4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: নভেম্বর 2025 > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

“বিকৃত বাউলচর্চা ও জাহেলিয়াতের কবিকুল: একটি পরিত্যাজ্য সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি”

 

ইদানীং কিছু বাউলের আচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা সরাসরি স্রষ্টার প্রতি অশ্রদ্ধা ও সীমালঙ্ঘনের সমান। জাহেলিয়াতের যুগে কবিরা যেমন বেপরোয়া, উচ্ছৃঙ্খল ও দায়িত্বহীন আচরণের পরিচয় দিত—আজ সেই একই বৈশিষ্ট্য যেন অনেক বাউলের মধ্যেও প্রকট। এ নিয়ে আল-কুরআনে পূর্বেই সতর্ক করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَ الشُّعَرَآءُ یَتَّبِعُهُمُ الْغَاوٗنَؕ
“আর কবিরা! তাদের পেছনে চলে পথভ্রান্ত যারা।”
(আশ-শুয়ারা, আয়াত: ২২৪)

অর্থাৎ কবি—বা বর্তমান ভাষায় যাদের আমরা বাউল বা বিকৃত ধারার গায়ক বলতে পারি—এদের সঙ্গে যারা মেশে, তাদের চরিত্র ও আচার-ব্যবহার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গীদের আদর্শিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় গোষ্ঠীর পার্থক্য এত স্পষ্ট যে একবার চোখ বোলালেই বোঝা যায়, একদিকে রয়েছে নৈতিকতা, শান্ত চরিত্র, সত্যবাদিতা, আমানতদারী, আল্লাহভীতি এবং মানবাধিকারের প্রতি সচেতনতা; অন্যদিকে রয়েছে কামনা–বাসনার উচ্ছ্বাস, অবাধ্যতা, অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, বিদ্বেষ ও বিকৃত সংস্কৃতির প্রভাব।

একদল লক্ষ্যভেদী, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান—যাদের জীবনে একটি পবিত্র উদ্দেশ্য রয়েছে; আরেকদল নিমগ্ন থাকে প্রেম-বাজনা, দেহ-লালসা, শরাব, গীবত-বিদ্বেষ, নিন্দা-অভিযোগ, ভাঁড়ামি ও নৈতিকতা-বিবর্জিত আসরে। কবি বা বাউলের আসরে ভিড় করা লোকদের দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়—এরা কামনা-বাসনার দাস, অর্ধ-বর্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত, যাদের কাছে কোনো উচ্চ জীবনাদর্শ টিকেই না।

যদি কেউ এই স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখে উপলব্ধি না করতে পারে, তবে সে অন্ধ। আর যদি সত্য জেনেও কেউ বলে যে মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর সঙ্গীরা কবি বা তাদের অনুসারীদের মতো, তবে সে সীমাহীন মিথ্যাচার করছে।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—

اَلَمْ تَرَ اَنَّهُمْ فِیْ كُلِّ وَادٍ یَّهِیْمُوْنَۙ
“তুমি কি দেখো না তারা উপত্যকায় উপত্যকায় উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়?”
(আশ-শুয়ারা, আয়াত: ২২৫)

অর্থাৎ তাদের চিন্তা, বক্তব্য ও কল্পনা—সবকিছুই দিশেহারা। আবেগ, কামনা বা স্বার্থের প্রতিটি ঢেউয়ে তাদের বক্তব্য রঙ বদলায়। কখনো জ্ঞানবান সাজে, কখনো নীচ-নিকৃষ্ট আবেগে গড়িয়ে পড়ে। সন্তুষ্ট হলে কাউকে আকাশে তুলে, রুষ্ট হলে তাকে মাটিতে পিষে ফেলে। সত্য-মিথ্যার বাছবিচার নেই; নৈতিকতা–অনৈতিকতা, পবিত্রতা–অপবিত্রতা, হাসি–ঠাট্টা, প্রশংসা–নিন্দা—সবকিছু একই কণ্ঠে সঙ্গী হয়ে যায়।

এ কারণেই রাসূল (সা.)–কে কবির সাথে তুলনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাঁর বাণী পরিমিত, লক্ষ্যভেদী, সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর কণ্ঠ থেকে কখনো অসত্য বা অর্থহীন কিছু বের হয়নি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشَّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ
“আমি তাঁকে কবিতা শিখাইনি এবং এটা তাঁর করার মতো কাজও নয়।”
(ইয়াসিন, ৬৯)

বিশ্বস্ত হাদীসসমূহে প্রমাণ রয়েছে—নবী (সা.) কবিতা মুখস্থ করার চেষ্টা করলেও কখনো যথাযথভাবে তা পাঠ করতে পারতেন না। অর্থাৎ তাঁর মেজাজ কবিত্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তিনি কবিতা অপছন্দ করতেন, যদিও ভালো কবিতার প্রশংসা করতেন।

আরবে কবিতার প্রচলিত বিষয় ছিল শরাব, নারী, অবৈধ প্রেম, যুদ্ধবিগ্রহ, বংশীয় অহংকার, মিথ্যা, অতিরঞ্জন ও নানা বিকৃততা। এসব কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন—

لأنْ يَمْتَلِئَ جَوْفُ أَحَدِكُمْ قَيْحًا خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمْتَلِى شِعْرًا
“তোমাদের কারো পেট পুঁজে ভরা থাকা কবিতায় ভরা থাকার চেয়ে ভালো।”

তবুও সত্যভিত্তিক, কল্যাণকর কবিতা তিনি প্রশংসা করতেন।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—

وَ اَنَّهُمْ یَقُوْلُوْنَ مَا لَا یَفْعَلُوْنَۙ
“এবং এমনসব কথা বলে যা তারা করে না।”
(আশ-শুয়ারা, আয়াত: ২২৬)

এটাই ছিল কবি ও বাউলদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য—বক্তব্য ও কর্মে অসামঞ্জস্য। তাদের জিহ্বায় দানশীলতার প্রশংসা, কর্মে কৃপণতা; মুখে বীরত্ব, কাজে কাপুরুষতা; কথায় নীতিবোধ, কাজে লালসা ও স্বার্থপরতা।

অপরদিকে নবী (সা.)–এর কথা ও কাজ ছিল পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা তিনি বলতেন তাই করতেন, আর যা করতেন তাই বলতেন। তাই কবি ও বাউলদের এই ভ্রান্ত ধারাকে ইসলাম স্পষ্টতই পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছে।

শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫

যে ভাবে আগে থেকেই ভূমিকম্পের আগাম বার্তা পেতে পারেন

 



অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ভূমিকম্প সতর্কতা বা আর্থকোয়েক অ্যালার্ট চালু করার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো। 


এই ফিচারটি গুগল দ্বারা চালিত এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার কাছাকাছি হওয়া ভূমিকম্প সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাঠায়। 


চালু করার ধাপসমূহ:

সেটিংস (Settings) খুলুন: আপনার অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মূল সেটিংস অ্যাপটি খুলুন।


অবস্থান (Location) অপশনে যান: সেটিংস মেনুতে 'Location' বা 'অবস্থান' খুঁজে বের করে ট্যাপ করুন। 


অবস্থান পরিষেবা (Location services) নির্বাচন করুন: 'Location' মেনুতে গিয়ে 'Location services' বা 'অবস্থান পরিষেবা' অপশনটি খুঁজুন। 


ভূমিকম্প সতর্কতা (Earthquake alerts) চালু করুন: 'Location services'-এর অধীনে 'Earthquake alerts' বা 'ভূমিকম্প সতর্কতা' অপশন দেখতে পাবেন।  এটিতে ট্যাপ করুন।


টগল সুইচ অন (ON) করুন: স্ক্রিনের উপরের দিকে থাকা টগল সুইচটি ট্যাপ করে চালু (ON) করে দিন।

সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

“হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনে বৌদ্ধ নিধন: অতীত-বর্তমানের লুকোনো ইতিহাস”

 



বৌদ্ধ ধর্মের পতন ও বিলুপ্তি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে শ্রী নরেশ কুমার উল্লেখ করেন যে, বৌদ্ধবাদের প্রভাব হ্রাস ও ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রাহ্মণিক পুনর্জাগরণকারীরা একটি সুপরিকল্পিত তিন ধাপের কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম ধাপে তারা বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘৃণা, অপমান ও অত্যাচারের অভিযানে নেমে পড়ে। দ্বিতীয় ধাপে বৌদ্ধ ধর্মের কিছু ইতিবাচক উপাদান নিজেদের ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে “নিম্নবর্ণের” বৌদ্ধদের মন জয়ের চেষ্টা চালায়, তবে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য যেন একটুও ক্ষুণ্ণ না হয়, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়। শেষ ধাপে প্রচার করা হয়—গৌতম বুদ্ধ নাকি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর অবতার। এভাবে বুদ্ধকে ব্রাহ্মণ্য দেবতাদের বিশাল সমাহারের ক্ষুদ্র এক অংশে রূপান্তরিত করা হয় এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী জাতপ্রথার শৃঙ্খলে শুদ্র–অচ্ছুতে পরিণত হয়। ক্রমে নিজেদের জন্মভূমিতেই বৌদ্ধদের অস্তিত্ব প্রায় মুছে যায়।

এই নির্মূল অভিযানের সামাজিক বৈধতা তৈরির উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ্য ধর্মগ্রন্থে বৌদ্ধদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়।। “যেহেতু বলা হয়—যে ব্যক্তি বৌদ্ধকে স্পর্শ করবে তাস্নান করে শুদ্ধ হতেহবে।”বে। অপরাকা ও ব্রাদ্ধ হরিতের লেখায়ও একই ধরনের নির্দেশ পাওয়া যায়—বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করা পাপ, যা আচারিক স্নান ছাড়া মোচনযোগ্য নয়। শুধু উচ্চগ্রন্থ নয়, সাধারণ মানুষের জন্য রচিত নাটকেও বুদ্ধবিদ্বেষ উদাহরণস্বরূপ, তেচীনণস্বরূপতেচীন নাটক মৃচ্ছাকটিকা-তে নাবৌদ্ধবলে, “অশুভ দেখে বিরক্ত হয়ে বলে—“অশুভ দৃশ্য, এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আমাদের দিকে আসছে!”

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর স্থানীয় রাজাদের উত্থানকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সপ্তম শতকের শুরুতে পশ্চিম বাংলায় রাজা শশাঙ্ক ক্ষমতায় আসেন, যিনি বৌদ্ধবিরোধিতার জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তাঁর কঠোর নিপীড়নে বহু বৌদ্ধ দেশত্যাগে বাধ্য হয়। ঐতিহাসিক আর.সি. মজুমদার উল্লেখ করেন—শশাঙ্কের সময় বৌদ্ধ নিপীড়ন ছিল সংগঠিত ও ভয়াবহ। শূন্যপুরাণে বলা হয়, সেতুবন্ধ থেকে হিমালয় পর্যন্ত বৌদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করার নির্দেশ ছিল রাজভৃত্যদের প্রতি।

চীনা ভিক্ষু হিউয়েন সাং তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে শশাঙ্কের বৌজানান কুশীনগরেরকাণ্ডের বিবরণ দেন। তিনি জানান—কুশীনগরের বৌদ্ধবিহারে আক্রমণ, পাটলিপুত্রে বুদ্ধের পদচিহ্নখচিত পাথর গঙ্গায় নিক্ষেপ, গয়ের পবিত্র বোধিবৃক্ষের শেকড় কেটে আগুনে পোড়ানো, এবং বৌদ্ধ মন্দিরে শিবমূর্তি স্থাপন—সবই শশাঙ্কের আদেশে সংঘটিত হয়। এমনকি বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ স্থল কুশীনগরকে ‘অশুভ মৃত্যু-দাবি এখানেবে প্রচার করে ব্রাহ্মণসমাজ; তাদের দাবি—এখানে মৃত্যু মানুষের পরজন্মকে নিকৃষ্ট করে দেয়, বিপরীতে কাশিতে মৃত্যু হলে নাকি সরাসরি স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে।

অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা চাণক্যও বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি নির্দেশ দেন—যদি কেউ বৌদ্ধ, আজীবিক বা শুদ্রদের সঙ্গে পুণ্যার্থে উৎসর্গিত ভোজসভায় অংশ নেয়, তবে তাকে একশো পানা অর্থদণ্ড দিতে হবে।

ওডিশার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস বৌদ্ধ নিধনের আরেক প্রমাণ। খ্যাতিমান প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. স্টেলা ক্র্যামরিশ স্পষ্ট বলেন—জগন্নাথের মূর্তি ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যের নয়, বরং এর মূল বৈশিষ্ট্য বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতিহাসবিদ ড. আর.সি. মজুমদারও মনে করেন—জগন্নাথ উপাসনার মূল ছিল বৌদ্ধ, যা পরে ধীরে ধীরে হিন্দুধর্মে বিলীন করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দও অকপটে জানান—জগন্নাথ মন্দিরসহ বহু বৌদ্ধ স্থাপনাই হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত হয়েছে।

বৌদ্ধ নিধন শুধু মন্দির দখল বা মূর্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে হয়নি; পুরো অঞ্চলজুড়ে বৌদ্ধদের অস্তিত্ব মুছে ফেকরেন যেচেষ্টা ছিল সুসংগঠিত। ড. দীনেশচন্দ্র সেহাজারের করেন—যে পূর্ববঙ্গে একসময় এক কোটি বৌদ্ধ ও দেড় হাজারেরও বেশি ভিক্ষু ছিলেন, পরবর্তীতে ত্রিশ বছর ধরেও একটি বৌদ্ধগ্রন্থ উদ্ধার করা যায়নি। মুসলমান শাসনের সময় বহু বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ্য অত্যাচার থেকে বাঁচতে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হয়। শূন্যপুরাণে এমনকি দেখা যায়—বৌদ্ধরা মুসলমান শাসকদের ব্রাহ্মণ্য নিপীড়নের প্রতিশোধ হিসেবে ‘ঈশ্বরের দান’ মনে করে স্বাগত জানিয়েছিল।

বৌদ্ধ নিপীড়ন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বৈষ্ণব সমাজ যদি তাদের আশ্রয় না দিত, তবে পূর্ব ভারতের অধিকাংশ বৌদ্ধই মুসলমান হয়ে যেত বলে ড. দীনেশচন্দ্র সেন মন্তব্য করেন।

এই দীর্ঘ অতীত আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্প্রতিক ইতিহাসেও বৌদ্ধ তীর্থস্থান দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হিন্দুত্ববাদী প্রভাব দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের মার্চে বিহারের মহাবোধি মন্দির—যেখানে গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভ করেছিলেন—দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু–বৌদ্ধ মিশ্র কমিটির দ্বারা পরিচালিত হলেও এখন সেখানে হিন্দু গোষ্ঠীর আধিপত্য বাড়ছে। অথচ ভারতের অন্যান্য ধর্ম নিজেদের উপাসনালয় নিজেরাই পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে হিন্দু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্ন তোলে—এটি কি অতীতের মতোই বৌদ্ধ ইতিহাস ও পরিচয় মুছে ফেলার একটি আধুনিক রূপ?

ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণ তাই একই দিকে ইঙ্গিত করে—বৌদ্ধধর্মের পতন ছিল আকস্মিক নয়; এটি ছিল ধর্ম, রাজনীতি, জাতব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দীর্ঘমেয়াদি সম্মিলিত চাপের ফল।


জ্ঞানচুরির প্রাচীন কৌশল: মুসলিম বিজ্ঞানীদের পরিচয় বিলোপের ল্যাটিন প্রকল্প

 



মুসলিম বিজ্ঞানীদের আড়াল করার চক্রান্ত : ল্যাটিন অনুবাদে নাম পরিবর্তন।


মুসলিম বিজ্ঞানীদের আড়ালে রাখার ইউরোপীয় কৌশল: নাম বিকৃতি থেকে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা

মধ্যযুগের স্বর্ণযুগে বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চায় মুসলিম সভ্যতার অবদান ছিল বিপুল ও নির্ণায়ক। ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত, তখন মুসলিম দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ ও চিকিৎসকেরা মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণার শক্তিতে। কিন্তু পরবর্তীতে ইউরোপে এই জ্ঞানভান্ডার স্থানান্তরের সময় একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা দেখা যায়—মুসলিম বিজ্ঞানীদের পরিচয় আড়াল করা, বিশেষ করে ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে তাদের নাম বিকৃত করা।

বিশ্বজুড়ে কোনো লেখকের রচনা অনুবাদ করার ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হলো—বই অনুবাদ হবে, কিন্তু লেখকের নাম অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়। তাদের পূর্ণ আরবি নাম বাদ দিয়ে ল্যাটিনে এমনভাবে রূপ দেওয়া হয় যাতে বোঝাই না যায়—তারা ছিলেন মুসলমান। এ ধরনের ঘটনার অন্য কোনো নজির পৃথিবীর সাহিত্য-ইতিহাসে নেই। অধ্যাপক জর্জ সারটন তাই মন্তব্য করেছিলেন—ইউরোপ পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদানকে অস্পষ্ট করতে চেয়েছিল, এবং ল্যাটিন নামকরণ তারই রাজনৈতিক প্রকাশ।

আরবি রচনাগুলো যখন ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ হলো, তখন দেখা গেল—দীর্ঘ আরবি নাম সংক্ষিপ্ত এক রূপে পরিবর্তিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বহু অনুবাদক নিজেদের নামে পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করেছেন; এমনকি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় জ্ঞানসম্পদের সঙ্গে যেমন লুটতরাজ হয়েছে, তেমনি মুসলিম জ্ঞানভান্ডারের ক্ষেত্রেও আয়োজন ছিল একই।

নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ—

ইবনে সিনা—যার পূর্ণ নাম ছিল আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা, তাঁকে ইউরোপ চেনে Avicenna হিসেবে।
খাওয়ারিজমি—আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি; ল্যাটিনে তিনি Algorism, যার থেকেই “Algorithm” শব্দের উৎপত্তি।
ইবনে বাজ্জাহ—যিনি আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহিয়া আল-সায়িগ নামেই পরিচিত ছিলেন; ইউরোপে তিনি Avempace
আল-ফরগানি—আবু আল-আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাছির ফরগানি; ল্যাটিনে রূপ Alfraganus
ইদ্রিসী—বিশ্বের প্রথম নির্ভুল মানচিত্র নির্মাতা; তাঁর দীর্ঘ আরবি নাম মুছে তাঁকে করা হয়েছে Dreses

এগুলো শুধু কিছু উদাহরণ। সত্য হলো—প্রায় সকল মুসলিম বিজ্ঞানীর নাম এভাবেই বিকৃত করা হয়েছে, ώστε ইউরোপীয় পাঠক বুঝতেই না পারেন যে জ্ঞানের এই বিশাল ভাণ্ডার এসেছে মুসলিম চিন্তাশীলদের কাছ থেকে।

কিন্তু নাম বিকৃতি ছিল প্রচেষ্টার মাত্র একটি দিক। এর পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে অস্পষ্টতা ছড়ানো হয়। ইতিহাসের কিছু ইউরোপীয় লেখক দাবি করেন—মুসলিম বিজ্ঞানীদের অনেকে প্রকৃতপক্ষে মুসলিমই ছিলেন না; বরং জোরোয়াস্ট্রিয়ান, ইহুদি, কিংবা ইউরোপীয় জাতিসত্তার ছিলেন। রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান তার বড় উদাহরণ। বলা হয়—“জাবির” নামে এক ইউরোপীয় রসায়নবিদ ছিলেন, যিনি নাকি আসল আবিষ্কারের পেছনে ছিলেন—এ দাবি আজও কিছু ইউরোপীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়।

খাওয়ারিজমি নিয়েও একই অপপ্রচার। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়—তিনি নাকি মুসলিম ছিলেন না; বরং ছিলেন জোরোয়াস্ট্রিয়ান। এমনকি দাবি করা হয়—‘দ্বিতীয় খাওয়ারিজমি’ নামের আরেক ব্যক্তি গণিতে প্রথম শূন্য ব্যবহার করেন।

আল-ফরগানি—যিনি পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ে বিশ্ববিখ্যাত—তাঁর ক্ষেত্রেও একই প্রচেষ্টা দেখা যায়। বলা হয়—ফরগানি নাকি দু’জন ছিলেন, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় কার প্রকৃত কীর্তির উত্তরাধিকার কাকে দেওয়া হবে।

এইসব পরিকল্পিত বিকৃতি–তত্ত্বের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: মুসলিম সভ্যতার অগ্রণী অবদানকে পশ্চিমা ইতিহাসে আড়াল করা বা গুরুত্বহীন করে দেখানো। শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বহু আলেম ও বিজ্ঞানী রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়ে কারাবন্দি হন, অথবা হত্যা হন; ফলে মুসলিম বিশ্বের বহু জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আলোচনার বাইরে পড়ে যান।

আজ আমরা কোপার্নিকাস, নিউটন এবং গ্যালিলিওর নাম মুখস্থ করলেও খুব কম মানুষ জানেন—তাদের বহু তত্ত্ব ও গণনার ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন ইবনে বাজ্জাহ, ইবনে রুশদ এবং নাসিরুদ্দিন তুসি।
তাদের কাজই পরে ইউরোপীয় রেনেসাঁর কেন্দ্রে স্থান পেয়েছিল—কিন্তু তাদের নামধাম, পরিচয় ও ভূমিকা প্রায় মুছে ফেলা হয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলোর অন্যতম হলো এই পরিচয়-বদলের প্রক্রিয়া। ইউরোপীয় অনুবাদের পর যে নামগুলো আমাদের কাছে পরিচিত, সেগুলো আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক পর্দা—যা সরালে দেখা যায় মুসলিম সভ্যতার অবদান সভ্যতার ইতিহাসে কতটা গভীর।

তবুও, এ দৃশ্যপট পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। কারণ জ্ঞান কখনও লুকিয়ে থাকে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিজেই সত্যকে টিকিয়ে রাখে। পৃথিবীতে বিজ্ঞান যতদিন থাকবে, ততদিন থাকবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম, অবদান ও কীর্তি—যদিও তা একসময়ে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।

জ্ঞানচর্চার ইতিহাস তাই আজও প্রমাণ করে—
যে সভ্যতা বিজ্ঞানকে লালন করেছে, তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না।
আর সত্যকে বিকৃত করা যায়, কিন্তু স্থায়ীভাবে ধামাচাপা দেওয়া যায় না।

শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

ইসলামি রাষ্ট্রে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে কি?

 


ইসলামি রাষ্ট্রে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে কি? 

নেতৃত্বের অধীনে লক্ষ্য অর্জনে অধীনস্তদের সংগঠিত, প্রভাবিত ও উৎসাহিত করে এবং তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা নিয়ে কর্মতৎত্রতা পরিচালনা করা হয়।

নারী নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ ও সিদ্ধান্তঃ
উল্লেখ্য, কুরআন সুন্নাহে নারী নেতৃত্ব বৈধ বা অবৈধ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ নেই। রসুল সা.-এর যুগে কোনো নারীকে গভর্নর, বিভিন্ন অভিযানে দলনেতা বা বিচারিক নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন বলে প্রমাণিত নয়। খোলাফায়ে রাশিদীনের যুগেও তাই। এজন্য পরবর্তী আলিমগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ করেছেন। 

তাদের মতামতসমূহ প্রধানত ছয় ধরনের:

প্রথম অভিমত: সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব অবৈধ, কারো মতে হারাম।

দ্বিতীয় অভিমত: সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ।

তৃতীয় অভিমত: মজলিশে শুরা ব্যবস্থায় বা যৌথ নেতৃত্বে নারীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বসহ সকল ক্ষেত্রের নেতৃত্ব বৈধ।

চতুর্থ অভিমত: বিশেষ অবস্থা বা প্রেক্ষাপটে নারীর রাষ্ট্রপ্রধানসহ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বৈধ।

পঞ্চম অভিমত: বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ।

ষষ্ঠ অভিমত : গোটা জাতির উপর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ। নিম্নে এসব পর্যালোচনা করা হলো:

প্রথম অভিমত: সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব অবৈধ বরং হারাম (অধিকাংশ আলিম)

অধিকাংশ আলিমের মতে সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব জায়েয নয় তথা বৈধ নয়। কারো কারো মতে এটা হারাম তথা তাদেরকে নেতা নিয়োগ করা হালাল নয়। এসব মতের সমর্থনকারীগণ কয়েক ধরনের দলিল উপস্থাপন করেন। সেগুলো হলো:

ক. আল কুরআন থেকে দলিল

১. আল্লাহর বাণী:"পুরুষগণ নারীদের কাউয়াম (পরিচালক)- এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে একজনকে অপরের উপর বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর পুরুষরা যেহেতু নারীর খরচ বহন করে। সেহেতু পুরুষকে তাদের উপর পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে"।"

তাদের মতে, এ আয়াতে পুরুষদেরকে স্ত্রীলোকদের 'কাউয়াম' কর্তা, পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়ক বলে ঘোষণা করা হয়। সামাজিক নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব তাদেরই।১০ এছাড়া, একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম ইউনিট হলো পরিবার। আল্লাহ তাআলা যেখানে একটি মাত্র পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব অর্পণ করেননি, কোটি কোটি পরিবার নিয়ে যে রাষ্ট্র- তার দায়িত্বভার ও নেতৃত্বের বোঝা নারীর উপর তিনি কীভাবে চাপাতে পারেন? সুতরাং সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, ইসলামে সামাজিক, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নারীদের জন্য নয়।"

২. আল্লাহর বাণী: 'আর নারীদের উপর পুরুষের এক ধরনের প্রাধান্য রয়েছে'। এ আয়াতে দারাজাত বা প্রাধান্য নেতৃত্বের।

৩. আল্লাহর বাণী:" তোমরা (নারীরা) তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং বিগত কালের চরম জাহেলিয়াতের ন্যায় প্রশাধনী মেখে উন্মুক্তভাবে জনসম্মুখে বাইরে বেরিও না"।

তারা বলেন, নারী তার স্বামীর ঘরে রাণী। ঘর দেখাশোনা, ঘরোয়া কাজের ব্যবস্থাপনা, সন্তানদের লালন-পালন ও সুযোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা প্রভৃতি তার দায়িত্ব। ঘরের বাইরের জীবন সংগ্রাম, চেষ্টা সাধনা ও দৌড়াদৌড়ি থেকে মুক্ত হয়ে নারী তার ঘর সামলাবে, ঘর সংশোধন করবে, জাতির ভবিষ্যতে সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলবে। এটাই তার মূল ও মৌলিক দায়িত্ব। সুতরাং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং দেশ শাসন নারীদের কর্মসীমা বহির্ভূত।"

তাদের মতে সামাজিক, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসনে আসীন হলে নারীকে প্রায় সবসময় বাইরে যেতে ও থাকতে হবে। প্রয়োজনেই কেবল ঘরে আসা সম্ভব হবে। বাধ্য হয়ে আল্লাহর বিধানের উল্টোটাই সে করবে। এতে আল্লাহর পুরো ব্যবস্থাটাই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তাই ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েয নেই।

৪. আল্লাহর বাণী: "আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজের নিষেধ করবে"।

এ আয়াতের প্রেক্ষিতে তাদের বক্তব্য হলো: মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে নামায কায়েমের প্রধান দায়িত্ব সরকার প্রধানের। তিনি নিজে নামাযী হবেন এবং জাতির ইমামতি করবেন। শরিআহতে এটা স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বসম্মত বিধান যে, নামাযে পুরুষদের ইমামতি করা নারীর জন্য জায়েয নেই।"

খ. হাদিস থেকে দলিল প্রমাণ

১. হযরত আবু বাকারাহ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেন, "যে জাতি তাদের বিষয়াদির উপর নারীদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করে, সে জাতি কখনো কল্যাণ পাবে না, সফল ও সার্থক হবে না"।

তাদের মতে, এ হাদিস রাষ্ট্রে নারী নেতৃত্ব জায়েয না হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল। অধিকাংশ আলিম সার্বিক কর্তৃত্ব প্রয়োগে নারী নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাওকানী রহ. বলেন, হাদিসের ভাষ্য মতে তাদের নেতৃত্বে বসানো হালাল নয়, তথা হারাম। কেননা যে বিষয় আবশ্যিকভাবে অকল্যাণ ডেকে আনে তা পরিহার করাও আবশ্যিক (ওয়াজিব)"। তিনি আরো বলেন, "সফলতা বা কল্যাণ তিরোহিত হওয়ার বিষয়টির চেয়ে প্রচণ্ড ধমকি আর কিছু নেই"।

২. জাবির ইবন সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন, "সে জাতির কখনো কল্যাণ হবে না, যাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক হলো একজন নারী"।" তবে হাদিসটিতে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী থাকায় এটি দুর্বল বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

৩. আবু বকর রা. বর্ণিত, মহানবি সা. বলেন, 'পুরুষরা ধ্বংস হয়েছে, যখন তারা নারীর আনুগত্য করেছে, পুরুষরা ধ্বংস হয়েছে যখন তারা নারীর আনুগত্য করেছে'। তাদের মতে হাদিসটিতে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হাদিস যাচাইকারী শুআইব আরনাউথ বলেন: হাদিসটির সনদে বাক্কার ইবন আবদিল আযীয (আবু বাকারাহ রা.-এর নাতি) একজন দুর্বল রাবী। এজন্য হাদিসটি দুর্বল। কিন্তু হাকিম স্বীয় 'মুস্তাদরাকে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। ২৪

৪. মহানবি সা. বলেন, বিচারক তিনজন। তন্মধ্যে একজন জান্নাতে, আর দু'জন দোযখে। যিনি জান্নাতে তিনি সেই পুরুষ ব্যক্তি, যে সত্য জানলো এবং সে মোতাবেক ফয়সালা দিল। আর যে পুরুষ সত্য জেনেও ফয়সালায় যুলম করলো সে দোযখে। আর যে পুরুষ অজ্ঞতা সত্ত্বেও ফয়সালা দিল সেও দোযখে"।

শাওকানী উল্লেখ করেন, এ হাদিসে বিচারক হিসেবে বার বার শুধু পূরুষ ব্যক্তি )رح( বলা হয়েছে। তাই এর দ্বারা নারী বিচারক হবে না তাই বুঝানো হয়েছে।

৫. বর্ণিত হাদিস, একদা আবু যর বলেন, হে আল্লাহর রসুল সা.! আপনি আমাকে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব দিবেন কি? তখন তিনি বললেন, হে আবু যর! তুমি দুর্বল। আর ঐ দায়িত্বটি আমানত। এটির হক বা দাবি যারা পুরণ করে এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তারা ব্যতীত অন্যদের জন্য এটি কিয়ামতের দিন অপমান ও অনুসুচনার উপলক্ষ্য হবে"।২৬

তাদের মতে এ হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, দুর্বলদেরকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেয়া যায় না। আর নারীরা শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে দুর্বল।

৬. সাহাবিগণের বক্তব্য: আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. বলেন: "তাদেরকে (নারীদেরকে) সেভাবে পিছনে রাখ, যেভাবে আল্লাহ তাদেরকে পিছনে রেখেছেন"।২৭

আল মাওয়ারদী বলেন: "যেহেতু তাদেরকে পিছনে রাখা ওয়াজিব, সেহেতু তাদেরকে (নেতৃত্ব দিয়ে) আগে বাড়িয়ে দেয়াও হারাম হয়েছে"।

গ. ইজমা থেকে দলিল

কুরআন-সুন্নাহর এসব সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে সর্বযুগে গোটা উম্মাহর অধিকাংশ নারী নেতৃত্বকে নাজায়েয বলেই অভিমত ব্যক্ত করে এসেছেন। এটি হলো ইজমায়ে উম্মাত। ইজমায়ে উম্মাত শরিআহতের একটি অকাট্য দলিল।
ঘ. সৃষ্টিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি

প্রথমত:

তাদের মতে নারী পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত পার্থক্য রয়েছে। তাদেরকে হাদিসে বলা হয়েছে তারা: আকল তথা বুদ্ধিগত স্বল্পতা ও ধর্মপালনে ঘাটতি যুক্ত ناقصات عقل و دین(। তাদের দু'জনের সাক্ষী একজন পুরুষের সাক্ষীর সমান। তারা পূর্ণ মাসের সালাত ও সিয়াম পালন করতে পারে না হায়েযের কারণে।

দ্বিতীয়ত:

সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে ভবিষৎ প্রজন্ম গড়ার তথা সন্তান লালন পালনের কঠিন দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এজন্য তাদের যুক্তি বিদ্যা কম দিয়ে আবেগ মমতা বেশি দেয়া হয়েছে। তারা দ্রুত ভুলে যায়। তারা নেতৃত্বের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে পড়লে মানবসমাজে আদর যত্নে সন্তান লালন পালনের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বিঘ্নিত হবে।

তৃতীয়ত:

তাদের মতে শরিআহর বিধানের আলোকে নারীসমাজ নেতৃত্বের সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়।

এরূপ ক'টি সীমাবদ্ধতা নিম্নরূপ:

১. নারীরা কোনো অবস্থাতেই নামাযে ইমামতি করতে পারবে না।

২. যাঁর উপর জামাআতে নামায পড়া ওয়াজিব নয়।

৩. যিনি কখনো জামাআতে শামিল হলেও সব পুরুষের পেছনেই তাঁকে দাঁড়াতে হয়।

৪. যাঁর প্রতি মাসে হায়েয তথা কিছুদিন এমন অবস্থা হয়, যখন মসজিদে প্রবেশ করা তাঁর জন্য নাজায়েয থাকে।

৫. যাঁর উপর জুমা ফরয নয়।

৬. যাঁর পক্ষে কোনো জানাযার সাথে যাওয়া জায়েয নয়।

৭. কোনো মুহরম সাথে না নিয়ে সফরে যাওয়া যাঁর জন্য নিষেধ। এমনকি মুহরেম না পেলে আমৃত্যু হজ পর্যন্ত করা জায়েয নেই। এ অবস্থায় বদল হজের অসীয়ত করে যেতে হয়।

৮. যাঁর উপর জিহাদ ফরয নয়।

৯. বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে যাওয়া যাঁর জন্য জায়েয নয়।

১০. এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত যিনি পরিবার প্রধান হতে পারেন না। ১

মালেকি মাযহাবের ফকীহ ইবনুল আরাবী বলেন: "নারী এমন নয়, যে মজলিশে বের হতে পারে, পুরুষের সাথে মুক্ত মেলামেশা করতে পারে, একজন সমকক্ষ আরেকজন সমকক্ষের ন্যায় আলোচনা করতে পারে, কারণ সে যদি যুবতী হয়, তার দিকে দৃষ্টি দেয়া, কথা বলা হারাম। তিনি যদি সতী সাধ্বী বৃদ্ধা মহিলাও হন, তিনি তো পুরুষদের সাথে একই মজলিশে একত্রিত হতে পারেন না, ঠেসাঠেসি করে ভীড় জমাতে পারেন না"। 

অবৈধ মতের দাবির পক্ষে দলিলসমূহের পর্যালোচনা:

প্রথমত:

আয়াতে قوامون শব্দটি قوام এর অর্থ রক্ষক। এটা পারিবারিক ক্ষেত্রে। এজন্য ভরণ পোষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুরুষের উপর। পরিবারের বাইরে কোনো নারীর ভরণপোষনের কথা বলা হয়নি।

দ্বিতীয়ত:

ঘরে অবস্থান করার জন্য আল কুরআনের নির্দেশটি রসুল সা.-এর স্ত্রীগণের জন্য নির্দিষ্ট। এ নির্দেশ সার্বিক নয়। এরূপ অনেক বিশেষ নীতিমালা রয়েছে। যেমন আল কুরআনের একই সুরায় এসেছে, সাধারণ নারীগণের ব্যাভিচারে যে শাস্তি হবে মহানবি সা.-এর স্ত্রীগণের সেরূপ ক্ষেত্রে ঐ শাস্তির দ্বিগুণ দিতে হবে।

তৃতীয়ত:

পুরুষকে নেতৃত্বে প্রাধান্য দেয়া মানে নারীকে নেতৃত্ব থেকে একেবারে বঞ্চিত করা নয়।

চতুর্থত:

এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ একমাত্র হযরত আবু বাকারাহ রা. থেকে বর্ণিত। এছাড়া, এ হাদিসের সনদেও ত্রুটি রয়েছে।

পঞ্চমত:

আর আবু বাকারাহ রা.-এর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য প্রদান করা হয় যে, তিনি তায়েফ অভিযানের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, এটি মহানবি সা.-এর সময়কালের শেষ পর্যায়ে। এটি রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত। এর ভাষ্য শরিয়াতের একটি মৌলিক বিষয় সংশ্লিষ্ট। অথচ হাদিসটি ২৫ বছর পর্যন্ত আর কেউ জানতেন না। শুধু আবু বাকারাহ রা. ২৫ বছর পর বললেন।

মাও. আকরম খাঁ বলেন, হাদিসটির ভাষাতে অসংলগ্নতা (ইদতিরাব) রয়েছে।.... ৩৬ হিজরিতে উম্মাহর মাঝে বিবাদের এক ক্রান্তি কালে অনুষ্ঠিত জামাল যুদ্ধে হাজার হাজার সাহাবি রা. অংশগ্রহণ করলেন। তারা কেউই হাদিসটি সম্পর্কে জানলেন না। সেই সময়কার বর্ণিত এবং গোত্রগত প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেওয়াতগুলোর মূল্যমর্যাদা নির্ধারণের সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।৪

কারো মতে, এ হাদিস বর্ণনা দ্বারা হযরত আয়েশা রা.-কে হেয় করাই উদ্দেশ্য। ইবন হাজার আসকালানী উল্লেখ করেন: ইবন বাত্তাল এক সুত্রে মুহাল্লাব থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: "আবু বাকারাহ বর্ণিত হাদিসটি বাহ্যত হযরত আয়েশা রা. যা করলেন সে বিষয়ে তাঁর মতামতকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি ইঙ্গিত করে"।৩৫

কারো মতে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এটি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বর্ণিত। এছাড়া, আবু বাকারাহ রা.-কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে উমর রা. বেত্রাঘাতের দণ্ড আরোপ করেছিলেন। যারা এ দন্ডে দন্ডিত তাদের সাক্ষ্য শরিয়াতে গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপ হাদিসও গ্রহণযোগ্য নয়। এ রূপ অনেক সমালোচনা করা হয়।

কিন্তু এর উত্তরে বলা হয়: হাদিসটি সহিহ বুখারিতে এসেছে, যার উপর গোটা উম্মাহ আলিমগণের অধিকাংশ ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। এছাড়া, সাক্ষ্য দেয়া ও হাদিস বর্ণনা করার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। উম্মাহর অধিকাংশ ফকীহগণ এ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই হাদিসটিকে শাষ বা দুর্লভ বলা ঠিক নয়। এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও প্রচলিত। আর মহানবি সা.-এর সাহাবিগণ বিশ্বস্ত। সম্ভবত এজন্য শায়খ মুহাম্মদ গায্যালি বলেছেন, হাদিসটি সনদ ও মতনের দিক দিয়ে সহিহ। তবে এটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাথে জড়িত। তিনি বলেন: “রসুল সা. সত্য কথাই বলেছেন। এটা ছিল সেখানকার পুরো পরিস্থিতির চিত্রায়ন। সে সময়ের পারস্যে যদি মজলিশে শুরাভিত্তিক ব্যবস্থা থাকতো, আর গোল্ড মাইর নামে ইহুদি নারীর মত শাসক থাকতো যে কিনা ইসরাইল শাসন করেছে, তাহলে সেখানকার পারস্যের বিষয় অন্য রকম মন্তব্য হতো।..." তিনি আরো বলেন: "মহানবি সা. মক্কায় সুরা নামাল মানুষকে পাঠ করে শুনিয়েছেন। সেখানে তাদের কাছে সাবা রাণীর কিস্সাও বর্ণনা করেন, যে নারী স্বীয় প্রজ্ঞা ও প্রখর মেধায় তার জাতিকে সফলতা ও নিরাপত্তার দিকে পরিচালনা করেন। আর এটা অসম্ভব যে, সেখানে সে নবি সা. তাঁর হাদিসে এমন হুকুম দিবেন যা কুরআনের ঐ ওহির বিরোধী হয়!! কোনো জাতি কী ব্যর্থ হয়েছে এ ধরনের উৎকৃষ্ট মানের একজন নারীর নেতৃত্বে"?!

এজন্য বর্তমানে অনেকের মতে সম্ভবত মহানবি সা.-এর উদ্দেশ্য ছিল এটা বুঝানো যে, পারস্যবাসীরা নারীদেরকে নেতা বানিয়েও সফল হবে না। এর ভাষ্য সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বা এটি সার্বিক নয়। এটা মহানবি সা.-এর কোনো নির্দেশ ছিল না যে, 'তোমরা নারীদেরকে নেতা বানাবে না'।

অপরদিকে এসব বক্তব্যও সমালোচিত হয়েছে। বলা হয়, হাদিসটির ভাষ্য সার্বিকভাবে প্রযোজ্য। কেননা শরিআহর মূলনীতি অনুসারে দলিলের ভাষ্য দ্বারা কি বুঝাচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য। বিশেষ العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب) 1 হাদিসে জাতি )قوم(, কর্তৃত্ব )أمر( সাধারণভাবে এসেছে। এটি অনির্দিষ্টজ্ঞাপক )نكرة( শব্দ। এগুলো থেকে প্রমাণিত যে, হাদিসের ভাষ্য বিশেষ ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং সার্বজনীন ও সর্বব্যাপী )عام(।

এ বক্তব্যের পর্যালোচনায় ড. কারযাভী বলেন: এটা ঠিক যে, অধিকাংশ উসূলবিদদের মতে, কোনো বক্তব্যের ভাষ্য বিশেষ প্রেক্ষাপটের সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং সার্বিক'। কিন্তু এ মূলনীতির সাথে সকলে একমত নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. ও ইবন উমর রা. ঘটনার প্রেক্ষাপটের আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়াকে অধিক পছন্দ করতেন। অন্যথায় বিভিন্ন ধরনের ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, বক্তব্য অসংলগ্ন হয়। যেমনিভাবে খারেজীদের হারুরিয়া উপদলসহ আরো কিছু সংখ্যক ব্যক্তি যে সব আয়াত মুশরিকদের বিষয়ে অবতীর্ণ হয়, সেগুলোকে মু'মিনদের উপর আরোপ করে'।

তিনি আরো বলেন, মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ প্রায় একমত যে, উপরোক্ত হাদিসটি নারীকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব তথা আল ইমামাতুল কুবরার পদে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাদিসটি যে প্রেক্ষাপট নিয়ে, সেটা তাই প্রমাণ করে। আর সেটা হয় যদি কোনো নারীকে সমগ্র মুসলমানদের নেতা বা ইমাম বানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ১৯২৪ খ্রি. কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক উসমানী খিলাফতের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার পর সে ধরনের ইমামত বা নেতৃত্ব মুসলিম উম্মাহর মাঝে নেই। অতএব অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। হাদিসের ভাষ্য অনুসারে কোনো নারীকে যদি রাষ্ট্রপ্রধান বা সম্রাজ্ঞী সদৃশ বানিয়ে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই হাদিসটি সকল ক্ষেত্রে বা বিভিন্ন অঞ্চলে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নারী নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের বিরোধিতায় কেউ কেউ বলেন, বর্তমানে আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহ অতীতের বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনের মতো।০

এ হাদিসের পর্যালোচনায় অনেকে বলেছেন, নারীরা নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে বা সর্ব সময়ে ব্যর্থ এটা ঠিক নয়। তাদের কেউ কেউ কখনো কখনো সফল হতে পারে। এমনকি কুরআনে এরূপ একজন নারী নেত্রীর কথা উল্লেখ আছে। যিনি পরামর্শ ভিত্তিতে কাজ করতেন এবং নিজ প্রজ্ঞায় স্বজাতিকে এক ভয়াবহ যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।১

কারো মতে হাদিসটি উপদেশমূলক। এটি হুকুমমূলক নয়। অন্যথায় নারীনেতৃত্ব অবৈধ হলে মহানবি সা. মুসলমানদের জন্য করণীয় হিসেবে আরো সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে হুকুম বলে দিতেন।

একইভাবে হযরত জাবির ইবন সামুরাহ রা.-এর বর্ণনাটির সনদে হায়ছামীর মতে একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। সেহেতু এটি দুর্বল হাদিস।

ষষ্ঠত:

সকল নারী দুর্বল এ কথাটি কোনো হাদিসে সরাসরি বা স্পষ্ট করে কোথাও বলা নেই। তাই অন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তির সাথে কিয়াস বা তুলনা করে সিদ্ধান্ত দেয়া সঠিক হবে না।

সপ্তমত:

অবৈধতার উপর ইজমা হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়, তাও সঠিক নয়। তাহলে মতবিরোধ হলো কী করে? অতীতে অনেক আলিম বৈধতার পক্ষেও ছিলেন। 

অষ্টমত:

নারীরা কোনো অবস্থাতেই সালাতে ইমামতি করতে পারবে না এ কথাটি সঠিক নয়। উম্মে ওয়ারাকাহ বিনতি নাওফাল রা.-কে তার ঘরে সালাতে ইমামতির জন্য মহানবি সা. অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় দেখা যায়, সেখানে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি আযান দিত। রসুল সা. যুগেও আয়েশা রা. ও উম্মে সালামাহ রা. মহিলাদের নিয়ে ঘরে জামাতে সালাতে ইমামতি করেছেন। তবে সামনে না গিয়ে কাতারের ভিতরে থেকেছেন। মহানবি সা. নিজেও তা দেখেছেন ও অনুমোদন দিয়েছেন। 

নবমত:

হযরত আয়েশা রা. উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্গত মুজতাহিদ সাহাবি। তিনি জামাল যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে ঘর থেকে বের হয়েছেন। কেউ হিজাব অবলম্বন করে বের হলে আল কুরআনের দৃষ্টিতে দোষণীয় নয়। দলবদ্ধ হয়ে বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিমানে নারীদের মাহরিম ছাড়া একা হজসহ অন্যান্য উদ্দেশ্যে বের হওয়া বা ভ্রমণকে অনেক আলিম বৈধ বলেছেন। সমাজের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতে পারে। রসুল সা. অন্য হাদিসে নারীদের নিরাপদ একাকী ভ্রমণের ভবিষৎ বাণী দিয়েছেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, মহানবি সা. আদী ইবন হাতিম রা.-এর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: 'হে আদী! তোমার জীবন যদি দীর্ঘ হয়, তা হলে তুমি অবশ্যই দেখবে হীরাত থেকে হাওদাজে মহিলা সফর করবে আর এভাবে কাবায় এসে তাওয়াফ করবে, রাস্তায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না'। 

এজন্য তাবেঈ হাসান বাসরী, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ (এক বর্ণনায়), ইমাম গাযযালি, মাওয়াদী, ইবন তাইমিয়াসহ অনেক আলিম মাহরিম ব্যতীত নারীর হজে বা সফর বৈধ বলেছেন অন্যান্য একাধিক বিশ্বস্ত নারীদের সাথে বের হওয়া বা নিরাপত্তা বিধানের শর্তে। এক হাদিসে এক দিনের বা এক রাত্রের সফরের ভ্রমণে মাহরিম থাকার কথা বলা হয়। অন্য বর্ণনায় দুই বা তিন দিনের কথাও আছে। ৪৯

আজকে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিমানে মক্কা বা একটি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কয়েক ঘন্টা প্রয়োজন। পূর্ণ দিবসের প্রয়োজন নেই। সুতরাং নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে নারী নেতৃত্ব বৈধ মনে করার পথে বাধা থাকে না।

দশমত:

নারীকে প্রধানত ঘরে অবস্থান করতে বলা হয় পারিবারিক দায়িত্ব বিশেষত সন্তান-সন্ততি লালন পালনে অধিক গুরুত্ব দেয়ার জন্য। যাদের সন্তান সাবালক হয়ে গেছে, নিজের কাজ নিজে করতে সক্ষম, সেই সব নারীর ক্ষেত্রে উক্ত নির্দেশ প্রযোজ্য নয়।

দ্বিতীয় অভিমত: সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ:

অতীতে ফকীহগণের মধ্যে কেউ কেউ সাধারণভাবে নারী নেতৃত্ব বা কর্তৃত্বকে সঠিক বা সহিহ বলেছেন:

হানাফি ফকীহ ইবন নুজাইম (৯২৬হি ৯৭০হি.) বলেন "সে নারীর সালতানাত সহিহ তথা সঠিক। মিসরের সালতানাতে এক নারী অধিষ্ঠিত হয়েছিল। যার নাম শাজারাতুর দুরা। যিনি ছিলেন বাদশা সালিহ ইবন আইয়্যুব এর দাসী"। পরবর্তীতে বধূ।

ইবন জারীর তাবারীও সকল ক্ষেত্রে নারীর শাসন বা হুকুমতকে বৈধ বলেছেন। ইবন রুশদ বলেন: "তাবারী বলেন, 'প্রত্যেক ক্ষেত্রে বা সকল বিষয়ে নারী হাকিম (সিদ্ধান্ত প্রদান কারী) বা শাসক হওয়া বৈধ"। 

আধুনিককালে কিছু আলিম ও আধুনিকতাবাদী মুসলিম বুদ্ধিজীবিদের মতে রাষ্ট্র প্রধান হওয়া (ইমামত) সহ সকল ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ। মিসরের শায়খ মুহাম্মদ আল গায্যালি সহ আরো অনেক আলিম এ মত পোষণ করেন। শায়খ মুহাম্মদ আল গায্যালি আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার নারীদের দিকে ইশারা করে বলেন: "তারা (আমেরিকা অস্ট্রেলিয়াবাসীরা) যদি সম্মত হয় যে, নারীদেরকে শাসক অথবা বিচারক কিংবা মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূত হোক, তারা যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। আর আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আর সেটা হলো নারীর এ সমস্ত পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বৈধ"।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গীয় অঞ্চলে মাও. আকরম খাঁ ইসলামের খিলাফতের বিধান মতে নারী পুরুষ উভয়ে যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে সৃষ্টিগত দিক দিয়ে নারীরা মাতৃত্বের স্বরূপে এবং পুরুষরা আল্লাহর হুকুমত পরিচালন ও সংরক্ষণে সক্ষম। উভয়ের সৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কখনো এর তারতম্য তথা ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা যায় না। কুরআন সুন্নাহেও এরূপ তারতম্য না হওয়ার পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। লাহোরের প্রফেসর রফীউল্লাহ শিহাব, জাভীদ জামাল দাসকাভী সহ আরো অনেকে।

এমত পোষণকারীগণও কয়েক ধরনের দলিল পেশ করেন। যেমন:

১. আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আ'মলকারীর আ'মল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ"।৫৭

এতে বুঝা যাচ্ছে, কাজে কর্মে নারী পুরুষের সমঅধিকার। তাই নারীরাও পূরুষের মত নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার রয়েছে।

২. আল্লাহর বাণী: "তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের খিলাফত প্রদান করবেন"।

তাদের মতে এখানে খিলাফত লাভের যোগ্যতার জন্য দুটি শর্ত করা হয়, তা হলো: ইমান ও আমাল সালিহ বা নেক কাজ। এখানে নারী পুরুষ পার্থক্য করা হয়নি।

৩. আল্লাহর বাণী: "আর মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা একে অপরের সহযোগী বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজে নিষেধ করে, আর সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে"।"

এ আয়াতে মু'মিনদেরকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা হয়নি। আর নেতৃত্বও একটি রাজনৈতিক তৎপরতা। এখানে নারী পুরুষ সমান।৬০

৪. সাবা সম্রাজ্ঞীর প্রজ্ঞার প্রশংসা: ইয়ামানে প্রাচীনকালে সোলায়মান আ.-এর সমসাময়িক সাবা অঞ্চলে এক প্রতাপশালী নারী শাসন করেছেন। আল কুরআনে বর্ণিত, সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ বলে: 'আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন'। 

তৎকালীন আল কুদস নগরীতে ইসরাইল রাষ্ট্রনায়ক সোলায়মান আ. এ নারীকে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। এ বিষয়ে দম্ভ প্রদর্শন না করার জন্য সতর্ক করেন। তখন এ সম্রাজ্ঞী কিছু খোজ খবর নিয়ে নিজ সভাসদকে ডেকে চিঠির কথা বলেন এবং পরামর্শ নিলেন। তারা রাষ্ট্রদূত হোক, তারা যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। আর আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আর সেটা হলো নারীর এ সমস্ত পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বৈধ"।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়, বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গীয় অঞ্চলে মাও. আকরম খাঁ ইসলামের খিলাফতের বিধান মতে নারী পুরুষ উভয়ে যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে সৃষ্টিগত দিক দিয়ে নারীরা মাতৃত্বের স্বরূপে এবং পুরুষরা আল্লাহর হুকুমত পরিচালন ও সংরক্ষণে সক্ষম। উভয়ের সৃষ্টিগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কখনো এর তারতম্য তথা ব্যতিক্রম হবে না, তা বলা যায় না। কুরআন সুন্নাহেও এরূপ তারতম্য না হওয়ার পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। লাহোরের প্রফেসর রফীউল্লাহ শিহাব, জাভীদ জামাল দাসকাভী সহ আরো অনেকে।

এমত পোষণকারীগণও কয়েক ধরনের দলিল পেশ করেন। যেমন:

১. আল্লাহর বাণী: "অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো পুরুষ অথবা মহিলা আ'মলকারীর আ'মল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ"।৫৭

এতে বুঝা যাচ্ছে, কাজে কর্মে নারী পুরুষের সমঅধিকার। তাই নারীরাও পূরুষের মত নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার রয়েছে।

২. আল্লাহর বাণী: "তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের খিলাফত প্রদান করবেন"।

তাদের মতে এখানে খিলাফত লাভের যোগ্যতার জন্য দুটি শর্ত করা হয়, তা হলো: ইমান ও আমাল সালিহ বা নেক কাজ। এখানে নারী পুরুষ পার্থক্য করা হয়নি।

৩. আল্লাহর বাণী: "আর মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীরা একে অপরের সহযোগী বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজে নিষেধ করে, আর সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে"।"

এ আয়াতে মু'মিনদেরকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা হয়নি। আর নেতৃত্বও একটি রাজনৈতিক তৎপরতা। এখানে নারী পুরুষ সমান।

৪. সাবা সম্রাজ্ঞীর প্রজ্ঞার প্রশংসা: ইয়ামানে প্রাচীনকালে সোলায়মান আ.-এর সমসাময়িক সাবা অঞ্চলে এক প্রতাপশালী নারী শাসন করেছেন। আল কুরআনে বর্ণিত, সংবাদ সংগ্রাহক হুদহুদ বলে: 'আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন'। 

তৎকালীন আল কুদস নগরীতে ইসরাইল রাষ্ট্রনায়ক সোলায়মান আ. এ নারীকে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। এ বিষয়ে দম্ভ প্রদর্শন না করার জন্য সতর্ক করেন। তখন এ সম্রাজ্ঞী কিছু খোজ খবর নিয়ে নিজ সভাসদকে ডেকে চিঠির কথা বলেন এবং পরামর্শ নিলেন। তারা বলল, আমরা শক্তিশালী। অস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিরোধ করব। তবে সর্বময় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আপনার। কিন্তু সম্রাজ্ঞী দ্বিমত করে বললেন, শক্তিশালী রাজারা কোনো এলাকায় প্রবেশ করলে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের অপদস্ত করে। তখন তিনি উপটৌকন পাঠিয়ে তাকে অধিকতর পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সোলায়মান আ. তার আনুগত্য না মেনে উপটৌকন পাঠানোকে পছন্দ করেননি। ফলে যুদ্ধের হুমকি দেন। এতে সম্রাজ্ঞী সশরীরে সোলায়মান আ.-এর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর অধীনস্ততা মেনে নিয়ে তার সাথে সন্ধি করে গোটা সাবা জাতিকে ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেন। এসব কাজে এ সম্রাজ্ঞীর অনন্য প্রজ্ঞার কথা ফুটে উঠেছে। সোলায়মান আ. তাকে অপসারণ করেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই।

এভাবে আল কুরআনেও তার প্রজ্ঞাপূর্ণ, দূরদর্শী ও পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছে। উপরোক্ত মতানুসারীগণ বলেন, এতে বুঝা যায়, নারী নেতৃত্ব অবৈধ নয়। ৩৬৩

তবে এ যুক্তিটিও সমালোচিত হয়েছে। আল্লামা আলুসী বলেন: "এ আয়াতে এমন কিছু নেই যা প্রমাণ করে যে, নারী সম্রাজ্ঞী হওয়া জায়েয। আর কাফির জাতির কোনো কাজের দ্বারা উক্ত মতের পক্ষে কোনো দলিল হয় না"। 

আলুসীর এ কথা দ্বারা বুঝা যায়, তার সময়েও আয়াতটি নারী সাম্রাজ্ঞী হওয়ার বৈধতার পক্ষে দলিল হিসেবে কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন।

মোটকথা, যেহেতু আল কুরআনে ঐ নারীর কথা এসেছে এবং তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গণতান্ত্রিকতা তুলে ধরে প্রশংসা করা হয়েছে এবং একইভাবে নবি সোলায়মান আ. ঐ মহিলার শাসন স্থিতাবস্থায় রেখেছেন, সেহেতু এটাকে নারী নেতৃত্বের পক্ষে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা অমূলক নয়। তবে নেতৃত্বটি কোন পর্যায়ের ছিল, সেটা বিবেচ্য। কারণ ঐ নারী সোলায়মান আ.-এর বশ্যতা স্বীকার করা এবং পরবর্তীতে তাঁর সাম্রাজ্যের অধীনে থেকে শাসন চালানোর দ্বারা সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করেননি। পরবর্তীতে সে নারীর ক্ষমতা বা নেতৃত্ব ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক।

৫. মুনাফিক নারীরা সংঘবদ্ধভাবে সমাজবিরোধী কাজ করবে, আর মু'মিন নারীরা নিরবে শুধু দেখবে তা সঠিক নয়। ইরশাদ হয়েছে, "মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা একে অপরের অংশ, তারা মন্দ কাজের আদেশ দেয়, আর ভাল কাজ থেকে নিষেধ করে"।

৬. খোলাফায়ে রাশিদীনের যুগ: উমর রা. শিফা নামে এক মহিলাকে বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দিয়ে ছিলেন। তার এ কর্তৃত্ব সার্বজনীন ছিল। নারী পুরুষ সকলের উপর এ মহিলা কর্তৃত্ব করেছেন।

৭. উষ্ট্র যুদ্ধে হযরত আয়েশা রা.-এর নেতৃত্ব: তিনি মুসলমানদের তৃতীয় খলিফা উসমান রা.-এর হত্যার বিচারের দাবিতে মক্কা থেকে সাহাবি ও তাবেঈগণকে সংগঠিত করেন ও তাদের সামনে বক্তব্য প্রদান করেন। এমনকি বিভিন্ন গোত্র প্রদানদের নিকট চিঠি দিয়েও তাদেরকে প্রভাবিত ও একত্রিত করেন। ফলে আলি রা.-এর অনুসারীদের সাথে ৩৬ হিজরি/ ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় অনুষ্ঠিত হয় জামাল বা উষ্ট্র যুদ্ধ।

তিনি আলি রা. তাঁর সাথে পত্র বিনিময় করে শেষ পর্যায়ে উভয়ে সন্ধির প্রস্তাবে একমত হন। তবে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু মুনাফিকের চক্রান্তে উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের দ্বারা ভোর বেলায় হঠাৎ আক্রমণে কিছু লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আয়েশা রা. পর্দায় থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে হযরত আলি রা.-এর দ্রুত পদক্ষেপে ও আয়েশা রা.-এর মদিনায় ফিরে যাওয়ার শর্তে যুদ্ধ প্রশমিত হয়। যাহোক, জামাল যুদ্ধে আয়েশা রা.-এর সাথে ত্রিশ হাজার সৈন্য সমাবেশ ঘটে। যাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন সাহাবি, অন্যরা ন্যূনতম পক্ষে তাবেঈ। তিনি তাদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তাঁর সামষ্টিক নেতৃত্ব, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব সবই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। এসব পদক্ষেপে তাঁর সাথে অংশগ্রহণকারী এ বিশাল সংখ্যক সাহাবি ও তাবেঈন কোনো আপত্তি করেছেন বলে প্রমাণ নেই। এসব প্রমাণ করে নারী নেতৃত্ব বৈধ।

এ দলিলের পর্যালোচনায় বলা হয়, হযরত আয়েশা রা.-এর নেতৃত্ব একচ্ছত্র ছিল না। তাঁর সহযোগী ছিল হযরত যুবায়ের রা. ও তালহা রা.। তাছাড়া, এ নেতৃত্ব ছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে। কারণ ঐ ঘটনার পর তিনি নেতৃত্ব প্রদানমূলক আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

৮. ঐতিহাসিক প্রমাণ: ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক মুসলিম নারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তারা সরকার প্রধান বা কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। তারা ইতিহাসের ক্রান্তি লগ্নে জাতির নেতৃত্বের হাল ধরে তাদের জাতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন ও জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখেন। তন্মধ্যে: খারেজীদের হারুরী শাবীবাহ উপদল নেতা হিসেবে গাযালাহ (মৃ.৭৭হি./৬৯৬ খ্রি.) নেতৃত্ব, মিসরের ফাতেমী শাসনামলে সিতুল মুলুক (৯৭০-১০২৩ খ্রি.), হিন্দুস্থানের সুলতানা রাজিয়া বিনতে সুলতান ইলতুৎমিশ (৬৩৪-৬৩৭হি./ ১২৩৬-১২৪০ খ্রি.), মিসরের শাজারাতুদ দুররা (১২৪৯-১২৫০ খ্রি.), ভুপালের রাণী সেকান্দর বেগম (১৮১৬-১৮৬৮ খ্রি.), পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনযীর ভুট্টো (১৯৮৮-১৯৯০ খ্রি., ১৯৯৩-১৯৯৬ খ্রি.), বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ২০০১-২০০৬ খ্রি.) এবং সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১ খ্রি., ২০০৯ বর্তমান), তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থানসো সিলার (১৯৯৩-১৯৯৬খি.), ইন্দোনেশিয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকার্ণ পুত্রী (২০০১-২০০৪ খ্রি.), সেনেগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মামে মেডিউর বুয়ে (২০০২-২০০২ খ্রি.), প্রমুখ। এসব প্রমাণ করে মুসলিম সমাজে নারীরাও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। আলিমগণ কেউই এসব ঐতিহাসিক মুসলিম নারী নেত্রীদের নেতৃত্বের বিরোধিতা করেননি। তাই এটা প্রমাণ করে নারী নেতৃত্বের দাবিটি বাস্তবসম্মত।

৯. শরিআহর আইন প্রণয়নে মূলনীতি হলো: সাধারণভাবে মূলত সবকিছু বৈধ, যদি শরিআহ কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত না হয়। তাই কুরআন হাদিসে কোথাও নারী নেতৃত্ব নিষেধ নেই। সেখানে বলা নেই যে, নারীদেরকে নেতৃত্ব দিবে না বা নেতা বানাবে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই নারী নেতৃত্ব বৈধ।

ক. নারীগণও সমাজের অংশ। এটি পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতা প্রসূত নেতৃত্ব সৃষ্টি হতে পারে। তাদের বংশানুক্রমিক প্রভাবও থাকতে পারে। যা নেতৃত্ব অর্জন ও প্রয়োগে প্রভাব বিস্তার করে। তাই তারা সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

খ. নারীরা সৎ ও মেধাবী হতে পারে।

গ. নিষেধ এসেছে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব চর্চার ক্ষেত্রে। কিন্তু শুধু এ ক্ষেত্রে সীমিত নয়।

ঘ. বর্তমানে প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামষ্টিক নেতৃত্ব কার্যকর। এ ধরনের নেতৃত্ব হলে যেকোনো পর্যায়ের নেতৃত্বে নারী আসতে সক্ষম।

ঙ. সার্বিক নেতৃত্বে পুরুষদেরকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই নয় যে, নারীদেরকে বঞ্চিত করা। যোগ্যতা থাকলে নারীরাও নেতৃত্বের অধিকারী হতে পারে।

তৃতীয় অভিমত: মজলিশে শুরা ব্যবস্থায় বা যৌথ নেতৃত্বে রাষ্ট্রপ্রধানের পদসহ নারীর সকল ধরনের নেতৃত্ব বৈধ

রসুল সা.-এর বাণী: কোনো যদি জাতি কখনো সফল হবে না যদি তারা নারীকে তাদের কর্তৃত্বে বসায়। এ হাদিসের হুকুম সম্পর্কে মাও. আশরাফ আলি থানভী রহ. (মৃ. ১৩৬২ হি.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি তখন ফাতওয়া দিতে গিয়ে বলেন: শাসন করার বিষয়টি তিন ধরনের:

এক. যেখানে কর্তৃত্ব পূর্ণ ও সার্বিক সার্বজনীন। যেখানে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়, তার উপরে অন্য কেউ ক্ষমতাধর নেই। তার ক্ষমতা সর্বোচ্চ। সেটা কোনো নির্দিষ্ট দল বা অঞ্চলের সাথে নির্ধারিত নয়। যেমন: রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষমতা। যিনি এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ইখতিয়ার রাখেন।

দুই, যেখানে কারো পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করেন, তবে সেটা সার্বজনীন নয়। যেমন: নির্দিষ্ট একটি দলের প্রধান হওয়া।

তিন, যেখানে কারো এককভাবে পূর্ণ ও সার্বজনীন ক্ষমতা হয় না। যেমন গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতা। যেখানে শাসক মূলত মজলিশে শুরা তথা পরামর্শ কমিটির একজন সদস্য রূপে অবস্থান করেন। সেখানে মজলিশে শুরাই শাসক।

প্রথম ধরনের ব্যবস্থায় নারী শাসক হওয়া জায়েয নয়। অবশিষ্ট দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনের ব্যবস্থায় একজন নারী প্রশাসক হওয়া জায়েয। আর এটাই আবু বাকারাহ বর্ণিত উপরোক্ত হাদিসের ভাষ্য। 

চতুর্থ অভিমত: বিশেষ অবস্থা বা প্রেক্ষাপটে নারীর রাষ্ট্রপ্রধান সহ সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বৈধ

সৈয়দ আবুল আলাসহ বেশ কিছু আলেমের মতে যদি প্রেক্ষাপট এমন হয়, যেখানে নারীর চেয়ে অধিক প্রভাবশালী যোগ্যতর পুরুষ নেতা না থাকা বা নারী নেতৃত্বের বিকল্প না থাকা (সৈয়দ আবুল আলা)। ১৯৬৪ খ্রি. পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়্যুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকে সৈয়দ আবুল আলাসহ অনেক আলিম সমর্থন করেছিলেন। তারা চেয়ে ছিলেন, যেকোনো উপায়ে আইয়্যুবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। সৈয়দ আবুল আলা বলেন, এ পরিস্থিতিতে নারী নেতৃত্ব বৈধ হওয়াতে কোনো বাধা নেই। ২

পঞ্চম অভিমত: বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ

অনেক আলিমের মতে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৈধ। যেমন:

ক. বিচারিক কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে: মুসলিম ফকীহগণের অধিকাংশের মতে বিচারিক কাজে নারীদের নিয়োগ বৈধ নয়। তবে অনেকের মতে নারীদের বিচারিক কাজ বৈধ। এমতটি হলো হাসান আল বাসরী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক (এক বর্ণনায়), মালেকি মাযহাবের ইমাম ইবনুল কাসিম, ৪ ইমাম ইবন জারীর তাবারী, ইমাম ইবন হাযাম প্রমুখের। তবে ইমাম আবু হানিফার মতে যেসব ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য বৈধ, সেসব তাদের বিচার কাজও বৈধ। যেমন: ব্যবসায়িক লেনদেন, পারিবারিক আদালতে ইত্যাদি।

অনেকে বর্ণনা করেন যে, ইবন জারীর তাবারীর মতে সার্বিক ক্ষেত্রে নারী বিচারক হতে পারে এবং হওয়া বৈধ। 

মালেকি মাযহাবের ফকীহ ইবন রুশদ উল্লেখ করেন: "তাবারী বলেন: প্রতিটি ক্ষেত্রে সাধারণভাবেই একজন নারী হাকিম (বিচারক) হওয়া জায়েয"। 

মালেকি মাযহাবের ফকীহ ও ব্যাখ্যাকার ইবন আবী মারয়াম এর বর্ণনা মতে ইমাম ইবনুল কাসিম আল মালেকি মনে করতেন, সার্বিক ক্ষেত্রে নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া বৈধ। ইবন আবদিস সালাম বলেন, সম্ভবত তিনি হাসান বাসরী ও তাবারীর ন্যায় নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়াকে সাধারণভাবেই বৈধ মনে করতেন। অবশ্য ইবন যারকূনের বর্ণনা মতে ইবনুল কাসিম এর মতটি ছিল ইমাম আবু হানিফার মতো। তিনি মনে করতেন, যে সব ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য বৈধ, সেখানে বিচার করাও বৈধ। মালেকি মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল হাত্তাব এ বর্ণনাটি অধিক গ্রহণযোগ্য বলেছেন। 

শাফেঈ মাযহাবের শায়খ উপাধীধারী আবুল ফারজ ইবন তিরার-এর মতে সকল ক্ষেত্রে বিচারিক কাজে নারীদের কর্তৃত্ব বৈধ। তিনি বলেন: 'এর পক্ষে দলিল হলো হুকুম আহকাম চালুর উদ্দেশ্য হলো বিচারক কর্তৃক হুকুম-আহকাম কার্যকর করা, বিভিন্ন পক্ষের দলিল শ্রবণ করা, বাদী-বিবাদীর মাঝে বিবাদ মিমাংসা করা। আর এসব কাজ একজন পুরুষের পক্ষে যেমনিভাবে সম্ভব, নারীর পক্ষেও সম্ভব'।

ইবন হাযম নারীদেরকে খিলাফতের আসনে বসানো জায়িয মনে না করলেও সকল ক্ষেত্রে তাদের বিচার কাজ বৈধ বলেছেন। তাঁর মতে সকল ক্ষেত্রে নারীরা সাক্ষ্য দিতে পারে। আর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বিশ্বস্ত হওয়া শর্ত। আর কিছু নয়। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ নেই। যে কারো পক্ষে ও বিপক্ষে প্রত্যেক বিশস্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য"।
এখানে সাক্ষ্য দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিষয়কে আলাদা করা হয়নি। তেমনি বিচারের ক্ষেত্রেও। বিচারক হওয়ার শর্তসমূহ উল্লেখ করতে যেয়ে বলেন, মুসলমান ও যিম্মীদের কোনো বিষয়ে কারো বিচার কাজ ও হুকুম জারী করা হালাল নয় একমাত্র সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যিনি মুসলিম, বালিগ, বুদ্ধিমান এবং কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান সম্পন্ন। এখানে নারী পুরুষ ভেদাভেদ করা বা পুরুষ হওয়ার শর্তারোপ করা হয়নি।

তবে হানাফি মাযহাবের অধিকাংশের মতে কিসাস ও হদ প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ বৈধ নয়। শারহ আদাবুল খাসসাফে রয়েছে: "কিসাস ও হাদ্দ ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে নারী বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে পারে"।

তারা কুরআন হাদিসে দলিলের উপর কিয়াস করেছেন। তাদের মতে কুরআন হাদিসে নারীদের সাক্ষ্য দেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, বৈধ বলা হয়েছে। সেহেতু যেসব ক্ষেত্রে সাক্ষ্য বৈধ, বিচার করাও বৈধ। হানাফি মাযহাবের 'হিদায়াহ' গ্রন্থে উল্লেখ: 'সকল ক্ষেত্রে নারীর বিচার কাজ বৈধ। একমাত্র দন্ডবিধি তথা হুদুদ ও কিসাসের ক্ষেত্রে ফয়সালা ব্যতীত। আর এ ক্ষেত্রে তাদের সাক্ষীর বিষয়টি বিবেচনায়'।

ইবন রুশদ বলেন, "ইমাম আবু হানিফা বলেন, সম্পদের বিষয়ে বিচার কাজে নারী বিচারক হওয়া জায়েয"। 

খ. প্রশাসনিক ক্ষেত্রে: ইবন হাযম খিলাফতের বিষয়টি ব্যতীত প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীদের শাসনকে বৈধ বলেছেন। তিনি বলেন: নারীদেরকে প্রশাসনে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এটাই আবু হানিফার মত। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. শিফা নামে এক নারীকে তার স্বজাতির বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন"।

তিনি এ বিষয়ে আল কুরআন থেকে দলিলও পেশ করেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন হকদারের নিকট আমানতসমূহ পৌঁছে দিতে। আর যখন তোমরা ফয়সালা দিবে তখন ন্যায়ের সাথে ফয়সালা দিবে"। 

এখানে আমানত মানে কর্তৃত্বের আমানত। ইবন হাযম বলেন: এ আয়াতের নির্দেশনা নারী পুরুষ সকলকে সার্বিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। যদি না কোনো স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে তা থেকে পৃথক করা হয়। তখন দীনের সার্বিক নির্দেশ থেকে একে প্রথক করা যাবে।

গ. ওয়াক্ত স্টেটে: হানাফি মাযহাবের দুররুল মুখতারে এসেছে, নারীর কর্তৃত্বকে বিচারিক কাজের বাইরে আরো সম্প্রসারিত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, "নারী ওয়াকফ স্টেটে নাযীর বা তদারককারী হওয়ার যোগ্য, সে ইয়াতিমদের জন্য ওসিয়্যতকারীনী হতে পারে, যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে"।

হযরত উমর রা. স্বীয় কন্যা হাফসা রা.-কে খায়বারের এক ওয়াক্ত স্টেটের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।

নারী নেতৃত্বের স্বরূপ: পরিপ্রেক্ষিত ইসলাম / আবদুর রহমান আনওয়ারী ও শামীমা নাসরিন

ঘ. পার্লামেন্টে: ড. মস্তফা সাবাঈ নারীর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বিরোধিতা করলেও তারা পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন।

৬. মন্ত্রণালয়ে: মহানবি সা. ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ওযারাত তথা মন্ত্রণালয় ছিল না। মন্ত্রী নিয়োগ ব্যবস্থা ছিল না। মাওয়ার্দী উপরোক্ত আবু বাকারাহ রা. বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে নারীকে মন্ত্রীত্ব প্রদান করাকেও অবৈধ বলেছেন। তার মতে মন্ত্রীর নিকট থেকে মতামত চাওয়া হয়, তার মাঝে দৃঢ়তা থাকা প্রয়োজন। এগুলো নারীদের মাঝে দুর্বল। বিভিন্ন বিষয় সরাসরি প্রত্যক্ষণ প্রয়োজন। যা নারীর জন্য নিষিদ্ধ'। 

ড. ইউসুফ আল কারযাভী ও যায়নাব গায্যালিসহ অনেকে নারীরা মন্ত্রী হওয়ার বৈধতার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তারা বলেন, আবেগ থাকলেই মতামত ও পরামর্শ দিতে দুর্বল হবে সেটা ঠিক নয়। মহানবি সা.-এর যুগেও নারীরা পরামর্শ দিয়েছেন। আর তা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। যেমন: হুদায়বিয়ার ঘটনায় উম্মে সালামাহ রা.-এর পরামর্শ।

চ. সালাতের ইমামতিতে: পূর্বেই বলা হয়, অধিকাংশ আলিমের মতে ফরয বা নফল সালাতে নারীদের ইমামতি অবৈধ। তারা দলিল হিসেবে রসুল সা.-এর হাদিস উল্লেখ করেন। মহানবি সা. বলেন: "সাবধান! কোনো নারী কোনো পুরুষের ইমামতি করবে না"।৯৩

মাওয়ার্দী বলেন, কোনো পুরুষের জন্য জায়েয নয় কোনো নারীর ইমামতিতে সালাত আদায় করা। ইমাম শাফেঈর মতে তা করলে তাকে পুনরায় সালাত আদায় করতে হবে। এটাই সঠিক মত। এ বিষয়ে সকল ফকীহগণ একমত পোষণ করেন। একমাত্র আবু ছাওর ব্যতীত। কেননা যে সালাতে পুরুষের ইমাম হতে পারে সে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অন্য পুরুষের মত নেতা হতে পারে"। 


ষষ্ঠ অভিমত: রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সবধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ

গোটা জাতির উপর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তথা খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্ব ব্যতীত অন্যান্য সবধরনের নারী নেতৃত্ব বৈধ। যেমন: সংসদ সদস্য হওয়া, মন্ত্রী হওয়া ইত্যাদি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে তথা রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নারীকে নেতৃত্ব প্রদান করা নিষিদ্ধ। ড. ইউসুফ আল কারাযাভীসহ কিছু আলেম এ মত পোষণ করেন। তিনি বলেন: "পরিবারের গণ্ডির বাইরে কিছু পুরুষের উপর কিছু নারীর কর্তৃত্ব চালানো বিষয়ে শরিয়াতে এমন কোনো দলিল নেই যা প্রমাণ করে যে সেটা অবৈধ। বরং যা নিষিদ্ধ সেটা হলো সকল পুরুষের উপর কোনো নারীর সামগ্রিক কর্তৃত্ব" ।

এর সমর্থনে দলিল হিসেবে বলেন: সাধারণ অবস্থা থেকে এ নিষেধটি খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে আবু বাকারাহ রা. বর্ণিত হাদিসটি। যাতে রসুল সা. বলেন: "যে জাতি তাদের উপর কর্তৃত্ব নারীদেরকে প্রদান করে, সে জাতি কখনো কল্যাণ পাবে না, সফল ও সার্থক হবে না"।

এখানে أمرهم তথা তাদের কর্তৃত্ব বলে তাদের সবোর্চ্চ কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব বুঝানো হয়েছে। এটা বুঝা গেল হাদিসটি যে প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল, তার আলোকে। কারণ সেখানে পারস্য সাম্রাজ্যে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সম্পর্কে বলা হয়। অতএব, সাধারণভাবে নারী নেতৃত্ব বৈধ নয়। তবে এ হাদিসে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বকে খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যা নারীর জন্য নিষিদ্ধ। 

এভাবে যারা নারী নেতৃত্ব অবৈধ বলেন, তাদের দলিলের পর্যালোচনায় ড. কারযাভী আরো বলেন, নেতৃত্ব দিতে হলে, নির্বাচনে ভোট দিতে গেলে নারীদেরকে ঘর থেকে বের হতে হয়। আলিমগণের মতে প্রয়োজন ছাড়া নারীর ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। কিন্তু বাস্তবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের চেয়ে সামাজিক প্রয়োজন আরো গুরুত্বপূর্ণ। আজকে সেকুলার নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে ভোট দিয়ে সেকুলারদের ক্ষমতায় বসাচ্ছে। ইসলামের স্বার্থে শরিআহ পালনকারী নারীগণ কি ভোট দেয়া তথা সত্যের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বের হওয়া কি প্রয়োজন নয়? আল কুরআনে ঘরে অবস্থান করার বিধানটি নবি সা.-এর স্ত্রীগণের জন্য কার্যকর ছিল। অনেকের মতে এটি সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু সেটা মেনেও নিয়ে বলা যায়, একই আয়াতের অবশিষ্ট অংশ দেখা দরকার। সেখানে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত করা হয়, জাহেলী সমাজের মতো তাবাররুজ না করা তথা বেপর্দা ও অশ্লীলভাবে বের না হওয়া। অশ্লীলতা প্রদর্শন না করে বের হতে শরিআহর দৃষ্টিতে কোনো বাধা নেই। আর বাস্তবতা হলো আজকে নারী শিক্ষা দীক্ষা, চাকুরির জন্য স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিসের উদ্দেশ্যে হরহামেশা ঘর থেকে বের হচ্ছে। ১০৪

নারীরা সংসদ সদস্য হওয়ার বিরোধিতাকারীগণ যে সব যুক্তি প্রদর্শন করেন, ড. কারযাভী সেগুলোরও সমালোচনা করে বিভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তারা এর বিরোধিতায় বলেন, পার্লামেন্ট তথা মজলিশে শুরার কাজ দু'ধরনের: ক. রাষ্ট্রপ্রধানের হিসেব নিকাশ নেয়া ও তাকে বিভিন্ন কাজে জবাবদিহি করা। দুই. সুচিন্তিত মত দিয়ে আইন প্রণয়ন করা। প্রথম কাজটি মূলত রাষ্ট্রপ্রধানের উপর কর্তৃত্ব করার নামান্তর। সে একজন পুরুষ হলে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব বুঝায়। আল কুরআনে নারীদেরকে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব দেয়নি (পূর্বে উল্লেখ করা হয়)। দ্বিতীয়ত: শরিআহর বিষয়ে জ্ঞান গবেষণা তথা ইজতিহাদে পুরুষরাই অগ্রগামী।

প্রথম পর্যায়ের বক্তব্যের পর্যালোচনায় তিনি যুক্তি দেন, পার্লামেন্টে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। তাই তাদেরই প্রাধান্য থাকে। তাছাড়া, শাসককে নাসীহত করা, পরামর্শ দেয়া, ত্রুটি বিচ্যুতি ধরিয়ে দেয়াই ইসলামি রাজনীতির মূল কথা। যা আমরু বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকারের অংশ। আল কুরআনে একাজে অংশগ্রহণের জন্য নারীদেরকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে (পূর্বে বিবৃত)। মহানবি সা.ও মুসলমানদের সামষ্টিক বিষয়ে নারীর পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। যেমন: হুদায়বিয়াহর সন্ধির প্রাক্কালে উম্মে সালামাহ রা.-এর পরামর্শে তিনি পদক্ষেপ নেন। মসজিদে নববীতে খলিফা উমর রা. এক ভাষণে নারীর সর্বোচ্চ মহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে চাইলে, সেই উম্মে সালামাহ রা.-এর বিরোধিতা করে যুক্তি প্রদর্শন করেন। এসব প্রমাণ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ দেয়া ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে পারে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের বক্তব্যের পর্যালোচনায় তিনি যুক্তি দেন যে, নারী শিক্ষায় সুযোগ সুবিধা কম থাকার কারণেই তারা পিছিয়ে। কিন্তু তাই বলে জ্ঞান-গবেষণায় তাদের অবদান কম নয়। হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট অনেক বড় বড় বিদ্বান সাহাবিও ফাতাওয়া চাইতেন। কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের দ্বার নারী পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত। কেউই এ কথা বলে না যে, ইজতিহাদ করার যোগ্যতার শর্তসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো: পুরুষ হওয়া। সুতরাং এ কাজে নারীদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। এছাড়া, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক দিয়ে কোনো কোনো নারী অনেক পুরুষের চেয়েও অগ্রগামী হতে পারে। যেমন আল কুরআনে বর্ণিত সাবা রাণী এবং মহানবি সা.-এর সাহাবিগণের মধ্যে আয়েশা রা.।

একইভাবে নারী মন্ত্রীসভার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্পর্কে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দায়িত্ব সামষ্টিক, কর্তৃত্ব সকলের অংশীদারিত্বমূলক। যা একদল মানুষ কার্যকর করে, বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থার দ্বারা। আর নারী তার অংশ মাত্র। সে একচ্ছত্র শাসক হতে পারে না। তার ক্ষমতা নিরংকুশ বা একচ্ছত্র নয়। যেকোনো সময় তার ক্ষমতা চলে যেতে পারে। সার্বিক পর্যালোচনা ও চিন্তাভাবনায় দেখা যায়, কোনো জাতি উপর নারীর শাসন নয়, বরং শাসন হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বা গোষ্ঠীর ও ব্যবস্থাদির। যদিও কোনো নারী সর্বোচ্চে থাকুক না কেন। সেখানে সে নারী শাসক নয়। প্রধানমন্ত্রী শুধু এককভাবে শাসক নয়, বরং সামষ্টিকভাবে গোটা মন্ত্রী সভা হলো শাসক। 

অধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত ও উপসংহার:

উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যায়, যারা নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছেন, তাদের যুক্তির মূল কেন্দ্র বিন্দু নারীর যোগ্যতা, দায়িত্ব ও হিজাব ব্যবস্থা ঠিক রাখাকে কেন্দ্র করে। বাকি দলিলসমূহ সার্বিকভাবে প্রযোজ্য নয়, অংশ বিশেষের সাথে প্রযোজ্য। আর তা হলো সর্বোচ্চ পদ তথা খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। খিলাফত বা ইমামতকে সামনে রেখে তারা সামগ্রিক নেতৃত্বের উপর হুকুম সম্প্রসারিত করেছেন। পক্ষান্তরে যারা নারী নেতৃত্বের সমর্থক তারা বলছেন, কুরআন সুন্নাহে এ বিষয়ে কোনো নিষেধ নেই। তাছাড়া, কোনো কোনো নারীর নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকতে পারে। যোগ্যতা থাকলে নারী যেকোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে। অন্যরা বিশেষ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় বা বিশেষ ক্ষেত্রে বা প্রেক্ষাপটে নারী নেতৃত্ব বৈধ বলেছেন। তন্মধ্যে যারা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বৈধ বলেছেন, তারা ইমামত কুবরা তথা রাষ্ট্রপ্রধান পদে নারী নেতৃত্বকে অবৈধ ধরেই সেসব মত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে উল্লেখ করেন, নারীদেরকে রাষ্ট্রপ্রধান তথা খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেয়া জায়েয না হওয়ার বিষয়ে উলামায়ে উম্মাহ ঐক্যমত্য পোষণ করে।





বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫

মানুষের আইন বনাম আল্লাহর বিধান: ইসলাম কেন গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করে

 

ইসলামে গণতন্ত্র হারামের শরয়ী দলিল — পর্যালোচনা

গণতন্ত্রকে অনেকেই ইসলামসম্মত বা গ্রহণযোগ্য মনে করলেও ইসলামী আকীদা ও শরিয়তের আলোকে এ ব্যবস্থাটি যে সরাসরি শিরক ও কুফরীর সাথে সাংঘর্ষিক—তা বিভিন্ন দলিল দ্বারা স্পষ্ট হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের একজন সাবেক সভাপতি দাবি করেছেন যে “গণতন্ত্র হারাম”—এমন কোনো আয়াত বা শরয়ী দলিল নেই। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়।

মনে রাখতে হবে—কুরআন নাজিল হয়েছিল এমন এক যুগে, যখন ‘গণতন্ত্র’ নামে কোনো রাজনৈতিক ধারণারই অস্তিত্ব ছিল না। তাই শব্দগতভাবে “গণতন্ত্র হারাম” না থাকলেও মানুষের বানানো সকল বিধানকে যে শরিয়তে হারাম করা হয়েছে—তা কুরআন-সুন্নাহ বহু জায়গায় সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।
অর্থাৎ মানুষের তৈরি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব শাসনব্যবস্থাই ইসলামে বাতিল—যদি তা আল্লাহর বিধানের বিপরীতে দাঁড়ায়।

আমি পরামর্শ দেব—ছাত্র শিবিরের ঐ সাবেক সভাপতি এবং এই লেখার পাঠকরাও যেনো প্রথমে “খেলাফত ও মুলকিয়াত” বইটি পড়ে নেন। কারণ সেখানে ইসলামের রাজনৈতিক ধারণা ও মানুষ-নির্মিত ব্যবস্থার মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে অযথা বিতর্ক, ভুল ব্যাখ্যা বা বিভ্রান্তি এড়ানো যাবে।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন—“যদি গণতন্ত্র হারাম হয়, তাহলে আজকের যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিকল্প পথ কী?”
এই প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর আলাদা করে উপস্থাপন করা হবে। আপাতত বিষয়টির মূল শরয়ী দিকগুলো দেখা যাক।


গণতন্ত্র কেন শিরক ও কুফরি — কুরআন-হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ

১. সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) : কার হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা?

গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় মূলনীতি হলো—“সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”
অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব মানুষের।

ইসলামের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট শিরক।

আল্লাহ বলেন—

وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيْكٌ فِي الْمُلْكِ
“রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই।” (বনী ইসরাঈল ১৭/১১১)

তিনি আরও বলেন—

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ
“বলুন, হে আল্লাহ! রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে চান রাজত্ব ছিনিয়ে নেন।” (আলে ইমরান ৩/২৬)

আরও বলেন—

تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“বরকতময় তিনি, যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব এবং যিনি সর্ববিষয়ে সর্বক্ষমতাশালী।” (মূলক ৬৭/১)

এছাড়াও—

الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ... وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيكًا
“যার হাতে আসমান-জমিনের রাজত্ব… তাঁর রাজত্বে কোনো শরিক নেই।” (ফুরক্বান ২৫/২)

সরাসরি প্রমাণ—মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর।
মানুষকে সার্বভৌম বানানো মানেই আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন।


২. আইন প্রণয়ন : বিধান দেয়ার অধিকার কার?

গণতন্ত্রে আইন তৈরি করে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
তারা চাইলে কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী আইনও চালু করতে পারে এবং তা অমান্য করা অপরাধ হয়।

যেমন—
• পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স
• মদের বৈধতা
• সুদের বৈধতা
• ইসলামবিরোধী নৈতিক আইন
• আল্লাহর হারামকে হালাল করা

এসবই আল্লাহর হুকুমের জায়গায় মানুষের হুকুম বসানোর শামিল—যা শিরক ও কুফরি।

আল্লাহ বলেন—

اَلَا لَهُُ الْخَلْقُ وَالْاَمْرُ
“শুনে রাখ! সৃষ্টি তাঁর, বিধানও তাঁর।” (আ‘রাফ ৭/৫৪)

তিনি বলেন—

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“বিধান করার অধিকার কেবল আল্লাহর।” (ইউসুফ ১২/৪০)

আরও বলেন—

وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ
“আল্লাহই নির্দেশ দেন, তাঁর নির্দেশকে বাতিল করার কেউ নেই।” (রা‘দ ১৩/৪১)

এটি স্পষ্ট দলিল—আইন প্রণয়নের অধিকার মানুষের নয়, কেবল আল্লাহর।


৩. বিরোধ নিষ্পত্তি : শেষ সিদ্ধান্ত কার?

গণতন্ত্রে বিরোধ নিষ্পত্তির শেষ বিচারক হলো—
সংবিধান, আদালত ও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত।

ইসলামে এ ভূমিকা একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের।

আল্লাহ বলেন—

فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ
“তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও।” (নিসা ৪/৫৯)

তিনি আরো বলেন—

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ ... أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো ফয়সালা দিলে মুমিনদের আর কোনো বিকল্প থাকে না।” (আহযাব ৩৩/৩৬)

গণতন্ত্রে সিদ্ধান্তের উৎস মানুষ—ইসলামে উৎস আল্লাহ। দুটো ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত।


শেষ কথা : দাবি যিনি করেছেন, যাচাই করুন

ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতির বক্তব্য—“গণতন্ত্র হারাম এমন দলিল নেই”—
এ কথা সত্য না মিথ্যা তা কুরআনের আলোতেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

গণতন্ত্রের মূলনীতি—
• সার্বভৌমত্ব মানুষের
• আইন প্রণয়নের অধিকার মানুষের
• চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষের

আর কুরআনের মূলনীতি—
সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর
বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর
ফয়সালার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের

এ দুটি ব্যবস্থা একে অন্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাই ইসলামের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রকে কুফরি ও শিরকি ব্যবস্থা বলা—দলিলসম্মত বক্তব্য।

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫

১৭ নভেম্বর ভয়াল নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস


 

১৭ নভেম্বর ভয়াল নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস : তিন দশক পরও বিচারহীনতা, ভুক্তভোগীদের আহাজারি একই রয়ে গেছে

আজ ১৭ নভেম্বর—পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে কলঙ্কে ভরা এক শোকাবহ দিন।
১৯৯৩ সালের এই দিনটি রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় বাঙ্গালীদের ওপর শান্তিবাহিনীর (বর্তমান জেএসএস) পরিকল্পিত গণহত্যার দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
আজ সেই নৃশংস ঘটনার ৩২ বছর পূর্তি। এই হত্যাযজ্ঞকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে ১৯তম ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

গণহত্যা ভুলে গেছে জাতি, দুঃসহ স্মৃতি বহন করে পরিবারগুলো

দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও নানিয়ারচর গণহত্যায় নিহতদের জন্য আজও রাষ্ট্রীয় কোনো বিচার হয়নি।
৪৯ জনেরও বেশি নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হত্যা, নারীদের গণধর্ষণ ও হত্যা, ১৫০–২০০ জনকে আহত করার ভয়াল ঘটনাটি ক্রমেই ভুলে যাচ্ছে পার্বত্য বাঙ্গালীরা।

সেদিন কী ঘটেছিল?

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস সন্ত্রাসীদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল—পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙ্গালীদের উৎখাত করে পাহাড়কে বাঙ্গালীশূন্য করা।
সেসময় তাদের পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হামলায় পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ৩৫ হাজার বাঙ্গালী প্রাণ হারান বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা সবাই ছিলেন নিরস্ত্র ও সাধারণ মানুষ।

গণহত্যার পর নানিয়ারচর থেকে ২১৮টি পরিবার ভয়ে সমতলে পালিয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও প্রশাসন সেদিন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, আর সমগ্র নানিয়ারচর পরিণত হয় সন্ত্রাসের জনপদে।

বুধবারের সাপ্তাহিক হাট — যে দিনটি পরিণত হয়েছিল মৃত্যুকূপে

১৭ নভেম্বর দিনটি ছিল সাপ্তাহিক হাটবাজারের দিন।
শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ শত শত মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বাজারে এসেছিল। সেই সময় পার্বত্য গণপরিষদের ব্যানারে শান্তিবাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদে এক বিশাল মিছিল হয়—যার নেতৃত্বে ছিলেন আহমেদ মিয়া এবং আবদুল লতিফ।

মিছিলে ছিলো কয়েক হাজার বাঙ্গালী, যারা শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবি জানাচ্ছিল।
মিছিল শেষে কৃষি ব্যাংকের সামনে সমাবেশের সময়襲突 শুরু হয়।

১৩টি এলাকার উগ্র উপজাতিদের সমন্বিত হামলা

বেতছড়ি, ছয়কুড়িবিল, মাইচ্ছড়ি, গবছড়ি, তৈচাকমা, বড়াদমসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত উগ্র উপজাতিরা জেএসএসের নেতৃত্বে হামলা চালায়।
হামলাকারীরা ১৩২টি বাঙ্গালী ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।

নেতৃত্বে ছিলেন সন্তু লারমা — প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়াবহ বিবরণ

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী—
সন্তু লারমা নিজেই এই গণহত্যার নেতৃত্ব দেন।
তার সাথে ছিলেন ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা ও বীরেন্দ্র চাকমা।
৭৭ জন জেএসএস সন্ত্রাসী এই হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়।

সন্তু লারমার বাড়ি ছিল নানিয়ারচরেই।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তিনি সেদিন ১৩ মাস বয়সী নুর কায়েদা নামের শিশুকে পিষে হত্যা করেন এবং শিশুটির মাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করেন।

আহত বাঙ্গালীদের অনেককে পশুর মতো জবাই করে হত্যা করা হয়।
অনেকে প্রাণ বাঁচাতে কাপ্তাই লেকে ঝাঁপ দিলেও জেএসএস সন্ত্রাসী ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
দোকান, ঘরবাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে মানুষকে হত্যা বা পুড়িয়ে মারা হয়।

পরবর্তীতে রাঙ্গামাটি থেকে আগত লঞ্চের যাত্রীদের ওপরও হামলা চালানো হয়, যেখানে মু‌ল্লা আনিসুজ্জামানকে হত্যার পর তার লাশ গুম করা হয়।

মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ৪৯ জন নিহত, গুম, আগুনে পুড়িয়ে গৃহহারা ২০০-এর বেশি পরিবার

নানিয়ারচর গণহত্যায়—

  • ৪৯ জনের বেশি নারী, শিশু ও বৃদ্ধ নিহত হয়,

  • অধিকাংশ লাশ গুম করা হয়,

  • ১৫০–২০০ জন আহত,

  • শত শত মানুষ অপহৃত,

  • ২০৪টি বাড়ি লুটপাটের পর সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ফেলা হয়,

  • হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়

লাশ পুড়িয়ে একত্রে ফেলা হয়—মুসলিম ধর্মীয় রীতিকে উপহাস করে।

গণমাধ্যম তখন নীরব ছিল

বাঙ্গালী লেখক না থাকায় এসব ভয়াবহ গণহত্যা ইতিহাসে সেভাবে স্থান পায়নি।
তৎকালীন গণমাধ্যম জেএসএসের ভয়ে সত্য প্রকাশ করত না।
পাহাড়ে গণমাধ্যম প্রবেশেও ছিল কড়া সেন্সর।

তবুও নানা প্রতিকূলতা ভেদ করে ঘটনাটি প্রকাশ করে দৈনিক ইত্তেফাকদৈনিক ইনকিলাব

অবশেষে ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ : বিচার চাই

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুরুজ মিয়া (৮১), ফয়জ আলী (৭৯) ও আনোয়ার মোল্লা (৮৪)—
যারা মৃত্যুভয়ে পরদিনই ময়মনসিংহে পালিয়ে গিয়েছিলেন—
এখনো ঘটনাটি মনে করলে অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

তাদের একটাই দাবি—
নানিয়ারচর গণহত্যার বিচার হোক, নিহত পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।

নারীর পর্দা—সমাজ, পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে এক গভীর বাস্তবতা

 


নারীর পর্দা—সমাজ, পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে এক গভীর বাস্তবতা

নারীর পর্দা নিয়ে আমরা অনেক সময় কোরআন–হাদীসের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকি। কিন্তু আজ আমি কোরআন–হাদীস উল্লেখ না করে—যুক্তি, বাস্তবতা ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু প্রশ্ন ও উপলব্ধি সামনে আনতে চাই। সম্মানিত মা-বোনেরা—অনুগ্রহ করে মনোযোগ দিয়ে একবার ভেবে দেখবেন।


১. আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না যে আপনারা সুরক্ষিত, মূল্যবান ও আল্লাহর বিশেষ রহমত?

নারী সৃষ্টি নিজেই এক অপূর্ব রহমত ও সম্মানের প্রতীক। এই বিশেষ মর্যাদাকে রক্ষার জন্যই পর্দা—যা আপনাদের সুরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদার ঢাল।


২. আপনি কি কখনো ভেবেছেন—আপনারাই দুনিয়ার সকল পুরুষের মা?

আজ পৃথিবীতে যে হাজারো মানুষ—তারা কারও না কারও গর্ভে লালিত। প্রতিটি মহান মানুষের পেছনে ছিলেন একজন মা। তাই আপনার মর্যাদা আসলে সমগ্র মানবজাতির সম্মানের সমান।


৩. আপনাদের গর্বেই জন্ম হয়েছে সকল মনীষী, মহানায়ক, নবী-রাসূল—এ কথা কি ভুলবেন কেন?

ইতিহাসের প্রতিটি মহান ব্যক্তিত্বের সূচনা এক মায়ের হৃদয় ও গর্ভ থেকেই। এ মর্যাদা যে কত বড়—তা ভেবে দেখলেই পর্দার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যায়।


৪. আপনি যে শরীরের অংশ বেপর্দাভাবে প্রকাশ করেন—তা যে মানবজাতির সৃষ্টি ও লালনের কেন্দ্র—এটা কি জানেন না?

নারীর শরীরের অতি মূল্যবান অঙ্গগুলো মানবসৃষ্টির অপরিহার্য কেন্দ্র। যা যত মূল্যবান, তাকে তত সংরক্ষণ করা হয়—এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম।


৫. মা হিসেবে আপনি কেন আপনার পবিত্র দেহ পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করে অপবিত্র করবেন?

একজন সন্তান তার মাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় দেখে। মা যদি নিজেকে বেপর্দা করে চোখের জিনার সামনে উপস্থাপন করেন—সন্তানের চোখে তার সেই পবিত্রতার মর্যাদা নষ্ট হয় না কি?


৬. সব মা-ই নেককার, দ্বীনদার সন্তান চান—কিন্তু যে গর্ভ চোখের জিনায় অপবিত্র, তা কি পবিত্র সন্তান জন্ম দিতে পারে?

চোখের জিনা প্রথম নৈতিক দূষণ। নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রভাব পড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও। তাই পবিত্র সন্তান চাইলে প্রথমে মায়ের গর্ভই পবিত্র হওয়া জরুরি।


৭. পবিত্র স্তনদুগ্ধে সন্তান বেড়ে ওঠে—কিন্তু সে স্তন যদি চক্ষুর জিনায় অপবিত্র হয়, তবে কি সন্তান পবিত্র থাকতে পারে?

যে অঙ্গ সন্তানের পুষ্টি ও বিকাশের উৎস, তা যদি মানুষের কুদৃষ্টি দ্বারা অপবিত্র হয়—সন্তানের চরিত্র, মানসিকতা ও নৈতিকতা তাতে প্রভাবিত না হবে কেন?


৮. আপনার কারণে পবিত্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপবিত্র হলে এবং সমাজে চোর, বাটপার, জেনাখোর জন্ম নিলে—আপনি কি দায়মুক্ত?

প্রতিটি চরিত্রহীন মানুষের পিছনে একটি নৈতিকভাবে ভেঙে পড়া পরিবার থাকে। মা নিজেকে রক্ষা না করলে, সন্তানও চরিত্রের দিক থেকে দুর্বল হয়ে যায়।


৯. আপনার গর্ভে জন্ম নেয়া অপবিত্র চরিত্রের সন্তান যদি পরবর্তীতে আরেকজন নারীকে ধর্ষণ করে—আপনার কি অপরাধবোধ হয় না?

সমাজে যে অপরাধ জন্ম নেয়, তা কেবল আইনের ব্যর্থতা নয়—বরং নৈতিক অবক্ষয়ের ফসল। আর নৈতিকতা শুরু হয় মা থেকে।


১০. যেসব পবিত্র অঙ্গ থেকে নবী-রাসূল, মনীষী, মহান ব্যক্তিত্ব জন্ম নেন—সেগুলোকে কেন অকারণে প্রকাশ করে অপবিত্র করছেন?

এ অঙ্গগুলোর পবিত্রতা রক্ষাই মানবিক মর্যাদার দাবি। পরপুরুষের দৃষ্টি এগুলোকে অপবিত্র করে—এটা ভাবলেও লজ্জা জাগার কথা।


১১. কেন আপনার সম্মানিত শরীরটিকে অপবিত্র হতে দিচ্ছেন?

আপনার দেহ পবিত্র। আপনি পবিত্র। আপনার মর্যাদা অমূল্য। বেপর্দা হওয়া মানে সেই মর্যাদাকে নিজেই ক্ষুণ্ন করা।


**১২. মনে রাখুন—বদনজর লাগা লাউ, কুমড়া বা ফল যেমন অকার্যকর হয়ে যায়, তার বীজ থেকেও আর চারাগাছ জন্মায় না—

তেমনি চক্ষুর জিনায় আক্রান্ত মা-বোনদের গর্ভেও সুস্থ ও নেক সন্তান জন্ম নেওয়া কঠিন।**
পবিত্রতা শুধু শারীরিক নয়—এটি মানসিক, নৈতিক ও আত্মিক বিষয়। একজন মা যত পবিত্র, তাঁর সন্তানও তত নেককার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।


সম্মানিত মা-বোনেরা,

আপনারা আপনার মর্যাদা উপলব্ধি করুন।
আপনারা নিজেকে রক্ষা করলে—আপনার পরিবার, সমাজ, জাতি রক্ষা পাবে।
আপনারা পর্দা করলে—আপনারা সম্মান পাবেন, নিরাপত্তা পাবেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পবিত্র ও নৈতিক পথে বড় হবে।

নিজেকে পবিত্র রাখুন—জাতিকে পবিত্র উপহার দিন।

রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, বাস-ট্রেন—সকল স্থানে পর্দা করুন।
আপনার পর্দা আপনার মর্যাদা, আপনার সম্মান, আপনার নিরাপত্তা, আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ।

ডা. বশির আহাম্মদ

রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫

মুসলমানদের মাঝে বিভেদ তৈরীর নীল নকশায় মুসলমানরাই জড়িত



মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরির নীল নকশা: একটি পরিকল্পিত চক্রান্ত

মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি আজ নতুন কিছু নয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো—এই বিভক্তির নীল নকশা বাস্তবায়নে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মুসলমানরাই অনেক সময় ভূমিকা রাখছে। দীপা মনি নামের একজনের লেখায় যে চিত্র পাওয়া যায়—তা ইহুদি রাব্বিদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও তার সুস্পষ্ট সফলতার দৃষ্টান্ত।


ইহুদিদের সুদীর্ঘ প্রস্তুতি

আরব উপদ্বীপে ইহুদিরা আরবদের চাইতেও ভালোভাবে আরবি জানে। কারণ তাদের শিশুরা শৈশব থেকেই বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়।
ইহুদিদের রয়েছে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার বিশাল আন্তর্জাতিক গবেষণাভিত্তিক অর্গানাইজেশন। সেখানে ধর্ম, মানবমনের আচরণ, মনস্তত্ত্বসহ প্রচুর গবেষণা জমা আছে।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা—সব জায়গায় তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক মুসলিম জাতিকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি দেশে তাদের সক্রিয় তৎপরতা চোখে না পড়লেও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।


তাদের কৌশল—অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর

ইহুদিদের কার্যক্রম আপনি সহজে ধরতে পারবেন না।
বাংলাদেশে কোনো পীর জনপ্রিয় হলে তারা প্রথমে মুসলিম পরিচয়ে মুরিদ হিসেবে যুক্ত হয়।

তারপর পীর সাহেবকে উৎসাহ দিয়ে বলে:
“হুজুর, আপনি বড় পীর। আপনার সুনাম সর্বত্র। এ খানকা বড় করে না তুললে ভবিষ্যতের ওরশ আয়োজন কঠিন হবে। আমরা আপনার জন্য ১০ কোটি টাকা জোগাড় করেছি। খানকা তৈরিতে ব্যবহার করুন।”

এভাবে পীরের মনে অহংকার ঢোকায়।
তারপর আরাম–আয়েশে অভ্যস্ত করে তার হৃদয়ে প্রবেশ করে তাকে ধীরে ধীরে ভুল পথে টেনে নেয়। সাধারণ মুরিদরা বুঝতেই পারে না যে তাদের পীরকে নীরবে ছিন্নভিন্ন করা হচ্ছে।


আহলে হাদিসের কাছে আরেক রূপ

এবার তারা যায় আহলে হাদিসদের কাছে। অত্যন্ত দরদী হয়ে বলে:
“আপনারাই সঠিক পথে আছেন। কিন্তু আপনারা প্রচার করছেন খুব কম। আমাদের মন কেঁদে ওঠে। নিন ২ কোটি টাকা—এই বইগুলো ছাপিয়ে প্রচার করুন।”

আহলে হাদিসও খুশি হয়—কারণ তারা স্বেচ্ছায় দীন প্রচারে নিজেদের সর্বস্ব ব্যয় করতে প্রস্তুত। কিন্তু এই সুযোগেই ইহুদিরা তাদের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রাখে—এবং বিশ্বব্যাপী সফল হয়।


পরবর্তী টার্গেট—কওমী উলামা

এরপর তারা কওমীদের কাছে গিয়ে আবার অন্য কথা বলে:
“জামাতীদের আকিদা বিপজ্জনক। এখনই তাদের বিরুদ্ধে ওয়াজ, মাহফিল, বই–কিতাব রচনা না করলে আপনারাই একসময় বিলুপ্ত হবেন। নিন ১ কোটি টাকা, নিন তথ্য—বই আকারে ছাপিয়ে দিন।”

সেখানে আবার তারা সফল হয়।
সব কাজ তারা সর্বোচ্চ খাঁটি মুসলিম সেজে করে।


জামায়াতিদের ক্ষেত্রে আরেক কৌশল

জামায়াতের কাছে গিয়ে বলে:
“প্রচলিত ধারায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। গণতন্ত্র চর্চা করুন। অমুসলিম শাখা খুলুন। বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা বাড়ান। ক্ষমতায় গিয়ে সব ঠিক করবেন। এখন শরীয়তে কিছু ছাড় দিন—মক্কী যুগেও তো এমন হয়েছিল।”

জামায়াতও খুশি হয়ে এইসব পথে হাঁটে—ফলে পূজায় যাওয়া, অমুসলিম শাখা খোলা—সবই স্বাভাবিক হয়ে যায়।


সর্বোচ্চ সফলতা—সালাফি গ্রুপে অনুপ্রবেশ

ইহুদিরা সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছে সালাফিদের ক্ষেত্রে।
কারণ এখানে তারা ছোটকাল থেকেই মুসলিম পরিচয়ে মাদরাসায় পড়ে, মুসলিম ডিগ্রি নেয়, মুসলিম আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এরপর বিভিন্ন মাসআলা ও ফিকহী মতবিরোধে এমন গোলকধাঁধা তৈরি করে—যা আজ বিশাল বিশ্বকোষের মতো জটিল।

আপনি বড় মুহাদ্দিস হলেও তাদের सामने কঠিন হয়ে যায়।
তাদের জ্ঞানে, তীক্ষ্ণতায়, প্রস্তুতিতে তারা ভয়ঙ্কর।

এ খাইবারের ফিতনা কিয়ামতের আগে মুসলিম উম্মাহকে গভীর সংকটে ফেলবে।


মিশরের উদাহরণ—ইয়াসির বুরহামি

মিশরের এক সালাফি আলেম ইয়াসির বুরহামি—জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।
কিন্তু তিনিই নির্বাচিত মুসলিম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিসির হাতে শক্তি জুগিয়েছিলেন।
তার পক্ষে ২৫ শতাংশ ভোটও পড়েছিল।

আজ সেই মোল্লা ফতোয়া দিচ্ছেন—
“ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জায়েজ নয়। কারণ চুক্তি আছে।”

এটাই প্রমাণ করে—দাড়ি বা কপালের দাগ দেখে কাউকে সমর্থন করার প্রয়োজন নেই।
মনন, কর্ম ও নীতি দিয়ে বিচার করতে হয়।


ইতিহাসেও এমন হয়েছিল

ঠিক এ রকম ভূমিকা পালন করেছিলেন কিছু লোক—
যেমন হোসাইন মাদানী–ও, ফরিদ উদ্দিন মাসুদের মতো কিছু আলেম, যারা শেখ হাসিনার সাথে যুক্ত ছিলেন—আজ পালিয়ে আছেন।
কফিলউদ্দিন, রুহুল আমিন—এধরনের হাজারো মানুষ দেশের ভেতরে সক্রিয়।

মুসলমানদের পতন শেষ পর্যন্ত মুসলমানরাই ডেকে আনবে—ফিতনার মধ্য দিয়ে।
এবং সেই সময় খুব কাছে।


শেষ কথা

| মুসলমানদের বিভেদ আজ কাকতালীয় নয়—এটি সুস্পষ্ট নীল নকশা।
| মুসলমানদের সরলতা, আবেগ, বিভক্তি—সবকিছু কাজে লাগাচ্ছে ইহুদি কৌশল।
| আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি—এটাই মর্মান্তিক।


ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

  মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এ...