4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: “মানুষ নয়, মাটি চাই”: পাহাড় ইস্যুতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডা ও বাস্তবতার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

“মানুষ নয়, মাটি চাই”: পাহাড় ইস্যুতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডা ও বাস্তবতার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ


 


পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি সংবেদনশীল, কৌশলগত ও বহুজাতিক অঞ্চল। এই অঞ্চলকে ঘিরে আবেগ, ইতিহাস ও রাজনীতির জটিলতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু লেখালেখিতে এমন একটি প্রবণতা স্পষ্ট—যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাষা, ব্যঙ্গ, বিদ্বেষ ও অর্ধসত্য ব্যবহার করে রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী এবং সাবেক রাষ্ট্রনায়কদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা নির্মাণ করা হচ্ছে। আলোচ্য লেখাটি ঠিক সেই ধরনের একটি উদাহরণ, যেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগ, যুক্তির চেয়ে গালি এবং বিশ্লেষণের চেয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

প্রথমেই বলা প্রয়োজন, কোনো অঞ্চলের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা, সমালোচনা করা বা সমাধান চাওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই আলোচনার নামে যদি ইতিহাস বিকৃতি, ব্যক্তি আক্রমণ ও পুরো একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে “দখলদার চক্র” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তা আর মতপ্রকাশ থাকে না—তা পরিণত হয় মিথ্যা প্রপাগান্ডায়।

১. ‘মানুষ নয়, মাটি চাই’—স্লোগান নাকি বিকৃত উপস্থাপন?

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে যে জিয়াউর রহমান ও এরশাদ “মানুষ নয়, মাটি চাই” নীতিতে পাহাড় ধ্বংস করেছেন। বাস্তবতা হলো, এই বাক্যটি কোনো সরকারি নথি, রাষ্ট্রীয় নীতি বা ঐতিহাসিক ঘোষণার অংশ নয়। এটি একটি রাজনৈতিকভাবে নির্মিত বাক্য, যা পরবর্তীতে কিছু গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করেছে।

১৯৭৫–১৯৯০ সময়কালে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা ছিল, তা মূলত ছিল—

  • বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন

  • সীমান্ত নিরাপত্তা

  • রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণহীনতা

  • উন্নয়ন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র যে ভূমিকা নিয়েছে, তা ছিল সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার অংশ, জমি দখলের কোনো ঘোষিত নীতি নয়। ভুল, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকতে পারে—কিন্তু সেগুলোকে “মাটি দখলের থিওরি” বানানো ইতিহাসের সরলীকরণ ও বিকৃতি।

২. অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও আমলাদের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত চরিত্রহনন

লেখাটির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি একটি পুরো পেশাজীবী শ্রেণিকে ব্যঙ্গ, তাচ্ছিল্য ও সন্দেহের চোখে উপস্থাপন করেছে। “জুতো পালিশ করা”, “ফাইল টানা”, “বুড়ো বাপেরা”—এ ধরনের শব্দ কোনো যুক্তি নয়, বরং চরিত্রহননের কৌশল

বাস্তবতা হলো—

  • অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও আমলাদের বিশাল অংশ সৎভাবে জীবনযাপন করেন

  • কেউ কেউ পাহাড়ে চাকরি করেছেন, কেউ করেননি

  • কেউ অবৈধভাবে জমি দখল করলে তা অপরাধ, কিন্তু ব্যক্তির অপরাধ দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানকে দোষী করা ন্যায্য নয়

যদি কোথাও অবৈধ জমি দখল হয়ে থাকে, তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে—গালাগালি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে নয়।

৩. “সব দাবি বিচ্ছিন্নতাবাদ”—এই বক্তব্য কে দিল?

লেখাটিতে বলা হয়েছে, পাহাড়িদের সব দাবি রাষ্ট্র ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ হিসেবে দেখে। এটি একটি চরম মিথ্যা সাধারণীকরণ। বাস্তবে—

  • পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়েছে

  • আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছে

  • বিশেষ আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো চালু আছে

  • পাহাড়িদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংবিধানিকভাবে স্বীকৃত

হ্যাঁ, সব সমস্যা সমাধান হয়নি। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্র পাহাড়িদের সব দাবিকে বিদ্বেষের চোখে দেখে—এটি একটি রাজনৈতিক বয়ান, বাস্তব তথ্য নয়।

৪. “পাহাড়ে সেনা থাকলেই অবৈধ ব্যবসা সহজ”—যুক্তির অসংগতি

এই দাবি যুক্তিগতভাবে দুর্বল ও আত্মবিরোধী। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে—

  • যেখানে রাষ্ট্রীয় নজরদারি কম, সেখানেই চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা বাড়ে

  • পাহাড়ে সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি না থাকলে সশস্ত্র গ্রুপ ও অপরাধচক্রই শক্তিশালী হয়

অতএব সেনা উপস্থিতিকে সরাসরি “ব্যবসায়িক স্বার্থ” হিসেবে চিহ্নিত করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপব্যাখ্যা।

৫. জমি দখলের অভিযোগ: প্রমাণ বনাম গল্প

লেখাটিতে কিছু ব্যক্তির নাম, গুজব ও “শোনা যায়” টাইপ বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু কোথায়—

  • আদালতের রায়?

  • তদন্ত প্রতিবেদন?

  • দালিলিক প্রমাণ?

একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুতে দায়িত্বহীন অভিযোগ ছড়ানো সমাজকে উত্তপ্ত করে, সমাধান নয়।

৬. পাহাড় বনাম সমতল—ভুল তুলনা

“পাহাড়িরা সমতলে জমি কিনতে পারলে বাঙালিরা পাহাড়ে কেন পারবে না”—এই বিতর্কটি জটিল আইন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িত। এটি শিশুসুলভ খেলনার উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

পাহাড়ের জমি—

  • প্রথাগত মালিকানার আওতায়

  • পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল

  • আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত

এই বাস্তবতা অস্বীকার করে সরল তুলনা টানা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের কৌশল।

৭. আগুনের ভাষা, সমাধানের নয়

সবশেষে, লেখাটি যে ভাষা ব্যবহার করেছে—তা সংঘাত উসকে দেয়, সমাধান নয়। রাষ্ট্রকে “শুনছেন তো?” বলে হুমকির সুরে কথা বলা দায়িত্বশীল নাগরিকতার পরিচয় নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা—

  • রাজনৈতিক

  • সামাজিক

  • ঐতিহাসিক

এর সমাধান হবে সংলাপ, আইন ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে—বিদ্বেষ, ব্যঙ্গ ও মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাধ্যমে নয়।


উপসংহার

আলোচ্য লেখাটি পাহাড়িদের অধিকার রক্ষার চেয়ে বেশি করে একটি রাষ্ট্রবিরোধী, প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও বিভাজনমূলক বয়ান নির্মাণে আগ্রহী। এতে সত্যের চেয়ে আবেগ, প্রমাণের চেয়ে অভিযোগ এবং সমাধানের চেয়ে সংঘাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান প্রয়োজন—কিন্তু তা হবে ইতিহাস বিকৃতি, ব্যক্তিহেনস্থা ও মিথ্যা থিওরি দিয়ে নয়। বরং প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠ আলোচনা, দায়িত্বশীল ভাষা ও জাতীয় ঐক্যের দৃষ্টিভঙ্গি।

মিথ্যা প্রপাগান্ডা পাহাড় বাঁচায় না—বরং আগুন ছড়ায়।
আর আগুনে শেষ পর্যন্ত সবাই পুড়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

  মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এ...