থার্টি ফার্স্ট নাইট: উৎসবের আড়ালে এক প্রাচীন পৌত্তলিক ছায়া
মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—নিজের ঈমানকে নিরাপদ রাখা। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আজ আমরা অনেকেই না জেনে, না বুঝে এমন সব সাংস্কৃতিক চর্চায় জড়িয়ে পড়ছি, যার শিকড় ইসলামের সঙ্গে নয়, বরং পৌত্তলিক বিশ্বাস ও দেবতাকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। “থার্টি ফার্স্ট নাইট” তেমনই একটি উদাহরণ, যা বাহ্যিকভাবে বিনোদন মনে হলেও এর ঐতিহাসিক উৎস চিন্তা করলে বিষয়টি অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
অনেকে প্রশ্ন করেন—এই থার্টি ফার্স্ট নাইটের সঙ্গে দেবতার সম্পর্ক কোথায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাচীন রোমান সভ্যতার বিশ্বাসে। রোমানদের কাছে নতুন বছর, পুরোনো বছরের সমাপ্তি এবং ভবিষ্যতের সূচনা—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল এক বিশেষ দেবতা, যার নাম জানুস।
রোমান বিশ্বাস অনুযায়ী, জানুস ছিলেন শুরু ও শেষের দেবতা। সময়ের প্রবাহ, দিকনির্দেশ, পথ, দরজা—সব কিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাকে মানা হতো। অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেবতার চেহারা ছিল দ্বিমুখী—এক মুখ পেছনের দিকে, আরেক মুখ সামনের দিকে। এই দুই মুখ দিয়েই তিনি নাকি একসঙ্গে অতীতের বিদায় আর ভবিষ্যতের আগমন প্রত্যক্ষ করতেন।
এই কারণেই রোমানরা নতুন বছরের শুরুতে জানুসকে বিশেষভাবে স্মরণ করত। তাদের বিশ্বাস ছিল—নতুন বছরে প্রবেশের আগে জানুসকে সন্তুষ্ট না করলে সামনে অগ্রসর হওয়া যাবে না। ফলে বছরের শেষ রাত এবং নতুন বছরের সূচনালগ্নে বিভিন্ন আচার, উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতা পালিত হতো এই দেবতাকে ঘিরেই।
রোমান স্থাপত্যে প্রায় প্রতিটি প্রবেশপথে জানুসের মূর্তি স্থাপন করা হতো। কারণ তিনি ছিলেন দরজার রক্ষক। এমনকি তার হাতে চাবি থাকত—যা ক্ষমতা, প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। রোমানদের কাছে চাবি শুধু দরজা খোলার বস্তু ছিল না, বরং নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতো।
শুধু তাই নয়, রোমানরা বিশ্বাস করত—যেকোনো শুভ কাজের আগে জানুসকে স্মরণ করা জরুরি। বিয়ে, সন্তানের জন্ম, ফসল রোপণ, ঋতু পরিবর্তন, এমনকি নতুন বছরের প্রথম মুহূর্ত—সবকিছুই শুরু হতো জানুসের নাম নিয়ে। তাই রোমান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে প্রথম আহ্বান, প্রথম নৈবেদ্য, প্রথম উৎসর্গ—সবই ছিল এই দ্বিমুখী দেবতার জন্য।
এখানেই মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। আজ যে “নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন” বা “থার্টি ফার্স্ট নাইট” আমরা অন্ধভাবে অনুসরণ করছি, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি ইসলামের সঙ্গে নয়; বরং পৌত্তলিক রোমান সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। আমরা হয়তো বলছি—“আমরা তো কাউকে পূজা করছি না”, কিন্তু ইসলাম শুধু নিয়ত নয়, অনুসরণকেও গুরুত্ব দেয়। যে কাজের উৎস ও প্রতীক শিরকের সঙ্গে যুক্ত, তা অনুকরণ করাও ঈমানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
নতুন বছর উদযাপনের নামে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের পরিচয় হারাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন নিজস্ব ঈদ, নিজস্ব আনন্দ, নিজস্ব জীবনব্যবস্থা। সেগুলো উপেক্ষা করে অন্য জাতির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীক গ্রহণ করা কখনোই নিরাপদ নয়।
অতএব, সময় এসেছে ভাবার। উৎসবের মোড়কে মোড়া যে কোনো সংস্কৃতি গ্রহণের আগে তার শিকড় কোথায়—তা জানা জরুরি। নইলে অজান্তেই এমন পথে হাঁটা হয়ে যাবে, যা ঈমানের জন্য ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সচেতন হোন।
অনুকরণে নয়, অনুসরণ করুন কুরআন ও সুন্নাহ।
কারণ ঈমান একবার হারালে—ফিরে পাওয়া সহজ নয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ