ইদানীং একদল আলেম ও ওলামা বৃন্দ ও তাঁদের অনুসারীরা আল কোরআন ও সহীহ হাদিস ব্যতিত আর কিছু শরীয়তের দলিল হিসাবে মানতে চায় না।
তাদের যুক্তি হলো:
১। দুনিয়াতে অনেক জাল ও জয়ীফ হাদিসের ছড়াছড়ির কারনে মানুষ জাল হাদিস পালন করে পথ ভ্রষ্ট হচ্ছে, তাই সহীহ হাদিস পড়ে যা বুঝবে তাই পালন করবে,কারো তাকলীদ করবে না।
২। কোরআন ও হাদিসের বাইরে যাই মানবেন তাই বিদা'ত, অতএব করো তাকলীদ করা হারাম।
৩। হাদিস পড়ে যা বুঝবো তাই মানবো,সহীহ হাদিসে যা নাই তা মানবো না মানবো না।
৪। জয়ীফ হাদিস বর্জনীয়, কারে তাকলীদ করে না,তাকলীদ করা নাকি হারাম।
এরা নিজেকে আহলে হাদিস নাম বলে দাবী করে,বাকী সবাইকে বিদা'তি মনে করে।
একটা কথা তারা মানতে চায় না যে ইসলাম কোনো কিতাব ভিত্তিক ধর্ম নয়, ইসলম সম্পূর্ণ ব্যবহারিক ধর্ম এটা তারা মানতে চায় না। এই ধর্মটা শুধু বই পড়ে শিখার নয়, সম্পূর্ণ ব্যবহারিক ধর্ম,কোনো কিতাবি ধর্ম নয়।। এই ধর্মের শিক্ষক সরাসরি আল্লাহ সুবহানাল্লাহ এবং জিবরাইল মারফত শিক্ষা দিয়েছেন নূর নবী হযরত মুহাম্মদ সা: কে।নূর নবী হযরত মুহাম্মদ সা: শিক্ষা দিয়েছেন সরাসরি সাহাবাগনকে, সাহাবারা হযরত মুহাম্মদ সা:এর কথা শোনে,আদেশ শোনে,সরাসরি দেখে শিখেছেন। যা সরাসরি দেখে শিখেছেন কিন্তু লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয় নি তা হাদিসে আসে নি।আবার হাদিসে যেগুলো এসেছে তার সবগুলোর সনদও শক্তিশালী নয়। এখন সাহাবাগন যা দেখে দেখে শিখেছেন তার সব কিছু হাদিসে আসে নি, তার পরও দেখে শিখা বিষয়গুলো সাহাবাগন আমল করতেন এবং তারাও পরবর্তীতে তাবেঈ,তাবে তাবঈদের শিখিয়েছেন, তাবেতাবেঈগন পরবর্তী জেনারেশনকে আমল শিখিয়েছেন। এটাকে বলে আমলের ক্রমধারা। ক্রমধারা অনুযায়ী কোনো আমল যদি জয়ীফ হাদিসে লিপিবদ্ধ থাকে সে ক্ষত্রে সেটা সহীহ হাদিসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এটা অনেকে জানে না।
আবার দেখেন হযরত মুহাম্মদ সা: কে আল কোরআনে সমস্ত সমস্যার সমাধান পুংখনো পুংখ ভাবে আলকোরআনে লিপিবদ্ধ করে দিলেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনেক বিষয়ে আল্লাহ সরাসরি দেন নি, ঐ বিষয় গুলোর বিষয়ে হাদীসে বিস্তারিত বর্ননা করা আছে,কারন ঐ বিষয় গুলো হযরত মুহাম্মদ সা: এর জীবদ্দশায় নিজেই সমাধান করে গেছেন, এই বিষয় গুলো হাদিসে বর্নিত আছে এবং কিছু হাদিসে বর্নিত না থাকলেও আমলের ধারা অনুযায়ী চলে আসছে সাহাবা ও পরবর্তী জেনারেশনে।
এখন বুঝার বিষয় হলো হযরত মুহাম্মদ সা: এর ওফাতের পর সাহাবাদের সময়ে যে নতুন নতুন সমস্যার সময়ের প্রেক্ষীতে সম্মুখীন হতে হয়েছে মুসলমানদের সেগুলো কি হাদিসে ছিলো? না ছিলো না, সে গুলো সাহাবাগন তাদের তাকওয়া, বুদ্ধি, ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে কোরআন ও হাদিসের মূলনীতি অনুযায়ী সমাধান করেছে,সে ক্ষেত্রে তো হাদিসের রেফারেন্স আনার সুযোগ ছিলো না। সে সময়ের যে সমাধান গুলো সাহাবাগন নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শরীয়ত মত সমাধান করেছে সে সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি কি অস্বীকার করা যাবে, নিশ্চয়ই না।
সাহাবাদের পর তাবেঈদের আমলেও কিছু নতুন নতুন সমস্যা যুগের আলোকে তৈরী হয়েছে, তখন তাবেঈগন প্রথমে আলকোরআন, তার পর হাদিস তারপর সাহাবাগনের জীবনেও যখন একই সমস্যার বিষয়ে দলিল প্রমান পায় নি তখন তাঁদের আমলে তারাও শরীয়তের আলোকে কিছু নতুন সমস্যার সমাধান নিজেরা করতে হয়েছে, সে ক্ষেত্রে তাদের সামাধান পদ্ধতি কি অস্বীকার করার উপায় আছে? এভাবে তাবেতাবেঈ, আইয়ামে ৃমুস্তাহেদিন ও চার ইমামের সময়ও কিছু নতুন নতুন সমস্যা নতুন নতুন সময়ের আলোকে ইসলাম বিস্তারের কারনে নতুন নতুন দেশে যখন নতুন ভাবে সম্মুখীন হত তখন কোরআম,হাদিসের মূলনীতি ঠিক রেখে নতুন ভাবে সমকালীন ইসলামি চিন্তাবিদগন সমাধান করেছে,একনওমকরতে হচ্ছে, ওই গুলাকে হাদিসে না পেলে কি অস্বীকার করে বিদা'ত আখ্যা দেওয়ার সুযোগ আছে? নাই।
জয়ীফ হাদিস হলো সে সকল হাদিস যে গুলোর সনদ দূর্বল,এর মানে এই নয় যে হাদিস নয়, বরং হাদিসই। আর যদি জয়ীফ হাদিস অনুযায়ী আমলের ধারা চলে আসতে থাকে সে ক্ষেত্রে তো আর কথাই নাই, অবশ্যই পালনীয়।
তাইলে যদি শুধু মাত্র কোরআন ও হাদিস পালন করে কি সম্পূর্ণ ইসলাম পালন করা সম্ভব? তাইলে তো হযরত মুহাম্মাদ সা:: এট পরবর্তী যত সমস্যা নতুন ভাবে সমাধান হয়েছে সবই বিদা'ত হবে। আমলের ধারা অস্বীকার করে কি ইসলামে টিকতে পারবেন নাকি পথভ্রষ্ট হবেন?আপনারা যারা কারো অনুকরন করবেন না মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ তারা কি জানেন হাদিস বিশারদগন হাদিস পড়ে যা বুঝেন বা যে সিদ্ধান্ত নেন সে একই হাদিস পড়ে আপনি তার উল্টোটা বুঝে বসতে পারেন?আপনারা কি জানেন বোখারী শরীফে এমন হাদিসও আছে যার একটি হাদিস অন্য হাদিসকে রহিত করে? এগুলো না জানলে আপনি হাদিসে অভিজ্ঞ কারো শরনাপন্ন না হয়ে কি ভাবে সহীহ ভাবে হাদিস পড়েই আমল করবেন? নাকি নিজের অজান্তেই সহীহ হাদিস পড়ে সহীহ ভাবে পথ ভ্রষ্ট হয়ে যাবেন?
এবার আসুন সহীহ হাদিস পড়েও যেসকল গুরুত্বপূর্ণ শরীয়তের বিষয় গুলো নিয়ে আপনারা কোনো সমাধান পাবেন না।
কোরআন-হাদিস পড়লেও যে সকল প্রশ্নের সরাসরি সমাধান পাবেন না নিম্নে কয়েকটি তোলে ধরা হলো:
১. কোরআন শরীফের পরে সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব, বুখারী শরীফ, এটা আল্লাহর বাণী না রাসূলের বাণী এটা কোনো সহীহ হাদিসে পাবেন না।
২. বুখারী শরীফে পূর্ণ এক রাকাআত নামাযের পরিপূর্ণ বিবরণ পাবেন মা।
৩. বুখারী শরীফে কি-
سبحان ربي الأعلى، سبحان ربي العظيم، سبحانك اللهم অথবা তাশাহহুদে দরূদ পড়ার কথা পাবেন না।
৪.বুখারী শরীফে কি সীনার উপর সর্বদা হাত
বাঁধার হাদীস পাবেন না।
৫. বুখারী শরীফে উটনীর দুধ খাওয়ার কথা আছে। এর উপর শুধু হাদীস আমল কারীরা আমল করেনা। অথচ গরু, মহিষের দুধ খাওয়ার কথা কোন হাদীসে পাবেন না। (তবুও মজা করে কেন খায়? তারা তো হাদীসের বাহিরে যেতে একদম নারাজ।)
৬. বুখারী শরীফে বগলের অবাঞ্চিত লোম উপড়ে ফেলার হুকুম রয়েছে (২/৮৭৫)। তাহলে আহলে হাদীস ব্লেড ব্যবহার কেন করে? এর পক্ষে তো কোন হাদীস আছে কি, নাই।
৭. রাসূল সা. বলেছেন- যে ব্যক্তি সর্বদা রোযা রাখে, সে কোন রোযাই রাখেনি (১/২৬৫)। অথচ ইমাম বুখারী রহ. সর্বদা রোযা রাখতেন ।(ইমাম বুখারী হাদীসটি বুঝেন নি?
৮. রাসূল সা. বলেছেন- মুসিবতের সময় কেউ যেন কোনক্রমেই মৃত্যুর তামান্না না করে (২/৮৪৭)। কিন্তু এ হাদীসের বিপরীতে ইমাম বুখারী রহ:ই মৃত্যু কামনা করেছেন। (তারীখে বাগদাদ ২/৩৪) (ইমাম বুখারী হাদীস মানতেন না? এর পক্ষে কোনো হাদিস আছে?
৯. রাসূল সা. বলেছেন— বেশীর থেকে বেশী সপ্তাহে একবার কোরআন খতম কর । এর থেকে বেশী পড়না। (২/৭৫৬) কোন কোন হাদীসে তিন দিন, কোন কোন হাদীসে পাঁচ দিনের কথাও এসেছে। তবে অধিকাংশ হাদীসেই সাত দিনের কথা এসেছে (বুখারী) অথচ ইমাম বুখারী রহ. রমযান মাসে প্রতিদিন এক একবার খতম করতেন। (তারীখে বাগদাদ ২/১২, তরকাতে সুবকী ২/৯, আল হুত্তা ২২) (আপনারা কী ইমাম বুখারী থেকেও বড় আহলে হাদীস? )
১০.শুধু আহলে হাদীস দাবীদাররা বলেন- আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীস (১/২২৯) দ্বারা প্রমাণিত যে, তারাবীহ-তাহাজ্জুদ একই নামায। কিন্তু ইমাম বুখারী রহ. রমযান মাসে তারাবীর পরে তাহাজ্জুদও পড়তেন। তিনি কি হাদীসের বিরোধিতা করতেন?এটা তো হাদিসে নাই।
১১. ইমাম বুখারী রহ. হাদীস বর্ণনা করেন যে, কুকুর কোন পাত্রে মুখ দিলে তা সাত বার ধৌত কর। পানি নাপাক হওয়ার মাসআলায় তার মাযহাব হল- রং, গন্ধ, স্বাদ পরিবর্তন না হলে পানি নাপাক হয় না। (১/২৯) একথা তো স্পষ্ট যে, কুকুর কোন পাত্রে মুখ দিলে পানির রং, গন্ধ, স্বাদ কিছুই পরিবর্তন হয় না। (সুতরাং তার নিকট কি কুকুরের ঝুটা পাক? আপনাদের মতামত কী? এটার সমাধান সহীহ হাদিসে সঠিক ভাবে পাবেন না।
১২. বুখারী শরীফের হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, কুকুরের ঝুটা নাপাক। (১/২৯) কিন্তু এর বিপরীতে ইমাম বুখারী রহ,ই বলেন- কুকুরের ঝুটা দ্বারা অযু করা জায়েয। (১/২৯) (এতো হাদীসের স্পষ্ট বিরোধিতা। এখন কী বলবেন- ইমাম বুখারী রহ. ভ্রান্ত ছিলেন?)
১৩. ইমাম বুখারী রহ. বলেন- মুছল্লীর পিঠে নাপাক বস্তু এবং মৃত প্রাণী রেখে দিলেও নামায ভেঙ্গে যায় না। (১/৩৭) (আহলে হাদীসের মাযহাব কী? ) এই বিষয়ে সহীহ হাদিসে সহজ সমাধান নাই।
১৪. ইমাম বুখারী রহ. এর নিকট হাত খোলা রেখেও নামায জায়েয। (১/৫২) (আপনারা কী বলেন?) এর সমাধানও সহীহমহাদিসে পাবেন না।
১৫. ওয়াজিব কাকে বলে? ওয়াজিব তরককারীর হুকুম কী? সহীহ, সরীহ এবং বিরোধহীন হাদীসের আলোকে জওয়াব প্রদান করতেমপারবেন না কারন এসকল বিষয়ে সহীহ হাদিসে বিস্তারিত কিছু লেখা নাই।
১৬. তাকলীদে মুতলাক ওয়াজিব। এ দাবী কোরানের আয়াত অথবা সহীহ, সরীহ, বিরোধহীন হাদীস দিয়ে প্রমাণ করতেমপারবেন না।
১৭. মুবাহ কাকে বলে? মুবাহ তরককারী এবং মুবাহ অনুযায়ী আমল কারীর হুকুম কী? সহীহ হাদিসে পাবেন না।
১৮. তাকলীদে শখছী মুবাহ। কুরআনের আয়াত কিংবা সহীহ, সরীহ,এবং বিরোধহীন হাদীসের আলোকে প্রমাণ পাবেন না।
১৯।. কোন আলেম মাসআলা বলার সময় দলীলের পূর্ণ বিবরণ পেশ করা ফরয না ওয়াজিব? কোরআন-হাদীসের থেকে দলীল পেশ করুন। তাও পারবেন না।
২০. হাদীসের প্রসিদ্ধ কিতাব 'মুছান্নাফে আব্দুর রায্যাক' এ সাহাবা ও তাবেয়ীনের প্রায় সতের হাজার (১৭,000 ) ফতওয়া রয়েছে। যাতে সাহাবা ও তাবেয়ীনের কেউ আপন ফতওয়ার সাথে কোরআন-হাদীস থেকে দলীল পেশ করেননি। তারা ফরয ওয়াজিবের তরককারী ও গুনাহগার হয়েছেন কিনা তা সহীহ হাদিসে দেখাতে পারবেন না।
২১. এ সতের হাজার ফতওয়ায় প্রশ্নকারীও দলীল তলব করেননি। সুতরাং দলীল তলব না করে এবং দলীলবিহীন মাসআলা মেনে নিয়ে তারা তাকলীদই করেছেন। প্রশ্নহল ঐ সকল সাহাবা এবং তাবেয়ীরা দলীল তলব না করে এবং তাকলীদ করে কাফের হয়েছেন না ফাসেক? সহীহ হাদীসের আলোকে জওয়াব পাবেন না।
২২. অশিক্ষিত বা জেনারেল শিক্ষিত সকলের জন্যই প্রত্যেক মাসআলার পরিপূর্ণ দলীল সম্পর্কে অবগত হওয়া ফরয না ওয়াজিব? সহীহ হাদীসের আলোকে জওয়াব খোঁজে পাবেন না।
২৩. জেনারেল শিক্ষিত অধিকাংশ আহলে হাদীসই আলেমদের থেকে মাসআলা জিজ্ঞাসা করে আমল করে এবং দলীল তলব করে না। ঐ সকল মানুষেরা আলেমদের মুকাল্লিদ হয়েছে না হয়নি এর জবাবও হাদিসে পাবেন না।
২৫. কথিত আহলে হাদীসরা দেওবন্দী আলেমদের থেকেও মাসআলা জিজ্ঞাসা করে না, বেরেলবী আলেমদের থেকেও না। তারা শুধু আহলে হাদীস আলেমদের থেকেই মাসআলা জিজ্ঞাসা করে। এটা তাকলীদে শখছী না মুতলাক?
অনুরুপ হাজারো শরয়ী সমস্যা বের করা যাবে যার একটাও সহীহ হাদিসে পাওয়া যায় না, এ ক্ষেত্রে আপনারা কিভাবে সমাধান করবেন? নাকি এই ক্ষেত্রে চুপ থেকে ইসলামের বারোটা বাজাবেন?
এজন্যই বলি যতই সহীহ হাদিসের দোহাই দিয়ে কোনো হাদিস বিশারদের তাকলীদ না করে নিজে নিজে হাদিস পড়ে আমল করতে গেলে সহসাই পথ ভ্রষ্ট হবেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ