"ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্বাধীন জুনাগড় দখল ও গনহত্যার ইতিহাস"
ভারতে জুনাগড়ের অন্তর্ভুক্তি বলতে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর দেশীয় রাজ্য জুনাগড়ের সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে বোঝানো হয়েছে। এই ঘটনার ফলে জুনাগড় রাজ্যে বাবি রাজবংশের নবাবের শাসনের অবসান ঘটে।ভারত সরকারের তরফ থেকে কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলে অবস্থিত সেনাবাহিনীকে জুনাগড়ের চারিদিকে কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ৪ঠা অক্টোবর সেনাবাহিনীকে জুনাগড় রাজ্যের অন্তর্গত ভারতে যোগদানে ইচ্ছুক বাবারিয়াওয়াড় ও মাংরোল অঞ্চল অধিকারের কৌশল স্থির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর প্রস্তুতি হিসেবে কাথিয়াওয়াড় ডিভিশন নামে একটি সৈন্যবাহিনী গঠন করে ব্রিগেডিয়ার গুরদয়াল সিংহকে তার প্রধান করা হয়। পোরবন্দরে তিনটি যুদ্ধজাহাজ এবং রাজকোট বিমানবন্দরে আটটি টেম্পেস্ট বিমান প্রস্তুত রাখা হয়।[৪] ভারত সরকার জুনাগড়ের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে মাল পরিবহন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় নবাব তৃতীয় মহম্মদ মহবত খানজী ও তার পরিবার ২৫শে অক্টোবর জুনাগড় থেকে করাচি চলে যান। দেওয়ান শাহ নওয়াজ ভুট্টো ২৭শে অক্টোবর জিন্নাহকে রাজ্যের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ও ২৮শে অক্টোবর পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের সচিব ইকরামউল্লাহকে সাহায্যের অনুরোধ করে চিঠি পাঠান। কিন্তু পাকিস্তানের তরফ থেকে কোন সাহায্য পাঠানো হয়নি।
১লা নভেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী বাবারিয়াওয়াড় ও মাংরোল অধিকার করে নেয়। এই দিন ভুট্টো ভারতের তরফ থেকে সশস্ত্র আক্রমণের কথা উল্লেখ করে নবাবকে টেলিগ্রাম করেন। এর প্রত্যুত্তরে নবাব তাকে জুনাগড়ের মুসলিম জনগণের স্বার্থরক্ষা করার সমস্ত কর্তৃত্ব প্রদান করে টেলিগ্রাম পাঠান। ৫ই নভেম্বর জুনাগড় রাজ্য পরিষদ একটি সভায় ভুট্টোকে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার কর্তৃত্ব প্রদান করে। ভুট্টো ক্যাপ্টেন হার্ভে জনসন নামক মন্ত্রী পরিষদের একজন বরিষ্ঠ সদস্যকে ভারতীয় আধিকারিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রাজকোট পাঠান।[২] ৭ই নভেম্বর জুনাগড় রাজ্য পরিষদের একটি সভায় স্থির হয় যে, ভারত সরকারকে জুনাগড় রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করার অনুরোধ করা হবে। সেই মতো ৮ই নভেম্বর, ভুট্টো জনসনকে রাজকোটে ভারত সরকারের প্রতিনিধি নীলম বুচের নিকট পাঠিয়ে জুনাগড়ে আইন শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনের জন্য সহায়তার অনুরোধ করে করাচি চলে যান। ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে একটি আদেশনামায় লিখিত হয়, যেখানে দেওয়ান ভুট্টোর অনুরোধে ভারত সরকার দ্বারা জুনাগড় অধিগ্রহণের ঘোষণা করা হয়। ৯ই নভেম্বর ভারতীয় সেনা সরদারগড় ও বন্তভা অধিকার করে নেয় এবং ভারতীয় আধিকারিকেরা জুনাগড় পৌঁছে রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন:
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভারত-পাকিস্তানে বিভক্তির পরপরই ভারত মুসলিম শাসিত রাজ্য জুনাগড়ের ওপর সীমা লঙ্ঘন এবং জোরপূর্বক এটি দখল করে। কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিসের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, জুনাগড় মুসলিম রাজ্যগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং একটি ধনী হওয়ার অনন্য ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশ ভারতের ৫৬১টি রাজকীয় রাজ্যের মধ্যে রাজস্ব উৎপাদনের ক্ষেত্রে পঞ্চম স্থানে ছিল। এতে আরো বলা হয়েছে, ‘ভিয়েনা চুক্তির আইনের ২৬ ধারা’র স্পষ্ট লঙ্ঘন করে এটি অবৈধভাবে ভারত দখল করেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, জুনাগড়ের তৎকালীন গভর্নর নবাব মহাব্বত খানজি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিলেন এবং ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’-এ স্বাক্ষর করেছিলেন।
প্রতিবেদনে যোগ করা হয়েছে যে, এটিই প্রথম রাজকীয় রাজ্য যা ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে যোগদান করে।
এতে বলা হয়েছে, ‘রাজ্যটি আইনগতভাবে পাকিস্তানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, কারণ সেখানে জুনাগড়ের নবাব এবং কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর স্বাক্ষরিত একটি প্রকৃত ‘অধিযোগের উপকরণ রয়েছে’।
এতে বলা হয়েছে, জুনাগড়ের নবাব যখন যোগদান সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগত বিশদ আলোচনার জন্য পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচি সফর করেন, তখন ভারত একে হস্তক্ষেপের সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে এবং তার সৈন্যদের অগ্রসর করিয়ে ১৯৪৭ সালের ৯ নভেম্বর রাজ্যটি দখল করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক আইন ও বিভাজন পরিকল্পনা লঙ্ঘন করে ভারত কাশ্মীর এবং জুনাগড় উভয়কেই বেআইনিভাবে দখলে রেখেছে’।
প্রতিবেদনে যোগ করা হয়েছে, রাজ্যটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা, কারণ ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন।
প্রতিবেদনে উপসংহারে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তান জুনাগড় ইস্যুতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কারণ তারা এটিকে তার নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং কাশ্মীর এবং জুনাগড় উভয়ই একই ভাগ্য বরণ করেছে, কারণ শুধুমাত্র এ রাজ্যের জনগণই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে’।
সূত্র : এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
.jpeg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ