মুসলিমদের মতভিন্নতার মাঝেও সম্প্রীতি রক্ষা : সুন্নাহসম্মত পথ
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যার মূল ভিত্তি তাওহীদ, সুন্নাহর অনুসরণ এবং মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক ঐক্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনা স্পষ্ট—ঐক্য রক্ষা করা ফরয, আর সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে মেনে চলা ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। তাই এ দুই বিষয়ের মধ্যে কোনো বিরোধের অবকাশ নেই; বরং তারা একে অপরকে সমর্থন করে।
উম্মাহর বিভেদ কেন তৈরি হয়?
আজকের বাস্তবতায় দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, হাদীস-সুন্নাহর অনুসরণকে কেন্দ্র করে অযথা দ্বন্দ্ব-বিবাদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেকেই ফিকহী মাযহাবকে বিভেদের মূল মনে করেন, অথচ এগুলোই কুরআন-সুন্নাহর দলিলভিত্তিক ব্যাখ্যা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাওয়ারুছের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
মূল সমস্যা হলো—
সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা,
উম্মাহর ঐক্যের নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা,
আর শাখাগত মতভেদের সাথে মৌলিক আকীদার ভেদাভেদ গুলিয়ে ফেলা।
ঐক্যের ভিত্তি : তাওহীদ
কোরআনে বহু আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে উম্মাহ মূলত এক উম্মাহ—তাওহীদের উম্মাহ। বিভেদ সৃষ্টি হয় তখনই, যখন কেউ মৌলিক আকীদা ও সুস্পষ্ট বিধানকে বদলে বা অস্বীকার করে আলাদা পথ তৈরি করে। শাখাগত ইখতিলাফ এর অন্তর্ভুক্ত নয়; কারণ নবীগণের মধ্যেও কিছু আমলী ভিন্নতা ছিল, কিন্তু তাঁদের দ্বীন ছিল এক।
সুন্নাহ অনুসরণ ও ঐক্য—দুটোই অবিচ্ছেদ্য
সুন্নাহর অনুসরণ মানে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশিত পথ গ্রহণ করা। আর উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা মানে সেই পথে সম্মিলিত থাকা। তাই সুন্নাহর অনুসরণের অজুহাতে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা বা ঐক্যের নামে সুন্নাহ ত্যাগ করা কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।
মতভেদ নয়, বিভেদ হারাম
আল-কুরআন স্পষ্ট ঘোষণা দেয়—
‘হাবলুল্লাহ’ অর্থাৎ কুরআন ও তাওহীদকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে।
পরস্পর কলহ-বিবাদ সমাজকে দুর্বল করে, প্রভাব বিলুপ্ত করে।
মুমিনের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তাকওয়ার মাধ্যমে—গোত্র, ভাষা, অঞ্চল, মাযহাব বা দলীয় পরিচয়ে নয়।
সুতরাং হানাফী, শাফেয়ী, সালাফী, মাদানী, নদভী, দেওবন্দী বা অন্য যে কোনো পরিচিতি—এগুলো পরিচয়ের জন্য গ্রহণযোগ্য; কিন্তু এগুলোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা, ঈমানী ভ্রাতৃত্বকে উপেক্ষা করা বা বিরোধ তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম।
ঈমানী ভাইচারা : ইসলামের অপরিহার্য নীতি
মুমিন-মুমিন ভাই—এ নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কুরআন যেসব আদেশ দিয়েছে তা হলো—
কাউকে উপহাস না করা,
অপবাদ, কটুক্তি ও গীবত থেকে বিরত থাকা,
কুধারণা ও গুপ্তচরবৃত্তি না করা,
প্রতিপক্ষকে অপমান না করা।
দুঃখজনকভাবে আজকের দ্বীনি মতভেদে এসব ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়, যেন প্রতিপক্ষের ইজ্জত নষ্ট করাই দ্বীনের কাজ! অথচ এসব আচরণে একজন মানুষ ফাসিক হয়ে যায়, যা একজন দ্বীনদারের জন্য ভয়ংকর অপমান।
ইসলামের ঘোষিত দুটি দল
কোরআন বলে—
হিযবুল্লাহ : যারা ঈমান, সুন্নাহ ও মুসলিম ভাইচারা রক্ষা করে।
হিযবুশ শয়তান : যারা বিভেদ সৃষ্টি করে, কুফর-শিরকের সাথে বন্ধুত্ব রাখে।
মুয়ালাত (বন্ধুত্ব) ও বারাআত (আলাদা হওয়া)—এই নীতি স্পষ্ট করে যে ঐক্যের ভিত্তি শুধু ঈমান। তাওহীদ অক্ষুণ্ণ রেখে একতা বজায় রাখা ফরয; কিন্তু তাওহীদ বিসর্জন দিয়ে কোনো ঐক্য গ্রহণযোগ্য নয়।
উপসংহার
সুন্নাহর অনুসরণ ও উম্মাহর ঐক্য—দুটি ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ।
মতভিন্নতা থাকবে, কারণ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু বিভেদ, দলবাজি, অহংকার, উপহাস, কটূক্তি ও বিদ্বেষ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান দান করুন, সত্যকে গ্রহণ করার তাওফীক দিন, আর উম্মাহর মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করুন। আমীন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ