।অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চিঠিতে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন: কেএনএফ-এর সন্ত্রাসবাদের বাস্তব চিত্রের অনুপস্থিতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের বম জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আটক প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক চিঠি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, তিনজন শিশুসহ ৫৯ জন বম সদস্যকে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছে। এই আটককে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনার পর নির্বিচার গ্রেফতারের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, যথাযথ প্রমাণ থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফৌজদারি অপরাধে মামলা দিতে হবে, নতুবা তাদের মুক্তি দিতে হবে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মোট ১৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮০ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছে এবং তিনজন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাবে হেফাজতে মারা গেছে।
এই অভিযোগগুলো একটি একপাক্ষিক ও খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরে, যা বাস্তব ঘটনা ও সরকারের নিরাপত্তামূলক প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে। এই লেখায় অ্যামনেস্টির চিঠির বিভ্রান্তিকর ও অসত্য অংশগুলো বিশ্লেষণ করা হবে, যেখানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্য এবং স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে দেখানো হবে—এ ধরনের প্রতিবেদন কীভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী কেএনএফ-কে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করতে পারে।
প্রথমেই কেএনএফ-এর প্রকৃতি স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন, যা ২০২২ সালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে। তারা ‘কুকিল্যান্ড’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে এবং সেই দাবির পক্ষে মানচিত্র, লোগো, মুদ্রা ও সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ভিডিও প্রচার করে। এই গোষ্ঠীটি বান্দরবান জেলার রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় সক্রিয়। সংগঠনটির সভাপতি নাথান বম, যিনি রুমা উপজেলার ইডেনপাড়ার বাসিন্দা। ২০২২ সালের অক্টোবরে যৌথবাহিনী কেএনএফ-এর জঙ্গি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অভিযোগে অভিযান শুরু করলে নাথান বম পালিয়ে যায়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সে ভারতের মিজোরাম অথবা মিয়ানমারের চিন জনগোষ্ঠীর এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে। কেএনএফ শুধু একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনই নয়, তারা সশস্ত্র অপরাধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত। অথচ অ্যামনেস্টির চিঠিতে তাদের ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী’ হিসেবে হালকাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদী চরিত্রটি স্পষ্ট করা হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগও ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত কেএনএফ-এর সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া চলেছে। কিন্তু আলোচনা ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের ২ ও ৩ এপ্রিল কেএনএফ বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতি চালায়। তারা ব্যাংকের অর্থ লুটের চেষ্টা করে, ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে মসজিদে নামাজরত অবস্থায় অপহরণ করে এবং পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ১৪টি অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনাগুলো নিছক অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর নিরাপত্তা অভিযান শুরু করে, যাকে অ্যামনেস্টির চিঠিতে ‘চলমান সামরিক অভিযান’ বলা হয়েছে। তবে বিভ্রান্তিকর দিক হলো—এই অভিযানের ফলকে ‘নির্বিচার গ্রেফতার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে নিরাপত্তা বাহিনী স্থানীয় তথ্য ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করেই গ্রেফতার করেছে। কেএনএফ সদস্যরা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকায় শনাক্তকরণ জটিল ছিল, তবুও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৪২ জন গ্রেফতার হলেও বর্তমানে ৫৯ জন আটক রয়েছেন। কিন্তু এতে উপেক্ষিত হয়েছে যে, যাচাই শেষে বহু ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বা জামিনে ছাড়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, মূলত ব্যাংক ডাকাতিতে জড়িত কেএনএফ সদস্য, তাদের সহায়তাকারী ও আশ্রয়দাতাদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে মুক্তি দেওয়াই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ (স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টের ১৫ ধারা), ডাকাতি ও অপহরণের অভিযোগ আনা হলেও ‘ডাকাতির ঘটনায় কাউকে যুক্ত করার মতো তথ্য ব্যবহার করা হয়নি’। এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গোয়েন্দা তথ্য, সাক্ষ্য ও আলামতের ভিত্তিতেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত চলমান। প্রমাণ না থাকলে ৮০ জন জামিন পেত না। হেফাজতে তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগজনক, তবে এটিকে সামগ্রিকভাবে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব’ বলে চিহ্নিত করা অতিরঞ্জিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা বয়স্ক ছিলেন এবং চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো অবহেলা থেকে থাকে, তা তদন্তসাপেক্ষ, কিন্তু সেটিকে পুরো প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দাঁড় করানো যুক্তিসংগত নয়।
চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে আদিবাসী বম জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা বর্ণবৈষম্যের শামিল। এই বক্তব্যও বিভ্রান্তিকর। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। বম জনগোষ্ঠী একটি উপজাতি গোষ্ঠী, কিন্তু কেএনএফ তাদের পরিচয় ব্যবহার করে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সরকারের অভিযান কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে। সাধারণ নাগরিকদের আটক করা হলে আইনগত সহায়তার মাধ্যমে মুক্তি চাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা মৌলিক অধিকার। অ্যামনেস্টির কাছে যে তথ্য পৌঁছেছে, তা সম্ভবত কেএনএফ-সমর্থক মহল থেকে এসেছে, যার প্রতিফলন চিঠিতে দেখা যায়। এ ধরনের প্রতিবেদন সন্ত্রাসবাদকে আড়াল করার পাশাপাশি কেএনএফ-কে আরও শক্তিশালী করে এবং নতুন সহিংসতায় উৎসাহ জোগায়, যা পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি বিনষ্ট করে।
এই চিঠির প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রায়ই স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষা করে একপাক্ষিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মানবাধিকার ধারাগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান অ্যামনেস্টি জানালেও, ১৯৯৭ সালের ওই চুক্তির বহু ধারা সরকার ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। বিপরীতে কেএনএফ-এর মতো গোষ্ঠী চুক্তির মূল চেতনাই অস্বীকার করে। সত্যিকারের মানবাধিকার রক্ষায় আগ্রহী হলে অ্যামনেস্টির উচিত ছিল কেএনএফ-এর ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ ও সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া, যা সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চিঠিটি অসত্য ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে, যা কেএনএফ-এর বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডাকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। সরকারের নিরাপত্তা অভিযান আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে এবং নির্দোষদের মুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত সব পক্ষের তথ্য যাচাই করে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়া। তাতেই পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও সন্ত্রাসবাদ দমন কার্যকরভাবে নিশ্চিত হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ