একাত্তর! একাত্তর! একাত্তর!
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সংখ্যা যেন এক অব্যর্থ “ম্যাজিক নম্বর”—বিশ্বের আর কোনো দেশে হয়তো সংখ্যাভিত্তিক রাজনৈতিক মতাদর্শ এত প্রবল নয়। আর এই ‘একাত্তর চেতনা’ দিয়েই মূলত বাংলাদেশের একটি দলকে—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে—চাপে রাখা হয়, যাদের পাকিস্তান জামায়াতের উত্তরসূরি বলা হয়।
এই দলটির চরিত্র অনেক সময় গিরগিটির মতো রূপান্তরশীল বলে মনে হয়। সকলেই জানি, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জন্মলগ্নে অনেক রাজনৈতিক দল স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যার মধ্যে জমিয়ত ছিল সবচেয়ে সংগঠিত, আর জামায়াত ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট দল। কিন্তু তাদের বিরোধিতার মূল কারণ কী ছিল?
শুধু কি পশ্চিমাদের গোলামী? নাকি এর পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক শঙ্কা ছিল?—এটা বুঝতে হলে কিছু প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্যঃ
ফ্যাক্ট–১
বাংলাদেশ পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ থেকে স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের জন্মের বিরোধী ছিল ভারত—অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানেরও জন্মের বিরোধিতায় ভারত ছিল একটি বড় পক্ষ।
ফ্যাক্ট–২
সাধারণভাবে মনে করা হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। অথচ তাদের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের আগরতলায় যে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন তা প্রকাশ হয়েছিল, এবং আওয়ামী লীগের নেতারাই পরে—২০১৫ সালের পর—এটিকে সত্য বলে স্বীকার করেন।
ফ্যাক্ট–৩
পূর্ব বাংলা ধর্মীয় ভিত্তিতে পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার নেতৃত্বে ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল।
ফ্যাক্ট–৪
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নাস্তিক-কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য, যদিও রাষ্ট্রটি ধর্মীয় ভিত্তিতে পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল নাম মুসলিমলীগ।
ফ্যাক্ট–৫
২০১৩ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী দিল্লিতে গিয়ে বলেন—বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভারতের লাখো সৈন্যের রক্তের বিনিময়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান সম্পর্কে সেখানে উল্লেখ ছিল না।
ফ্যাক্ট–৬
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বক্তব্যে বলেন—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারতের “উপহার”—যা শুনে মনে হয় বাংলাদেশের মানুষের কোনো অবদান নেই।
ফ্যাক্ট–৭
বাংলাদেশের সাবেক এক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন—“ভারতকে আমরা এমন কিছু দিয়েছি যা তারা আজীবন মনে রাখবে।” কিন্তু সেই ‘জিনিস’ কী—এখনও জনগণ জানে না।
ফ্যাক্ট–৮
স্বাধীনতার দিন আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কোনো মুক্তিবাহিনী কমান্ডারকে জায়গা দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। বিজয়-পরাজয়ের খেলা হয়ে দাঁড়ায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে; বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ছিল কার্যত দর্শকের মতো।
ফ্যাক্ট–৯
ভারত আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে “ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ” হিসেবে উপস্থাপন করে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা কোথায়? তারা কি ভারতের পক্ষে লড়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল?
উপরের তথ্যগুলো মিলিয়ে অনেকেই তখন বুঝেছিলেন—পাকিস্তানের শৃঙ্খল ভেঙে বের হয়ে বাংলাদেশ যেন আবার ভারতের প্রভাববলয়ে বন্দী হয়ে পড়তে পারে। তাই অনেকে স্বাধীনতার বিরোধী হয়েছিলেন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করে, যদিও তা আজকে ‘একাত্তরের বিরোধীতা’ নামে একপাক্ষিকভাবে প্রচারিত হয়। জামায়াতকেও সে দায়ে চাপে রাখা হয়, যদিও তাদের অবস্থান সেই সময়কার রাজনৈতিক শঙ্কারই প্রতিফলন ছিল।
জামায়াতে ইসলামী: অতীত ও বর্তমান
জমিয়ত ও তৎকালীন জামায়াত—উভয়ই পাকিস্তান ভেঙে ভারত-প্রভাবিত একটি নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভবকে শঙ্কার চোখে দেখেছিল। ৫৪ বছর আগের তাদের এই রাজনৈতিক অবস্থানকে তারা আজও স্পষ্টভাবে ভুল বলেনি।
কিন্তু সমস্যা হলো বর্তমান জামায়াতের দ্বিধাগ্রস্ত আচরণ।
একাত্তর বিষয়ে তাদের অবস্থান একেক সময়ে একেক রূপ নেয়। কেউ পরিষ্কার ভাষায় বলে না যে তারা স্বাধীনতার বিরোধিতাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছিল। বরং তারা কখনো ‘ক্ষমা চেয়েছি’, কখনো ‘চাইনি’—এভাবে জনগণের কাছে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
১৯৮৬-র নির্বাচন, ১৯৯১-এর জোট, ১৯৯৬-র সমর্থন, ২০০১-এর জোট—এভাবে ক্ষমতার স্বার্থে বারবার আদর্শ বিসর্জন দিতে দিতে দলটি আদর্শিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
আদর্শ থেকে সরে যাওয়া
জামায়াতের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী রাষ্ট্র—কিন্তু আজ তারা নিজেরাই সেটি অস্বীকার করছে।
একটি বিবিসি সাক্ষাৎকারে সাবেক এমপি ও নায়েবে আমির ডা. তাহেরকে যখন প্রশ্ন করা হয়—“ক্ষমতায় গেলে শরীয়াহ আইন প্রয়োগ করবেন কি?” তিনি বিস্ময়ের ভান করে বলেন—“আমরা কবে এমন দাবি করেছি?”
দলের সংবিধান থেকেও ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের দফা বাদ দিয়ে ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ বলা হয়েছে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের গঠনতন্ত্রের ‘ইসলামী বিপ্লব’–সংক্রান্ত ধারা বদলে করা হয়েছে ‘ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা’।
অর্থাৎ বিপ্লব নয়—নরম ও অস্পষ্ট শব্দচয়ন।
ভারতের প্রসঙ্গ ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ
যে ভারত স্বাধীন পাকিস্তানকেও মানতে চায় না এবং ইসলামি শক্তিকে দমনে সবসময় সক্রিয়—জামায়াত সেই ভারতের সঙ্গে ‘সম্পর্ক উন্নয়ন’ করতে চায় বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়। অথচ তাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থানে ভারতের ভূমিকাই ছিল মূল শঙ্কা।
উপসংহার
জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান আজ অত্যন্ত দ্বিমুখী।
তারা—
-
গণতন্ত্র চর্চা করবে বলে, সেটিকে ‘ইসলামিক গণতন্ত্র’ নাম দেয়
-
খেলাফত প্রতিষ্ঠা নিয়ে নীরব থাকে
-
শরীয়াহ আইন প্রসঙ্গে অস্বস্তি দেখায়
-
কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের কথা বললেও পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে না
ফলে বোঝা যায়—দলটি আদর্শগতভাবে দুর্বল, বিভ্রান্তিকর এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটি অবস্থানে চলে গেছে। তাদের হাতে ক্ষমতা গেলে দেশে কতটুকু ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে, কিংবা আদৌ হবে কি না—তা অনুমান করতে খুব বেশি কষ্ট হয় না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ