4547715 ডা.বশির আহাম্মদ: একটি ঐতিহাসিক ছবির বিভ্রান্তি: পাকিস্তানি সেনা নয়, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর তল্লাশির দৃশ্য > expr:class='"loading" + data:blog.mobileClass'>

Wikipedia

সার্চ ফলাফল

রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

একটি ঐতিহাসিক ছবির বিভ্রান্তি: পাকিস্তানি সেনা নয়, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর তল্লাশির দৃশ্য

 



একটি ঐতিহাসিক ছবির বিভ্রান্তি: পাকিস্তানি সেনা নয়, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর তল্লাশির দৃশ্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে বহু ছবি, দলিল ও স্মৃতি যুগের পর যুগ ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে কিছু ছবি সত্য ইতিহাসের শক্ত সাক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, আবার কিছু ছবি ভুল ব্যাখ্যা, অপপ্রচার কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। আলোচিত এই ছবিটিও তেমনই একটি উদাহরণ—যেটিকে বহু বছর ধরে পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা পথচারীর লুঙ্গি খুলে হিন্দু না মুসলমান তা যাচাইয়ের দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এই দাবি পুরোপুরি ভুল।

প্রথমেই স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, আলোচিত ছবিটি কোনো পাকিস্তানি সৈন্যের নয় এবং এখানে হিন্দু বা মুসলমান পরিচয় যাচাইয়ের কোনো ঘটনাও ঘটেনি। বরং ছবিটিতে দেখা যায়, একজন ভারতীয় সেনা সদস্য পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে একজন গ্রামবাসীর লুঙ্গির ভেতরে অস্ত্র লুকানো আছে কি না—তা তল্লাশি করছেন। অর্থাৎ, এটি একটি সামরিক নিরাপত্তা তল্লাশির দৃশ্য, ধর্মীয় পরিচয় নির্ণয়ের কোনো বর্বর প্রক্রিয়া নয়।

ছবিটির প্রকৃত উৎস ও প্রামাণ্য দলিল

রিভার্স ইমেজ সার্চ এবং ঐতিহাসিক সূত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে ছবিটির প্রকৃত উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতীয় খ্যাতিমান চিত্র সাংবাদিক কিশোর পারেখ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তাঁর আলোকচিত্র গ্রন্থ ‘Bangladesh: A Brutal Birth’-এ এই ছবিটি অন্তর্ভুক্ত করেন। বইটির ২২ নম্বর পৃষ্ঠায় ছবিটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ভারতীয় সেনাদের একটি তল্লাশির দৃশ্য হিসেবে।

ছবির বিবরণী থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির পরিস্থিতিতে ভারতীয় মিত্রবাহিনী পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে বিভিন্ন গ্রামে তল্লাশি চালাচ্ছিল। সেই সময় অনেক ক্ষেত্রে গ্রামবাসীদের লুঙ্গির ভেতরে অস্ত্র লুকানো আছে কি না—তা নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের তল্লাশি করা হতো। ছবিটি সেই বাস্তবতারই একটি দলিল।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ছবিতে থাকা সেনা সদস্যের পোশাক, অস্ত্র ও ভঙ্গি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং তা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম ও আচরণের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই তথ্যই প্রমাণ করে, ছবিটির সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।

কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নামে ছবিটি ছড়ালো?

এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের দিকে। যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক নয়নিকা মুখার্জী তাঁর গবেষণাপত্র ‘The Absent Piece of Skin: Gendered, Racialized and Territorial Inscriptions of Sexual Violence during the Bangladesh War’-এ এই ছবির অপব্যবহারের ইতিহাস তুলে ধরেন।

গবেষণায় দেখা যায়, ছবিটি সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যায় ভুল ক্যাপশনসহ প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক গোলাম জিলানী নজরে মোরশেদের লেখা ‘হানাদারদের ঘাঁটি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ’ শীর্ষক কলামে ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে ছবিটির নিচে এমন একটি শিরোনাম দেওয়া হয়, যার মর্মার্থ দাঁড়ায়—পাকিস্তানি সেনারা মানুষকে উলঙ্গ করে হিন্দু না মুসলমান তা যাচাই করছে।

এই ভুল ক্যাপশনই মূলত পরবর্তী বিভ্রান্তির সূত্রপাত করে। এরপর বছরের পর বছর ধরে বই, পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ভুল ব্যাখ্যায় ছবিটি পুনঃপ্রচারিত হতে থাকে। এমনকি ২০১৬ সালেও ফেসবুকে এই ছবিকে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার প্রমাণ হিসেবে শেয়ার হতে দেখা যায়।

গবেষণায় উদ্ঘাটিত সত্য

নয়নিকা মুখার্জীর গবেষণা এই দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। তিনি কিশোর পারেখের বইয়ের মূল সূত্র ব্যবহার করে প্রমাণ করেন যে ছবির সেনা সদস্যটি পাকিস্তানি নয়, বরং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একজন সদস্য। একই সঙ্গে তিনি দেখান, ছবিটির সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

এখানে কিশোর পারেখের পরিচয় ও কাজের প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিশোর পারেখ ভারতের গুজরাটের ভাবনগর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফিল্ম মেকিং ও ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফিতে শিক্ষালাভ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ডিসেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশে আসেন। মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে, ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে, তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির ৬৭টি মূল্যবান ছবি ধারণ করেন। পরবর্তীতে এসব ছবি নিয়েই তিনি ১৯৭২ সালে ‘Bangladesh: A Brutal Birth’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন।

এই বইয়ে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আলোচিত ছবিটি ভারতীয় সেনাদের দ্বারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামবাসী তল্লাশির একটি মুহূর্ত। ফলে এখানে পাকিস্তানি সেনা বা ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক

পরবর্তীকালে ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা রিউমর স্ক্যানারও এই ছবি নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। তাদের প্রতিবেদনে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়—ছবিটি পাকিস্তানি সেনাদের নয় এবং এখানে হিন্দু-মুসলমান পরিচয় যাচাইয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং এটি ভারতীয় সেনাদের একটি নিরাপত্তা তল্লাশির দৃশ্য।

সত্য ও প্রেক্ষাপটের পার্থক্য

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন। এই ছবির দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে এ ধরনের বর্বরতা চালায়নি। ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্যাতনের ঘটনাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

তবে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিটি ছবির, প্রতিটি তথ্যের সঠিক প্রেক্ষাপট জানা অত্যন্ত জরুরি। ভুল তথ্য দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলে তা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসকেই দুর্বল করে দেয়। আলোচিত এই ছবিটি সেই ভুলেরই একটি দৃষ্টান্ত।

উপসংহার

সার্বিকভাবে বলা যায়, ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামের লোকদের লুঙ্গির ভেতরে অস্ত্র লুকানো আছে কি না—তা তল্লাশির যে ছবিটি কিশোর পারেখ ধারণ করেছিলেন, সেটিকেই ১৯৭২ সাল থেকে পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা ধর্মীয় পরিচয় যাচাইয়ের ছবি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ভুল তথ্য প্রচলিত থাকলেও, গবেষণা ও ফ্যাক্টচেকের মাধ্যমে এখন এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত—এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

ইতিহাসকে জানতে ও জানাতে হলে আবেগ নয়, বরং প্রমাণ ও প্রেক্ষাপটের ওপর ভর করেই এগোতে হবে। তাহলেই মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র:
১. কিশোর পারেখ, Bangladesh: A Brutal Birth
২. নয়নিকা মুখার্জী, The Absent Piece of Skin…, Cambridge.org
৩. Dhaka Tribune: 1971 in Kishor Parekh’s eyes
ফ্যাক্টচেক: Rumor Scanner

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

ব্যাফোমেট, কুফুরী বিদ্যা ও ইলুমিনাতির আদ্যোপান্ত

  মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা হয়েছে হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেন এ...