পাহাড়ে উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ: ইয়েন ইয়েনের বিরুদ্ধে নতুন বিতর্ক
পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল অঞ্চল—যেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু বছর ধরে সহাবস্থান বজায় রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার পেছনে কিছু ব্যক্তি ও গ্রুপের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েন ইয়েনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে—যে তিনি বিদেশ থেকে বসে বিভিন্ন উসকানিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি, সেনাবাহিনীবিরোধী প্রচার এবং বাঙালি বিরোধী মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলেও এ ধরনের অভিযোগের ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানা যায়।
ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট
ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের প্রথম স্ত্রী মৃত্যুবরণ করার পর ২০১৪ সালের ৪ জুলাই ইয়েন ইয়েনকে বিয়ে করেন। রাখাইন বংশোদ্ভূত ইয়েন ইয়েনের বাড়ি বান্দরবানের উজানিপাড়া ও ঢাকার শেওরাপাড়ায়। তিনি আগে ‘পিস’ নামে একটি এনজিওর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে—বিয়ের পর থেকেই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন, সেনা প্রত্যাহার ও উপজাতিদের বিশেষ স্বীকৃতির দাবিতে আগ্রাসী ভূমিকা নিতে শুরু করেন।
‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি ইস্যুতে বিতর্ক
ইয়েন ইয়েন দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীকে “আদিবাসী” হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি তুলে আসছেন। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান, সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তির ভাষায় তাদের “উপজাতি / ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়ে একতরফা প্রচারণা স্থানীয় জনগণের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির অভিযোগ
পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত যেকোনো নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনায় ইয়েন ইয়েন দ্রুত বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বক্তব্য তদন্তের ফলাফলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে সত্য উদঘাটন ব্যাহত হয় এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ে—যা সামাজিক শান্তি ও সহাবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকানির অভিযোগ
বিভিন্ন সামাজিক, প্রশাসনিক বা স্থানীয় ইস্যুকে তিনি সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলকভাবে উপস্থাপন করেন—যার ফলে ছোট ইস্যুও বড় সংঘাতে রূপ নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফেসবুকে তার পোস্টগুলো অনেক সময় ইউপিডিএফ (মূল) ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রচারধারার সাথে মিল পাওয়া যায় বলে গোয়েন্দা তথ্যসূত্র দাবি করে।
ধর্মীয় ইস্যুকে উত্তেজনা সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার
ধর্মীয় সংবেদনশীলতা কাজে লাগিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে বিভাজন তৈরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অতীতের কিছু বিতর্কিত ঘটনা
২০১৮ সালের বিলাইছড়ির মারমা কিশোরী ঘটনার সময় ইয়েন ইয়েনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তিনি হাসপাতালে গিয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে; পরবর্তীতে উক্ত ধর্ষণের ঘটনা অসত্য প্রমাণিত হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিযোগ তোলা
ইয়েন ইয়েন আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। সেনা প্রত্যাহার, স্বায়ত্তশাসন দাবি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ—এসব ইস্যু বিদেশি সংগঠনগুলোর কাছে প্রভাবিতভাবে উপস্থাপন করেন বলে জানা যায়। যদিও ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে “গ্লোবাল চ্যাম্পিয়ন অব অ্যাডভোকেসি” পুরস্কার দেয়—যা নিয়েও দেশে বিতর্ক তৈরি হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতামত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন—পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কথা বলার সময় দায়িত্বশীলতা জরুরি। যাচাই ছাড়া একপেশে অভিযোগ তোলা দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে।
রাষ্ট্রীয় অবস্থান
রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মহল বলছে—সমালোচনা বা ভিন্নমত অবশ্যই থাকতে পারে, তবে তা যেন বিদেশি মহলে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণায় রূপ না নেয়। তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও আইনি কাঠামোর প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি।
ইয়েন ইয়েনের কাছে মন্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ