ভারতে মুসলিম নাগরিক হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা
একটি বিস্তৃত তথ্যভিত্তিক মানবাধিকারমূলক আলোচনা
ভারত রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তা বিশ্বের অন্যতম প্রগতিশীল দলিল হিসেবে স্বীকৃত। ধর্ম, ভাষা, জাতি বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি সেখানে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ক্রমাগত একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—এই সংবিধান কি সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে কার্যকর?
গত এক দশকে ভারতে সংঘটিত মুসলিম নাগরিক হত্যাকাণ্ড ও গণপিটুনির ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এই লেখাটি কোনো একক রাজনৈতিক দল, সরকার বা ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে রচিত নয়। এটি একটি সমষ্টিগত সামাজিক ব্যর্থতার নথি, যেখানে রাষ্ট্র, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং সমাজ—সকলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়।
১. “গণপিটুনি” : রাষ্ট্রের বাইরে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর বিচারব্যবস্থা
গণপিটুনি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত অপরাধ নয়। এটি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে গুজব, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি একসঙ্গে কাজ করে।
যখন একদল মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আইন, আদালত ও তদন্তের প্রয়োজন ছাড়াই “অপরাধী” নির্ধারণ করবে, তখন সেটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
মহম্মদ আখলাখ (২০১৫), পেহেলু খান (২০১৭), আফরাজুল (২০১৭), তাবরেজ আনসারি (২০১৯)—এই নামগুলো কেবল ব্যক্তি পরিচয় নয়; এগুলো গণপিটুনির এক একটি অধ্যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ ছিল গরু, গরুর মাংস, চুরি বা ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে। কিন্তু কোনো অভিযোগই হত্যা বৈধ করতে পারে না—এটি সভ্য সমাজের মৌলিক নীতি।
২. ধারাবাহিকতা ও বিস্তার: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি প্যাটার্ন
আপনার প্রদত্ত তালিকায় ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় জুড়ে ৪০টির বেশি নাম রয়েছে। এই তালিকা দেখলে স্পষ্ট হয়—
- ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়
- একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে
- একই রাজ্যে একাধিকবার একই ধরনের সহিংসতা ঘটেছে
ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি—এই রাজ্যগুলোর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সহিংসতার ধরনে এক ধরনের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এটি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি কোনো একটি প্রশাসনিক ইউনিটের নয়; এটি জাতীয় সামাজিক বাস্তবতা।
৩. ঝাড়খণ্ড ও রাজস্থান: পুনরাবৃত্ত সহিংসতার উদাহরণ
ঝাড়খণ্ডে আলিমুদ্দিন আনসারি, তৌহিদ আনসারি, তাবরেজ আনসারি এবং একই দিনে একাধিক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড (সেখ সাজ্জাদ, হালিম, সিরাজ, নাইম)—এসব ঘটনা দেখায়, কীভাবে একটি রাজ্যে সহিংসতা প্রায় নিয়মে পরিণত হতে পারে।
রাজস্থানে পেহেলু খান ও আফরাজুলের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আফরাজুলকে হত্যার সময় ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়। এটি কেবল হত্যা নয়; এটি ছিল ভয়ের প্রদর্শন। যখন খুনকে “উদযাপনযোগ্য” করে তোলা হয়, তখন সমাজের নৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
৪. দিল্লি ২০২০: রাষ্ট্রের রাজধানীতেই সংখ্যালঘুদের অসুরক্ষা
২০২০ সালের দিল্লি সহিংসতা ভারতের ইতিহাসে একটি লজ্জাজনক অধ্যায়। আকবরি হুসাইন, হামজা, আমিন আলি, বুকরে আলি—এই নামগুলো রাজধানীর বুকে সংঘটিত সহিংসতার সাক্ষ্য। প্রশ্ন ওঠে—যদি দেশের রাজধানীতেই নাগরিকরা নিরাপদ না হন, তবে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
এই ঘটনাগুলো শুধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়; এগুলো প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেও স্পষ্ট করে।
৫. নারী ও শিশু: সহিংসতার নীরবতম শিকার
আসিফা বানুর হত্যাকাণ্ড ভারতের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত। শিশু, নারী এবং সংখ্যালঘু পরিচয়—তিনটি পরিচয়ই এখানে নিপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জান্নাত আরা ও অন্যান্য নারী ভুক্তভোগীদের ঘটনাও দেখায়, সহিংসতা কেবল পুরুষদের লক্ষ্য করে নয়; এটি পুরো সম্প্রদায়কে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার কৌশল।
৬. বিচারব্যবস্থা ও দায়মুক্তি: কেন ন্যায় অধরাই থেকে যায়
এই ঘটনাগুলোর পর সাধারণত যা ঘটে—
- মামলা দায়ের হতে দেরি
- তদন্ত দুর্বল বা পক্ষপাতদুষ্ট
- সাক্ষীদের নিরাপত্তা না থাকা
- দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া
- অভিযুক্তদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়
ফলে বহু পরিবার ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলে। ন্যায়বিচার যখন বিলম্বিত হয়, তখন তা কার্যত ন্যায়বিচার না পাওয়ারই সমান।
৭. গণমাধ্যমের ভূমিকা: নীরবতা ও বিকৃতি
গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এই ঘটনাগুলোকে প্রায়শই “সংঘর্ষ”, “উত্তেজনা” বা “গুজবের ফল” বলে হালকা করে দেখিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয় আড়াল করা হয়েছে, কিন্তু অভিযুক্তদের পরিচয় রক্ষা করা হয়েছে। এতে সামাজিক উপলব্ধি বিকৃত হয়েছে এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সর্বসম্মত প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি।
৮. সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দাবি
এই লেখাটি প্রতিশোধের আহ্বান নয়। এটি ন্যায়, মানবাধিকার ও সংবিধান রক্ষার দাবি। আমাদের স্পষ্ট দাবিগুলো হলো—
১. প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত
২. দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
৩. ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসন
৪. গণপিটুনি বিরোধী কঠোর আইন কার্যকর করা
৫. প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা
৬. শিক্ষা ও গণসচেতনতার মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক রাজনীতির মোকাবিলা
উপসংহার: নীরবতা মানেই সম্মতি নয়
মহম্মদ আখলাখ, পেহেলু খান, তাবরেজ আনসারি, আসিফা বানু থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জাহানুর হক বা মহম্মদ হাবিবুল্লাহ—এই নামগুলো ইতিহাসে থেকে যাবে। প্রশ্ন হলো, তারা কি কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে, নাকি সমাজকে বদলানোর অনুপ্রেরণা হবে?
আজ নীরব থাকা মানে আগামী দিনের সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলা।
এই লেখাটি তাই একটি স্পষ্ট অবস্থান—
আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ভয় নয়, ন্যায়ের পক্ষে।
বিদ্বেষ নয়, সংবিধানের পক্ষে।
নীরবতা নয়, মানবতার পক্ষে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ