।
ওদিকে পবিত্র আরব-ভূমিতে অপবিত্র-গোস্তাখ সালাফী-ওহাবীরা ইবনে ওয়াহ্হাবের যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণা ও অপকর্মগুলো বাস্তবায়নের সাথে সাথে মাযহাব-বিরোধী মারাত্মক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে, আর এদিকে (পাক-বাংলা-ভারত উপমহাদেশ ইত্যাদিতে) ওই ‘কুখ্যাত’ ওহাবীদের একটি অংশকে তথাকথিত ‘আহলে হাদীস’ নাম দিয়ে লেলিয়ে দিয়ে তাদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। এখন বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর পবিত্র ঘর মসজিদ থেকে আরম্ভ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লোকালয় পর্যন্ত এ ভ্রান্ত সম্প্রদায়টার অশুভ পদচারণা ও অপকর্মতৎপরতায় মুসলিম সমাজ অতীষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে; তাদের অপপ্রচার ও নানা লোভ-লালসার শিকার হয়ে মহামূল্যবান ঈমান ও মুক্তির অন্যতম উপায় নেক আমলকে দ্রুত বিনষ্ট করতে চলেছে কিছু সরলপ্রাণ কিংবা বদনসীব মুসলিম-জনতা। এসব কারণে এদের মুখোশ ঊন্মোচনের নিমিত্তেই এ লেখা।

ওহাবী ও আহলে হাদীসের গোড়ার কথা:
 মিশকাত শরীফ: ২য় খন্ড: ইয়ামন ও শাম (সিরিয়া) সম্পর্কে আলোচনা শীর্ষক অধ্যায়ে সহীহ্ বোখারী শরীফের বরাতে বর্ণিত, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, একদিন হুযূর-ই আক্রাম বিশ্ব জগতের জন্য রহমত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রহমতের সমুদ্রে ঢেউ খেললো। তিনি আল্লাহ্ তা‘আলার মহান দরবারে হাত মুবারক তুলে দো‘আ করে যাচ্ছিলেন, ‘আল্লাহুম্মা বা-রিক লানা ফী শা-মিনা’ [হে আল্লাহ্! আমাদের শাম (সিরিয়া)’-এ বরকত দাও], আল্লাহুম্মা বা-রিক লানা ফী ইয়ামনিনা। [হে আল্লাহ্! আমাদের ইয়ামনে বরকত দাও]। উপস্থিতদের থেকে একজন আরয করলেন, ওয়া ফী নজদিনা ইয়া রাসূলাল্লাহ্ [হে আল্লাহর রসূল! আমাদের নজদের জন্যও দো‘আ করুন। যেন আল্লাহ্ তা‘আলা তাতে বরকত দান করুন। তারপরও হুযূর-ই আক্রাম ওই দো‘আ করলেন। দো‘আয় শাম ও ইয়ামনের কথা উল্লেখ করেছেন, নজদের নাম নেননি। তাঁরা আবারও হুযূর-ই আক্রামের কৃপাদৃষ্টি কামনা করে আরয করলেন, ওয়াফী নজদিনা’ (হুযূর, অনুগ্রহ করে এ দো‘আও করুন যেন, আল্লাহ্ তা‘আলা নজদেও বরকত নাযিল করেন)। মোটকথা, তিনবার ইয়ামন ও শামের জন্য দো‘আ করেছেন; কিন্তু বারংবার কৃপাদৃষ্টি আকৃষ্ট করার চেষ্টা সত্ত্বেও নজদের নাম নিলেন না; নজদের জন্য দো‘আ করেননি বরং এরপর এরশাদ করেছেন ‘হুনা-কায্ যালা-যিলু ওয়াল ফিতানু ওয়া বিহা-ইয়াত্বলা‘উ ক্বরনুশ্ শয়তান’। (অর্থাৎ আমি ওই আদি বঞ্চিত ভূ-খন্ডের জন্য কীভাবে দো‘আ করবো? ওখানে তো ভূ-কম্পন ও ফিৎনাদি সংঘটিত হবে। আর ওখানে শয়তানী দলসমূহের সৃষ্টি হবে)। এ থেকে বুঝা গেলো যে, হুযূর সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দৃষ্টিতে দাজ্জালের ফিৎনার পর নজদের (ওহাবী) ফিৎনাও ছিলো। এ কারণে তিনি তাদের সম্পর্কেও বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া, মিশকাত শরীফ: ১ম খন্ড: কিতাবুল ক্বিয়াস-এ, মুসলিম শরীফ ও মিশকাত শরীফের: ‘মু’জিযাত শীর্ষক অধ্যায়ে’; ফাতাওয়া-ই শামীর ‘বুগাত’ (বিদ্রোহী) শীর্ষক অধ্যায়ে এবং ‘সায়ফুল জব্বার’ ইত্যাদিতে এ ওহাবী সম্প্রদায়ের পরিচয়, তাদের নিষ্ঠুরতা ও নানা ধরনের ফিৎনা ছড়ানো ইত্যাদির বর্ণনা বিশদভাবে দেওয়া হয়েছে।
এ উপমহাদেশে ওই ওহাবীদেরই প্রধান ঘাঁটি হচ্ছে দেওবন্দ মাদরাসা। হাদীস শরীফের ‘ক্বরনুশ্ শয়তান’ (শয়তানের শিং বা দল)-এর উর্দু অনুবাদও হয় ‘দেওবন্দ’। (‘দেও’ মানে শয়তান এবং ‘বন্দ’ মানে দল বা অনুসারী।) ওহাবী ও দেওবন্দী-এ উভয়ের আক্বীদা হুবহু এক, আমলে বাহ্যিকভাবে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও উভয়ে ইবনে ওয়াহ্হাব নজদীকে ভাল মনে করে, এমনকি এ দেওবন্দীরা ইবনে ওয়াহ্হাবের ভ্রান্ত আক্বীদাগুলো প্রতিষ্ঠার কাজেই আত্মনিয়োগ করে আসছে। দেওবন্দীদের পেশোয়া মৌং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী তার ‘ফাতাওয়া-ই রশীদিয়া’র ১ম খন্ডে: তাক্বলীদ পর্বে (পৃ. ১১৯) লিখেছেন, ‘‘মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব -এর অনুসারীদেরকে ‘ওহাবী’ বলা হয়। তার আক্বাইদ উত্তম ছিলো। তার মাযহাব ছিলো হাম্বলী। অবশ্য তার মেজাজে কঠোরতা ছিলো। তার অনুসারীরা ভালো লোক; কিন্তু যারা সীমা লংঘন করেছে তাদের মধ্যে বিপর্যয় (ফ্যাসাদ) এসে গেছে। আক্বাইদ সবার এক ও অভিন্ন। আমলে ভিন্নতর-হানাফী, শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী।’’

হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর শানে গোস্তাখী ও মান-হানিতে ওহাবী-দেওবন্দী মতবাদের কতিপয় নেতা ও তাদের লিখিত চরম বিভ্রািন্তপূর্ণ পুস্তকাবলী হচ্ছে- (১) মৌলভী আশরাফ আলী থানভী ও তার হিফযুল ঈমান, এতে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর ইলমকে চতুষ্পদ পশুর ইলমের মতো বলা হয়েছে। (২) মৌং খলীল আহমদ আম্বেটভী ও তার পুস্তক ‘বারাহীন-ই ক্বাত্বি‘আহ্’। এতে মৌলভী খলীল দেওবন্দী শয়তান ও মালাকুল মওতের জ্ঞানকে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জ্ঞান অপেক্ষা বেশী বলেছে। (৩) মৌং ইসমাঈল দেহলভী ও তার পুস্তক ‘তাক্বভিয়াতুল ঈমান’ ও ‘সেরাতে মুস্তাক্বীম’। মৌলভী ইসমাঈল নামাযে হুযূর-ই আক্রাম (আলায়হ্সি সালাতু ওয়াস্ সালাম)-এর খেয়াল আসাকে গরু-গাধার খেয়াল থেকেও মন্দতর লিখেছে। (৪) মৌলভী কাসেম নানূতভী ও তার ‘তাহযীরুন্নাস’। নানূতভী এতে ‘খাতামুন নবিয়্যীন’ মানে ‘আখেরী নবী’ ‘মানতে অস্বীকার করেছে। আর একথা বলার ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর পর যদি আরো নবী এসে যায়, তবুও ‘খাতামিয়াত’ (হুযূর-ই আক্রামের ‘শেষ নবী’ হওয়া)’র কোন ক্ষতি হবে না। তার মতে, ‘খাতাম’ মানে ‘আসলী নবী’ আর অন্য নবী হবে ‘ছায়ানবী’। ভন্ডনবী গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী একথাই বলেছে, ‘‘আমি বরোযী নবী।’’ মোটকথা, মির্যা গোলাম আহমদ তার ভন্ড নুবূয়তের দাবীতে মৌলভী কাসেম নানূতবীর বিশ্বস্ত শীর্ষই হলো। উল্লেখ্য, বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশে কওমী-হেফাযতীরা ওই নজদী-ওহাবীদেরই একান্ত অনুসারী। ঢাকার লালবাগ, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, বাবুনগর, পটিয়া, জিরি ইত্যাদিতে অবস্থিত ওহাবী মাদরাসাগুলো ওই নজদী-দেওবন্দীদের আক্বাইদ ও আমলকেই এদেশে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দুঃখজনকভাবে তৎপরত রয়েছে। বর্তমানে তো একই আদলে আরো মাদরাসা, নূরানী মাদরাসা, ইসলামী কিন্ডার গার্টেন, হেফযখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠায় আশঙ্কাজনকভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

আহলে হাদীস’ (লা-মাযহাবী): এ সম্প্রদায়টাও উক্ত ওহাবী-নজদীদেরই একটা অংশ। ওহাবী সম্প্রদায়ের প্রবক্তা যেমন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব নজদী, ‘আহলে হাদীস’ সম্প্রদায়টার গোড়ায়ও রয়েছে ওই একই ব্যক্তি। এমনকি এতদিন ইবনে ওয়াহ্হাব নজদীর যে ভ্রান্ত আক্বীদা ও অ-ইসলামী কাজটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, সেটাও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে- আরবে সালাফী-ওহাবীরা আর এ উপমহাদেশে ‘আহলে হাদীস’ (লা-মাযহাবী) সম্প্রদায়। এক্ষেত্রে আসল ওহাবীরাই নামের হেরফের করে, মূল ওহাবী-মতবাদকে ঠিক রেখে ‘মাযহাব অস্বীকার’ ও তদ্সম্পর্কিত বিভ্রান্তিপূর্ণ কার্যাদির পরিবর্দ্ধন করা হয়েছে মাত্র।
এভাবে বললে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে যে, ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব নজদী তার ওহাবী মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার কাজ যখন থেকে আরম্ভ করেছিলো, তখন থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ তার সব বাতিল আক্বীদা ও সুন্নী মতাদর্শ বিরোধী কর্মকান্ড মুসলিম সমাজে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এজন্য তাদেরকে আর্থিক যোগান ও যাবতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগী দেওয়া হচ্ছে। সমমনা ধনাঢ্য ও ক্ষমতাসীন লোকদের পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, ইবনে ওয়াহ্হাব নজদীই ছিলো মূলত: ‘লা-মাযহাবী’। মাযহাব ও মাযহাবের (হানাফী, শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী) ইমামগণের অনুসরণে সে বিশ্বাসী ছিলো না। পুরানা ‘খারেজী সম্প্রদায়’ ও ইবনে তাইমিয়ার অনুসরণে তাদের উদ্ভাবিত বাতিল আক্বীদা ও আমলগুলোরই নতুন সংস্করণ হলো এ ইবনে ওয়াহ্হাবের মাধ্যমে। এ ওহাবী মতবাদ প্রচারের জন্য নিয়োগ করা হলো প্রচূর এজেন্ট ও প্রচারক। প্রাথমিক পর্যায়ে এ প্রচারক ও এজেন্টরা বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সমসাময়িক অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে তাদের এ প্রচারণা চালিয়ে যায়। আর এক পর্যায়ে এসে যখন সৌদী আরবে একচ্ছত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ মতবাদী লোকের সংখ্যা কিছুটা বাড়লো, তখনই তার অবশিষ্ট কাজটি (মাযহাবকে অস্বীকার করা এবং মাযহাব বিরোধী কর্মতৎপরতা) ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হয়। সৌদী আরবে ও পার্শ¦বর্তী দেশগুলোর ওহাবীদের নাম দেওয়া হয় ‘সালাফী’ আর এ উপমহাদেশের ওহাবীদের একটি অংশকে ‘আহলে হাদীস’ নাম দিয়ে এ মতবাদ প্রচারের জন্য নিয়োগ করা হলো। ওদিকে সালাফীরা মুসলমানদেরকে, এমনকি সারা বিশ্বের হজ্ব ও ওমরাহ্ এবং যিয়ারতকারীদের মধ্যে সরকারীভাবে মাযহাবের বিরোধিতাসহ ওহাবিয়াৎ প্রচার করা হচ্ছে আর এদিকে, বিশেষত এ উপমহাদেশে ‘আহলে হাদীস’ (লা-মাযহাবী, গায়র মুক্বাল্লিদ) সম্প্রদায়টা, তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় একই ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
শুরু থেকেই বিশ্বের মুসলমানগণ সুন্নী আক্বীদায় বিশ্বাসী। সুন্নী মতাদর্শই ইসলামের একমাত্র সঠিক রূপরেখা। এ ‘আহলে সুন্নাতের’ আদর্শে রয়েছে কোন না কোন মাযহাবের একজন ইমামের অনুসরণ করা। এটা পবিত্র ক্বোরআন, সুন্নাহ্, ইজমা’ ও ক্বিয়াস অনুসারে ‘মুজতাহিদ’-এর মর্যাদায় পৌঁছেনি এমন সকল মুসলমানের উপর ‘ওয়াজিব’। ইসলামের পরিভাষায় মাযহাবের এ অনুসরণকে বলা হয়, ‘তাক্বলীদ’ আর যিনি এ ওয়াজিব কাজটা মানেন ও সম্পন্ন করেন, তিনি হলেন ‘মুক্বাল্লিদ’। আর ইসলামের মূল দলীলগুলো থেকে মাসআলা-মাসাইল (সমাধান) বের করা ‘উসূল-ফিক্বহ্’ অনুসারে যোগ্যতা সম্মত ইমামগণ হলেন ‘মুজতাহিদ’ আর তাঁদের এ গবেষণাকর্ম হচ্ছে ‘ইজতিহাদ’। ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, মুজাহিদের জন্য ‘ইজতিহাদ’ করা যেমন ওয়াজিব বা অপরিহার্য, তেমনি ‘মুক্বাল্লিদ’ পর্যায়ের মুসলমানদের উপর ‘তাক্বলীদ’ (বা হানাফী, শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবগুলো থেকে যেকোন একটির অনুসরণ) করাও ওয়াজিব। এ কারণে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিশ্বের মুসলমানগণ কোন না কোন মাযহাবের অনুসারী হয়ে আসছেন।

উল্লেখ্য যে, এ ইবনে ওয়াহ্হাব নজদীর প্রচারকরা যখন মাযহাব-বিরোধী প্রচারণাও আরম্ভ করে, তখন তারা চতুর্দিকে থেকে বাধার সম্মুখীন হতে থাকে। তখন তারা ‘মাযহাব’ মান্য করার বিষয়টি শিথিল করে ওহাবী মতবাদের অন্যান্য বিষয়গুলো (বিশেষত ওহাবী আক্বীদা)’র প্রচারে প্রতি জোর দিতে থাকে। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় যে, যেসব অঞ্চলে যে মাযহাবের অনুসারী বেশী ওই অঞ্চলের ওহাবীরা ওই মাযহাবের অনুসারী বলে পরিচিত। যেমন- মদীনা শরীফের ওহাবীরা মালেকী, ফিলিস্তীন, সিরিয়া ও ইরাক ইত্যাদির ওহাবীরা শাফে‘ঈ, পাক-ভারত-বাংলাদেশের ওহাবীরা হানাফী এবং নজদের ওহাবীরা হাম্বলী ইত্যাদি। আল্লামা শামী তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ‘ফাতাওয়া-ই শামী’: ৩য় খন্ড: বুগাত (বিদ্রোহীগণ) এর বর্ণনা শীর্ষক অধ্যায়ে লিখেছেন-
‘‘যেমন আমাদের যুগে ‘ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের অনুসারীদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনা ঘটে। এসব লোক নজদ থেকে বের হয়েছে। এক সময় মক্কা ও মদীনা শরীফের উপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে নেয়। তখন তারা নিজেদেরকে হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী বলে পরিচয় দিতে থাকে। কিন্তু তাদের এ আক্বীদা (বিশ্বাস) ছিলো যে, শুধু তারাই মুসলমান, আর যারা তাদের আক্বীদার পরিপন্থী (বিরোধী) তারা মুশরিক। এ কারণে তারা ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আতের’ লোকদের হত্যাকে পর্যন্ত জায়েয বলে মনে করতো। সুতরাং তারা তাঁদের (আহলে সুন্নাত) আলিমদের শহীদ করলো। শেষ পর্যন্ত (তখনকার সময়ে) আল্লাহ্ তা‘আলা ওহাবীদের দাপটকে দমিত করে দিয়েছিলেন। তাদের শহরগুলোকে বিরান করে দিয়েছেন। ইসলামী সৈন্যবাহিনীকে বিজয় দান করেছিলেন। এ ঘটনা ঘটেছিলো ১২৩৩ হিজরিতে।’’ ‘সাইফুল জাব্বার’-এ তখনকার সময়ে ওহাবীদের, মক্কা, মদীনা শরীফ এবং এতদ্ঞ্চলের পবিত্র ভূমিগুলোর উপর তাদের তান্ডবের বর্ণনা বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় যে, ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে এ ওহাবীরা গোটা হেজাযভূমিতে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং রাজকীয় ক্ষমতা ও অর্থ ব্যবহার করে এ ওহাবী আক্বীদা প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখে। এখনো আরব ও অনারব বিশ্বে তাদের এ অপচেষ্টা চলে আসছে।
বাকী রইলো, পাক-ভারত বাংলাদেশ (উপমহাদেশ)-এ এ ওহাবী মতবাদের অনুপ্রবেশ ও শেষ পর্যন্ত আহলে হাদীসের আত্মপ্রকাশ। সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী এদেশে ওহাবী মতবাদ আমদানীতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে বলে ইতিহাস সাক্ষী দেয়। ‘আশ-শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব’ নামক পুস্তক (কৃত. আহমদ ইবনে হাজর: কাতার: মক্কা মুকাররমাহয় মুদ্রিত ও বিনামূল্যে প্রচারিত-১৩৯৫হি.), পৃ. ৭৮-৭৯ তে একথা স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়েছে। এ সৈয়্যদ আহমদ বেরলভীর প্রধান সহযোগী ছিলো মৌং ইসমাঈল দেহলভী। সে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব নজদীর ‘কিতাবুত্তাওহীদ’-এর সারসংক্ষেপ উর্দুতে অনুবাদ করে ‘তাক্ভিয়াতুল ঈমান’ নামে এ উপমহাদেশে প্রকাশ ও প্রচার করে। বিশেষতঃ আক্বীদাগত বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী পাঠানগণ তাকে হত্যা করেছিলেন। [সূত্র. আন্ওয়ার-ই আফতাব-ই সদাক্বত] ওহাবীরা তাকে ‘শহীদ’ বলে। আর একথা বলে প্রচার করে যে, তাকে নাকি শিখরা হত্যা করেছে।

আ’লা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত আলায়হির রাহমাহ্ লিখেছেন- ওয়হ্ ওয়াহ্হাবিয়াহ্ নে জিসে দিয়া হ্যায় লক্বব শহীদ ও যবীহ্ কা, ওয়হ্ শহীদে লায়লা-ই নজদ থা, ওয়হ্ যবীহে তী-সে খেয়ার হ্যায়। অর্থ: ওই ওহাবীরা যাকে ‘শহীদ’ ও ‘যবেহ্কৃত’ উপাধি দিয়েছে, সে তো আসলে নজদের লায়লার জন্যই মজনু রূপী শহীদ ছিলো; তাকে আল্লাহর নেক বান্দারাই হত্যা করেছেন। এমনকি তার লাশ পর্যন্ত ওইসব খাঁটি মুসলমানগণ গায়ব করে ফেলেছেন। এজন্য তার কবরের কোন হদীস পাওয়া যায়না। এ ইসমাঈল দেহলভীর অনুসারীরা পরবর্তীতে দু’ভাগে বিভক্ত হয়- এক. তারা নিজেদেরকে ‘হানাফী’ বলে পরিচয় দেয়। নামায-রোযা আমাদের মতো সম্পন্ন করে। তাদেরকে ‘গোলাবী-ওহাবী-দেওবন্দী’ বলা হয়। হাদীসে পাকের পবিত্র ভাষায়, ‘ক্বরনুশ শয়তান’-এর উর্দু অনুবাদ করলেও ‘দেওবন্দ’ হয়।
দুই. তারা ইমামগণের ‘তাক্বলীদ’-এর মতো একান্ত জরুরী বিষয়টিকে অস্বীকার করে। তাদেরকে ‘গায়র মুক্বাল্লিদ ওহাবী’ বলা হয়। পরবর্তীতে তারা ‘আহলে হাদীস’ নাম ধারণ করেছে। আমি এর পক্ষে একটি ঐতিহাসিক প্রমাণ পেশ করতে চাই। মাওলানা আবুল হামিদ মুহাম্মদ যিয়াউল্লাহ্ ক্বাদেরী (সিয়ালকোট, পাকিস্তান) তাঁর প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ওহাবী মাযহাবের হাক্বীক্বত’-এ ‘মুহাম্মদ হোসেন বাটালভীর ইংরেজ প্রীতি’ শিরোনামে লিখেছেন, ‘‘ওহাবী-নজদীদের নেতা সৈয়্যদ আহমদ বেরলভী, মৌলভী ইসমাঈল দেহলভী (মাক্বতূল), মিঞা নযীর হোসেন দেহলভী, নবাব সিদ্দীক্ব হাসান ভূপালী, আবদুল্লাহ্ গযনভী ও সিদ্দীক্ব হাসান পেশোয়ারীর পর ওহাবীদের অতি সম্মানিত ব্যক্তি হলেন- মুহাম্মদ হোসেন সাহেব বাটালভী। তিনি বলেছেন, ‘‘ইংরেজ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা ওয়াজিব।’’ তিনি লিখেছেন, ‘‘ইংরেজগণও বাটালভীর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলো। বাটালভীকে জায়গীর দিয়েছে, পুরস্কারও দিয়েছে। বাটালভীও অতিরিক্ত সুযোগ মনে করে নিজেদের জন্য ‘ওহাবী’র পরিবর্তে ‘আহলে হাদীস’ নামের প্রচলন ও প্রসিদ্ধ করিয়েছে। তারা দ¯ুÍরমত বৃটিশ সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততার ঘোষণা সরকারী রেকর্ডপত্রে তাদের পরিচয় ‘ওহাবী’র পরিবর্তে ‘আহলে হাদীস’ লিপিবদ্ধ করানোর নির্দেশ জারী করিয়েছিলেন।’’ মুহাম্মদ আইয়ুব ক্বাদেরী লিখেছেন, ‘‘তিনি/তারা ‘জমায়াতে আহলে হাদীসের কর্মকর্তাদের সইকৃত একটি দরখাস্ত পাঞ্জাবের ল্যাফটেন্যান্ট গভর্ণরের মাধ্যমে ভারতবর্ষের ভাইসরয়ের নিকট পাঠিয়েছিলো। ওই দরখাস্তকারীদের তালিকার শীর্ষে মিঞা নযীর হোসেনের দস্তখতও ছিলো। পাঞ্জাবের গভর্ণর ওই দরখাস্তে তার সুপারিশনামা সহকারে গভর্ণম্যান্ট অফ ইন্ডিয়ার নিকট পাঠিয়েছিলেন। ওখান থেকে দস্তুর মত মঞ্জুর হয়ে এসে গিয়েছিলো- ‘‘আগামীতে ‘ওহাবী’ শব্দের পরিবর্তে ‘আহলে হাদীস’ ব্যবহার করা হবে।’’ [সূত্র. জঙ্গে আযাদী-১৮৫৭, কৃত. আইয়ূব ক্বাদেরী) দরখাস্তটার মঞ্জুরী ইংরেজী ভাষায়র অনুবাদ নিম্নে প্রদত্ত হলো-
অর্থাৎ মি. ডব্লিউ এম. ইয়াং বাহাদুর, সেক্রেটারী, পাঞ্জাব সরকার, সূত্র. চিঠি নং ১৩৭, তারিখ ১৯ জানুয়ারী, ১৮৮৭ইং, প্রাপ্রক মৌলভী আবূ সাঈদ মুহাম্মদ হোসেন সাহেব, সম্পাদক, ইশা-‘আতুস্ সুন্নাহ্, লাহোর, চিঠি নং ১৯৫, তারিখ ১২ মে, ১৮৮৬ইংরেজী এর জবাবে- এ মর্মে জানানো হচ্ছে যে, আপনার দরখাস্ত অনুসারে ‘ওহাবী’ শব্দটি এ জামা‘আতের জন্য সরকারী কাগজপত্রে ব্যবহার করা হবেনা।’’ [সংক্ষেপিত]
উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, ‘আহলে হাদীস’ সম্প্রদায়টা আসলে ওহাবী। কিন্তু এ পরিচয় বহনে নানা অসুবিধা এড়ানোর জন্য কিংবা মুসলমানদেরকে অন্যভাবে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তারা এর বিকল্প নাম ‘আহলে হাদীস’ গ্রহণ করেছে। তদুপরি, তাদের কর্মকান্ড ও মুখের দাবী থেকে বুঝা যায় যে, তারা মাযহাবের গুরুত্বকে অস্বীকার করে সরাসরি ‘হাদীস’ থেকে শরীয়তের বিধানাবলী ও সমাধান বের করে আমল করতে চায়। অথচ, তাদের মধ্যে না এর যোগ্যতা আছে, না আছে কোন সদুদ্দেশ্য; বরং ওহাবী মতবাদের প্রবর্তক ইবনে ওহাবী নজদী মাযহাবকে অস্বীকার করে ইতোপূর্বে মুসলিম সমাজে যেই বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছিলো এবং প্রকারান্তরে সেটাও বাস্তবায়ন করার স্বপ্ন দেখেছিলো ওই বিভ্রান্তিটাকেই প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা এহেন গর্হিত পথটা বেছে নিয়েছে। অথচ পবিত্র ক্বোরআনে আল্লাহ্ তা‘আলার স্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে- ‘‘তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর, অনুগত্য করো রসূলের এবং ‘উলিল আমর’ (তথা মাযহাবের ইমামদের)।’’ [৪:৫৯]
‘‘কাজেই হে লোকেরা, ইলমসম্পন্নদের জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমাদের ইলম না থাকে।’’ [২১: ৭] তাছাড়া, দারেমী শরীফে ‘বাবুল ইক্বতিদা বিল ইলমে’ বর্ণিত হয়েছে- ‘‘আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য রসূলের এবং নিজেদের মধ্য থেকে নির্দেশদাতাদের।’’ হযরত আত্বা বলেন, আয়াতে ‘উলিল আমর’ (নির্দেশ দাতা) হলেন- সম্মানিত জ্ঞানী ও ফিক্বহবিদগণ। তাছাড়া, ‘তাফসীর-ই সাভী’ শরীফে ‘ওয়ায্কুর রাব্বাকা ইযা নাসী-তা’-এর তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘‘চার মাযহাব ব্যতীত অন্য কারো ‘তাক্লীদ’ (অনুসরণ) করা বৈধ নয়; যদিও তা হয় সাহাবা-ই কেরামের অভিমত, সহীহ্ হাদীস ও আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যে ব্যক্তি এ চার মাযহাব বহির্ভুত, সে নিজেও পথভ্রষ্ট, অপরকেও পথভ্রষ্টকারী। কারণ ক্বোরআন ও হাদীসের নিছক জাহেরী অর্থ লওয়া কুফরের মূল। এতদ্ব্যতীত ক্বোরআন, সুন্নাহ্ ও ফিক্বহর যথেষ্ট প্রমাণ এ মর্মে রয়েছে যে, তাক্বলীদ করা (মাযহাবের অনুসরণ করা) ‘মুক্বাল্লিদ’ পর্যায়ের মুসলমানদের উপর ওয়াজিব বা অপরিহার্য। এর ব্যতিক্রম করা জঘন্য গোমরাহী।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এ লা-মাযহাবীরা ইসলামী বিধানাবলীতে যেসব নতুন কাজ উদ্ভাবন করেছে, সেগুলোর অধিকাংশই হানাফী মাযহাবের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ মাযহাবগুলোর মধ্যে হানাফী মাযহাবই শ্রেষ্ঠ। হানাফী মাযহাবের ইমাম হলেন ইমাম-ই আ’যম। হানাফী মাযহাবের দলীলগুলো সর্বাধিক মজবুত। সর্বোপরি, হানাফী মাযহাবের অনুসারীও সারা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী। (বিশ্বের অর্দ্ধেক কিংবা অর্দ্ধেকেরও বেশী মুসলমান হানাফী।) এসব কারণে, সালাফী ও আহলে হাদীস তথা লা-মাযহাবীরা তাদের বিরোধিতার সর্বোগ্রে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইমাম-ই আ’যম আবূ হানীফা ও হানাফী মাযহাবকে। তারা অন্যান্য ইমামের তুলনায় ইমাম আ’যমের শানে বেশী অশালীনতা প্রদর্শন করে, আর হানাফী মাযহাবের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ ইমাম-ই আ’যমের শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আর ইমাম আ’যম ও অন্যান্য ইমামগণের শানে বেয়াদবী করা বে-দ্বীনী বৈ-কিছুই নয়। আরো লক্ষ্যণীয় যে, তাদের হানাফী মাযহাব-বিরোধী অনেক কাজ শাফে‘ঈ, হাম্বলী ও মালেকী মাযহাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অথচ তারা হানাফী মাযহাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে যে অন্য মাযহাবের প্রকারান্তরে অনুসরণ করছে, তা মুখে বলে না। তাদের আরেক কৌশল লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, তারা কথায় কথায় ইমাম বোখারীর বোখারী শরীফ ও তাঁর কিছু কিছু লেখনীর বরাত দেয়। অথচ, ইমাম বোখারী হয়তো শাফে‘ঈ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন অথবা তিনি নিজে একজন মুজতাহিদ ছিলেন। আরো মজার বিষয় যে, অনেক বিষয়ে হানাফী মাযহাবের পক্ষে খোদ্ বোখারী শরীফে সহীহ্ হাদীস রয়েছে। সুতরাং হানাফী কিংবা অন্য কোন মাযহাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে ইমাম বোখারীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগ নেই। মর্যাদাগতভাবেও ইমাম-ই আ’যম হলেন ইমাম বোখারীর দাদা-ওস্তাদ। এ প্রসঙ্গে যদি লা-মাযহাবীরা এ প্রশ্ন করে যে, ‘তা-ই যদি হয়, তাহলে ইমাম বোখারী ইমাম আযমের বর্ণিত হাদীস কেন বোখারী শরীফে উল্লেখ করেন নি?’ এর জবাব হচ্ছে- ইমাম বোখারী ইমাম মুসলিমেরও কোন হাদীস তাতে আনেননি। এতে তো মুসলিম শরীফের বিশুদ্ধতার কোন ক্ষতি হয়নি। কি কারণে ইমাম বোখারী তাঁদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেননি, তাও হাদীস শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সেগুলো উল্লেখ করে কলেবর বৃদ্ধি করার কোন যুক্তি নেই।

এখন দেখা যাক আহলে হাদীসের উদ্ভাবিত হানাফী-মাযহাব বিরোধী কিছু কর্মকান্ড। বিশেষত নামাযের ক্ষেত্রে তাদের ব্যতিক্রমধর্মী ও অমূলক কার্যাদি বেশী পরিলক্ষিত হয়। যেমন- নামাযে দাঁড়াতে গিয়ে দু’পায়ের মধ্যখানে অস্বাভাবিক ফাঁক করে দাঁড়ায় সালাফীও লা-মাযহাবীরা; অথচ হানাফী মাযহাব মতে দাঁড়াতে হয় দু’পায়ের মাঝখানে মাত্র চার আঙ্গুল পরিমাণ ফাঁক রেখে।
তাকবীর-ই তাহরীমাহ্ বলার সময়, হানাফী মাযহাব মতে, পুরুষ তার দু’হাত তুলবে তার দু’কান পর্যন্ত আর নারী তার দু’কাধ পর্যন্ত। তারপর পুরুষ তার দু’হাত বাঁধবে তার নাভীর নিচে, আর নারী তার বুকের উপর। কিন্তু সালাফী ও আহলে হাদীস উভয় ক্ষেত্রে যথাক্রমে পুরুষকে বলে হাত কাঁধ পর্যন্ত তুলতে, আর হাত বাঁধতে বুকের উপর। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রে মেয়েদের মতো করতে বলে। অথচ উভয় ক্ষেত্রে হানাফীদের প্রমাণ-ই মজবুত, তাই হানাফী মাযহাব শ্রেষ্ঠতম। ইমাম সূরা ফাতিহা পড়ার পরক্ষণে মুক্তাদীগণ ‘আমীন’ বলবে নি¤œস্বরে। কিন্তু সালাফী ও আহলে হাদীস বলে উচ্চস্বরে। অথচ নি¤œস্বরে বলার পক্ষে দলীলগুলো অধিকতর শক্তিশালী। তারপর নামাযের বৈঠকগুলোতে পুরুষ বসবে বাম পা বিছিয়ে সেটার উপর আর ডান পা সোজা করে দাঁড় করিয়ে এমনভাবে বসবে যেন আঙ্গুলগুলো ক্বিবলার দিকে থাকে। আর মেয়েরা বসবে উভয় পা ডানদিকে বের করে দিয়ে। কিন্তু সালাফী ও তার দোসররা এ ক্ষেত্রেও পুরুষদেরকে মেয়েদের মতো করতে প্ররোচনা দেয়। এভাবে তারাবীহর নামায বিশ রাক্‘আত পড়া সুন্নাত-ই মুআক্কাদাহ্; কিন্তু এখানেও এসব ভ্রান্ত (সালাফী ও আহলে হাদীস) কাটসাঁট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা বলে আট রাক্‘আত পড়তে। অথচ সব দলীল বিশ রাক্‘আতের পক্ষে। আর আট রাক্‘আতের কোন দলীলই তারাভীহ্ নামাযের নয়; বরং অন্যান্য নামাযের। আর ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীর ছয়টি; কিন্তু লা-মাযহাবী বলে আরো বেশী। বিতরের নামাযের বেলায়ও একই বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজে লিপ্ত এসব গোমরাহ্ লোক। অথচ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায় যে, এসব ক’টি বিষয়েই হানাফীদের প্রমাণাদি অতি মজবুত ও যুক্তিযুক্ত। পক্ষান্তরে, সালাফীদের দোসর ‘আহলে হাদীস’-এর কর্ম, অপতৎপরতা ও অশালীনতাপূর্ণ আচরণ দেখলেই বুঝা যায় যে, তারা কোন না কোন ভ্রান্ত বরং মহাভ্রান্তের প্রদত্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছে। তাদের ধর্মীয় জ্ঞান না থাকা ও বিধর্মীদের বেশভূষা গ্রহণ করা সত্ত্বেও মাযহাবের বিরুদ্ধে বলা এবং ক্বোরআন-সুন্নাহ সমর্থিত ও মুসলিম সমাজে সসম্মানে সমাদৃত ইমামদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার মতো ধৃষ্ঠতা দেখলেই অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে সহজে অনুমান করা যায়। আরো জানা গেছে যে, বর্তমানে বাতিলদের নিয়োজিত এসব এজেন্ট দলবদ্ধ হয়ে মসজিদ ও ঈদগাহে যায় এবং পরিকল্পিতভাবে কয়েকজন করে একসাথে দাঁড়িয়ে নামাযে উক্ত সব অশালীন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে আ-মী-ন উচ্চস্বরে বলে, নির্লজ্জভাবে তাদের অশুভ উপস্থিতির ঘোষণা দেয়। মসজিদের বাইরে চনামুড়ি বিক্রেতা, মুচি-চামার ও টোকাইদেরকে টাকা দিয়ে মসজিদে নিয়ে যায় এবং নামাযে মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাদেরকে নিয়োগ করে। এদের এসব টাকার উৎস কোথায় তা নিয়েও সচেতন মানুষের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করে। মোটকথা, এসব লা-মাযহাবী (সালাফী-আহলে হাদীস)-এর অশুভ পাঁয়তারায় গণ-মানুষ তীব্র অসন্তুষ্ট ও অতীষ্ঠ। এদের ব্যাপারে সমাজকে এখন থেকে সচেতন হওয়া জরুরী। নি¤েœ অতি সংক্ষেপে কতিপয় মাসআলায় হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রয়াস পাচ্ছি। বিস্তারিত ও প্রমাণ্যভাবে প্রায় সব মাসআলার হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে যাচ্ছি মাসিক তরজুমানে।

তাকবীর-ই তাহরীমায় পুরুষ কান পর্যন্ত হাত তুলবে বোখারী মুসলিম, তাহাবী শরীফে মালেক বিন হুয়াইরিস থেকে বর্ণিত- كان النبى صلى الله عليه وسلم اذا كبر رفع يدىه حتى اذنيه وفى لفظ حتى يحاذى بهما فروع اذنتيه অর্থাৎ রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন তাকবীর বলতেন, তখন কান পর্যন্ত হাত তুলতেন। অপর বর্ণনা মতে কানের লতি পর্যন্ত হাত তুলতেন। এ ধরনের কানের লতি পর্যন্ত হাত তোলার ব্যাপারে আবূ দাঊদ শরীফের বারা ইবনে আযেব থেকে, মুসলিম শরীফে ওযাইল ইবনে হুজার থেকে বোখারী, আবূ দাঊদ ও নাসা‘ঈ শরীফে আবূ ক্বালাবাহ্ থেকে, ইমাম আহমদ, ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াহ্, দারে ক্বুতনী ও ত্বাহাভী বারা ইবনে আযেব থেকে, বায়হাক্বী তাঁর মুস্তাদরাকে আনাস ইবনে মালেক থেকে, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক বারা ইবনে আযেব থেকে, তাহাবভী আবূ হুমাইদ সা’দী থেকে ২০টি বর্ণনা এসেছে, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে তাকবীরে তাহরীমার সময় কানের লতি পর্যন্ত হাত তোলার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং আহলে হাদীস বলে দাবীদারগণ এতগুলো হাদিসের উপর আমল না করেও কিভাবে ‘আহলে হাদীস’ পরিচয় দেয় তাও ভাববার বিষয়।
উচ্চস্বরে আ-মীন বলা: সালাফী ও আহলেহাদীস মাগরিব এশা এবং ফজরের নামাযে ইমাম সূরা ফাতিহা পাঠ শেষ করলে উচ্চস্বরে আমিন বলে। এবং মুসলিম সমাজে নতুন আরেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। অথচ হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু যে হাদিস দ্বারা আমীন উচ্চস্বরে বলার দলিল দিয়ে থাকেন সেখানে উচ্চস্বরে বলার কোন কথাই নেই। হাদিস পেশ করা হলো- হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন তোমাদের কেউ যখন নামাযে আমিন বলে, তখন ফেরেশতারা আসমানে আমীন বলেন। তখন একে অপরের আমীন এক সাথে হয়ে যায়, তখন আল্লাহ্ তার সমস্ত অতীত গোনাহ্ মাফ করে দেন। [বোখারী শরীফ: ৭৮১, মুসলিম শরীফ:৪১০] এ হাদীসে আমীন উচ্চস্বরে বলার কোন কথাই নেই। আর এটাই লা-মাযহাবীদের উচ্চস্বরে আমিন বলার দলিল। এভাবে আরো একটি হাদীসের দিকে দেখা যাক- হযরত আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নামায শেখাতে গিয়ে বলেছেন, তোমরা ইমামের আগে কোন কাজ করবে না। ইমাম তাকবীর বললে তোমরাও তাকবীর বলবে, ইমাম ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামীদাহ্ বললে তোমরা ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’ বলো। ইমাম ওয়ালাদ্ব্ দ্বোয়া-ল্লীন’ বললে তোমরা আমীন বলো। [মুসলিম শরীফ, হাদিস নং ৪১৫]
এটা আহলে হাদীসের দলিল। অথচ এখানে আমীন বলার কথা থাকলেও উচ্চস্বরে বলার কোন ইঙ্গিত নেই। এদের আরো একটি দলিল- তিরমিযী শরীফে হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘‘আমি রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে শুনেছি যে, তিনি ‘গাইরিল মাগদ্বূবে আলায়হিম ওয়ালাদ্ব্ দ্বোয়া-ল্লী-ন’ বলে আমীন বললেন, আওয়াজকে দীর্ঘ করে (মাদ্ পড়ে) আ-মীন।
দেখুন, হাদিসে এসেছে ‘মাদ্দাবিহা’ এর অর্থ মাদ্ করা, দীর্ঘ করা, আ-মী-ন টেনে টেনে পড়াকে ‘মাদ্’ বলে। যেমন ক্বারী সাহেবানগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করবেন। এটাকে উচ্চস্বরে অর্থ নেয়া অপব্যাখ্যার নামান্তর। অবশ্য আবূ দাঊদ শরীফে ‘রাফা‘আ বিহ্ াসাওতাহু’ এসেছে যার অর্থ আওয়াজকে উঁচু করা। এর জবাবে আলিমগণ বলেছেন, প্রথমত: এর পূর্বের মাদ্দা শব্দকে কোন বর্ণনাকারী হয়তো ‘রাফা‘আহ’ দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন। অথবা তিরমিযী ও আবূ দাঊদের রেওয়ায়েতে নামাযের কথা নেই। হতে পারে নামায ছাড়া সূরা ফাতিহা পড়লে সকলের ঐকমত হলো আমিন উচ্চ স্বরে পড়া। অথবা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম দুই, একবার তালিম দেয়ার জন্য উচ্চস্বরে পড়েছেন- এসব উত্তর এ জন্য দিতে হচ্ছে যেহেতু আমীন নি¤œস্বরে পড়ার পক্ষে সরাসরি হাদীস ‘নাস’ (দলীল) এসেছে। যেমন-
‘‘হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, তিনি একদা রাসূলে পাকের সাথে নামায পড়ছিলেন। তিনি যখন ওয়ালাদ্ব্ দ্বোয়া-ল্লীন’ এ পৌঁছলেন তখন চুপিচুপি আমীন বললেন। [আহমদ-৪র্থ খন্ড, পৃ. ৩১৬, আবূ দাঊদ-৯৩২,৯৩৩ পৃ., মোস্তাদরাক এর বর্ণনায় এসেছে ইয়াফিদ্বু বিহা সাওতাহু’ (আওয়াজকে নিচু করলেন), ২য় খন্ড, ২৫৩ পৃ. হাদীস নং-২৯১৩] নি¤œলিখিত হাদীসে ‘আমীন’সহ এরা ৪টি বিষয় নামাযে নি¤œস্বরে পড়ার সরাসরি উল্লেখ রয়েছেঃ ‘‘হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, ইমাম ৪টি বস্তু ছোট আওয়াজে পড়বে। এক. আউযুবিল্লাহ্, দুই. বিসমিল্লাহ্, ৩. আমিন, ৪. রাব্বানা লাকাল হামদ। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত হাকিমুল উম্মত আকায়ে নে’মত মুফতী আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী বদায়ূনী আশরাফী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি লিখিত জা‘আল হক-এর ২য় খন্ড (৪৫-৫২) দেখার অনুরোধ রইল।

৩য় মতবিরোধ: বুকের উপর হাত বাধা: লা-মাযহাবিদের আরেকটি ব্যতিক্রম কাজ হলো বুকে হাত বাঁধা। নারী ও পুরুষের হাত বাঁধা নিয়ে ভিন্ন পদ্ধতি চলে আসছে। পুরুষ নাভীর নিচে হাত বাঁধবে আর মহিলা বুকের উপর। কিন্তু ‘আহলে হাদীস’ লা-মাযহাবীরা এই ভেদাভেদকে অমান্য করতঃ উভয়কে বুকের উপর হাত বাধার জন্য বাধ্য করে। এবং দলিল হিসেবে আবূ দাঊদ শরীফের একটি হাদীস পেশ করে। তা হচ্ছে- হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর বলেন, ‘‘আমি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে দেখেছি, তিনি বাম হাতের কব্জিকে ডান হাত দ্বারা ধরেছেন, আর নাভীর উপরে বেঁধেছেন।’’ সুতরাং বুঝা গেল নাভীর উপরে অর্থাৎ বুকে হাত বাধঁতে হবে। সম্মানিত পাঠক দেখুন যে হাদীস দ্বারা দলিল দেয়া হলো সে হাদিসে বুকের নাম গন্ধও নেই তা ছাড়া সে আবূ দাঊদ শরীফেই ওই হাদীসের পরপর আরো ব্যাখ্যা আছে তা কৌশলে গোপন করা হচ্ছে। যেমন- তাতে বর্ণিত হয়েছে- ‘‘এই নাভীর উপরে বাধা শব্দটি আবূ দাঊদের বর্ণনা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে সাঈদ ইবনে জুবাইর রেওয়ায়েত করেছেন। কিন্তু ওই একই সাহাবী থেকে আবূ জালাদ বর্ণনা করেছেন, ‘নাভীর নীচে’। আর হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন, ‘নাভীর উপরের বর্ণনাটি’ শক্তিশালী নয়। এতে গেলো নাভীর উপর হাত বাঁধার বর্ণনা। কিন্তু নিচে বাধাঁর ব্যাপারে প্রায় ১৪টি হাদিস বর্ণিত আছে। তার ১টি নি¤েœ উল্লেখ করা হলো- ‘‘ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন, আমি স্বয়ং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি তিনি ডান হাতকে বাম হাতের উপরে নাভীর নিচে হাত বেঁধেছেন। ইবনে আবী শায়বা এই হাদীস বর্ণনা করে বলেছেন ওই হাদীসের সকল রাভী নির্ভরযোগ্য। [ইবনে আবী শায়বা ১ম খন্ড, ৩৯০ পৃ. তদরীবুর রাবী ১ম খন্ড, ১৮৮পৃ. আসারুস্ সুনান ১৭পৃ.]
চতুর্থতঃ রুকুর পূর্বে ও পরে হাত তোলা: এ সম্পর্কে নি¤েœর হাদিসটি দেখুন- ‘‘হযরত জাবের ইবনে সামুরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, আমার কি হলো যে, আমি তোমাদেরকে অবাধ্য ঘোড়ার লেজ তোলার মতো (বার বার) হাত তুলতে দেখছি? নামাজে শান্ত থাকো (এমনটি করো না)। [মুসলিম শরীফ ১ম খন্ড, ১৮১ পৃ. আবূ দাঊদ ১ম খন্ড, ১৪২পৃ.] এ হাদীসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে তাদেরকে রুকুর পূর্বে পরে হাত তুলতে নিষেধ। সুতরাং প্রমাণিত হলো ‘রফ‘ই ইয়াদাঈন’ সুন্নত নয়; বরং মানসূখ বা রহিত। হযরত আলকামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু একদিন আমাদেরকে বললেন, আমি তোমাদেরকে রাসূলাল্লাহর নামায পড়ে দেখাব? তখন তিনি নামায শুরু করে দিলেন। যে নামাযে তিনি শুধুমাত্র একবারই (তাহরীমাতে) হাত তুলেছেন। [আবূ দাঊদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১০৯, তিরমিযী ২য় খন্ড, পৃ. ৪০, নাসা‘ঈ ১ম খন্ড, পৃ. ১৯৫] ইমাম তিরমিযী এ হাদিসকে ‘হাসান’ বলেছেন। সাহাবী তাবেয়ীগণ এ হাদিস এর উপর আমল করেছেন। এটাই সুফিয়ান সাওরী এবং কুফাবাসীর মতামত। এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। মোটকথা চার খলিফা থেকে সহীহ্ সনদে হাত তোলার কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। যদি হাত তোলা সুন্নাত হতো, তাহলে অবশ্যই চার খলিফা এর উপর আমল করতেন। বুঝা গেল এটা সুন্নাত নয়, মনসুখ।

পঞ্চমতঃ ইমামের পেছনে ক্বিরআত: লা-মাযহাবীদের আরেক নতুন কথা হলো ইমামের পেছনে মুক্তাদী ক্বিরআত পড়তে হবে। অন্ততঃ সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। কখনো বলে নিচু স্বরে, যখন ইমাম ক্বিরআত পড়েন, তখন মুক্তাদীকে ক্বিরআত পড়তে হবে। অথচ হাদিস শরীফে ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে, ইমামের পেছনে নামায পড়লে মুক্তাদী কিরআত পড়বে না- হযরত আবূ মূসা আশয়ারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদের নামায শিখিয়েছেন, বলেছেন যখন তোমরা নামাযে যাবে তোমাদের একজন ইমামতি করবে এবং ইমাম যখন ক্বিরআত পড়বে তোমরা তখন চুপ থাকবে। [মুসলিম ১ম খন্ড, পৃ. ১৭৪, আদদেরায়া ফি তখরীজে আহাদীসে হেদায়া, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৪, মুসনাদে আবী আওয়ানা, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৩ আহমদ]
হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে ক্বিরআত ইমামই পড়বে আর মুক্তাদী নীরব থেকে শুধুই শুনবে। এ হাদীস একদিকে যেমন মুক্তাদী ক্বিরআত না পড়ার জন্য দলিল অপরদিকে এটা সূরা আ’রাফ এর ২০৪ নং আয়াতের তাফসীরও বটে। ‘‘আর যখন ক্বোরআন তিলাওয়াত করা হবে তখন কানপেতে শুন এবং চুপ থেকো যাতে তোমাদের উপর রহমত বর্ষিত হয়।’’ আ’রাফ ২০৯, পারা-৯ আয়াতকে পড়বে তা বলা হয়সি হাদিসে তা পরিস্কার করা হয়েছে পাঠক হলো ইমাম। অথএব বুঝা গেল মুক্তাদী ইমামের পেছনে ফাতিহাও পড়বে না কোন ক্বিরআতই পড়বে না। হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনাতেও তার কথা বলা হয়েছে-ইমাম এ জন্য বানানো হয়েছে যেন তাকে অনুসরণ করা হয়। অতএব ইমাম তাকবীর বললে তোমরাও তাকবীর বলো ইমাম ক্বিরআত পড়লে তোমরা চুপ থেকো। [নাসা‘ঈ, ২য় খন্ড, পৃ. ১১২]
হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যার ইমাম আছে ইমামের ক্বিরআত-ই তার জন্য ক্বিরআত। [মুয়াত্তা, ৮৯পৃ. মুসনাদে ইমাম আযম, পৃ. ৬১] এ হাদীসগুলো সহীহ্ এবং এর সকল রাভী বিশ্বস্থ ও নির্ভরযোগ্য আহলে হাদীসরা বোখারী-মুসলিমের একটি রেওয়ায়েত ‘‘লা-সালাতা ইল্লা-বি ফাতিহাতাল কিতাব’’ এ হাদীস দ্বারা যে মুক্তাদীকেও সূরা ফাতিহা পড়তে হবে বলে দলিল দিয়ে থাকেন সে হাদিসে তো ফাসা-‘ইদান শব্দও আছে, যার অর্থ সূরা ফাতিহা ও আরো কিছু আয়াত ছাড়া নামায হবে না। সে হাদীস অনুসারে তো মুক্তাদীরদেরকে ফাতিহা কেরাত সব পড়তে হবে, আহলে হাদীসরা তো বলে না শুধু ফাতিহা পড়তে বলে তাও আবার জোহর ও আসরে। যেখানে চুপে চুপে ক্বিরআত পড়া হয়। আহলে হকের কথা হলো- এ হাদিসের ব্যাখ্যা সুফিয়ান সাওরী করেছেন- যা আবূ দাঊদে উল্লেখ আছে لمن يصىل وحده অর্থাৎ যে একাকী নামায পড়বে তার জন্য এ হাদীস প্রযোজ। জামাতে পড়লে আগের হাদীস অর্থাৎ فقراءة الامام له قراة ইমামের ক্বিরআতই মুক্তাদীর ক্বিরআত প্রযোজ্য।
মোটকথা, আলহামদুলিল্লাহ্, আহলে সুন্নাতই সঠিক ও সরল পথে আছেন। মাযহাবের অনুসরণ আহলে সুন্নাতেরই আক্বীদা। বর্তমানে বিশ্বে হানাফীম, শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী- যে চার মাযহাব রয়েছে এগুলো সত্য। এগুলোর মধ্যে যে কোন একটার অনুসরণ ওয়াজিব বা অপরিহার্য। পক্ষান্তরে, মাযহাবকে অস্বীকার করাও একটি মহা গোমরাহী বা ভ্রান্তি। মাযহাব অস্বীকারকারীদের গুরুঠাকুর হচ্ছে ওহাবী নেতা ইবনে আবদুল ওহাব নজদী। প্রথমে তার অনুসারী ও প্রচার করা তাল মিলিয়ে চলার জন্য মাযহাবের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত করলেও আরবে এখন তারা নিজেদেরকে তথাকথিত ‘সালাফী’ বলে পরিচয় দেয় এবং এ উপমহাদেশের ওহাবীদের ‘মাযহাববিরোধী সম্প্রদায়টি নিজেদের ‘ওহাবী’ না বলে তথাকথিত আহলে হাদীস’ বলে পরিচয় দেয়। উভয়ের আক্বীদা ও আমল এক ও অভিন্ন। তাই নির্দ্ধিদায় বলা যায়- ‘আসল ওহাবী’ ও ‘আহলে হাদীস’ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এদের থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা ও তাদের খন্ডন ও প্রতিহত করা মুসলিম সমাজের উপর অপরিহার্য কর্তব্য।

বাউল নামের ফাউল আর আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিদের পরিত্যাজ্য

  ইদানীং বাউলদের ফাউল আচরন আর সৃষ্টি কর্তার সাথে বেয়াদবীর সীমা অতিক্রম করেছে। আগের যুগে আইয়্যেমে জাহেলিয়াতের কবিরা যেরকম আচরন করত সেরকম আচরন...