জামায়াতে ইসলামী: অন্তর্দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিংয়ের বাস্তব চিত্র
জামায়াত তার নিজের ভিতরে হাঁচিনার মতো এককেন্দ্রিক, স্যাডিস্ট, ঘোয়ার, ডিক্টেটর, মোনাফিক এবং স্বজনপ্রিয় গ্রুপিং মানসিকতার একটি হিংস্র প্রকৃতির দল।
এর পূর্বে আমি আমার অনেক পোস্টে জামায়াতের ভিতরের চিত্র তুলে ধরেছিলাম। তখন অনেকেই বক্রচোখে হেসে বলেছিলেন, “একটা মেয়ের কি জানা সম্ভব?” তারা আমার আর্টিকেলের ২%ও বিশ্বাস করেনি। কিন্তু বাস্তব চিত্র আজ সেই কথাকেই প্রমাণ করছে।
বিশিষ্ট ইউটিউবার সোলায়মান সাহেব চট্টগ্রামের গ্রুপিং নিয়ে একটি ভিডিও আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনেকেই অস্বীকার করতে পারবেন না। কিন্তু আমি যখন একই কথা বলি, তখন আমাকে অবজ্ঞাপূর্ণভাবে “ডেডার মেয়ে” বলা হয়। এটি স্যাডিস্ট মানসিকতার কিছু মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
১৪ জুন ২০২৫: মহানগর আমীর পদ থেকে পদচ্যুতি
১৪ জুন ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের একটি “বিশেষ দায়িত্বশীল সমাবেশ” শেষে কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি-জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের অনুমোদনে শাহজাহান চৌধুরীকে মহানগর আমীর পদ থেকে সরানো হয়। নায়েবে আমীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
পদচ্যুতির পেছনে কিছু বিতর্কিত ঘটনা প্রভাবিত করেছে, যেমন:
জামালখান এলাকা থেকে বাম ছাত্র সংগঠনের মিছিলে হামলা, যেখানে এক নারী জামায়াত কর্মীর প্রতি হামলা হয়।
জামেয়া আহম্মাদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা এবং আহলে সুন্নাত জামাতের অনুসারীদের নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য ও ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও বার্তা।
বির্জা খালের সংস্কার নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি।
বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং কিছু ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ তৈরি।
পদচ্যুতির পর দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ বলেন, এটি কেন্দ্রীয় নেতাদের অসন্তুষ্টির ফল, আবার কেউ বলেন জনপ্রিয়তার কারণে স্থানীয়ভাবে চাপ তৈরি হয়েছিল।
দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ দাবি করেছেন, এটি “স্বাভাবিক” পদোন্নতির অংশ এবং শাহজাহান চৌধুরীকে বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এবং ‘জনশক্তি’ হিসেবে নিয়োজিত।
গ্রুপিং এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং বহুদিন ধরেই বিদ্যমান। কেন্দ্রে এবং মহানগরে কিছু নেতা চাননি, শাহজাহান মহানগর আমীর হোক। তাকে ভোট না দেওয়ার প্রচারও করা হয়েছিল। তবে অধিকাংশ রুকন তাকে ভোট দিয়ে জয় নিশ্চিত করে।
শাহজাহান চৌধুরীকে ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন সেক্টর থেকে সুবিধা নিচ্ছিলেন। অন্যদিকে, বিরোধী পক্ষ বিভিন্ন কমিটিতে নিজের পছন্দের লোক বসিয়ে অবস্থান শক্ত করছে। এদের মধ্যে এক সংসদ প্রার্থীর দুবাইয়ে ৬টি দোকানসহ চট্টগ্রামে ৩টি ব্যবসা রয়েছে। আমার ইনবক্সে ১৩ নেতার বিরুদ্ধে ৮৪টি রিপোর্ট জমা আছে।
শাহজাহান চৌধুরীর পদক্ষেপ, যেমন মিডিয়া ফ্রেন্ডলি হওয়া, জনপ্রিয়তা অর্জন এবং স্বাধীন ভিডিও বার্তা, অনেকের মধ্যে ঈর্ষা ও আপত্তি সৃষ্টি করেছে।জনপ্রিয় পদক্ষেপ বনাম কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা
শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রামে কিছু জনপ্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেমন:
জনসাধারণের সঙ্গে ভিডিও বার্তা এবং সরাসরি গণসংযোগ।
স্থানীয় ইস্যুতে সরব হওয়া, যেমন খাল সংস্কার, জামেয়া ইস্যু।
তবে কেন্দ্রীয় পক্ষ এটিকে “স্বায়ত্তশাসন ও শৃঙ্খলা উপেক্ষা” হিসেবে দেখেছে। পদচ্যুতির পেছনে শুধুই সাংগঠনিক কারণ নয়, বরং রাজনৈতিক ভারসাম্য, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং সামলানোই মূল উদ্দেশ্য ছিল।
দুই প্রধান গোষ্ঠী
চট্টগ্রাম মহানগর শাখায় দুই প্রধান গোষ্ঠী বিদ্যমান।
কেন্দ্রীয় অনুগত গ্রুপ: নায়েবে আমীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ, কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
দ্বিতীয় গ্রুপ: শাহজাহান চৌধুরীর নেতৃত্বে স্থানীয় ভিত্তিতে জনসমর্থন বৃদ্ধি।
দুই গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং শাসন কাঠামোর মধ্যে সংঘাত চলমান।
অর্থ, কমিটি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলেজ ও মেডিকেল কলেজগুলো দলের অর্থ সংগ্রহে ব্যবহার।
দলীয় কমিটি ও কার্যক্রমে ২য় গ্রুপের প্রভাব।
৪১টি ওয়ার্ড ও ১৬টি থানার কমিটি কার্যকর, যেখানে প্রশিক্ষণ কর্মশালা, রুকন সম্মেলন, “দাওয়াতি সপ্তাহ” পরিচালিত।
২১টি পেশাজীবী সংগঠনের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম।
মামলার সংখ্যা এবং রাজনৈতিক চাপ
গত ১৬ বছরে চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে ~১,৪০০টি মামলা দায়ের। শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৮৫–৮৭টি মামলা।
শাহজাহান চৌধুরীর জনপ্রিয়তা ও স্বায়ত্তশাসনের উদ্যোগ বনাম কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রণ পন্থার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে।
পদচ্যুতির মূল কারণ
শাহজাহান চৌধুরীকে পদ থেকে সরানোর পেছনে:
সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা।
আইনি জটিলতা এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ভঙ্গ।
জনপ্রিয়তা ও একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
দ্বিতীয় পক্ষের পছন্দের লোকদের বিভিন্ন পদে বসানোয় বাধা।
দলীয় ইউনিট থেকে ২য় পক্ষের ৭০% পদ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ।
শাহজাহান চৌধুরীকে সরিয়ে দিয়ে জামায়াত স্বীকার করেছে যে, দলের ভিতরে এখনও চাঁদাবাজ, ডাকাত এবং বিভিন্ন স্তরের মোনাফিক বিদ্যমান।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ