বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্তকে কীভাবে কবর দেওয়া হয়েছিল
—একটি নীরব রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দলিল
১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও বিতর্কিত একটি দিন। এই দিনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই দেশে দুটি ভিন্ন ন্যারেটিভ সক্রিয় রয়েছে। প্রথমটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত—বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায় রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর আরোপ করা। দ্বিতীয়টি তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক কিন্তু তথ্যসূত্রনির্ভর—যেখানে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত পরিকল্পিতভাবে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। এই লেখায় দ্বিতীয় ন্যারেটিভটি বিশ্লেষণাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হলো।
ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। তবে এই দিনটিকে সবসময় একমাত্রিক বিজয়ের দিন হিসেবে দেখেননি মওলানা ভাসানীর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। তিনি কয়েক বছর ১৬ ডিসেম্বরকে ‘কাল দিবস’ হিসেবে পালন করেন। তার যুক্তি ছিল—আত্মসমর্পণের সময় ভারতীয় জেনারেল অরোরার সঙ্গে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ব্যবসায়ী, আমলা ও সাংবাদিক উপস্থিত থাকা কেবল সামরিক ঘটনাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত বহন করছিল (দি টেলিগ্রাফ, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯২)। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক ধরনের নির্ভরতার বীজ রোপিত হয়েছিল—এমন আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছিলেন।
এই বিতর্কের মধ্যেই ঘটে আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা—বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের খ্যাতনামা শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পেশাজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। দায় চাপানো হয় রাজাকার-আলবদর ও পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর। যুদ্ধোত্তর আবেগঘন পরিবেশে এই ব্যাখ্যা সহজে গৃহীত হলেও লক্ষণীয় বিষয় হলো—পরবর্তীকালে এই ঘটনার কোনো নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি। দায় নির্ধারণের বদলে দায় এড়ানোর রাজনীতিই প্রবল হয়েছে।
সৈয়দ মবনু তার ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ গ্রন্থে পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে কথোপকথনের বিবরণ তুলে ধরেন। সেখানে রাও ফরমান আলী প্রশ্ন তোলেন—ঢাকা তখন ভারতীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে দায় কার? তার বক্তব্যে রাজাকারদের সম্পৃক্ততা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। যদিও এসব বক্তব্য বিতর্কিত, তবে এগুলো তদন্তের প্রয়োজনীয়তাই নির্দেশ করে—যা কখনোই করা হয়নি।
১৯৯২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সাংবাদিক আকবর ইমাম দি টেলিগ্রাফ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাবির এক শিক্ষকের বরাত দিয়ে জানান—ভারতীয় প্যারাট্রুপাররা ৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই ঢাকায় প্রবেশ করে এবং আত্মসমর্পণের সময়সূচি পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। এই তথ্য সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদের ‘আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল’ গ্রন্থেও উদ্ধৃত হয়েছে।
সরকার শাহাবুদ্দীন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন—১৪ ডিসেম্বরের দিকে ঢাকায় রাজাকার বা আলবদরদের কার্যকর উপস্থিতি ছিল না। অথচ কারা নিজ নিজ বাসা থেকে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যা করল, সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। নিহত পরিবারের চাপে একটি দেশীয় তদন্ত কমিশন গঠিত হলেও তার প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয়নি। লক্ষণীয়ভাবে, সেই সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। যদি রাজাকার-আলবদররাই দায়ী হতো, তবে যুদ্ধোত্তর সময়েই কেন তাদের বিচার হয়নি—এই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—বুদ্ধিজীবী হত্যা সংক্রান্ত দলিলপত্র পরিকল্পিতভাবে গুম করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শহীদুল্লাহ কায়সারের ভাই, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনিও বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। পান্না কায়সার তার লেখায় জানান—জহির রায়হান ও প্রেসিডেন্ট ভবনের স্টাফ অফিসার সেলিম নিখোঁজ হওয়ার পর বঙ্গভবন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও হয়ে যায়। এই ঘটনা কোনোভাবেই রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থিদের পক্ষে ঘটানো সম্ভব ছিল না—এমন মন্তব্য তিনি করেন।
নাফিসা কবিরকে শেখ মুজিবের দেওয়া হুমকির বর্ণনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হতে পারে—তিনি জানতেন, এই ঘটনার পেছনে এমন শক্তি রয়েছে, যার ওপর সরকারেরও নিয়ন্ত্রণ নেই। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের নীরবতা ও উদাসীনতা সন্দেহকে আরও গভীর করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবী আওয়ামী লীগের আদর্শিক অনুসারী ছিলেন না। বরং তারা বামপন্থী বা স্বাধীনচিন্তক ছিলেন এবং আওয়ামী লীগকে উদীয়মান পুঁজিবাদী শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে দেখতেন। এই আদর্শিক দূরত্বও তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর ছিল বলে গবেষকদের ধারণা।
অধ্যাপক মুনির চৌধুরী ও সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বর্ণনা হত্যার প্রচলিত ন্যারেটিভকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি তারা সত্যিই পাকিস্তানি সেনাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকেন, তবে রাজাকার-আলবদরদের হাতে তাদের নিহত হওয়ার ব্যাখ্যা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি সত্য উদ্ঘাটনের সদিচ্ছা থাকত, তবে তদন্ত রিপোর্ট, দলিলপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য কেন হারিয়ে গেল? কেন একমাত্র তদন্ত কমিটির সব আলামত অদৃশ্য হয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না।
বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত যে পরিকল্পিতভাবে কবর দেওয়া হয়েছিল, তা কেবল রাজনৈতিক অভিযোগ নয়—বরং ধারাবাহিক নথি, সাক্ষ্য ও রাষ্ট্রীয় আচরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নের মুখোমুখি না হলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব নয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ