১৯৬৪ সালের ২৮ মে আল-কুদস শহরে ফিলিস্তিনি কংগ্রেস বসে। এই কংগ্রেসে ফিলিস্তিন মুক্তিসংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। গঠিত হয় ফিলিস্তিন মুক্তিবাহিনী 'পিএলও'। পরবর্তীতে ইয়াসির আরাফাতের আল-ফাতাহ 'পিএও-ই' যোগ দিলে এটি হয়ে উঠে তার সামরিক বাহিনী।
১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে মিসরের সামরিক বাহিনী অতর্কিত সুয়েজ খাল অতিক্রম করে অলঙ্ঘনীয় বলে খ্যাত ইসরাঈলের বারলেভ প্রতিরক্ষা লাইন ভেঙে ফেলে এবং সিনাই মরুভূমি ও দখলকৃত ইসরাঈলি ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে। পূর্বদিক থেকে একই সময় সিরিয় বিমানবাহিনী ইসরাঈলের উপর হামলা চালায়। যুদ্ধের প্রথম কয়েকদিনে ইহুদিবাদের শত শত জঙ্গিবিমান ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়। নিহত হয় কয়েক হাজার ইসরাঈলি। শূণ্যে মিলিয়ে যায় ইসরাঈলের অপরাজেয় হওয়ার রূপকথা। যুদ্ধের পরবর্তী দিনগুলোতে ক্রুসেডার যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের দ্রুত সামরিক সহায়তা ও সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সিরিয় সেনাবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতায় যুদ্ধের গতি ইহুদিদের পক্ষে মোড় নেয়। অন্যান্য আরব দেশ এই যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা না রাখায় মিসর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। ইসরাঈলি সামরিক বাহিনি হেলিবোর্ডের মাধ্যমে সুয়েজ খালের পশ্চিমে মিসরের অভ্যন্তরের একটি ছোট্ট এলাকায় সৈন্য নামিয়ে তা অবরোধ করতে সক্ষম হয়। অবশেষে ক্রুসেডার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কায়রো থেকে ৬০১ কিলোমিটার দূরত্বে যুদ্ধাবসানের জন্য আলোচনা শুরু হয় এবং সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে।
রমজানের যুদ্ধ ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদীদের দখলদারী প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। দুই পক্ষের সমরাস্ত্র, লজিস্টিক ও ক্ষয়-ক্ষতি থেকে এর আন্দাজ করা হয়। ১৯ দিন ব্যাপী স্থায়ী এ যুদ্ধে তিন হাজারের অধিক ইহুদি সন্ত্রাসী নিহত হয়। আহত হয় ৯ হাজারের মতো। জায়নবাদীদের প্রায় ১০৬৩টি ট্যাঙ্ক, ৪০৭টি সাঁজোয়া, ৩৮৭টি জঙ্গিবিমান ও এয়ারক্রাফট ধ্বংস হয়। ভিন্ন দিকে মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের নিহত সৈন্যের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। ৩৪১টি এয়ারক্রাফট ও ১৯টি নেভাল ভ্যাসেলসহ ধ্বংস হয় ২২৫০টি ট্যাঙ্ক। সমরশক্তির দিক থেকে শুধু মিসরই ইসরাঈল থেকে প্রায় দুই গুণ ছিল। সিরিয়া ও অন্যান্য আরব দেশের হিশেব করলে জায়নবাদীদের সঙ্গে তাদের সামরিক সক্ষমতার অনুপাত দাঁড়ায় ৩:১।
ইন্তেফাদা; বিপ্লবের নয়া তরিকা। সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানির প্রচেষ্টায় মুসলিম দেশগুলোতে যে জাগরণ আন্দোলনের সৃষ্টি হয় তা মিসরে মুহাম্মাদ আবদুহু ও সাইয়্যেদ কুতুবের মাধ্যমে নতুনত্ব লাভ করে। এই জাগরণ আন্দোলনের পরোক্ষ ফলাফল আল্লামা ইকবালের মতো মনীষীদের মাধ্যমে পাক-ভারতে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, আলজেরিয়াতে ১৯৬২ সালের বিপ্লব প্রভৃতি।
মুসলিম বিশ্বের আত্মমর্যাদাহীন সরকারগুলো মুসলমানদেরকেই স্বৈরাচার বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও ইসলামি জাগরণের তাত্ত্বিক দিকটিকে ম্লান করে দেখতে বাধ্য করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে 'আরব জাতীয়তাবাদ'কে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছিল, যার প্রধান চিন্তক ছিল খ্রিষ্ট-ধর্মাবলম্বী মাইকেল আফলাক (সিরিয়া ও ইরাকের বার্থ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাদ্দাম ও হাফেজ আসাদের তাত্ত্বিক গুরু)। ফিলিস্তিনের জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংঘবদ্ধ ও সংহত হওয়ার সূত্রটি ইসলাম ছিল না, ছিল আরব জাতীয়তাবাদ। এ কারণে ফিলিস্তিনিরা ইসলামি, খ্রিষ্টীয় ও সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন মতাদর্শ নিয়ে কাজ করতো। কিন্তু এগুলো তাদেরকে তাওহিদ-বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ জিহাদে উজ্জীবিত করতে পারেনি। ইরানের শিয়ারা শাহের বিরুদ্ধে নাশকতার প্রশিক্ষণ নিতো ফিলিস্তিনি শিবিরগুলো থেকে। ফলে ফিলিস্তিনি গেরিলা গ্রুপগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। ১৯৭৮ সালে ইরানে শিয়া বিপ্লবের গতিধারা তুঙ্গে উঠলে 'আজ ইরান কাল ফিলিস্তিন' শ্লোগান ফিলিস্তিনিদের কিছুটা আশান্বিত করে। কিন্তু শিয়া বিপ্লবকেন্দ্রিক সমস্ত আশা ফিলিস্তিনিদের জন্য গুড়েবালি হয়ে থেকেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রাচ্যব্লক ও প্রগতিশীল দেশগুলো বাহ্যত ফিলিস্তিনি গেরিলা গ্রুপগুলোর পৃষ্ঠপোষক ছিল। এসব পৃষ্ঠপোষকতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা। এই দেশগুলোর কোনো একটিও ইসরাঈলের অস্তিত্ব বিরোধী ছিল না। জায়নবাদীদেরকে তারা বরং বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহায়তা দিয়েছে।
বিরুদ্ধে আন্দোলনের নূন্যতম নীতি অবস্থানও গ্রহণ করা হয়নি। সম্মেলনের সব মনোযোগ নিবন্ধ ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে আম্মানে অনুষ্ঠিত আরব শীর্ষ সম্মেলনে জায়নবাদী ইহুদিদের ছিল ইরান-ইরাকের যুদ্ধের দিকে এবং সামগ্রিকভাবে এ সম্মেলন ক্যাম্প ডেভিড লাইন ধরে এগিয়ে যায়। এদিকে ফিলিস্তিনি জাতি বছরের পর বছর অপেক্ষা করছিল আরবজগত তাদেরকে বাস্তহারা অবস্থা থেকে নাজাত দেবে। বিশেষত অধিকত ফিলিস্তিনে বসবাসরত ফিলিস্তিনি জনজস তাকিয়ে ছিল আরব সরকারগুলোর দিকে।
ফিলিস্তিনের মজলুম জাতি তাদের গেরিলা গ্রুপগুলোর ভোগ-বিলাস, বিভেদ, অনৈকা ও দলাদলির পরিপ্রেক্ষিতে এবং ফিলিস্তিনি জনতার দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার প্রতি আরব সরকারগুলোর প্রকাশ্য উদাসীনতা ও অবহেলা প্রত্যক্ষ করে আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তা-দর্শনের কার্যকারিতা এবং সরকারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন সম্পর্কে আরেকবার সব আশা-ভরসার অবসান ঘটায়। ১৯৮৭ সালের হেমন্তে অধিকৃত ফিলিস্তিনের সাধারণ জনতা ইসরাঈলের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা ঘটায়, যার নাম দেয়া হয় ইন্তিফাদা। ইন্তিফাদার অর্থ 'আন্দোলন করা, নাড়া দেয়া'। ইন্তিফাদার পূর্বপর্যন্ত তামাম আন্দোলন ও অভ্যুত্থান ছিল বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন 'ফাতাহ আন্দোলন'। এটি ১৯৮৩ সালের মে মাসে আরাফাতের নেতৃত্বাধীন আল-ফাতাহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এবার (১৯৮৭) এই ইন্তিফাদার আগে বা পরে কোনো বিশেষণ যুক্ত হয়নি। এই ইন্তিফাদা মূলত গণপ্রতিবাদ বা গণঅভ্যুত্থান। ফিলিস্তিনে জায়নবাদীদের দখলদারীর প্রতিবাদে সংঘটিত এই ইন্তিফাদার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল-
ক. বিস্মৃতির আস্তাকুঁড় থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুকে বের করা।
খ. বিশ্ব জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণ।
গ. এ অঞ্চলে ইসলামি আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে ইন্তিফাদাকে সমন্বিত করা, যা ইন্তিফাদার চেহারার সবিশেষ রূপ দান করে।
ঘ. ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানকে জরুরী পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন।
ঙ. ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপকে ঘনিষ্ঠ করা।
চ. আমেরিকা ও ইহুদিদের মনে ইসরাঈলের রাজনৈতিক শুদ্ধতা সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা।
ছ. জায়নবাদীদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকিযুক্ত করা।
জ. ফিলিস্তিনি গেরিলা দলগুলোর অভ্যন্তরীন কোন্দল ও মতভেদকে ম্লান করে আরব সরকার ও আন্তর্জাতিক সমাজকে জনমতের অনুসারী করা, যারা এতোদিন নিজ নিজ স্বার্থে ফিলিস্তিন ইস্যুকে ব্যবহার করে আসছিল।
জবরদখল ও জায়নবাদীদের সরকার প্রতিষ্ঠার চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পর ইন্তিফাদার ফলে প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনি জনগণ আক্রমণাত্মক অবস্থানে এবং ইসরাঈলিরা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকায় যেতে বাধ্য হয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ